পুলককান্তি কর
– কী রে শিউলি, চুপ করে বসে আছিস কেন? আমার উপর রাগ করেছিস? খুব আন্তরিক হয়ে জিজ্ঞাসা করল মনোদীপ।
একথার কোনও উত্তর দিল না শিউলি। ওকে নিরুত্তর দেখে আবার মনোদীপ বলল, ‘কীরে রাগ করেছিস?’
– রাগ করার মতো কাজ করিস কেন ?
– স্যরি। আর করব না।
– এ নিয়ে অন্তত একশবার বললি ‘আর করব না।’ কোনওবার তো কথা রাখিস না।
– কী করব বল! তোর আঙুলগুলো যখন তোর কোলের ওপর অকারণ খেলা করে, আমারও ইচ্ছে হয় ওদের ছুঁই, ওদের সাথে খেলি। তখন আর ওই সব প্রমিস মনে থাকে না। আর তোরও বাবা বলিহারি, একটু না হয় আঙুলগুলো ছুঁই, তাতে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়?
– কী অশুদ্ধ হয় আমি জানিনা দীপ, তবে আমি পছন্দ করি না – এটা তোকে বোঝাতে চাই। অকারণে তুই আমাকে ছুঁবি না।
– সে তো আমিও পছন্দ করি না তুই আমাকে দীপ বলে ডাকিস। কতবার বলেছি আমাকে শুধু 'মন' বলে ডাক– কই ডাকিস না তো? সব সময় তোর পছন্দের দাম আছে, আমার নেই?
কপট মজা করার চেষ্টা করল মনোদীপ। শিউলিকে এর পরেও গম্ভীর থাকতে দেখে সে আবার বললো ‘ঠিক আছে বাবা, স্যরি। আর ধরবো না তোকে। তবে তুই একটা কাজ করতে পারিস। বন্ধু হিসেবে তোর উচিৎ এমন কিছু করা যাতে আমার তোকে ছুঁতে ইচ্ছে না করে।’
– কী সেটা? কী এমন আমি করতে পারি যাতে তোর এমন ইচ্ছে হবে না?
– এ তো খুব সিম্পল। গ্লাভস পরে থাক। এমন সুন্দর আঙুল যদি দেখতে না পাই, ইচ্ছে হবে না। আবার মজা করলো মনোদীপ।
এবার হেসে ফেলল শিউলি। ‘তুই কি লোকের সামনে আমায় পাগল বানাতে চাস? শীতকাল হলে না হয় তাও মানা যায়, এই গরম কালে পরে এলে লোকে নির্ঘাত ভাববে – এ পাগল, নয়তো হাতে কোনও চর্মরোগ ফোগ আছে।’
– সে লোকে ভাবলে ভাবুক। আমার চোখের সামনে তোর হাত খোলা থাকলে আমার কখন কী ইচ্ছে জেগে উঠবে, তার গ্যারান্টি দিতে পারবো না শিউলি।
– তুই বুঝিস না কেন দীপ, আমি তোর সাথে সিরিয়াসলি কথা বলছি!
– আমিও তো সিরিয়াস। তোর বিষয়েও। মজা করে, গায়ে ছুঁয়ে, কোমল স্বরে, গদগদ গলায়, প্রার্থনা করে– সমস্ত ভাবেই তোকে আমি বলেছি, আমি তোকে ভালবাসি। তোর সাথে পাকাপাকি বন্ধন চাই আমি। আমি তো কখনও তোকে টাইমপাশ হিসাবে ভাবতে চাই না শিউলি!
🍂
– তোকেও তো আমি নানাভাবে বুঝিয়েছি দীপ – এ সম্ভব নয়।
– কেন? সম্ভব নয় কেন, শুনি?
– দীপ তোর থেকে আমি কমসে কম পাঁচ বছরের বড়। শিং ভেঙ্গে একই কোর্সে পড়ছি বলে এই নয়, তুই আমার বয়সের সমান।
– দূর পাগলি। আজকাল ওটা কোন ম্যাটার করে নাকি? আমার তো দিদি-ফিদিকেই বিয়ে করতে ভালো লাগে।
– এ আবার কী কথা?
– আরে বাবা, বিয়ের পরও তো বউ-এর শাসনে থাকতে হবে! বয়সে ছোট মেয়ের শাসন সহ্য করার থেকে দিদি-বৌ এর শাসনে থাকা অনেক ভালো। অতটা গায়ে বা মনে কষ্ট হবে না তাতে।
– আবার মজা করছিস?
– তো কী করব শিউলি? আজকাল এটা কোনও বিষয়? আমরা কোন বাপ-মায়ের পছন্দে বিয়ে করতে যাচ্ছি যে ঠিকুজি-কুষ্টী-বয়স-জাত মানতে হবে? তোকে অন্তত দশ জন সেলিব্রিটি দেখাতে পারি যারা তুলনায় বেশী বয়সের মেয়েকে বিয়ে করেছে। আরে আমাদের এখনকার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট – কী যেন নাম ...
– ইমানুয়েল ম্যাকঁর।
– হ্যাঁ । উনি তো তাঁর ছোটবেলার শিক্ষিকাকেই মন দিয়ে ফেলেছিলেন। বড় হয়ে তাঁকেই বিয়ে করেছেন – অন্তত চল্লিশ বছরের বড়!
