জ্বলদর্চি

জঙ্গলমহলের লোকগল্প : রাক্ষস ও রাজকুমারী সংগ্ৰাহক- পূর্ণিমা দাস কথক- বিজয় দাস

জঙ্গলমহলের লোকগল্প 

রাক্ষস ও রাজকুমারী 

সংগ্ৰাহক- পূর্ণিমা দাস 

কথক- বিজয় দাস, গ্ৰাম- যুগীশোল, থানা- নয়াগ্ৰাম, জেলা- ঝাড়গ্ৰাম 

অনেকদিন আগে বিষ্ণুপুর নামে একটি গ্ৰামে পলাশ নামের এক ছেলে বাস করত। সে বাঁশি বাজাত। এই পৃথিবীতে বুড়ি মা ছাড়া তার আর কেউ ছিল না। সে বাঁশি বাজিয়ে যা রোজগার করত তাই দিয়ে তাদের সংসার চলত।

একদিন পলাশ ঘরের দুয়ারে বসে বাঁশি বাজাচ্ছিল। ঠিক সেইসময় এক সাধু এসে পলাশকে বলে-“বাবা, আমাকে একটু জল দিবি? 

তখন পলাশ বলে-“হ্যাঁ বাবা, এক্ষুনি দিচ্ছি। তুমি এখানে এসে বসো।”

এই বলে পলাশ ঘর থেকে জল নিয়ে এসে সাধুকে দেয়। 

জল খেয়ে সাধু বলে-“আঃ, প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। 

এরপর সাধু পলাশের দিকে তাকিয়ে বলে-“বাবা, আমার পা টা একটু টিপে দিবি? খুব ব্যথা করছে।”

পলাশ তখন দেখে সাধুর পায়ে রাজ্যের ধুলো কাদা লেগে আছে। যা দেখে পলাশ একটু বিরক্ত হয়। সে বলে-“ক্ষমা করবে বাবা। আমি তোমার পা টিপতে পারব না।”

এই শুনে সাধু হাসতে হাসতে বলে-“আমি জানতাম তুই এই কাজ করবি না। শোন আগামী অমাবস্যায় তোর রূপ বদলে যাবে। তুই রাক্ষস হয়ে যাবি।”

পলাশ তখন বলে-“তুমি কী আমায় অভিশাপ দিচ্ছ?”

সাধু বলে-“না রে, আমি তোর ভবিষ্যৎ জানাতেই এখানে এসেছিলাম। এখন আমি চলি রে।”

পলাশ বলে-“সে কী মানুষ থেকে রাক্ষস হয়ে যাব?”

সাধু বলে-“হ্যাঁ, এ তোর গত জন্মের পাপের ফল। তবে তুই আবার মানুষ হয়ে যাবি।”

এই বলে সাধু হাসতে হাসতে সেখান থেকে চলে যায়। 

এদিকে পলাশ চিৎকার করে বলতে থাকে -“কিন্তু আমি আবার মানুষ হব কীভাবে? তা তো বলে যাও।”

কিন্তু সাধু আর কিছু না বলে চলে যায়। আড়াল থেকে সব শুনে পলাশের বুড়ি মা কেঁদে উঠে। তারপর অজ্ঞান হয়ে সেখানে পড়ে যায়। 

আর পলাশ ভয়ে চিৎকার করে বলে-“রাক্ষস! নাআআআআআআ।”

এরপর মায়ের কথা ভেবে পলাশ মনে মনে বলে-“না না আমি আর এখানে থাকব না। আমি রাক্ষস হয়ে গেলে মা তা সহ্য করতে পারবে না। তাই অমাবস্যা আসার আগেই আমাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে। যদি সত্যিই রাক্ষস হয়ে যাই তাহলে আর কোনোদিন এ বাড়ি মুখো হব না। কোনোদিন আমার এ মুখ তোমাকে দেখাব না মা কোনোদিন না।” এই বলে সে কাঁদতে থাকে।

ঠিক তখনই তার মায়ের জ্ঞান ফিরে আসে। জ্ঞান ফিরতেই তার মা তাকে বলে-“রাক্ষস, কোথায় রাক্ষস?”

পলাশ বলে-“তুমি ভুল শুনেছ মা। রাক্ষস নয়, আসলে রাকসুর গ্ৰাম থেকে বায়না এসেছে। তারা আমার বাঁশি শুনতে চায়। তাই যাব বলছিলাম।”

তার মা বলে-“কবে যাবি?”

