জ্বলদর্চি

পুলিশী আক্রমণে শহীদ সংগ্রামীরা/ভাস্করব্রত পতি

মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ১৯১
পুলিশী আক্রমণে শহীদ সংগ্রামীরা

ভাস্করব্রত পতি

"বাজরে শিঙ্গা বাজ এই রবে 
শুনিয়া ভারতে জাগুক সবে 
সবাই স্বাধীন এ বিপুল ভবে 
সবাই জাগ্রত মানের গৌরবে 
ভারত শুধু কি ঘুমায়ে রবে?"
১৮৭০ সালে ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের 'এডুকেশন গেজেট' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ভারতসঙ্গীতটি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জনগণকে আরও বেশি সংগ্রামমুখর করে তোলার প্রাণপণ প্রচেষ্টা। ধীরে ধীরে ভারতবাসীর মনে ব্রিটিশবিরোধী বীজবপন শুরু হয়। মুষ্টিমেয় মানুষজনের থেকে তা সম্প্রসারিত হয় গণ আন্দোলনে। সার্বিক মানুষজন ধীরে ধীরে বিরোধিতা শুরু করে ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে।

ফলে একসময় শুরু হয়ে যায় প্রবল দ্বন্দ। একদিকে স্বাধীনতাকামী ভারতবাসীর মুক্তির কামনায় জীবনপণ লড়াই, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের শাসন শোষণের প্রক্রিয়া জারি রাখার ব্রিটিশ আভিজাত্য বজায় রাখা। ব্রিটিশ সরকারের প্রতিহিংসাপরায়ণতার দৃষ্টান্ত ফুটে উঠতে থাকে স্বতস্ফূর্ত গণসংগ্রামের বিরুদ্ধে। আর সাধারণ মুক্তিকামী মানুষজন ক্রমশঃ একজোট হয়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে থাকে। এই দুই তরফের 'দ্বন্দ্ব'তে শাসকের অস্ত্র 'দমন পীড়ন'। যার ফল হয়ে ওঠে মারাত্মক। অস্ত্রধারী পুলিশের জান্তব আক্রমণে ঘটতে থাকে একের পর এক মৃত্যুর লেলিহান শিখা। এইসব মৃত্যু কিন্তু অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষজনের দুর্দমনীয় মানসিকতার পরিচয়বাহী হয়ে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে মানুষের মনে। মেদিনীপুরের এইসব শহীদ বিপ্লবীর নাম শুধু ইতিহাসের পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে রয়েছে। এঁরাই মেদিনীপুরের মানুষ রতন। 

তমলুকের শহীদ তালিকা ~
তমলুক মহকুমার কংগ্রেসের সম্পাদক অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তমলুক থানা অভিযান কর্মসূচী নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত হয় ১৯৪২ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর থানা দখল করা হবে। এজন্য ২৯শে সেপ্টেম্বর পাঁশকুড়া, নরঘাট ও মহিষাদলের তিনটি পাকা রাস্তার ২০টি স্থানে বড় বড় গাছের গুঁড়ি ফেলে এবং গর্ত করে দেওয়া হয়। নদীঘাটে নৌকাগুলোকে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। ভেঙে ফেলা হয় ৩০ টি ক্যালভার্ট। শুরু হল থানা দখল অভিযান। 

তমলুক শহরের বানপুকুরের পাড়ে দেওয়ানি কোর্টের কাছে গুলিবিদ্ধ হন মাতঙ্গিনী হাজরা সহ পুরীমাধব প্রামাণিক, জীবনচন্দ্র বেরা, লক্ষ্মীনারায়ণ দাস এবং নগেন্দ্রনাথ সামন্ত। তমলুক থানার মধ্যে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয় বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী, রামচন্দ্র বেরা এবং ভূষণচন্দ্র জানার। কাকগেছিয়া, হিজলবেড়িয়া থেকে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা শঙ্করআড়া খালপাড় দিয়ে থানায় ঢোকে। তাঁদেরও ছত্রভঙ্গ করতে গুলি চালায় পুলিশ। এতে মৃত্যু হয় নিরঞ্জন পরিয়ালের। শঙ্করআড়া পুলের কাছে ব্যবত্তারহাট, মহিষাদল, বাড় অমৃতবেড়িয়া থেকে আসা লোকজনকে ঠেকাতে গুলি চালানো হয়। এখানে তিনজন পূর্ণচন্দ্র মাইতি, নিরঞ্জন জানা এবং উপেন্দ্রনাথ জানার মৃত্যু হয় গুলিবিদ্ধ হয়ে।
॥ বানপুকুরপাড় ।।
১. মাতঙ্গিনী হাজরা (৭৩), আলিনান -২৯.৯.১৯৪২
২. পুরীমাধব প্রামাণিক (১৫), দ্বারিবেড়িয়া, সুতাহাটা -২৯.৯.১৯৪২
৩. জীবনকৃষ্ণ বেরা (১৬), মথুরী -২৯.৯.১৯৪২
৪. লক্ষ্মীনারায়ণ দাস (১৩), মথুরী -২৯.৯.১৯৪২
৫. নগেন্দ্রনাথ সামন্ত (২৫), আলিনান -২৯.৯.১৯৪২
।। শঙ্করআড়া পুল ।।
৬. উপেন্দ্রনাথ জানা (১৬), খঞ্চি -২৯.৯.১৯৪২
৭. পূর্ণচন্দ্র মাইতি (২৪), ঘাটুয়াল -২৯.৯.১৯৪২
৮. নিরঞ্জন জানা (১৭), তমলুক শহর -২৯.৯.১৯৪২
।। তমলুক থানা ।।
৯. নিরঞ্জন পারিয়াল, হিজলবেড়িয়া -২৯.৯.১৯৪২
১০. রামচন্দ্র বেরা (৪৫), কিয়াখালি -২৯.৯.১৯৪২
১১. বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী (২৫), নিকাশী -২৯.৯.১৯৪২
১২. ভূষণচন্দ্র জানা (৩৫), পাইকপাড়ি -২৯.৯.১৯৪২
॥ পুতপুতিয়া ॥
১৩. বিপিনবিহারী মণ্ডল, কিসমত পুতপুতিয়া -৬.১০.১৯৪২
১৪. চন্দ্রমোহন দিণ্ডা, কিসমত পুতপুতিয়া  -৬.১০.১৯৪২