– ওসব বড় মানুষদের জন্য দীপ। আমাদের জন্য নয়।
– কেন? বড় মানুষেরা যা করবেন, আমরা তো তাঁদেরই অনুসরণই করব। ছোটবেলায় পড়োনি ‘মহাজ্ঞানী মহাজন যে পথে করে গমন হয়েছে প্রাতঃ স্মরণীয়/সেই পথ লক্ষ্য করে, স্বীয় কীর্তি ধ্বজা ধরে আমরাও হব বরণীয়?’ বেশ নাটকীয় ঢঙে আবৃত্তি করে হাসতে লাগলো মনোদীপ।
শিউলি কিছু বলল না। ওর নিজেকে অসহায় বোধ হতে লাগল। ওকে চুপ থাকতে দেখে মনোদীপ বলল 'কী হলো ম্যাডাম, এ যুক্তি ধোপে টিকবে না। অন্য কোনও যুক্তি থাকলে দাও দেখি তাকে কাটতে পারি কিনা?’
– এতে তর্ক বিতর্কের তো কিছু নেই দীপ। এ সম্পর্ক হতে পারে না – এই কথাটাই যথেষ্ট।
– কেন হতে পারে না শিউলি?
– পারে না কারণ আমি চাইনা বলে। রূঢ় গলায় বলল শিউলি।
– কেন চাস না? তুই কি আমার পছন্দ করিস না?
চুপ করে রইল শিউলি।
– কী হল বল? তুই আমাকে পছন্দ করিস, নাকি করিস না? হ্যাঁ না না ?
– সব কথার এক কথায় উত্তর হয় না দীপ। তুই যেভাবে পছন্দের কথা বলছিস ...
অসহিষ্ণু গলায় মনোদীপ আবার বলল, ‘হ্যাঁ না না?’
– না ।
– যাঃ। আমি বিশ্বাসই করি না শিউলি।
– আমি বললাম তো 'না'। বিশ্বাস করা না করা তোর ব্যাপার।
এ কথা শুনেই মাথাটা নীচু করে নিল মনোদীপ। বলল, ‘তাহলে তো আর কোনও কথাই থাকে না। আমি প্রাণপণ তোকে ভালোবাসতে পারি, কিন্তু এমন কিছু তো জানি না যাতে তুই আমায় ভালবাসবি, আমার মতো মানে আমি যেভাবে তোকে চাই, তুইও সেই ভাবে আমাকে চাইবি। ঠিক আছে, চেষ্টা করব তোকে আর বিরক্ত না করার। উঠে গিয়ে নিজের বাইকে স্টার্ট দিল মনোদীপ। শিউলিকে তখনও চুপ করে বসে থাকতে দেখে বলল, ‘কী হল? আয়। তোকে মুচিপাড়ার মুখটাতে নামিয়ে দিয়ে যাব।’
– তুই যা দীপ। আমি বাসে করে চলে যাবো।
– বিষয়টা তো মিটে গেল শিউলি। আরো যখন এক বছর একসাথে থাকতে হবে, মুখ ফোলাফুলি করে তো লাভ নেই। আমরা বন্ধু হয়েও তো থাকতে পারি।
– আমি মুখ ফোলাফুলি কখন করলাম দীপ? আমার তো সেই সন্ধ্যায় সিটি মলে যেতে হবে। এখন মুচিপাড়ায় গিয়ে আবার বেরোব? দু দু দফা টাকা খরচা হবে। তাই ভাবছিলাম একেবারেই দোকানেই চলে যাব। এখান থেকে পাঁচটা নাগাদ বেরোলে হবে।
– এখন কটা বাজে?
– চারটেই তো ভালো করে বাজেনি।
আজ আসলে ওদের ক্লাশ ট্লাশ তেমন ছিল না। দেড়টা নাগাদ দীপই ঝোঁক ধরল ‘চল না, ডিয়ার পার্ক এ যাই। ওখানে বিকালে চা-পেঁয়াজি খেয়ে বাড়ী ফেরা যাবে।’ শিউলিও দেখল এ সময় ওর পিজিতে ফিরে গেলে পড়া হবেনা কিছুই । পাঁচটায় ও সিটি মলের একটা দোকানে অ্যাকাউন্টস এর কাজকর্ম করে দেয়। এ বাবদ মাসে ছ হাজার টাকা পায় সে। হাল্কা ডিউটি। সাড়ে পাঁচটা থেকে নটা। এই টাকাটা তার খুব প্রয়োজন। টুকটাক খরচা আর পিজির খরচটা উঠে যায়। পিজিটা নামমাত্রই। একজন বৃদ্ধ দম্পতির ছোট একতলা বাড়ীর একটা ঘরে ভাড়া থাকে সে। সকালের চা বিস্কুটটা শুধু ওঁদের সাথে খায়। খায় মানে ও’ই বানিয়ে খাওয়ায় ওঁদের। দুপুরে রাতে খাওয়া নিজের। একটা ছোট ক্যাবসন গ্যাস স্টোভে সেদ্ধ করে কিছু খেয়ে নেওয়া– বাঁচবার জন্য যতটুকু রসদ লাগে আর কি! ভদ্রলোকেরা সজ্জন। ওর অন্তত নিরাপত্তার সমস্যা নেই এখানে। নইলে আজকাল দুর্গাপুর আর ততখানি নিরাপদ নয়। শহর বেড়ে ওঠার সাথে সাথে নানান ধরণের মানুষের সমাগম শহুরে কলুষতা অনেকখানি বাড়িয়ে দেয়। এখান থেকে ওদের বি.এড কলেজটা দূর পড়ে। সেই বিধাননগরে। তাও ভার্গব যখন ওকে নিয়ে ঘর খুঁজতে বেরিয়েছিল, এই বাড়ীটাই সবচেয়ে পছন্দ হয়েছিল তাদের। যাতায়াতে অটোরিক্সার ভাড়াটা যায় অনেকটা। তাও তো মনোদীপ অনেকদিনই বাইকে করে তার আসা যাওয়ার খরচটা বাঁচিয়ে দেয়। অবশ্য ও এই বাড়িতে আসে না কোনওদিন। মুচিপাড়ার মোড়েই নামিয়ে দেয়। শিউলি মনোদীপকে তখনও বাইকে বসে থাকতে দেখে বলল, ‘কীরে ঘোড়ার জিন টেনে বসে আছিস কেন? হয় চলে যা, নইলে স্টার্ট বন্ধ করে পাশে এসে বোস।’
– চল বরং ওদিকে গিয়ে চা খেয়ে আসি। মাথাটা খুব ধরেছে।
– তোর আজকাল এত মাথা ধরছে কেন রে দীপ? চোখে প্রব্লেম হচ্ছে নাকি? আমাদের কলেজের পাশেই তো হাসপাতাল। চোখটা দেখিয়ে নে না?