পলাশ বলে-“কালকেই যাব মা।”

এর পরদিন সকালে পলাশ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। সবার থেকে লুকিয়ে থাকবে বলে সে গভীর জঙ্গলে চলে আসে। আর হাঁটতে হাঁটতে জঙ্গলের ভিতরে একটা গুহা দেখতে পায়। 

গুহার সামনে এসে সে বলে-“কী কপাল আমার। বাড়ি ঘর থাকতে থাকতে এই জঙ্গলে থাকতে হবে।”

এই বলে সে গুহার ভিতরে প্রবেশ করে। সকাল থেকে সন্ধ্যে হয়ে যায়। আর ধীরে ধীরে পলাশের চেহারা বদলে যায়। সে রাক্ষসে পরিণত হয়। কিন্তু বাইরে রাক্ষস হলেও ভিতরে তার সেই সরল মনটাই থেকে যায়। 

জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে সে বাঁশি বাজাতে থাকে। তার বাঁশির সুর শুনে কোনো জন্তুই তার কাছে আসত না। এইভাবে তার দিন কাটতে থাকে।

এদিকে সে যে জঙ্গলে থাকত সেই জঙ্গলটা ছিল শ্যামগড় রাজ্যের। সেই রাজ্যে তখন দেখা দিয়েছিল এক ভয়ঙ্কর রাক্ষসের উৎপাত। সেই রাক্ষসের অত্যাচারে রাজ্যবাসী ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকত। সেই রাজ্যের রাজাও কিছুতেই সে বদমাইশ রাক্ষসটাকে ধরতে পারছিল না।

একদিন সকালে একটা পাথরের গায়ে ঠেস দিয়ে পলাশ বাঁশি বাজাচ্ছিল। হঠাৎই সে একটা মেয়ের গলার আওয়াজ শুনতে পায়। কেউ যেন ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিৎকার করছে। আর তার সঙ্গে বাঘের গর্জন।

বাঘের গর্জন শুনে পলাশ প্রথমে চমকে উঠে আর বাঁশি বাজানো বন্ধ করে দেয়। কিন্তু তার কিছুক্ষণ পর সে আবার বাঁশি বাজাতে থাকে। কারণ সে জানে যে তার বাঁশির সুর শুনে জন্তুরা সব পালিয়ে যায়।

তার ভাবনা মতো সত্যি সত্যিই বাঘ পলাশের বাঁশির সুর শুনে সেই মেয়েকে ছেড়ে পালিয়ে যায়। 

আর এইসব দেখে রাজকুমারী অবাক হয়ে যায়। 

রাজকুমারী বলে-“এ কী করে হল? এ কী করে সম্ভব?”

তখন পলাশ গাছের আড়াল থেকে রাজকুমারীকে বলে-“কী ব্যাপার, কে তুমি? আর একা একা এই গভীর জঙ্গলে এসেছ কেন?”

রাজকুমারী তখন বলে-“কে কে, কে তুমি?”

পলাশ বলে-“আমি এক অভাগা ছেলে। আমার কেউ নেই। তাই দূরে ওই সুবর্ণ নদীর তীরে বসে থাকি মন ভালো করতে।”

রাজকুমারী বলে-“ওওও, আচ্ছা ঠিক আছে। এবার তুমি সামনে এস।”

পলাশ বলে-“না না, আমি সামনে যাব না। আমি খুব খারাপ দেখতে।”

রাজকুমারী বলে-“তাহলে তুমি কী তোমার ওই খারাপ রূপ দেখিয়ে বাঘকে তাড়িয়ে আমাকে বাঁচিয়েছ।”

পলাশ বলে-“না না না।”

রাজকুমারী বলে-“তবে?”

পলাশ বলে-“আসলে আমার বাঁশি শুনে এই জঙ্গলের জন্তুরা আমার কাছে আসে না। আমার রাস্তা ছেড়ে দেয়।”

রাজকুমারী বলে-“আমি এই রাজ্যের রাজকুমারী। তোমাকে আদেশ করছি তুমি বেরিয়ে এসো।”

পলাশ বলে-“জঙ্গলে শুধু পশুদের আদেশ চলে। কোনো রাজকুমারী বা রাজার নয়। কিন্তু তুমি কোথাও যাচ্ছিলে?”