মহিষাদলের শহীদ তালিকা ~
তমলুকের মতো ১৯৪২ এর ২৯ শে সেপ্টেম্বর মহিষাদল থানা দখলের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল। এখানে নেতৃত্ব দেন সুশীল কুমার ধাড়া। তাঁর সহযোগী ছিলেন গোপীনন্দন গোস্বামী। প্রায় ২০ হাজার মানুষ এদিন থানা দখলে অংশগ্রহণ করেন। সে সময় পুলিশের গুলিতে প্রথমেই দু'জন ভোলানাথ মাইতি এবং শ্রীহরিচরণ দাস মারা যান। তবুও কেউ থামেননি। এবার গুলি চালায় রাজবাড়ির গোর্খাবাহিনী। বহু মানুষ আহত হন। মৃত্যুমুখে পতিত হন পঞ্চানন দাস, যোগেন্দ্রনাথ দাস, আশুতোষ কুইল্যা, সুধীরচন্দ্র হাজরা, সুরেন্দ্রনাথ মাইতি (পিতা-জগন্নাথ), রাখালচন্দ্র সামন্ত, সুরেন্দ্রনাথ মাইতি (পিতা বিপিনবিহারী), দ্বারিকানাথ সাহু, প্রসন্নকুমার ভূঁইঞ্যা, ক্ষুদিরাম বেরা এবং গুণধর হ্যাণ্ডেল।
১. আশুতোষ কুইলা (১৯), মাধবপুর, ২৯.৯.১৯৪২
২. পঞ্চানন দাস (২৯), হরিখালি
৩. যোগেন্দ্রনাথ দাস (৩৫), সুন্দরা
৪. সুরেন্দ্রনাথ মাইতি (১৬), সুন্দরা, পিতা - বিপিনবিহারী
৫. শ্রীহরিচরণ দাস (৩২), বক্সীচক
৬. গুণধর হ্যাণ্ডেল (৩০), খাগদা (নন্দীগ্রাম)
৭. সুধীরচন্দ্র হাজরা (২৭), কড়ক
৮. সুরেন্দ্রনাথ মাইতি (২৭), গোপালপুর, পিতা - জগন্নাথ
৯. দ্বারিকানাথ সাহু (৫৭), তাজপুর
১০. ভোলানাথ মাইতি (৩৬), কালিকাকুণ্ডু
১১. রাখালচন্দ্র সামন্ত (২৮), ঘাগরা
১২. প্রসন্নকুমার ভূঁইঞ্যা (৪৪), রাজারামপুর
১৩. ক্ষুদিরাম বেরা (৩০), চিঙুরমারি -২৩.১০.১৯৪২ 
(এনার ২৯.৯.১৯৪২ তারিখে গুলি লাগে, কিন্তু মৃত্যু হয় ২৪ দিন পর)
॥ দনিপুর ॥
১৪. শশীভূষণ মান্না, বাড় অমৃতবেড়িয়া, ৮.৯.১৯৪২
১৫. সুরেন্দ্রনাথ কর, বাড় অমৃতবেড়িয়া, ৮.৯.১৯৪২
১৬. ধীরেন্দ্রনাথ দিগর, টিকারামপুর, ৮.৯.১৯৪২

