জ্বলদর্চি

ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখি / ৩২পর্ব /চিত্রা ভট্টাচার্য্য


ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখি                                   
৩২পর্ব
চিত্রা ভট্টাচার্য্য


 (কবির সৃষ্ট রাগ রাগিনীর পরবর্তী অংশ )          

সংগীতের সুর,তাল, লয়, ভাব,ভাষা,ব্যঞ্জনা,শব্দচয়ন এবংবিভিন্ন ধরণের মাত্রা বিন্যাসের সমন্বয়ে বাংলা শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরে কিংবদন্তী সংগীতজ্ঞ হিসেবে অমর হয়ে আছেন কবি নজরুল। তাঁর সৃষ্ট অজস্র অনবদ্য রাগ রাগিণী নানাবিধ প্রয়োগের ধারায় উচ্চাঙ্গ সংগীত  হয়ে উঠেছে আধুনিক বাংলা সংগীত জগতের অদ্বিতীয় এক ভাবময় কেন্দ্রবিন্দু। এমন কোনো দিক বা ক্ষেত্র নেই যেখানে নজরুল গীতি সংগীতকে অলংকৃত করেনি। বিচিত্র সুরের সম্ভারেপরিপূর্ণ কবি নজরুলের গানের হদিশ নিতে গিয়ে ক্রমশঃএক সুদীর্ঘ সুরের জালে জড়িয়ে পড়েছি। আজ নজরুল সঙ্গীতকোষের পাতায় তাঁর রাগ রাগিণীর তত্ত্ব তল্লাশি করতে গিয়ে পেলাম কবির অতুলনীয় এক  সৃষ্টি 'রাগ রূপমঞ্জরী '  যা হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি সুরেলা গঠন ও নান্দনিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত  একটি মনোরম রাগ রূপমঞ্জরী। 

রাগ রূপমঞ্জরী
                        '' পায়েলা বোলে রিনিঝিনি।।
                 নাচে রূপ-মঞ্জরি শ্রীরাধার সঙ্গিনী॥
                         ভাব-বিলাসে
                          চাঁদের পাশে,
        ছড়ায়ে তারার ফুল নাচে যেন নিশীথিনী॥
             নাচে উড়ায়ে নীলাম্বরী অঞ্চল,
        মৃদু মৃদু হাসে আনন্দ রাসে শ্যামল চঞ্চল।---

রূপমঞ্জরী রাগে একটি জনপ্রিয় বন্দিশ যেখানে রাধার সঙ্গিনী রূপমঞ্জরীর নৃত্য ও তার পায়েলের ঝংকারে এক মনোরম দৃশ্যপট আঁকা হয়েছে ,যা রাগটির কোমলতা ও স্নিগ্ধতা প্রকাশ করে।
🍂