– মাথার আর দোষ কি শিউলি? যদি কখনও একপাক্ষিক প্রেম করতিস তবে বুঝতিস স্ট্রেস কাকে বলে ?
– প্লীজ দীপ, আর ওসব কথা না। ওতে স্ট্রেস আরো বাড়বে। তোর স্ট্রেস কমানোর মতো কোনো প্রবোধ বাক্য তোকে আমি দিতে পারবো না।
– তুই এত নির্দয় শিউলি? তোকে দেখে বোধ হয় ওই গানটা লেখা হয়েছিল – ‘পাষাণ হৃদয় তাই আজও গলেনি, সত্যি হৃদয় হলে গলে যেতো।’
মিষ্টি করে হাসলো শিউলি। বলল, ‘চল চা খেয়ে আসি।’
(২)
আজ দোকানে ডেবিট ক্রেডিট অঙ্কে আর মন বসল না শিউলির। চলে আসার সময়ে মনোদীপের করুণ মুখটাই খালি মনে পড়ছিল তার। ছেলেটি এমনিতে খুব ভালো। সরল, পরোপকারী। সবচেয়ে বড় কথা, ওর ছলচাতুরী নেই একেবারেই। ও কোনও একটা স্কুলের প্যারাটীচার ছিল। কেমিস্ট্রিতে এম.এস.সি। প্রথমে বি.এড করেনি। এবার চান্স পেয়ে এসেছে এখানে। সেই প্রথম দিন থেকেই ও শিউলির সাথে সাথে ঘোরে। পাশাপাশি বসে ক্লাশ করে, একসাথে ক্যান্টিনে যায়, চা খায়। ওর বাড়ি বেশি দূরে নয়। আসানসোলের কাছাকাছি। বাইকেই যাতায়াত করে। পয়সাওয়ালা বাড়ীর ছেলে। প্রথমদিকে তো ও জানতো না শিউলির সিটিমলে পার্ট টাইম জবের কথা। শিউলি বলতে সঙ্কোচ করতো বলেই বলেনি। অথচ শুরুর দিকে মনোদীপ প্রায় দিনই ওকে নিয়ে হয় সিনেমা নয় পার্কে যাওয়ার জেদ ধরতো বলেই ও একদিন বলে দিয়েছে ওর সন্ধের ডিউটির কথা। মাসে দুবার শনি রবিবারে শিউলি কলকাতায় বাড়িতে ফেরে। যে শনি রবি দুর্গাপুরে থাকে, সেই দিনগুলোয় বাহানা খুঁজতে খুঁজতে শিউলির অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। মনোদীপের কোনও না কোনও বায়না লেগেই থাকে। তবু ছেলেটা বড় মায়াময়! এত কিছুর পরেও ওর ওপর রাগ করতে ইচ্ছে করে না মোটেই। আজ শিউলি এতখানি কড়া না হলেই পারতো! কড়া না হলেও তো অল্প কথায় শোনে না মনোদীপ। কাল কি একবার দুঃখ প্রকাশ করবে শিউলি? অবশ্য করলে তো আবার পূর্ণমষিকো ভবঃ। এসব ভাবতে ভাবতেই দেখে ওর মোবাইলে মনোদীপের কল, 'কী রে শিউলি, তোর প্রোজেক্ট পেপার জমা দেওয়ার কথা ছিল, রেডি করেছিস?’
– না। সময় পাইনি।
– সে ঠিক আছে। ম্যাটারগুলো কিভাবে সাজাবো বলে দে। আমি এখনই বসেছি ওই নিয়ে। করে দেব।
– তুই ছাড় না দীপ। নিজেরটা কর।
– তুই কি ভাবিস নিজেরটা না করেই তোরটা করতে বসেছি? অতখানিও আমি হাঁদোল কাঁদোল নই ?
– এটা আবার কী ভাষা?
– ও আমি মাঝে মাঝে শব্দ বানাই।
– সে তো জানি। কিন্তু এটি কি ল্যাঙ্গুয়েজ?
– বিশুদ্ধ মনোদীপিয় বাংলা।
– এর মানে ?
– প্রসঙ্গ বুঝে দেখ । মানে কি বোঝা যায়নি?
– তা বোঝা গেছে।
– কী বুঝলি বল না?
– যা বাবা! এর আবার মানে বলা যায় নাকি? আচ্ছা সমস্যায় পড়লাম তো! একটু আগে আমি তোকে এর অর্থ জিজ্ঞাসা করলাম, এখন আমি এর অর্থ তোকে বলব?