রাজকুমারী বলে-“দূরে ওই আজমগড়ের দিকে।”

পলাশ বলে-“সে তো খুব ভয়ঙ্কর রাস্তা। চলো আমি তোমাকে এগিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু খবরদার তুমি আমাকে দেখার চেষ্টা করো না।”

রাজকুমারী বলে-“আচ্ছা ঠিক আছে।”

এরপর রাজকুমারী হাঁটতে থাকে। আর তার পেছন পেছন বাঁশি বাজাতে বাজাতে পলাশ হাঁটতে থাকে।

 পলাশের বাঁশির সুর শুনে রাজকুমারী খুব খুশি হয়। সে মনে মনে বলে-“বাঃ, ভারী মিষ্টি তো এই সুর। শুনে খুব আরাম লাগছে। কিন্তু এ আমার কী হচ্ছে। তাকে যে একবার দেখতে ইচ্ছে করছে।”

পলাশ তখন বলে-“আচ্ছা তুমি রাজকুমারী হয়ে একা একা এই জঙ্গলে কী করছ?”

রাজকুমারী বলে-“আমাদের রাজ্যে মাঝে মাঝে এক রাক্ষস আসে। আর অনেক ক্ষতি করে চলে যায়। সৈন্যরা তাকে ধরার অনেক চেষ্টা করেছে কিন্তু পারেনি। সেই জন্য আমি নিজে সেই রাক্ষসকে দেখতে চেয়েছিলাম।”

পলাশ বলে-“দেখে তুমি কী করবে?”

রাজকুমারী বলে-“যাতে কোনো বুদ্ধি বের করে তাকে মারতে পারি। ওই যে ওই দেখ দূরে ওই যে গুহাটা দেখতে পাচ্ছ। ওইখানেই থাকে শুনেছি। এবার আমি চললাম হ্যাঁ।”

এই বলে রাজকুমারী গুহার দিকে এগিয়ে যায়। আর রাজকুমারী এগিয়ে যেতেই সেই ভয়ঙ্কর রাক্ষসটি রাজকুমারীর গায়ের গন্ধ পেয়ে গুহা থেকে বেরিয়ে আসে। 

রাক্ষসকে দেখে রাজকুমারী ভয় পেয়ে যায় আর পালিয়ে যেতে চায়। কিন্তু পালাতে গিয়ে পাথরে পা লেগে রাজকুমারী পড়ে যায়।

তখন রাক্ষস হাসতে হাসতে বলে-“মানুষ হয়ে নিজেই মরতে এসেছিস, হা হা হা।”

এই বলে সে রাজকুমারীকে ধরতে আসে। কিন্তু রাজকুমারীকে ধরার আগেই রাক্ষসরূপী পলাশ ঝাঁপিয়ে পড়ে ওই ভয়ঙ্কর রাক্ষটির উপর। আর ওই রাক্ষসটিকে মেরে ফেলে। এই লড়াইয়ের মাঝে তার বাঁশিটা পড়ে গিয়েছিল। আর রাজকুমারী হঠাৎ সেই বাঁশিটা দেখতে পেয়ে সব বুঝে যায়। 

এদিকে পলাশ রাক্ষসটিকে মেরে ফেলে মুখ তুলে তাকাতেই দেখে রাজকুমারী তার দিকে তাকিয়ে আছে। এই দেখে সে মুখ লুকিয়ে সেখান থেকে দৌঁড়ে চলে যায়। 

রাজকুমারী তার ফেলে যাওয়া বাঁশিটা মাটি থেকে তুলে নেয়। আর রাজ্যে ফিরে এসে রাজাকে সব বলে। 

সব শুনে রাজা বলে-“না না মা তুই এটা একদম ঠিক করিসনি। তুই একা কেন গিয়েছিলি?”