ভগবানপুরের শহীদ তালিকা ~
।। মাশুড়িয়া ।। 
১৯৩২ এর ৪ ঠা জুলাই 'রাজবন্দী' দিবস উপলক্ষে ১৪৪ ধারা অমান্য করে আয়োজিত হয় জনসভা। সে সময়কার ১৩ নং ইউনিয়নের অর্জুননগর গ্রামে ডাঃ বিপিনবিহারী গায়েন ও ডাঃ রাসবিহারী পালের নেতৃত্বে ৫ নং ইউনিয়নের মাসুড়িয়া গ্রামে আয়োজিত হয় জনসভা। নেতৃত্ব দেন সতীশচন্দ্র গিরি এবং ধীরা দাস। হাজারের বেশি মানুষ উপস্থিত ছিলেন সেদিন। পুলিশ এসে প্রথমে লাঠিচার্জ করে। পরে নিরস্ত্র এবং উত্তেজিত জনতা ইট ছুঁড়লে দারোগা নীরদ দত্তের নির্দেশে গুলি চালানো হয়। এতে মৃত্যু হয় ৫ জনের।
১. হেমন্তকুমার নায়ক, পূর্ব মাশুড়িয়া
২. কামদেব প্রধান (৭৫), কন্দবেড়িয়া
৩. অভয় মণ্ডল, বিভীষণপুর
৪. রামচাঁদ সামন্ত, পচহরি
৫. রমানাথ মাইতি, কিশোরপুর (গুলি লাগে ৪.৭.১৯৩২ সালে। একমাস পরে তাঁর মৃত্যু হয়)
।। শিববাজার ।। 
১৯৪২ এর ২৯ শে সেপ্টেম্বর ভগবানপুর থানা দখল অভিযান সুনির্দিষ্ট হয় বিকাল ৩-৩০ মিনিটে। সেই মোতাবেক মোট ৪ টি মিছিল আসবে বলে ঠিক হয়। পূর্বদিকের মিছিলে নেতৃত্ব দেন পীতবাস দাস এবং ভূপেন্দ্রনাথ মাইতি। পশ্চিমদিকের মিছিলে নেতৃত্ব দেন প্রিয়নাথ পণ্ডা ও বরেন্দ্রনাথ দাস। উত্তরদিকের মিছিলে নেতৃত্ব দেন অশ্বিনীকুমার মাইতি এবং খগেন্দ্রনাথ বেরা। দক্ষিণ দিক থেকে যে মিছিল আসে তাতে নেতৃত্ব দেন হৃষিকেশ গায়েন এবং মুরারিমোহন শাসমল। সে সময় পুলিশ সুধাংশু দাশগুপ্ত এবং অমূল্য ঘোষের নেতৃত্বে প্রস্তুত বিপ্লবী জনতাকে ঠেকানোর জন্য। অবশেষে চলল গুলি। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় ১৩ জনের। আর চিকিৎসারত অবস্থায় মৃত্যু হয় আরও ৩ জনের। সব মিলিয়ে ১৬ জন মারা যান সেদিনের ঘটনায়।
১. বিভূতিভূষণ দাস, বর্তন, ২৯.৯.১৯৪২
২. যুধিষ্ঠির জানা, সিমুলিয়া, পিতা -ইন্দ্রনারায়ণ
৩. ভূষণচন্দ্র সামন্ত, বেনাউদা, পিতা -ভীখনচন্দ্র
৪. তারকনাথ জানা, বেঁউদিয়া, পিতা -উদয়চাঁদ
৫. জগন্নাথ পাত্র, নূনহণ্ড, পিতা -কৈলাস
৬. জ্ঞানদাচরণ মাইতি, টোটানালা, পিতা -রঘুনাথ
৭. রঘুনাথ মণ্ডল, বেতুলিয়াচক, লালপুর, পিতা -জনার্দন
৮. শ্যামাচরণ মাইতি, বাহাদুরপুর, পিতা-দ্বারিকানাথ
৯. হরিপদ মাইতি, গুড়গ্রাম, পিতা -ঈশ্বরচন্দ্র
১০. শ্রীনাথচন্দ্র প্রধান, কলাবেড়িয়া, (ইনিই প্রথম নিহত হন। এঁর ভাই কামদেব প্রধান মাশুড়িয়াতে পুলিশের গুলিতে মারা যান)
১১. পরেশচন্দ্র জানা, গড়াবাড়, পিতা -শ্যামাচরণ
১২. কৃষ্ণমোহন চক্রবর্তী, বাসুদেবপুর, এগরা
১৩. রজনীকান্ত মাইতি, খাজুরাড়ী, পিতা -রামপদ
১৪. ভূপতিচরণ দাস, শ্যামসুন্দরপুর (সবং থানা), পিতা-কালাচাঁদ
১৫. ভরতচন্দ্র সিংহ, নেলুয়া গোপালচক, পিতা -মধুসূদন
১৬. ধীরেন্দ্রনাথ দলপতি, কসবা, ৫.১০.১৯৪২, পিতা -নীলকণ্ঠ (থানা হাজতে ১৮ দিন বেঁচেছিলেন)।

এছাড়া এখানকার আরও কয়েকজনের তালিকা ~
১. উপেন্দ্রনাথ জানা, বরুরভেড়ি, ১৯.১১.১৯৪২, মেদিনীপুর জেল হাজতে মৃত্যু হয়।
২. ব্যোমকেশ কামিল্যা, নছিপুর, ২৫.৯.১৯৪২ (পুলিশি প্রহারে মৃত্যু)
৩. গৌরহরি কামিল্যা, বাজাবেড়িয়া (নরঘাট), ১৯৪২
৪. গোবিন্দচন্দ্র ঘোড়ই, কাজলাগড়, ১৯৪২
৫. রাধাকান্ত দাস, কলাবেড়িয়া, ১৯৪২
৬. হরিচরণ বেরা, বেনাউদা, ১৯৪২
৭. সর্বেশ্বর জানা, মহিষাগোট (কাঁথি থানা), অক্টোবর, ১৯৪২
৮. কেদারনাথ মাইতি, বাহাদুরপুর, ৩.৪.১৯৪৩, পিতা -সীতানাথ