– বলনা শিউলি বল না! কী বুঝলি শুনি! অনুনয় করল মনোদীপ।
– ওইতো – 'এতখানি আমি হাঁদা বোকা রাখাল প্রেমিক নই!’
– বাঃ এক্সেলেন্ট! তুই কমার্স না পড়ে লিটারেচার পড়তে পারতিস শিউলি।
– তা পারতাম। সে যাই হোক তুই আর আমার কত করে দিবি? এই তো পুরো প্রাকটিস টিচিং মডিউলটা তুই রেডি করে দিলি। আর ঋণ বাড়াস না দীপ।
– এভাবে ভাবছিস কেন? তুই পার্ট টাইম জব না করলে কি আর আমি তোরটা করে দিতাম? জানি তোর সময় বাঁচে না, তাই কিছুটা তোকে হেল্প করার চেষ্টা করছি।
– তুই না থাকলে আমার বি.এডের এই পরিক্রমা সত্যি খুব কঠিন হয়ে যেত দীপ।
– বা বা। তুই তো তাহলে আমাকে তোর জন্য প্রয়োজনীয় মনে করিস! এ আমার পরম সৌভাগ্য রে শিউলি।
– তোকে আমার সহপাঠী হিসেবে পাওয়া আমারও সৌভাগ্য দীপ।
– আর গ্যাস খাওয়াস না শিউলি। তুই জানিস না আমার হজম শক্তি? এরপর ফটাস করে ফেটে যাবো তখন বুঝবি।
– যাঃ। এতে গ্যাস খাওয়ার কিছু নেই। যাইহোক কাল তো ক্লাশে দেখা হবে, তখন ম্যাটারগুলো বলে দেব।
– কালকে ম্যাডামকে কীভাবে ম্যানেজ করবি? কালই তো দেখানোর কথা ছিল।
– ও কিছু একটা বলে দেব।
– ঠিক আছে । আজ আমি পেজ টেজ গুলো ডিজাইন করে রাখছি। ম্যাটারগুলো পরে ঢুকিয়ে দিলে হবে ।
– থ্যাঙ্ক ইউ দীপ। রাখ এখন। গুড নাইট।
– এখন কী গুড নাইট ? রাত্রে আর কল করবো না বুঝি?
– এই তো কথা বললি! আর কতবার বলবি?
– যতবার প্রাণ চায়। আমার তো ইচ্ছে করে সব সময় তোর সাথে কথা বলি। খালি তুই চাস না বলে বলি না।
– আচ্ছা নে। রাখ এবার।
ফোনটা রেখে শিউলি মনে মনে ভাবল ‘এই তোর প্রমিস!’
(৩)
সরস্বতী পূজা শেষ হয়ে গেল গতকাল। ওদের কলেজে বেশ ধুমধাম করে পুজো হলো এবার। এখানকার হাওয়ায় এখন পুরোপুরি বসন্তের পরিসর। চারপাশে রুক্ষ মাটি যেন হঠাৎ করে যৌবনের শোভা পেয়ে মদমত্তা হয়ে জয় করে নিতে চাইছে গাছ-গাছালির মন। ওদের এবার এক্সকারশন ঠিক হয়েছে পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ে। কাল বাদে পরশু যাওয়া। তারই তোড়জোড় করতে করতে শিউলি ভাবছিল অনেকগুলো এক্সট্রা টাকার ব্যাপার। কীভাবে ম্যানেজ করবে। প্রাথমিক টাকাটা মনোদীপই জমা করে দিয়েছে; তাকেও ফেরত দেওয়া উচিৎ। দিতে গিয়েছিল সে, মনোদীপ নানান বাহানায় 'পরে দিস' 'পরে দিস' করতে করতে সরে পড়েছে। প্রজেক্ট ফ্রজেক্ট বানিয়ে দেওয়া এককথা, আর টাকা সাহায্য নেওয়া আরেক। মনোদীপ অনেক কিছু বুঝতে চায় না। আর্থিক সাহায্য করতে চাইলে অনেক ক্ষেত্রে অহংকে ছোট করা হয় – সেটা তো বোঝা উচিৎ ওর। ও অবশ্য মানতে চায় না। বলে ‘নিজের জন্য যদি খরচ করতে পারি, তোর জন্য পারি না কেন? এটা তো আমার বাবার টাকা নয়, আমার নিজের টাকা। তুই যদি আমার নিজের রক্তের সম্পর্কে কেউ হতিস তবে কি এভাবে ‘তোর টাকা’, ‘তোর টাকা’ করতে পারতিস?’ শিউলি উত্তরে যদি বলে ‘রক্তের সম্পর্ক নেই বলেই তো করি’, তখন উল্টে অভিমান করে সে – ‘বলতো ‘রক্তের সম্পর্ক নেই বলেই কি পর হয়ে যায়া কেউ? আমার চেয়ে বেশী তোর শুভানুধ্যায়ী কেউ আছে? আমার চেয়ে তোকে কেউ বেশী ভালোবাসে?’ এবার পুজোয় জোর করে ওকে বেশ দামী সালোয়ার কামিজ উপহার দিয়েছে মনোদীপ। কখন লুকিয়ে ওর ব্যাগে রেখে দিয়েছে – যাতে ও ফেরাতে না পারে। পরে যখন শিউলি দেখছে তখন অনেক রাত। পরের দিন ভোরে ওর কলকাতায় ফেরা। সকালে ও যখন ট্রেনে, তখন মনোদীপের ফোন এল ‘কীরে শিউলি কতদূর পৌছুঁলি?’
– এই তো জনাই।
– জানলার ধারে সিট পেয়েছিস তো?
– হ্যাঁ।
– শরীর ঠিক আছে?