                 
  'নব রাগমালিকা'র দ্বিতীয় পর্বের তৃতীয় গানের  এই রাগটি সঙ্গীত প্রেমীদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা প্রদান করে। কবি নজরুল-সৃষ্ট নতুন রাগ 'রূপমঞ্জরী'-তে নিবদ্ধ এ গানের সুর।  যেখানে কবি শ্রীরাধার কল্পিত নৃত্যসঙ্গিনী রূপে রূপমঞ্জরী’কে কল্পনা করে উপস্থাপন করেছেন। নৃত্যের ছন্দে তার পায়ের নূপুরের  ধ্বনিতে  মৃদু ও কোমল রিনিঝিনি শব্দ মুখরিত হয়ে উঠে । রাতে তারা ফুল ছড়িয়ে নাচে-এ উপমায় মন হয় রাগের রূপে লাস্য রস চঞ্চল এবং একই সাথে রাসলীলার রূপমঞ্জরী। মৃদু মধুর হাস্য রসে পূর্ণ রাগটি মূলত প্রেম, স্নেহ ও কোমলতার অনুভূতি প্রকাশ করে। এই রাগটি বিশেষত তার আরোহ-অবরোহের বিন্যাস,স্বরপ্রয়োগ এবং বাদী-সমবাদী স্বরের ব্যবহারে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। সাধারণত প্রেমের অনুভূতির সাথে ,প্রকৃতির সৌন্দর্য বা ভক্তির ভাব প্রকাশিত হয়। একটি জনপ্রিয় বন্দিশ এর সুরেলা গঠন শ্রোতাদের মনে এক ধরণের প্রশান্তি ও স্নিগ্ধতার আবহ সৃষ্টি করে সঙ্গীত প্রেমীদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা প্রদান করে। এর পরিবেশনা শ্রোতাদের মনে এক গভীর প্রশান্তি ও মুগ্ধতার অনুভূতি জাগায় ।  
রাগ-অরুণ রঞ্জনী:
                        বহুবিধ রাগরাগিণীর স্রষ্টা ও সঙ্গীত শিল্পী কবি নজরুলের বিখ্যাত  সেই গান টি ---:
                “হাসে আকাশে শুকতারা হাসে  
               অরুণ-রঞ্জনী-উষার পাশে॥
                      ওকি উষসীর সাথি
                       বাসর ঘরে জাগে রাতি,
             (ওকি)   সখির মনের কথা জানে।....
                                                                                 এই রাগটি কবির সঙ্গীত প্রতিভার একটি উজ্জ্বল নিদর্শন যা অরুণ রঞ্জনী রাগে রচিত নজরুলের গানের সৌন্দর্য ও আবেগকে নিখুঁত ভাবে তুলে ধরেছেন। এই রাগে তিনি প্রভাতের পূর্ব মুহূর্তের সৌন্দর্য, প্রেমের অনুভব কে সুরের জাদুতে প্রকাশ করেছেন। গানটি ‘নবরাগমালিকা’র দ্বিতীয় পর্বের দ্বিতীয় গান হিসেবে পরিবেশিত হয়েছিল।  কবির মতে ,যখন আকাশে শুকতারা হাস্যজ্জ্বল দ্যুতি ছড়ায় এবং সূর্যোদয়ের পূর্ব মুহূর্তে প্রভাতের কোমল আলো ছড়িয়ে পড়ে অরুণ-রঞ্জনী রাগ তখন গাইবার সময়। 

 গীতিকার নজরুলের সৃষ্টি সঙ্গীত প্রতিভার ও এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর এই অনন্য রাগটিতে শৃঙ্গার রসের গভীর অনুভূতির প্রকাশ পায় যা প্রেম, প্রত্যাশা এবং প্রভাতের সৌন্দর্যকে সংগীতে সুরের লহরীর কারুকার্যে  অপরূপ ভাবে উপস্থাপন করে। এই রাগটি  নজরুলের সৃষ্ট একটি অনন্য রাগ, নবরাগ মালিকা গীতিনাট্য তে  প্রথম প্রচারিত হয় ১৯৪০ সালের ১১ মে কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে।  