সুতাহাটার শহীদ তালিকা ~
॥ কুঁকড়াহাটি ।। 
১. ব্রজগোপাল দাস, পানা, ১.১০.১৯৪২
২. শচীন্দ্রনাথ ঝুলকি (লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনে মৃত্যু)
৩. বসন্তকুমার শাসমল

এগরার শহীদ তালিকা ~
॥ চোরপালিয়া ॥
১৯৩০ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর চোরপালিয়া গ্রামের ব্রজ পণ্ডা ও ক্ষীরোদ জানার বাড়িতে এসে জনগণকে ট্যাক্স দেওয়ার ঘোষণা করে পলিশ। সেখানে জন্মায়তে হয় গ্রামবাসীরা। অনেকেই ট্যাক্স দিতে চাইলেও বেশিরভাগ লোক ট্যাক্স মকুব করতে আবেদন জানায়। এ নিয়ে উত্তেজনা বাড়লে পুলিশ নিরস্ত্র জনতার ওপর লাঠিচার্জ করে। ছত্রভঙ্গ জনতার কয়েকজন ব্রজ পণ্ডার পুকুরে পড়ে যায়। সেখানেও পুলিশ বেধড়ক লাঠিচার্জ করে জলে পড়া লোকজনের ওপর। এ ঘটনায় ৫ জন শহীদ হন পুলিশের লাঠি চালনায়। তাঁরা হলেন --
১. দিবাকর বেরা (২২), কুলটিকরি -৮.৯.১৯৩০
২. বৈকুণ্ঠনাথ জানা (১৮), কনকপুর -৮.৯.১৯৩০
৩. কার্তিকচন্দ্র রাণা (১৯), জাগুলিয়া -৮.৯.১৯৩০
৪. গোপীনাথ দাস (৪০), সরিষা -৮.৯.১৯৩০
৫. রুদ্রনারায়ণ শাসমল (৪৫), বহড়দা -৮.৯.১৯৩০
॥ আলঙ্গিরী ॥
১. পরশুরাম কামিল্যা, আলঙ্গিরী, ১৩.১০.১৯৪২
২. মুরারীমোহন বেরা, ১৩.১০.১৯৪২
৩. ভগীরথ রাউল, আলঙ্গিরী, ১৩.১০.১৯৪২
৪. নিত্যানন্দ বেরা
৫. কার্তিকচন্দ্র কামিল্লা, ৭.৯.১৯৩০
৬. কৃষ্ণমোহন চক্রবর্তী, গড়বাসুদেবপুর, ২৯.৯.১৯৪২ (ভগবানপুরে থানা আক্রমণে মৃত্যু)

পটাশপুরের শহীদ তালিকা ~
॥ প্রতাপদীঘি ॥
লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের আক্রমণে নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে পটাশপুরের প্রতাপদীঘিতে। এই ঘটনা পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় এবং মেদিনীপুর জেলায় প্রথম। ১৯৩০ সালের ১লা জুন প্রতাপদীঘি খালপাড়ে লবণ সত্যাগ্রহ পালিত হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নেতৃত্ব দেন নবদ্বীপ পট্টনায়েক, কুসুমকুমারী মণ্ডল, বরেন্দ্রনাথ মণ্ডল প্রমুখেরা। এদিকে পুলিশ হাজির টিকরাপাড়া এম.ই. হাইস্কুলে। আন্দোলন শুরু হতেই আক্রমণ চালায় পুলিশ। গ্রেপ্তার হন অধরচন্দ্র দাস, কুচলচরণ মান্না, প্রফুল্লকুমার সী সহ আরও অনেকে। এরপর গ্রামবাসীরা ক্যাম্পের অভিমুখে গেলে পুলিশ গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই দু'জনের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত হয়ে আর একজন মারা যান এক সপ্তাহ পরে।
১. রামকৃষ্ণ দাস (২৫), বাগমারি -০১.০৬.১৯৩০
২. কার্তিকচন্দ্র মিশ্র (১৭), শ্রীরামপুর -০১.০৬.১৯৩০
৩ উপেন্দ্রনাথ মিশ্র, খড়িকা পাটনা -০৭.০৬.১৯৩০
॥ টেপরপাড়া ॥
৪. গুণধর সাঁতরা (অমরপুর) -০৮.১০.১৯৪২
॥ চন্দনখালি ॥
৫. হরেকৃষ্ণ বর, চন্দনখালি -১৮.১২.১৯৪২ (বাল্যগোবিন্দপুর চন্দনখালি এলাকায় গুলিবর্ষণে মৃত্যু)
৬. সর্বেশ্বর সাঁতরা, অমরপুর (মেদিনীপুর জেলে মৃত্যু)
৭. সুরেন্দ্র ধাড়া, কল্যাণপুর (ভারতছাড়ো আন্দোলনে গ্রেপ্তার হয়ে কাঁথি জেলে মৃত্যু)
বানপুকুরের পাড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে মাতঙ্গিনী হাজরার নিথর দেহ। ছবিটি তুলেছিলেন বতুবাবু।

