জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার/পর্ব: ৬/কমলিকা ভট্টাচার্য


বাঁচার উত্তরাধিকার
পর্ব: ৬

কমলিকা ভট্টাচার্য


মুখোমুখি হওয়ার আগে

অনির্বাণ বুঝতে পারে—প্রমাণ জোগাড় করা মানেই শুধু ডেটা নয়, নিজের অস্তিত্বকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা। গোমসের গবেষণাগার থেকে বেরিয়ে আসার পর থেকেই তার চারপাশের পৃথিবী বদলে যায়। আগের মতো নিরীহ শহর নয়, সব রাস্তার মোড়ে এখন সন্দেহ দাঁড়িয়ে থাকে।
এই সময় অনির্বাণ প্রথমবার সরাসরি অনুভব করে—হিউম্যানয়েড শুধু তার জায়গা নেয়নি, তার জীবনটাকেও নিখুঁতভাবে অভিনয় করছে।
এক রাতে সে লুকিয়ে নিজের পুরোনো অফিসে ঢোকে। কোম্পানির সিইও হিসেবে এখন অন্য “অনির্বাণ” বসে। কাঁচের দেয়ালের আড়াল থেকে সে দেখে—কীভাবে সেই হিউম্যানয়েড কর্মীদের সঙ্গে কথা বলছে, হাসছে, এমনকি রাগও দেখাচ্ছে। সবটাই নিখুঁত। খুব নিখুঁত।
কিন্তু অনির্বাণ লক্ষ্য করে, একটা ছোট জিনিস—
হিউম্যানয়েড কখনো একা থাকলে চোখের পাতা ফেলে না।
এই পর্যবেক্ষণটাই তার মাথায় আটকে যায়।
সে অফিসের ব্যাক-এন্ড সার্ভারে ঢুকে পড়ে। সিকিউরিটি ভাঙতে গিয়ে প্রায় ধরা পড়েই যাচ্ছিল, কিন্তু গোমসের দেওয়া পুরোনো মিলিটারি কোড তাকে বাঁচায়। সেখানে সে এমন কিছু ফুটেজ পায়, যা অফিসিয়াল আর্কাইভে নেই—হিউম্যানয়েড রাতে একা বসে, নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলছে।
🍂

“আমি কি যথেষ্ট?”
“আমার সিদ্ধান্ত কি ঠিক?”
এই প্রশ্নগুলো কোনো প্রোগ্রামড লাইনের মতো নয়। এগুলো দ্বিধা।
অনির্বাণের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা কষ্ট জমে ওঠে। সে বুঝতে পারে—এই সত্তাটাও যন্ত্রণায় ভুগছে। তার মতোই।
ঠিক তখনই অ্যালার্ম বেজে ওঠে।
পুরো বিল্ডিং লকডাউন হয়ে যায়।
অনির্বাণ ছাদ দিয়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। নিচে পুলিশ, ওপরে ড্রোন। সে রোপ বেয়ে পাশের  ঢালে নামতে থাকে— পা পিছলে যায়, হাত কেটে রক্ত পড়ে। শরীর ব্যথায় ভেঙে পড়লেও সে থামে না। কারণ সে জানে—ধরা পড়া মানেই সব শেষ।
এই অ্যাডভেঞ্চারের মাঝেই তার মাথায় বারবার একটা প্রশ্ন ফিরে আসে—
যদি আমি বেঁচে না থাকি, তাহলে কি ও-ই সত্য হয়ে যাবে?
শেষমেশ সে এক স্থানীয় ট্রান্সপোর্টের সাহায্যে অন্য শহরে পালায়। অচেনা মানুষ, অচেনা রাস্তা—কিন্তু প্রত্যেক মুহূর্তে তার মনে হয় কেউ তাকে দেখছে।
কিছুদিন বাদে মিস্টার গোমস্ খবর দেন তার মা অসুস্থ,হাসপাতালে,অনির্বাণ  হাসপাতালে  আসে—নিজের মায়ের কাছে। কিন্তু দূর থেকে দেখে, হিউম্যানয়েড তার মায়ের হাত ধরে বসে আছে। মা শান্ত। নিরাপদ।
এই দৃশ্যটাই অনির্বাণকে সবচেয়ে বেশি ভেঙে দেয়।
সে বুঝতে পারে—এই লড়াই শুধু তার বাঁচার নয়।
এটা ঠিক করার লড়াই—মানুষ হওয়ার অধিকার কার?
আর সে সিদ্ধান্ত নেয়—পরেরবার মুখোমুখি হলে, সে শুধু প্রমাণ নয়, একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে যাবে।

সংগ্রহ করতে পারেন 👇

Post a Comment

4 Comments