রাগ-দেবযানী---
:কবির সৃষ্ট করা অসংখ্য রাগগুলোর মধ্যে ‘দেবযানী’ রাগ টি ও অন্যতম উল্লেখযোগ্য একটি রাগ যা কবি কে শুধু গীতিকার হিসেবেই নয়, একজন সুরস্রষ্টা রূপে অমরত্ব দান করেছে।          
  মহাভারতের আদিপর্বে বর্ণিত একটি সুপরিচিত পৌরাণিক কাহিনি কচ ও দেবযানীর উপাখ্যানে দেবযানী ছিলেন অসুরদের গুরু শুক্রাচার্যের কন্যা। কচ,দেবতাদের গুরু বৃহস্পতির পুত্র, মৃতসঞ্জীবনী বিদ্যা অর্জনের জন্য শুক্রাচার্যের আশ্রমে এলেন এবং দেবযানীর সাথে কচের নিবিড় প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠলো। নানা প্রতিকূলতা সহ্য করে দেবযানীর সাহায্যে কচমৃত সঞ্জীবনী বিদ্যা অর্জন করলে ও এরপর দেবযানীর প্রেম এবং বিবাহ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। যা দেবযানীকে ব্যর্থ প্রেমের জ্বালায় অসহনীয় কষ্ট দিয়েছিল। 
 দেবযানীর হৃদয় উৎসারিত কষ্টের আবেগ ও নাটকীয়তায় কবি নজরুল প্রাণিত হয়ে রাগ ‘দেবযানী’ সৃষ্টি করলেন ।এই রাগের স্বরবিন্যাসে কেবলমাত্র ‘নি’ স্বরটি কোমল; অন্যান্য সব স্বর শুদ্ধ।কোমল ‘নি’ এর ব্যবহার রাগটির মাধুর্য ও কোমলতা বৃদ্ধি করে, যা শ্রোতার মনে এক গভীর আবেগের আবেদনের সাড়া জাগায়। এই রাগে রচিত নজরুলের একটি বিখ্যাত গান হলো --- 
 দেবযানীর মনে প্রথম প্রীতির কলি জাগে।
কাঁপে অধর-আঁখি অরুণ অনুরাগে॥
          নব-ঘন-পরশে
          কদম শিহরে যেন হরষে,
ভীরু বুকে তা'র তেমনি শিহরণ লাগে॥ 
                                                              গানটি রচনা করে সুর ও ছন্দে নজরুল নতুনত্ব এনেছেন। যদিও  সুরারোপ করেছিলেন নজরুল স্বয়ং কিন্তু  স্বরলিপি রচনা করেন জগৎ ঘটক। তিনি ‘নবনন্দন’ নামক একটি নতুন ছন্দের প্রয়োগ করেছেন, যা ২০ মাত্রার তাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই ছন্দ ও সুরের সংমিশ্রণে গানটি একটি অনন্য সৃষ্টি হয়ে উঠেছে।  এই গানটি ও ১৯৪০ সালের ১১ মে কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত ‘নব রাগমালিকা’ গীতিনাট্যের দ্বিতীয় পর্বে প্রথম গান হিসেবে পরিবেশিত হয়। এই ছন্দ ও সুরের সংমিশ্রণে গানটি একটি অনন্য সৃষ্টি হয়ে উঠেছে। রাগ দেবযানী নজরুলের সৃষ্ট অনন্য একটি রাগ যা বাংলা সংগীতে তাঁর অবদানকে আরও সমৃদ্ধ করেছে এবং এর উপর ভিত্তি করে রচিত তাঁর গানগুলি বাংলা সংগীতের ইতিহাসে এক অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে । এই রাগের মাধ্যমে নজরুল তাঁর সুরসৃষ্টি ও ছন্দের নতুনত্ব প্রদর্শন করেছেন।  

 রাগ-মীণাক্ষী :
   প্রায় ৩০টিরও বেশি রাগ সৃষ্টি করেছেন কবি ,যার মধ্যে ‘রাগ-মীণাক্ষী’ একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এই রাগটি তাঁর সৃষ্টিশীলতার এক উজ্জ্বল নিদর্শন, যা বাংলা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।নজরুলের রচিত গান 
“চপল আঁখির ভাষায়, হে মীণাক্ষী ক’য়ে যা /
 না-বলা কোন্ বাণী বলিতে চাও” ----
                                   এই রাগে সুরারোপিত গানটির সুর ও ভাব রাগ-মীণাক্ষীর বৈশিষ্ট্যকে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করে, যেখানে কোমল ও শুদ্ধ স্বরের সংমিশ্রণ একটি মায়াবী আবহ সৃষ্টি করে।মীণাক্ষী একটি সম্পূর্ণ ও বক্রগতির রাগ, যার আরোহ ও অবরোহে স্বরের চলন সরল নয়, বরং বাঁকযুক্ত। এটি রাগটির সুরের গভীরতা ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করেছে ।  রাগ-মীণাক্ষী কাজী কবির সঙ্গীত প্রতিভার এক উজ্জ্বল নিদর্শন যে রাগের সুরবাহারে তিনি বাংলা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর সৃষ্টিশীলতা ও সঙ্গীতজ্ঞতার নিপুন পরিচয় দিয়েছেন।  যে রাগটি তাঁর সঙ্গীত সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