রাজকুমারী বলে-“চিন্তা করো না বাবা, ওই রাক্ষস মরে গেছে।”

এই শুনে রাজা বলে-“কী! রাক্ষস মারা গেছে। তুই ঠিক বলছিস? রাক্ষস মরে গেছে। আঃ আজ আমাদের সুখের দিন, রাক্ষস মরে গেছে।”

এই শুনে প্রজারা রাজকুমারীর জয় জয়কার করতে থাকে।
🍂

তখন রাজকুমারী বলে-“দাঁড়াও দাঁড়াও, তোমরা আমার জয় জয়কার করো না। আমি রাক্ষসকে মারিনি।”

রাজা বলে-“তবে কে মেরেছে? যে মেরেছে তার সঙ্গেই আমি তোর বিয়ে দেব।”

রাজকুমারী বলে-“সে হল এক রাক্ষস।”

রাজা তখন বলে-“কী! রাক্ষস রাক্ষসকে মেরেছে?”

রাজকুমারী বলে-“হ্যাঁ বাবা, আর সেই রাক্ষসকেই আমি বিয়ে করব।”

রাজা বলে-“না না এ হতে পারে না। একটা রাক্ষসের সঙ্গে আমি তোর বিয়ে দিতে পারব না।”

রাজকুমারী বলে-“কিন্তু বাবা, আজ সেই রাক্ষস যদি না থাকত তাহলে তোমার মেয়েকে রাক্ষস মারার আগে তোমার মেয়ে বাঘের পেটে চলে যেত। সে আমাকে ওই বাঘের হাত থেকে বাঁচিয়েছে। এমনকি পথের সমস্ত বিপদ থেকে বাঁচানোর জন্য সারা রাস্তা আমার সঙ্গে সঙ্গে গেছে। তার অন্তর ও বাইরের কোনো মিল নেই বাবা।”

রাজা তখন বলে-“বেশ, তাহলে তুই তাকে খুঁজে আন। আমি তাকে দেখতে চাই।”

এরপর রাজকুমারী ওই রাক্ষসকে খুঁজতে ওই জঙ্গলে যায়। কিন্তু তাকে কোথাও খুঁজে পায় না। তারপর তার মনে পড়ে যে রাক্ষসরূপী পলাশ বলেছিল যে সে তার মন ভালো করতে সুবর্ণ নদীর তীরে বসে থাকে।

রাজকুমারী তখন সেই নদীর তীরে গিয়ে পলাশের বাঁশিটা সেখানে রেখে গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। 

আর ঠিক তখনই বাঁশি নিতে পলাশ সেখানে আসে। আর পলাশ সেখানে আসা মাত্রই রাজকুমারী তার সামনে চলে যায়।

রাজকুমারীকে দেখে পলাশ বলে-“এ কী তুমি। তুমি এখানে কী করছ?”

রাজকুমারী তখন বলে-“আমি জানতাম এই বাঁশি নিতে তুমি এখানে আসবেই। আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।”

পলাশ বলে-“না না এ হতে পারে না। আমি একটা রাক্ষস।”

রাজকুমারী বলে-“তুমি রাক্ষস নও। যদি তুমি সত্যি রাক্ষস হতে তাহলে তুমি আমাকে বাঁচাতে না খেয়ে ফেলতে। কিন্তু তুমি তা করোনি। বলো, বলো তুমি কে?”

পলাশ বলে-“আমার নাম পলাশ। আমি আগে এইরকম রাক্ষস ছিলাম না। আগের জন্মে কোনো পাপের ফলে আমাকে রাক্ষস হতে হয়েছে। সাধুবাবা বলেছিল আমি নাকি আবার মানুষ হব। কিন্তু কবে এবং কীভাবে হব তার জানি না। আমার মা হয়তো আজও আমার জন্য অপেক্ষা করছে।”

রাজকুমারী তখন বলে-“তুমি বাইরে যেমন দেখতে হও না কেন, আমি তোমার সুন্দর মনটাকে ভালোবেসে ফেলেছি। আর তোমাকে ছাড়া আমি আর কাউকে বিয়ে করতে পারব না।”

এই বলে রাজকুমারী পলাশের হাতে হাত রাখে। আর ঠিক তখনই পলাশ আবার তার আগের রূপে ফিরে আসে। এই দেখে পলাশ খুব খুশি হয়। সে আনন্দে চিৎকার করতে থাকে।

তখন রাজকুমারী পলাশকে বলে-“তাহলে এবার তুমি আমার সঙ্গে রাজপ্রাসাদে চলো। সেখানেই আমাদের বিয়ে হবে।”

এরপর রাজকুমারীর সঙ্গে পলাশের বিয়ে হয়ে যায়। আর তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকে।

Post a Comment

0 Comments