– হ্যাঁ।
– এভাবে কাটাকাটা জবাব দিচ্ছিস কেন শিউলি?
– তুই বা এসব কেন করছিস দীপ?
– এসব মানে?
– তুই জানিস না?
– কী জানবো না?
– ন্যাকামো করিস না দীপ? আমার ব্যাগে সালোয়ার এলো কোত্থেকে?
– তার আমি কী জানি?
– ‘আমি কী জানি’ মানে?
– মানে আমি জানি না ।
– বেশ। তাহলে আমি ওটা ফেলে দিচ্ছি। তুই যখন দিস নি, আর আমি যখন কিনিনি – সেটা আমার পরার কথা নয়।
– পাগলামি করিস না শিউলি। পুজোকালের দিনে আমারও তো ইচ্ছে করে তোকে কিছু দিই।
– তাহলে এতক্ষণ ‘জানি না, জানি না’ করছিলি কেন?
– দ্যাখ শিউলি, তুই ভালো করেই জানিস ওটা আমারই দেওয়া। আমি যদি তোকে বলে কয়ে দিতাম, তুই নিতিস না।
– তোর এখনই বা কেন মনে হচ্ছে লুকিয়ে দিলে আমি নেব।
– লুকানো প্রকাশ্যের কোনও ব্যাপার নেই শিউলি। তুই একটু আমার অ্যাঙ্গেলে ভেবে দ্যাখ– আমি আন্তরিকভাবে চাই পুজোর অন্তত একটা দিন তুই এটা পর।
– কেন অবলিগেশন বাড়াচ্ছিস দীপ?
– একে অবলিগেশন কেন বলছিস তুই? এটা নিছক একটা উপহার। এর জন্য আমি কোনও বিনিময় চাইনি; তোর কোনও নিরালা চাইনি। বাড়ির সবার জন্য কিনতে গিয়েছিলাম। তোর কথা মনে হল, তাই তোর জন্যও কিনলাম। ঠিক আছে, এবছরের মতো পরে নে। আর কখনো তো তোকে দেওয়ার অবকাশও আসবে না আমার। আর যদি আসেও, আর কখনো দেবো না কিনে। প্রমিস। তুই পুজোর মধ্যে কোনও একদিন এটা পরে আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে ছবি পাঠাস, তাহলে আমি খুশি হব।
– স্যরি দীপ। ওটা আমি দুর্গাপুরেই রেখে এসেছি। সাথে আনিনি ।
– যাঃ। তুই আনলিও না? এত ক্রোধ তোর? হতাশ শোনালো মনোদীপের গলা।
– ঠিক আছে দীপ। আমি পুজোর পর কোনও একদিন তোকে এটা পরে দেখাবো। আমি এটা নিলাম।
পুজোর পর এটা ওটা নানা কাজে আর সালোয়ারটা পরা হয়ে ওঠেনি। মনোদীপও ওটা পরা নিয়ে বায়না করেনি। শিউলি ভেবেছিল সরস্বতী পুজোতে পরবে, কিন্তু ওদের অন্য সহপীঠীরা বলল সবাই হলুদ শাড়ি পরবে – তাই আর পরা হল না। শিউলি ভাবল এই এক্সকারসানেই সালোয়ারটা পরে নেবে সে। টুকটাক গোছগাছ করতে করতে যাওয়ার দিনও এসে গেল।
একটা বিয়াল্লিশ সিটার বাস রিজার্ভ করে যাওয়া হবে। বাসে করে ওরা যখন অযোধ্যা পাহাড় পৌঁছোলো তখন প্রায় বেলা আড়াইটে। সবাই মিলে হোটেলে চেক-ইন করে প্রথমেই খেতে চলে গেল। আজ সারাদিন মনোদীপের মুখটা থমথমে। বোঝাই যাচ্ছে মুড বিগড়েছে। খাওয়ার টেবিলে শিউলির ধারে পাশে এলোই না। বিকেলে ওরা যখন মার্কেটের বাইরে একটা চাতালের মতো জায়গা এসে বসল, তখন সূর্য আস্তে আস্তে ঢলতে শুরু করেছে। অযোধ্যা পাহাড়ের গড়নটা বেশ অদ্ভুত। দূর থেকে বেশ রহস্যময় পর্বত শৃঙ্গের সারি বলেই প্রতিভাত হয়। অথচ অযোধ্যা পাহাড়ের উপরেরটা একেবারেই সমতল। অন্য পাহাড়ের সাথে মেলানো যায় না। আর এসময় পুরুলিয়া সত্যি সত্যি রানীর মতো সেজে ওঠে। চারপাশে পলাশের বন। যেন আকাশে আগুন লেগে গেছে। কেমন পাগল পাগল লাগে নিজেকে। এই সমতলে ইদানীং অনেক হোটেল হয়ে গেছে। তবে একটু দূরে গেলেই পলাশের বন নজর কাড়ে।
আজ এখানে আদিবাসীদের নাচ দেখার বন্দোবস্ত হয়েছে। শুক্লা নবমীর চাঁদ উঠবে আকাশে। পূর্ণিমার মত এত উজ্জ্বল হবে না, অথচ চাঁদনিতে ভেসে যাবে আশপাশ। ভাবতেই রোমান্টিক হয়ে উঠলো শিউলি। অথচ মনে একটা খোঁচা রয়ে গেছে। মনোদীপের কী সমস্যা হল আবার? যে সারাক্ষণ পিছু পিছু ঘোরে, সে অন্য সুরে বাজলে খারাপ তো লাগেই। সে অনেক কষ্টেও মনে করতে পারলো না তার তরফ থেকে কিছু ইন্ধন আছে কিনা এই ব্যাপারে। একটু এপাশ ওপাশ দেখে মনোদীপকে একা পেয়ে এসে জিজ্ঞেস করল ‘কী ব্যাপার দীপ, আজ তোর বাত্তি বুজলো কী করে?’
