প্রবাসী ভারতীয় দিবস
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ৯ই জানুয়ারি প্রবাসী ভারতীয় দিবস, প্রবাসী ভারতীয় কাদের বলে,এর ইতিহাস কি, আসুন এই সম্পর্কে সবকিছুই জেনে নিই।
যেখানেই থাকি, ভারত আমার পরিচয় — এই গর্বই প্রবাসী ভারতীয় দিবসের মূল চেতনা।”
ভারত একটি প্রাচীন সভ্যতার দেশ, যার ইতিহাস হাজার বছরের ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। এই দেশের সংস্কৃতি, শিক্ষা, বিজ্ঞান, ব্যবসা, সাহিত্য ও দর্শনের প্রভাব আজ শুধু ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রান্তে। বিশ্বের নানা দেশে বসবাসকারী ভারতীয়রা তাঁদের কর্মদক্ষতা, মেধা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের মর্যাদা বৃদ্ধি করে চলেছেন। এই প্রবাসী ভারতীয়দের অবদানকে স্বীকৃতি জানাতে এবং তাঁদের সঙ্গে দেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে প্রতি বছর ৯ই জানুয়ারি পালন করা হয় “প্রবাসী ভারতীয় দিবস”।
এই দিনটি শুধু একটি স্মরণ দিবস নয়, বরং এটি প্রবাসী ভারতীয়দের সঙ্গে মাতৃভূমির আবেগ, আত্মিক সম্পর্ক এবং জাতীয় উন্নয়নে তাঁদের অবদানকে সম্মান জানানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
প্রবাসী ভারতীয় দিবসের ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট
ভারতের ইতিহাসে ৯ই জানুয়ারি একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। কারণ ১৯১৫ সালের ৯ই জানুয়ারি, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে ফিরে আসেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকাকালীন তিনি ভারতীয়দের অধিকার রক্ষার আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন এবং সত্যাগ্রহ আন্দোলনের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন।গান্ধীর প্রত্যাবর্তন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দেয়। তাই তাঁর স্মৃতিকে সম্মান জানাতে এবং প্রবাসী ভারতীয়দের অবদান স্মরণ করতে ২০০৩ সাল থেকে ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ৯ই জানুয়ারিকে প্রবাসী ভারতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় লাল বাহাদুর শাস্ত্রী সরকারের নেতৃত্বাধীন উচ্চ পর্যায়ের কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী।
🍂
প্রবাসী ভারতীয় বলতে বোঝায়, সেইসব ভারতীয় নাগরিক বা ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষ, যাঁরা জীবিকা, শিক্ষা, গবেষণা, ব্যবসা বা অন্যান্য কারণে বিদেশে বসবাস করছেন।
প্রবাসী ভারতীয়দের প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়—
NRI (Non-Resident Indian) – যাঁরা ভারতীয় নাগরিক হয়েও বিদেশে বসবাস করছেন
PIO (Person of Indian Origin) – যাঁরা অন্য দেশের নাগরিক হলেও তাঁদের পূর্বপুরুষ ভারতীয়
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ২০০টিরও বেশি দেশে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লক্ষের বেশি প্রবাসী ভারতীয় বসবাস করেন। তাঁরা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রবাসী জনগোষ্ঠী।
ভারতীয়দের বিদেশে যাত্রা শুরু হয়েছিল বহু শতাব্দী আগে। প্রাচীনকালে ব্যবসায়ী, পর্যটক ও ধর্মপ্রচারকরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপে যেতেন, ঔপনিবেশিক যুগে
ব্রিটিশ শাসনামলে বহু ভারতীয় শ্রমিককে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল—আফ্রিকা,
ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ,ফিজি,
মরিশাস,দক্ষিণ আফ্রিকা,
মালয়েশিয়া।তাঁরা সেখানে কঠোর পরিশ্রম করে নতুন সমাজ গড়ে তুলেছিলেন।
স্বাধীনতার পর ভারতীয়রা শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা ও ব্যবসার ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত হন।আজ ভারতীয়রা সিলিকন ভ্যালি, লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, সিঙ্গাপুর, দুবাই, টরন্টো প্রভৃতি শহরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
প্রবাসী ভারতীয়দের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান অনেক...