রামনগরের শহীদ তালিকা  ~
॥ নরণ্ডিয়া ॥
কাঁথি মহকুমার এলাকায় লবণ সত্যাগ্রহ করতে গিয়ে দ্বিতীয়বার মৃত্যুর ঘটনা ঘটে রামনগরের নরণ্ডিয়াতে। ১৯৩০ সালের ৬ ই জুন আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ। কিন্তু প্রায় ছয়শত মানুষকে দমাতে না পেরে গুলি চালায়। অনেকে আহত হন। এর মধ্যে বিপ্রপ্রসাদ বেরা গুলিবিদ্ধ হন। আহত অবস্থায় ১২ ই জুন তাঁর মৃত্যু হয়।

এই রামনগরের খেরশাইতে ১৯৩০ সালের ১লা জুলাই ট্যাক্স বন্ধ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ফের গুলি চালায় পুলিশ। এখানে ছিলেন স্বয়ং জেলাশাসক পেডী এবং দুই পুলিশ আধিকারিক গফুর ও সামসুদ দোহা। ট্যাক্স বন্ধ আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় প্রথম শহীদ হন হাড়োপুর গ্রামের বীরনারায়ণ বাউড়ি। এছাড়া আরও দু'জনের মৃত্যু হয়। তাঁদের নাম মেলেনি।
১. বিপ্রপ্রসাদ বেরা, বড়রাঙ্কুয়া -১২.০৬.১৯৩০ (গুলি চালানো হয় ৬.৬.৩০)
॥ খেরসাই ।
২. বীরনারায়ণ বাউড়ি, হাড়োপুর -০১.০৭.১৯৩০ (জেলাতে চৌকিদারী ট্যাক্স আদায় ব্যাপারে ইনিই প্রথম গুলিবিদ্ধ শহীদ)
৩. (নাম মেলেনি) ০১.০৭.১৯৩০ 
8. (নাম মেলেনি) ০১.০৭.১৯৩০
॥ বেলবনি ॥
রামনগরের বেলবনি গ্রামে পুলিশের আক্রমণে মারা যান মোট ১০ জন। এখানে বলাইলাল দাস মহাপাত্রের নেতৃত্বে বহু যুবকদের নিয়ে স্থানীয় বিদ্যাপীঠে গড়ে ওঠে একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। বেলবনির সেই প্রশিক্ষণ শিবিরে পুলিশ আক্রমণ করলে জনগণ প্রতিহত করে। তখন নির্বিচারে গুলি চালনা করা হয়। এদিন বেলবনি ছাড়াও চন্দনপুরের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর ওপরও আক্রমণ করা হয়।
১. ভজহরি রাউৎ, বেলবনি -২৭.০৯.১৯৪২
২. ভীমাচরণ দাস মহাপাত্র, লালপুর -২৭.০৯.১৯৪২
৩. বৈষ্ণবচরণ দাসমহাপাত্র, লালপুর -২৭.০৯.১৯৪২
৪. চৈতন্যকুমার বেরা, মাধবপুর -২৭.০৯.১৯৪২
৫. রজনীকান্ত ঘোষ, সোনাকনিয়া -২৭.০৯.১৯৪২
৬. শিবপ্রসাদ ভুঁইঞ্যা, কলাপুঞ্জা -২৭.০৯.১৯৪২
৭. হেমন্তকুমার দাস, কাদুয়া -২৭.০৯.১৯৪২
৮. বংশীধর কর, কাদুয়া -২৭.০৯.১৯৪২
৯. চন্দ্রমোহন জানা, ঘোলা -২৭.০৯.১৯৪২
১০. চন্দ্রমোহন দাস, বেলবনি -১৭.১০.১৯৪২