– কোথায় বুজেছে? দিব্যি তো আছি।
– তোর মন খারাপ হলে আমি বুঝতে পারি না বুঝি?
– বুঝিস? বাঃ। এ আমার অযাচিত সৌভাগ্য! তবে এখন তুই ভুল বুঝেছিস, আমার কোনও মনটন খারাপ হয়নি।
– সে তো ভালো কথা। কিন্তু সারাদিন কথাবার্ত্তা বলছিস না।
– তুই তো সারাদিন বকবক করতে বারণ করিস! আমার সাথে তোর বেশী কথা বলতে ভালো লাগে না বলেই তো বলিস।
– তা বলি। কিন্তু একেবারে কথা না বলতে তো বলি না।
– কখন বলব? সারাক্ষণ তো মুটকি মিতালির পাশে বসে জ্যাবজ্যাবিয়ে গেলি। তখন তো মনে হয়নি আর একজন এতদিন ধরে তোর পাশে বসে অযোধ্যা পাহাড় বেড়াবার স্বপ্ন দেখছে?
শিউলি এতক্ষণে বুঝতে পারল মন খারাপের আসল কারণটা। বিষয়টা লঘু করতে বলল, ‘কী করবো বল, ও এসে বসতে চাইলে আমি কি না বলতাম? তাতে কী ভাবতো বল দেখি?’
– কি ভাবতো? রোজ যে তোর পাশে আমি বসে ক্লাশ করি, তোর সাথে ক্যান্টিনে যাই – সেসব নিয়ে যা ভেবে এসেছে এতদিন, তাই ভাবতো! এ তো নতুন কোনও ভাবনার বিষয় নয়!
– ঠিক আছে, আর মেজাজ গরম করিস না। তোর দেওয়া সালোয়ারটা পরে এসেছি, তোর এত মাথা গরম যে একবারও বললি না কেমন লাগছে।
– এই সালোয়ারটার উপরই আমার রাগ হয়ে গেছে শিউলি। যবে থেকে এটা তোকে দিয়েছি, তবে থেকেই তোর সাথে আমার এটা সেটা নিয়ে ঝগড়া। এটা আমার জন্য অপয়া।
– ছিঃ দীপ! এভাবে বলিস না। দ্যাখ না, হলুদ লালের উপর কালো সুতোর কাজ- কী সুন্দর দেখাচ্ছে না এই গোধূলি আলোয়?
– মনোদীপ অনেকক্ষণ শিউলির দিকে তাকিয়ে রইল মুগ্ধ দৃষ্টি নিয়ে। বলল ‘তোকে তো সবসময় আমি ভালই দেখি, তবে আজ যেন শব্দের অতীত লাগছে তোকে। চুল ছেড়ে – সত্যি মনে হচ্ছে মায়ার কাজল পরিয়ে দিয়েছিস চোখে। যে তোকে পাবে, সে সত্যিই ভাগ্যবান শিউলি।’
– ঠিক আছে, চল। ওই দিকটায় যাই। আমাকে কতগুলো পলাশ ফুল কুড়িয়ে দে দেখি! মালা গাঁথবো।
– কাকে পরাবি রে ?
– তোকে যে নয় সেটা ভালো করেই জানিস। নে চল।
একটু এগিয়ে যেতেই একটা ফাঁকা মতো জায়গায় দেখা গেল পলাশের মস্ত বন। ঈশ্বরের আপন খেয়ালে সৃষ্টি। দেখলে মনে হবে, এক একটা সারিতে যেন মাপ মতো দূরত্বে সামাজ ভিত্তিক বনসৃজন করা হয়েছে এদের। পুরো মাটিতে শুধু লাল আর লাল ফুল। বনে মনে – সব জায়গায় শুধু লাল। একটু একটু করে সূর্যের লাল আলো মিশে গেল গোধূলি ধূসরে। আকাশে চাঁদ ইতিমধ্যেই উঁকি দিয়েছে। অনেক ফুল কুড়িয়ে মনোদীপ বলল ‘চল এখানে একটু বসি।’
– সন্ধ্যা হয়ে এলো রে। অজানা জায়গা। চল ফিরে যাই।
– পুরুলিয়ার মানুষজন ভালো রে শিউলি। এখানে শহরের ভয়গুলো নেই। নিশ্চিন্তে বোস। একটু পরেই চলে যাবো। এই অনাবিল দৃশ্য আর জীবনে কখনো আসবে কিনা কে জানে!
– সত্যি রে দীপ! দিনের আলোয় পলাশ বন আর চাঁদের নিচে পলাশ বন – একেবারে আলাদা অনুভূতি। দেখ গাছগুলোর মধ্যে দিয়ে হাওয়া যাচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন গাছেরা ফিসফিস করছে। শোন মন দিয়ে।
– ঠিক কথা রে শিউলি। মনে হচ্ছে যেন ওরা নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি করছে।
– যদি জানা যেত ওরা কি কথা বলছে, কী মজা হতো!
– আমি জানি তো, কী কথা বলছে ওরা।
– তুই জানিস?