১.অর্থনৈতিক অবদানে বলা যায়,প্রবাসী ভারতীয়রা প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ভারতে পাঠান। এই রেমিট্যান্স ভারতের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
বর্তমানে ভারত বিশ্বের সর্বাধিক রেমিট্যান্স প্রাপ্ত দেশ। এই অর্থ দেশের—দারিদ্র্য হ্রাস,শিক্ষা, স্বাস্থ্যের
কাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করে
২. প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান
ভারতীয় বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদরা নাসা, গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যাপল, অ্যামাজন, টেসলার মতো প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করছেন। তাঁরা ভারতের গবেষণা ও প্রযুক্তি খাতেও অবদান রাখছেন।
৩. শিক্ষা ও গবেষণায়
বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় অধ্যাপক ও গবেষকরা কাজ করছেন। তাঁদের গবেষণার ফলাফল মানবজাতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
৪.সংস্কৃতি বিস্তারেও নানা অবদান আছে প্রবাসী ভারতীয়দের যেমন,
যোগব্যায়াম, আয়ুর্বেদ, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত, নৃত্য, যোগ, ধ্যান— এসবকে বিশ্বমঞ্চে জনপ্রিয় করে তুলেছেন প্রবাসী ভারতীয়রা।
আজ আন্তর্জাতিক যোগ দিবস পালিত হচ্ছে, যার পেছনেও প্রবাসী ভারতীয়দের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
প্রবাসী ভারতীয় দিবসের উদ্দেশ্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রবাসী ভারতীয় দিবস পালনের প্রধান উদ্দেশ্যগুলো হলো—প্রবাসী ভারতীয়দের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া
তাঁদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা,ভারতীয় সংস্কৃতির বিশ্বব্যাপী প্রসার
বিনিয়োগ ও উন্নয়নে তাঁদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি,তরুণ প্রবাসী ভারতীয়দের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, এই দিবস প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যে দেশের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে।
এই দিবস উপলক্ষে ভারত সরকার বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করে,আন্তর্জাতিক সম্মেলন,সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,
ব্যবসা ও বিনিয়োগ ফোরাম
যুব প্রবাসী সম্মেলন, আলোচনা সভা,
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রবাসী ভারতীয় নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী, বিজ্ঞানী ও সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিরা এতে অংশগ্রহণ করেন।
ভারত আজ বিশ্বের দ্রুততম উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর একটি। ডিজিটাল বিপ্লব, মহাকাশ গবেষণা, চিকিৎসা, পরিবেশ ও শক্তি খাতে ভারত নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।
এই অগ্রযাত্রায় প্রবাসী ভারতীয়রা বিনিয়োগকারী,
পরামর্শদাতা,গবেষক
উদ্ভাবক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
ভারতের ভবিষ্যৎ গঠনে তাঁদের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে।
ভারত সরকার প্রবাসী ভারতীয়দের সুবিধার জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছে—
OCI কার্ড (Overseas Citizen of India)
বিশেষ ভিসা সুবিধা, বিনিয়োগ প্রকল্প,অনলাইন পরিষেবা,আইনি সহায়তা
এসব উদ্যোগ প্রবাসী ভারতীয়দের সঙ্গে দেশের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করছে।
এই দিবস শুধু ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী ভারতীয়রা এই দিনটি উদযাপন করেন। ভারতীয় দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা ও সংবর্ধনার আয়োজন করে। এর ফলে বিশ্বমঞ্চে ভারতের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হয়।প্রবাসী ভারতীয়দের আবেগ ও মাতৃভূমি প্রবাসে থেকেও ভারতীয়রা তাঁদের ভাষা, খাবার, উৎসব ও সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে রাখেন।
দীপাবলি, হোলি, দুর্গাপূজা, ঈদ, পঙ্গাল, বৈশাখী— সব উৎসবই তাঁরা প্রবাসে পালন করেন। এই আবেগই তাঁদের ভারতের সঙ্গে অটুট বন্ধনে বেঁধে রাখে।
প্রবাসী ভারতীয় দিবস কেবল একটি দিন নয়, এটি একটি আবেগ, একটি পরিচয় এবং একটি গর্বের প্রতীক। প্রবাসী ভারতীয়রা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থেকেও তাঁদের হৃদয়ে ভারতকে বহন করে চলেছেন। তাঁদের শ্রম, মেধা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে ভারত আজ বিশ্বমঞ্চে গর্বিতভাবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। ৯ই জানুয়ারি আমাদের মনে করিয়ে দেয়,ভারত শুধু একটি ভৌগোলিক সীমানা নয়, ভারত একটি অনুভূতি।
0 Comments