"দোলন-চাঁপা" 
নজরুলসৃষ্ট রাগ রাগিণীর আলোচনায় এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিখ্যাত রাগ ''দোলনচাঁপা।'' এটি একটি খেয়ালাঙ্গ বা নাট্যগীতি প্রকৃতির সুর। নজরুল গীতির গবেষকদের মতে এই রাগের প্রকৃতি বর্ণনায় দেখা যায় ,''ইহাতে হাম্বীর, কামোদ ও নট রূপ মাঝেমাঝে উঁকি দেয়, কিন্তু ইহার গতি অত্যন্ত দোলনশীল বলিয়া ঐসব রাগের আভাস দিয়াই ছুটিয়া পালাইয়া যায়। আরোহণে পূর্ববর্তী সুরকে ধরিয়া 'ঝুলনা' বা দোলাই ইহার প্রধান বিশেষত্ব। দক্ষিণ সমীরণে দোলন-চম্পার দোলনের সঙ্গে ইহার গতির সামঞ্জস্য হইতে ইহার নাম 'দোলন-চম্পা' হইয়াছে।যাহাতে চাঁপাফুলের সুরভির তীব্রতা ও মাধুর্য ফুটিয়া উঠে।  এমনি ক'রেই ভারতের সঙ্গীত সম্পদ চিরদিন বৃদ্ধি পেয়ে এসেছে, ইহার পিছনে থাকা দরকার-কৃষ্টি ও প্রতিভা"।কবির সৃষ্টি এই রাগটি রোমান্টিক এবং প্রকৃতি-ভিত্তিক রাগ, যা তাঁর একান্ত নিজস্ব উদ্ভাবন। আদি কয়েকটি রাগ রাগিণীর মিশ্রণ-ফলে কত যে নতুন রাগের সৃষ্টি এতাবৎকাল হ'য়ে এসেছে এবং হ'তে পারে, এই রাগটি তাহার অন্যতম দৃষ্টান্ত। এই রাগে নজরুলগীতি “দোলন চাঁপা বনে দোলে”গানটি রচিত হয়েছে। রাগটি ত্রিতালে নিবদ্ধ এবং এতে রাধা লতার দোলনা বা দেব-কুমারীর শুভ্রহাসির মতো কোমল, সুন্দর অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে। ''

  কলকাতা বেতারকেন্দ্র থেকে ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে  ১৩ জানুয়ারি সান্ধ্য অনুষ্ঠানে দুটি পর্বে নজরুলসৃষ্ট রাগের অনুষ্ঠান নবরাগ মালিকা প্রচারিত হয়েছিল।  শিরোনাম ছিল 'দোলন-চম্পা। তাল─তৃতালী'। জগৎঘটক-কৃত স্বরলিপি-সহ মুদ্রিত হয়েছিল ।এই পর্বে প্রচারিত ৬টি  রাগের উপর রচিত গানে এই দোলনচাঁপা রাগটি ছিল প্রথম পর্বের ষষ্ঠ রাগ। বেতার জগৎ পত্রিকার নবরাগ মালিকা'র প্রথম পর্বটি প্রকাশিত হয়েছিল।                   (তথ্য সূত্র --নজরুল সঙ্গীতকোষ)
   দোলন-চাঁপা বনে দোলে দোল্‌-পূর্ণিমা-রাতে চাঁদের সাথে।
(শ্যাম)   পল্লব-কোলে যেন দোলে রাধা লতার দোলনাতে॥
            (যেন)     দেব-কুমারীর শুভ্র হাসি
                         ফুল হয়ে দোলে ধরায় আসি'
            আরতির মৃদু জ্যোতি প্রদীপ-কলি দোলে যেন দেউল-আঙিনাতে॥
এই গানটির শুরুতে, নজরুল ইসলাম কবিতায় 'দোলানচাঁপা রাগের প্রকৃতি বর্ণনা করেছেন এই ভাবে-

ফিরে আসিল না আর বনের কিশোর
ঘরে ফিরিল না আর বনের কিশোরী
মাধুরী চাঁদের বুকে কৃষ্ণ লেখা হয়ে
দেখা দেয় আজো সেই কিশোরের ছায়া।
কাঁদে চাঁদ সেই বিরহীরে বুকে ধরি
আনন্দে কলঙ্কী নাম করিল বরণ।-----
 