– হ্যাঁ রে। নিশ্চয়ই গাছগুলো বলছে পৃথিবীতে এর থেকে সুন্দর কোনও মেয়ে আর নেই।
– এই শুরু হলো তোর।
– সত্যি রে শিউলি। তোর থেকে পৃথিবীতে সুন্দর আর কাউকে দেখিনি আমি।
– কেন গ্যাস খাওয়াস দীপ? আমি নিজেকে আয়নায় দেখিনা?
– 'প্রিয়ার কী রূপ, সেই জানে, যে কখনও ভালোবাসে'। দ্যাখ শিউলি, এতদিন আমি আমার কথা রেখেছি। আজ শুধুমাত্র একটুখানির জন্য তোর হাত ধরতে দিবি?
শিউলি চুপ করে রইল। ওর মৌনতাকে সম্মতি ভেবে মনোদীপ ওর দুটো হাত নিজের দুহাতের মুঠোর মধ্যে ভরে নিল। একটু পরে শিউলি বলল ‘চল এবার হোটেলে ফিরে যাই।’
– থাক না আর কিছুক্ষণ। একটু বাদে চাঁদ আর একটু উজ্জ্বল হবে।
– না রে। চল উঠি।
বলেই শিউলি উঠে দাঁড়াল। মনোদীপ হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে প্রবলভাবে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে অস্ফুট স্বরে বলতে লাগলো ‘কেন আমার সাথে এমন করিস শিউলি, তোকে ছাড়া আমি যে জীবন অন্ধকার দেখি।’ ওর উষ্ণ নিশ্বাস শিউলির ঘাড়ে গলায় পড়তে লাগল। শিউলি হাল্কা ধাক্কা দিল ওকে 'ছাড়'।
– না ছাড়বো না আজ। আজ তোর কোনও কথা শুনবো না।
– দীপ তুই আমার ওপর জোর করবি?
– না না । জোর খাটাতে চাই না। তুই বিশ্বাস কর আমি তোকে ভালোবাসি।
শিউলি আরও দৃঢ় গলায় বললো ‘ছাড় দীপ।’
– ছাড়ব। তার আগে বল, তুই আমায় ভালবাসিস।
– না, আমি তোকে ভালোবাসি না ।
– কেন? আমি এতই খারাপ?
– তুই খারাপ হতে যাবি কেন? তুই ভালো, খুবই ভালো।
– তবে? তুই কি অন্য কাউকে ভালবাসিস? তোকে তো আগে কতবার জিজ্ঞাসা করেছি, তুই এড়িয়ে গেছিস।
– ঠিক আছে, ছাড় এবার। আগে আমার সব কথা শোন, তারপর তোর যা মনে হয় করিস।
– ছাড়তে ইচ্ছে করছে না শিউলি। আর একটুখানি আমায় এভাবে থাকতে দে।
– দীপ, আমি বিবাহিতা। অন্য কারুর স্ত্রী। এবার কি ছাড়বি?
এবার বজ্রাহতের মতো চমকে উঠলো মনোদীপ। ‘কী বললি?’
– হ্যাঁ? ঠিকই শুনেছিস। আমার বিয়ে হয়ে গেছে আজ সাত বছর।
মনোদীপের আলিঙ্গন শিথিল হয়ে গেল তখনই। শিউলি বলল ‘বোস একটুক্ষণ।’
– শিউলি আমি বিশ্বাস করি না তোর কথা। আমাকে নিরস্ত করার জন্য বানিয়ে বলছিস তুই।
– তুই জানিস দীপ, আমি মিথ্যে কথা বলি না ।
– তাহলে তোর বিয়ের চিহ্ন নেই কেন? তোর শাঁখা-সিঁদুর কই?
– আমার বর গুজরাটী। নাম ভার্গব। ওদের এসব কিছু নেই। মঙ্গলসূত্র পরে এরা। এই দ্যাখ আমারও আছে। এই বলে সালোয়ারের তলা থেকে মঙ্গলসূত্র বের করে দেখালো শিউলি। 'আসলে তোরা এসব দেখতে অভ্যাস্ত নয় বলেই খেয়াল করিস নি।’
– কিন্তু তুই আমায় বলিস নি কেন? এতবার তোকে আমি প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছি, বিয়ের কথা বলেছি – তুই শুধু ‘সম্ভব নয়’, ‘বয়সে বড়’ ইত্যাদি বলে কাটিয়ে দিয়েছিস। সরাসরি বললেই পারতিস।
– আমার বর প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিল আমি যাতে আমাদের বিয়ের কথা কাউকে না বলি।
– কেন?
– এতে নাকি সবাই আমার মজা ওড়াবে, আমার পড়াও ঠিক মতো হবে না!
– কিন্তু বি.এডে তো অনেক বেশী বয়সের লোকও পড়তে আসে। তাদের অধিকাংশ বিবাহিত।
– আসলে এই প্রতিজ্ঞা আমি যখন করি তখন আমি বি.কম এ ভর্তি হয়েছি । তবে থেকে তা চলছে।
– তোর বর কী করেন?
– থার্টি বি রুটের বাসের কন্ডাক্টার।
– বলিস কি! ওর সাথে তোর বিয়ে হল কী করে? অ্যারেঞ্জ? নাকি প্রেমের?
– পাত্র পাত্রী নিজেরা বিয়ে ঠিক করলে যদি সেটা প্রেমের বিয়ে হয়, তবে বলতেই হবে আমাদের বিয়েটা প্রেমের।
– তোরা নিজেরাই ঠিক করেছিলি।
– হ্যাঁ।
– কেন? ও কি খুব সুন্দর দেখতে?