নন্দীগ্রামের শহীদ তালিকা ~
॥ ঈশ্বরপুর ॥
আগস্ট আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নন্দীগ্রামে পুলিশী আক্রমণের ঘটনা ঘটে তিনবার। ১৯৪২ সালের ২৭ শে সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ পুলিশ আক্রমণ করে ঈশ্বরপুরের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর ক্যাম্পে। দুজনকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু বিপ্লবচেতনায় জারিত মানুষজন দলে দলে ছুটে এলে, শঙ্কিত বাহিনী লাঠিচার্জ ও গুলি করে। ঘটনাস্থলেই চারজনের মৃত্যু হয়।
১. তরেন্দ্রনাথ মণ্ডল (৩২), গৌরচক -২৭.৯.১৯৪২
২. বানু রাণা ওরফে বানেশ্বর, (৫২), বামুনআড়া -২৭.৯.১৯৪২
৩. ভূতনাথ সাহু (৩৫), বামুনআড়া -২৭.৯.১৯৪২
৪. গোবিন্দচন্দ্র দাস (৪০), কুলুপ -২৭.৯.১৯৪২
॥ বৃন্দাবনপুর ॥
পরের দিন অর্থাৎ ২৮ শে সেপ্টেম্বর পুলিশ ঈশ্বরপুর সহ কাশীপুর এবং কোটালপুরে ব্যাপক ধরপাকড়, অত্যাচার চালায়। ক্ষিপ্ত মানুষ পুলিশের পিছু নিলে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ফের গুলি চালায়। এ ঘটনায় আরও দু'জনের মৃত্যু হয়।
৫. গৌরহরি কামিল্লা (১৬), শ্রীকৃষ্ণপুর -২৮.৯.১৯৪২
৬. গুণধর সাহু (৩৫), ধান্যশ্রী -২৮.৯.১৯৪২
।। নন্দীগ্রাম থানা ।। 
২৯ শে সেপ্টেম্বর নন্দীগ্রামে থানা দখল অভিযান হয়নি। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ৩০ শে সেপ্টেম্বর হবে। সেই মোতাবেক রাস্তা কাটা, রাস্তায় কাঠের গুড়ি ফেলা, টেলিগ্রাফ লাইন কাটা, নৌকা ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটানো হয় প্রথমে। বিশাল মিছিল করে থানা দখলের লক্ষ্যে বড় পুকুরের পাড়ে রাস্তা ধরে এলে পুলিশের বন্দুক গর্জে ওঠে। মারা যান মোট ৫ জন থানা দখলকারী।
৭. বিহারীলাল করণ (২২), আমড়াতলা -৩০.৯.১৯৪২
৮. শেখ আলাউদ্দিন (৪০), মহম্মদপুর -৩০.৯.১৯৪২
৯. পরেশচন্দ্র গিরি (২২), বাহাদুরপুর -৩০.৯.১৯৪২
১০. বিহারীলাল হাজরা (২৪), হরিপুর -৩০.৯.১৯৪২
১১. পুলিনবিহারী প্রধান (২২), সন্ধ্যাখালি -৩০.৯.১৯৪২
১২. গোপাল চন্দ্র মাঝি, নন্দীগ্রাম -২৫.৩.১৯৩২ (গুলিতে আহত হয়ে মৃত্যু এপ্রিলে)
১৩. গৌরাঙ্গ দাস, কাণ্ডপসরা -২৭.৫.১৯৩২ (প্রহারে মৃত্যু)
১৪. অর্জুনকুমার মণ্ডল, চকচিল্লা (৬.৫.১৯৩২ এ গুলিবিদ্ধ হন, ১১.৫.১৯৩২ এ মৃত্যু হয়)
১৫. মুচিরাম দাস, বিরুলিয়া (৮.১০.১৯৪২ এ ঘোলপুকুর গ্রামে পুলিশের গুলিতে আহত, কয়েকদিন পরে মারা যান)

পিংলার শহীদ তালিকা ~
।। ক্ষীরাই ।। 
১৯৩০ সালের ১১ ই জুন পূর্ণিমার দিন পিংলার ক্ষীরাই গ্রামে চৌকিদারী কর বন্ধের আন্দোলনকে দমাতে জেলাশাসক জেমস পেডীর নির্দেশে ঘটেছিল 'বাংলার জালিয়ানওয়ালাবাগ ঘটনা'। সম্পূর্ণ নিরস্ত্র মানুষজনের ওপর ক্ষীরাই গ্রামে সেদিন নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিল ৭০-৮০ জনের সশস্ত্র  পুলিশ। এতে ১১ ই জুন মারা গিয়েছিল ২০ জন, পরের দিন ১২ ই জুন ১ জন। আরও পরে ১ জন সহ মোট ২২ জন শহীদ হন ক্ষীরাইয়ের গুলি চালনার ঘটনায়। ১. ভীমাচরণ জানা, মালিগ্রাম -১১.৬.১৯৩০
২. গোপীনাথ খাঁড়া (গুণীন্দ্র), কুঞ্জপুর
৩. অধরচন্দ্র সিং, পূর্ব ক্ষীরাই
৪. অদ্বৈতচরণ ধাড়া, পূর্ব ক্ষীরাই
৫. নরেন্দ্রনাথ পাড়ই, পূর্ব ক্ষীরাই
৬. বাবুলাল জানা, পূর্ব ক্ষীরাই
৭. ঈশ্বরচন্দ্র মণ্ডল, কুলতাপাড়া
৮. নরেন্দ্রনাথ দাস, পূর্ব ক্ষীরাই
৯. গোবিন্দচরণ সিংহ, কুঞ্জপুর
১০. পূর্ণেন্দু ঘোড়ই (পুনু), গোবর্ধনপুর
১১. লক্ষ্মণচন্দ্র বেরা, সিতিবিন্দা
১২. রামপদ বেরা (রামচাঁদ), সিতিবিন্দা
১৩. মহেশ্বর মাইতি, রাজমা
১৪. শ্রীমন্তচরণ মাইতি, দণ্ডশিরা
১৫. জগন্নাথ ভক্তা, কুঞ্জপুর
১৬. কালাচাঁদ মাঝি, কুলতাপাড়া
১৭. ত্রৈলোক্যনাথ গুছাইত, রাত্রাপুর
১৮. উপেন্দ্রনাথ পালই, কুলতাপাড়া
১৯. গোবিন্দচন্দ্র দে, কাঁটাপুকুর
২০. ধনঞ্জয় মণ্ডল, পূর্ব ক্ষীরাই
২১. ধরণীধর জানা, পূর্ব ক্ষীরাই
২২. বিপিনবিহারী খাটুয়া, মালিগ্রাম
পুলিশের গুলিতে ক্ষীরাইতে নিহত শহীদ স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ

ঘাটালের শহীদ তালিকা ~
॥ চেঁচুয়াহাট ॥
অত্যাচারী দারোগার প্রতি মানুষের সমবেত ঘৃণা এই হত্যাকাণ্ডের মূলে ছিল। দাসপুরের চেঁচুয়াহাটে পিকেটিংয়ের সময় বিপ্লবী মৃগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের সঙ্গে দারোগা ভোলানাথ ঘোষের কথা কাটাকাটি হয়। দারোগাকে এরপর জনগণ পিটিয়ে মেরে ফেলে। সেই সাথে ছোট দারোগা অনিরুদ্ধ সামন্তকেও জনতা মেরে ফেলে। এরপরেই শুরু হয় পুলিশী অত্যাচার। ১৯৩০ সালের ৪ ঠা জুন দলবল নিয়ে চেঁচুয়াহাটে হাজির হয় এডিএম আবদুল করিম এবং দারোগা ইয়ার মহম্মদ। শুরু হয় পুলিশের অত্যাচার। পুলিশের কাছে আবেদন জানালেও কোনও সুরাহা হয়নি। বিকেলে বিভিন্ন দিক থেকে ধরপাকড় শুরু হয়। ৬ ই জুন ছিল দশহরা। পুলিশী অত্যাচার বন্ধের দাবিতে প্রচুর মানুষের মিছিল শুরু হয়। আর এতেই ভয় পেয়ে নৃশংসভাবে গুলি চালায় পুলিশ। মৃত্যু হয় ১৪ জন নিরস্ত্র গ্রামবাসীর।
১. চন্দ্রকান্ত মান্না, তেমুয়ানি -৬.৬.১৯৩০
২. শশীভূষণ মাইতি, সয়লা
৩. কালিপদ শাসমল, জালালপুর
৪. ভৃগুরাম পাল
৫. দেবেন্দ্রনাথ ধাড়া, জোতভগবান
৬. সতীশচন্দ্র মিদ্যা, খাড় রাধাকৃষ্ণপুর
৭. রামচন্দ্র পাড়ই, জ্যোতঘনশ্যাম
৮. নিতাই পড়্যা, পাঁচবেড়িয়া
৯. অবিনাশ দিণ্ডা, বাঁশখানি
১০. সত্য বেরা, বাঁশখানি
১১. পূর্ণচন্দ্র সিংহ, খাড়
১২. মোহনচন্দ্র মাইতি
১৩. অশ্বিনী দোলই, চক বোয়ালিয়া
১৪. কালি দিণ্ডা, গোবিন্দপুর

কাঁথির শহীদ তালিকা ~
॥ মহিষাগোট ॥
১৯৪২ সালের ২০ শে সেপ্টেম্বর কাঁথির পিছাবনী থেকে পুলিশ কয়েকজন কংগ্রেস কর্মীকে গ্রেপ্তার করার পর স্থানীয় মানুষের প্রবল চাপের মুখে পড়ে তাঁদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু পরবর্তীতে পুলিশী অত্যাচার নেমে আসতে পারে, এই আশঙ্কায় পুলিশকে আটকাতে মহিষাগোটের কাছে কাঁথি রামনগর রাস্তা কেটে দেয়। যথারীতি পুলিশ এলে গ্রামবাসীদের সঙ্গে ঝামেলা শুরু হয় ২২ শে সেপ্টেম্বর। রাস্তা মেরামতির নির্দেশ দিলেও গ্রামবাসীদের সহযোগিতা না পেয়ে গুলি চালায় পুলিশ। এই ঘটনায় ৬ জনের মৃত্যু হয়।
১. কুঞ্জবিহারী শীট, আদমবাড় -২২.৯.১৯৪২
২. অনন্তকুমার দাস, বেলতলিয়া -২২.৯.১৯৪২
৩. রামপ্রসাদ জানা, ঘোল (রামনগর) -২২.৯.১৯৪২
8. যামিনীকান্ত কামিল্লা, তাজপুর -২২.৯.১৯৪২
৫. অনন্তকুমার পাত্র, পাতাপুখুরিয়া -২২.৯.১৯৪২
৬. সর্বেশ্বর প্রামাণিক, দক্ষিণ শীতলা (রামনগর) -২২.৯.১৯৪২
৷৷ ভাইটগড় ॥
মারিশদায় গ্রামবাসীরা পুলিশদের গতিপথে বাধা দেয় ১৯৪২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। রাস্তা কেটে দিয়েছিল তাঁরা। কিন্তু পুলিশ ভয় দেখিয়ে সেই রাস্তা মেরামতি করায়। সে সময় এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় পুলিশ, রাস্তা মেরামতির কাজ চলাকালীনই পুলিশ কাঁথি ফিরে যাওয়ায় গ্রামবাসীরা পুনরায় রাস্তা কেটে দেয়। পরের দিন ১ লা অক্টোবর আবারও পুলিশ আসে সেখানে। রাস্তা কাটা অবস্থা দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়ে। সেখানকার ২৫ টি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেখান থেকে ভাইটগড় বাজার পর্যন্ত রাস্তায় রুটমার্চ করে। ভাইটগড় বাসস্ট্যান্ডের কাছে পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে তিনজন মারা যান।
১. অমূল্যকুমার শাসমল, উকিলচক -০১.১০.১৯৪২
২. সুধীরকুমার মাইতি, বাসুদেববেড়িয়া
৩. গোরাচাঁদ মাইতি, বাসুদেববেড়িয়া
এছাড়াও মৃত্যু হয় -
১. গোবিন্দচন্দ্র পাল, মির্জাপুর (লবণ সত্যাগ্রহে যোগ দিয়ে পুলিশের প্রহারে আহত হয়ে মৃত্যু)
২. শচীন্দ্রনাথ বারিক, বাড়সুবর্ণনগর (৮.১২.১৯৪২ কলকাতার রাজপথে মিছিলের সময় পুলিশের গুলিতে মৃত্যু)
৩. সর্বেশ্বর পাত্র, পাতাপুখুরিয়া
৪. হরেকৃষ্ণ জানা, আদমবাড়, (কারাবাসকালে মৃত্যু)