সম্পূর্ণ গানটির ভাব বিশ্লেষণে যে ভাবটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে--  ''দোল-পূর্ণিমায় শ্যামের সাথে রাধা যেমন দোলনায় দোলে, তেমনি দোলন-চাঁপাও সবুজ-পাতার কোলে লতার দোলনাতে দোলে। কবির কল্পনায় দেব-কুমারীর নির্মল হাসি দোলন-চাঁপা ফুল হয়ে পৃথিবীতে এসে দোল খায়। যেন পূজার আরতি-প্রদীপের মৃদু জ্যোতি ফুলের কলির মতো মন্দিরের আঙিনাতে দোলে। দোলন-চাঁপার রূপে মুগ্ধ কবি। তিনি ভাবেন বনদেবীর কানের দুলই যেনো চৈতালি চাঁদনী রাতে রূপালী ঝুমকা হয়ে দুলছে। রাতের গোপন আনন্দের সলাজ আঁখিতারা অন্ধকারের আবরণের ভিতর দিয়ে আনন্দ তরঙ্গে দুলছে। দোলন চাঁপায় যেনো একমুঠি চন্দনের গন্ধের মতো,যা গোপিনীর গোপন আনন্দে দোলে। চন্দ্রশোভিত রাত্রিতে যেন মন চুরি করা শ্যামের নূপুর ধ্বনির ছন্দ, গোপিনীকে আন্দোলিত করে।'' নজরুল গীতির অতুলনীয় রসময়তার সাথে গানের সুরের মূর্ছনায় মিশে আছে কবি মনের গভীর মায়াময় মমতার আবরণ এক অপূর্ব প্রেমের নিঃশব্দ ফল্গুধারা। মানব হৃদয়ের চিরন্তন জিজ্ঞাসা, চাওয়া পাওয়া শ্রোতা হৃদয়কে অনায়াসে ,এক অজ্ঞাত রসসাগরে দ্রবিভূত করে। 

বাংলা গানের ধারায় অবিস্মরণীয় হয়ে আছে নজরুলের বিপুল সংখ্যক গান যে গানগুলো সেই সময়ে প্রচারিত হতো আধুনিকগান হিসেবে।  
 আমার নয়নে নয়ন রাখি' পান করিতে চাও কোন্ অমিয়।
আছে এ আঁখিতে উষ্ণ আঁখি-জল মধুর সুধা নাই পরান-প্রিয়॥----

অথবা       
' আধো রাতে যদি ঘুম ভেঙ্গে যায়
মনে পড়ে মোরে, প্রিয়
চাঁদ হয়ে রবো আকাশের গায়
বাতায়ন খুলে দিও '

কিংবা   বিখ্যাত সেই মন স্পর্শ করা গান টির কথা --- 
''আমি চাঁদ নহি, চাঁদ নহি অভিশাপ"/ শূন্য হৃদয়ে আজো নিরাশায় আকাশে করি বিলাপ।। 
শত জনমের অপূর্ণ সাধ ল'য়ে আমি গগনে কাদিঁ গো ভুবনের চাঁদ হয়ে 
জোছনা হইয়া ঝরে গো আমার অশ্রু বিরহ-তাপ।

 কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও আবেগঘন নজরুল গীতি, যা বিরহ ও  নিঃসঙ্গতাকে ফুটিয়ে তোলে। এই গানটি বাস্তবে রবীন্দ্র-পরবর্তী আধুনিক গান।  যে গানে কবি নিজেকে আকাশের চাঁদ হিসেবে কল্পনা না করে একটি "অভিশাপ" বা নিঃসঙ্গ সত্তা রূপে তুলে ধরেছেন। গানে লিখেছেন "শূন্য গগনে আজও নিরাশায় আকাশে করি বিলাপ"।এক অসীম শূন্যতা ও হতাশা প্রকাশ পেয়েছে ।

  বাংলা সঙ্গীতের ক্রমবিবর্তনের ধারায় নজরুল সঙ্গীত তথা : নজরুলের আধুনিক পর্যায়ের গান সার্বিকভাবে সাহিতিক পরিমণ্ডলে একটি প্রভাব ফেলেছে। বাংলা গানের পর্যায়ক্রমিক সূচিতে এই গানগুলি , বৈচিত্র্যে বৈশিষ্ট্যে পরিপূর্ণ।
প্রিয়তম, এত প্রেম দিও না গো সহিতে পারি না আর
তটিনীর বুকে ঝাঁপায়ে পড়িলে কেন মহা-পারাবার॥

  নজরুল গানের প্রধান বিষয়বস্তু প্রেম। প্রাণবন্ত সুর ও অপূর্ব ব্যঞ্জনায় মূর্ত। তাঁর প্রেমের গান যেন উচ্ছ্বাসে, অনুরাগে, বেদনায় বিরহে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন ও আবেগের প্রতিচ্ছবি। নজরুলের গান সুরবৈচিত্র্যে অতুলনীয় হয়ে মানব হৃদয়ের মণি কোঠায় আপন আসন টি পেতে নীরব ধ্যানে বসেছে।

Post a Comment

0 Comments