– সুন্দর বান্দরের প্রশ্ন নেই এখানে দীপ। আমি যখন আমার মায়ের পেটে, আমার বাবা তখন থেকে নিরুদ্দেশ। বাবা একটা বেসরকারি কোম্পানিতে ভালো চাকরি করত। তারপর মা আক্ষরিক অর্থে অন্যের বাড়িতে ঝি গিরি করে আমাকে পড়ায়। আমি যখন নাইন টেনে পড়ি, তখন দেখেছি মা কত কষ্ট করে আমার টিউশনের টাকা জোগাড় করছে। ভার্গবেরা বহু পুরুষ ধরে কলকাতাতেই থাকে। ও ওর মা আর বোনকে নিয়ে আমাদের পাড়ায় থাকতো। আমি যখন নাইনে পড়ি, তখন ওর বয়স প্রায় সাতাশ আঠাশ। প্রায় দিনই দেখতাম, যখন ওর ডিউটি থাকতো না, সে আমার গতিবিধির পথে ঘোরাফেরা করতো। নাইনে পড়ার সময় একটা লাভ লেটারও ধরিয়ে দিল। আমি দেখলাম টিউশান থেকে ফিরতে আমার রাত হয়। আমাদের ভাড়াবাড়ীর সামনের অনেকখানি জায়গা ফাঁকা। রাতে ওখানে অনেক বখাটে ছেলেদের আড্ডা; ওদের অধিকাংশই ভার্গবের বন্ধু। আমি মনে মনে নিজের সাথে একটা বোঝাপড়া করলাম। আমার পড়া চালিয়ে যাওয়া দরকার। আমার মায়ের সে ক্ষমতা নেই। আমি ভার্গবের সাথে রফা করলাম। আমি ওকে বিয়ে করতে রাজি হলাম। শর্ত হল বিয়ের পর ও আমাকে পড়াবে আমি যতদূর পড়তে চাই ।
– কিন্তু শিউলি, জীবনটা তো একটাই। তুই তো রফা করেছিস। ভালো তো ওকে বাসিস নি!
– তখন বাসিনি, কিন্তু এখন বাসি।
– তুই একজন এম. কম, বি. এড হয়ে একজন বাস কন্ডাক্টারকে ভালোবাসতে পারবি শিউলি?
– দীপ, আজ আমি এম.কম হই বা বি.এড, স্কুল টীচার হই বা কলেজটীচার – সবকিছু ওই বাস কন্ডাক্টারেরই দয়া। দ্যাখ দীপ, ক’টাকা মাইনে পায় ও? মাসে সাড়ে বারো হাজার! অথচ দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে, ওভারটাইম করে ও টাকা রোজগার করে যাতে আমি আরামে পড়তে পারি। ওর বোনের বিয়ে দিয়েছে সে এই রোজগারে। ওর মায়ের ওষুধপত্র, বাড়ির খরচ – সবকিছু দায় নিয়ে অবিশ্রান্ত পরিশ্রম করে চলেছে সে একা একা। আজ বিয়ের সাত বছর পার হয়ে গেল, কখনও ছেলে মেয়ে হওয়ার জন্য সে বায়না ধরেনি; বাড়ীর কোনও উৎসব অনুষ্ঠানে আমাকে বাড়ি যেতে বাধ্য করেনি – বরং নিরন্তর উৎসাহ দিয়ে গেছে যেন আমি ভালো মতো পড়তে পারি। নিজে একটা দেড় হাজার টাকার ফোন নিয়ে আমাকে অ্যান্ড্রয়েড ফোন কিনে দিয়েছে যাতে আমার পড়াশোনার সুবিধা হয়। আমি যে এখানে পার্ট টাইম কাজ করতাম, ভীষণ আপত্তি করত ও। কিন্তু এখানে এত খরচ যে বাধ্য হয়ে মেনে নিয়েছিল শেষে। নিজে সেলাই করা জামা পরে আমাকে ভালো ভালো চুড়িদার-শাড়ী কিনে দিয়েছে সে, যাতে তোদের সামনে আমাকে হেয় না হতে হয়।
– এতদিন যখন বলিসনি, আজই বা প্রতিজ্ঞা ভাঙ্গলি কেন শিউলি ?
– কারণ তুই। অল্পে তো তুই শুনিস না দীপ। আমি জানি তুই আমাকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসিস। হয়তো এতটা বাসিস যা আমাকে কেউ বাসেনা। তোর সাথে সামান্য পদস্খলন বা তোর ইচ্ছেকে সামান্য মর্যাদা দিলে হয়তো তোর ভালোবাসাকে মর্যাদাই দেওয়া হত, কিন্তু এই মানুষটার বিশ্বাসের অমর্যাদা হত। সেটা আমি অতিকষ্টেও ভাবতে পারি না দীপ । আমি ওকে ভালোবাসি বা নাই বাসি, ভালোবাসতে চাই পুরোপুরি।
– তোর তো নিট ক্লিয়ার করা আছে । এস.এস.সিও পাস করে যাবি আশাকরি। তখন তোর ইগোর সমস্যা হবে না তো? সবাইকে পরিচয় দিতে পারবি তো- তোর বর বাস কন্ডাক্টার!
– অটো চালকের ছেলে ডাক্তারি পড়ে তার পিতৃ পরিচয় দিতে যদি গর্ববোধ করে, আমি বা পারবো না কেন? সে স্বামী বলে? সে তো আমার পিতার অধিক। দ্যাখ দীপ, তুই আমার জীবনের একজন সত্যিকারের বন্ধু। তোর ভালবাসাকে আমি স্বীকার করলাম। কিন্তু তুই সেই ভালোবাসাকে সামনে রেখে আমার কর্তব্যকে লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে দিস না।
0 Comments