সবং থানার শহীদ তালিকা ~
॥ শ্যামসুন্দরপুর ॥
১. হৃদয়রঞ্জন বাগ
২. হৃদয়রঞ্জন কামিল্লা, শ্যামসুন্দরপুর
৩. কালিপদ সাউ
৪. শুকদেব বেরা, দুবরাজপুর (পরে মৃত্যু হয় আহত অবস্থায়)
৫. সনাতন বাগ, বিষ্ণুপুর (বুলেটিন প্রকাশের মেশিনের সন্ধান না দেওয়ায় প্রহারের ফলে মৃত্যু)

দাঁতন থানার শহীদ তালিকা ~
॥ পোঁয়াহরিপুরে লাঠিচার্জ ॥
১. নিম জানা-১৯৩০

কেশপুর থানার শহীদ তালিকা ~
১. লালু পচা (পিটুনির জন্য মৃত্যু) -১৯৩০
॥ কোটা ॥
২. সতীশচন্দ্র ভুঁইঞ্যা, কুঁয়াপুর -১৯৪২
৩. সতীশচন্দ্র মাইতি, কোটা -১৯৪২
॥ তোড়িয়া ॥
৪. রামপদ ঘোষ (১৪), তোড়িয়া - ১১.১১.১৯৪২
৫. পঞ্চানন ঘোষ (৩৭), তোড়িয়া -১১.১১.১৯৪২
৬. শশীবালা দাসী, তোড়িয়া-১১.১১.১৯৪২
৭. উর্মিলা বালা পড়্যা, খেতুয়া (লবণ সত্যাগ্রহ, পূর্ব মেদিনীপুরের প্রথম মহিলা শহীদ) (মৃত্যু-১৯৩০ এর জুন মাসের শেষ সপ্তাহে)

১৯৩১ সালের ১৬ ই সেপ্টেম্বর খড়্গপুরের হিজলী জেলে রাতে বেজে ওঠে পাগলা ঘণ্টি। জেলবন্দীদের ওপর জেলের বন্দুকধারী পুলিশগণ শুরু করে অবাধ গুলিবর্ষণ। সেদিন নিরস্ত্র জেলবন্দীদের ওপর এহেন ন্যক্কারজনক আক্রমণে মারা যান সন্তোষকুমার মিত্র এবং তারকেশ্বর সেনগুপ্ত। যদিও তাঁরা মেদিনীপুরের বাসিন্দা ছিলেন না। কিন্তু মেদিনীপুরের বুকে ঘটনাটি ঘটেছিল।এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নেতাজী জানালেন, "এই নির্মম ঘটনার কোনো কারণ দেখা যায় না। ঘরের ভিতরে প্রবেশ করে গুলি বর্ষণের কি কারণ ছিল? বন্দীরা সাধারণত চক্রান্তকারী ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন সমাজের উচ্চ চরিত্রের ব্যক্তি। আন্তর্জাতিক নীতি অনুসারে যুদ্ধ বন্দীদের প্রযোজ্য সম্মান তাঁদের প্রাপ্য।" এই ঘটনাকে সামনে রেখে কবিগুরু লিখেছিলেন 'প্রশ্ন' কবিতা- "আমি যে দেখেছি গোপন হিংসা কপট রাত্রি ছায়ে/হেনেছে নিঃসহায়ে / আমি যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে / বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।” এই ঘটনায় জওহরলাল নেহরু মন্তব্য করেন- "হিজলীর বন্দীশালায় গুলি দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত কম্পিত করে তুলেছে। শিক্ষিত সম্মানীয় যুবকবৃন্দ বিনা বিচারে বন্দীশালায় নীত হয়ে বাস করেছিলেন, এরূপ ব্যক্তিদের উপর গুলি কাপুরুষোচিত এবং ক্ষমার অযোগ্য।”
১. সন্তোষকুমার মিত্র
২. তারকেশ্বর সেনগুপ্ত
ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে মেদিনীপুরের এইসব শহীদদের জন্য আজ আমাদের স্বাধীনতা লাভ হয়েছে। আক্ষরিক অর্থে এঁরাই মেদিনীপুরের মানুষ রতন।
🍂

Post a Comment

0 Comments