দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ৫ই ফেব্রুয়ারি, কাশ্মীর সংহতি দিবস। সংহতি কি, কাশ্মীর সংহতি দিবস কেন পালন করা হয়, এর তাৎপর্য এবং গুরুত্বই বা কি? আসুন এই সব কিছুই বিস্তারিত ভাবে জেনে নিই।
সংহতি অর্থ হল ঐক্য, মিলন, সংঘবদ্ধতা,বা একতাবদ্ধ হওয়া, যা সাধারণত স্বার্থ, উদ্দেশ্য বা মূল্যবোধের ভাগ করে নেওয়ার কারণে একটি গোষ্ঠী বা শ্রেণীর মধ্যে তৈরি হয়,এর মানে হলো, একসাথে থাকা, সমর্থন করা এবং একটি সাধারণ লক্ষ্যের জন্য কাজ করা।
বিশ্বের দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর মধ্যে কাশ্মীর সমস্যা অন্যতম। এই সমস্যার সঙ্গে জড়িত রয়েছে উপমহাদেশের ইতিহাস, রাজনীতি, জাতিসত্তা ও মানবাধিকারের প্রশ্ন। কাশ্মীরি জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ এবং তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের দাবিকে সামনে আনতেই প্রতি বছর ৫ই ফেব্রুয়ারি কাশ্মীর সংহতি দিবস পালিত হয়। এই দিনটি কেবল একটি স্মরণীয় দিবস নয়, বরং এটি কাশ্মীরি জনগণের কষ্ট, সংগ্রাম ও আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
কাশ্মীর সংহতি দিবস মূলত পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়। তবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী কাশ্মীরি জনগণ ও তাদের সমর্থকরাও নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি পালন করে থাকেন।
এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো,কাশ্মীরি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, তাদের ওপর সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলের সামনে তুলে ধরা এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানানো। কাশ্মীর সমস্যার সূচনা হয় ১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশ বিভক্তির সময়। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। সেই সময় জম্মু ও কাশ্মীর একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য হওয়া সত্ত্বেও জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এটি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এর ফলশ্রুতিতে কাশ্মীর প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত থেকে গেছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রস্তাব থাকলেও এখনো পর্যন্ত কাশ্মীরি জনগণ তাদের মত প্রকাশের পূর্ণ সুযোগ পায়নি এমনটাই অনেকের দাবি।
এই প্রেক্ষাপটে কাশ্মীর সংহতি দিবস একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দিবসটি পালনের মাধ্যমে কাশ্মীরি জনগণের সঙ্গে নৈতিক ও মানবিক সংহতি প্রকাশ করা হয়।
🍂
কাশ্মীর সংহতি দিবসের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মানবাধিকার প্রশ্ন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গণমাধ্যমে কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠে এসেছে। এই দিবসের মাধ্যমে এসব বিষয় বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। বক্তৃতা, প্রবন্ধ, চিত্র প্রদর্শনী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি করা হয়, যাতে আন্তর্জাতিক মহল কাশ্মীর সমস্যার প্রতি আরও মনোযোগী হয়।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও কাশ্মীর সংহতি দিবস গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হয়। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে রচনা প্রতিযোগিতা, বিতর্ক, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম কাশ্মীর সমস্যার ইতিহাস, বর্তমান অবস্থা এবং এর মানবিক দিক সম্পর্কে জানতে পারে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করাই এসব কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।
কাশ্মীর সংহতি দিবস কেবল রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশের দিন নয়; এটি শান্তির আহ্বানের দিনও। এই দিবসে বক্তারা প্রায়ই জোর দিয়ে বলেন যে, কাশ্মীর সমস্যার স্থায়ী সমাধান কেবল সহিংসতার মাধ্যমে নয়, বরং সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে শান্তিপূর্ণ উপায়েই সম্ভব। কাশ্মীরি জনগণের ইচ্ছা ও অধিকারকে সম্মান জানিয়েই যে কোনো সমাধান টেকসই হতে পারে এই বার্তাই বারবার উচ্চারিত হয়। আধুনিক যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কাশ্মীর সংহতি দিবস পালনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিভিন্ন হ্যাশট্যাগ, অনলাইন ক্যাম্পেইন, ভিডিও ও লেখার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম তাদের সংহতি প্রকাশ করে। এর ফলে কাশ্মীর সমস্যা স্থানীয় বা আঞ্চলিক গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো কণ্ঠহীন মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।
তবে কাশ্মীর সংহতি দিবস পালনের সার্থকতা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব উদ্যোগে রূপ নেয়। মানবাধিকার রক্ষা, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সংলাপের পথ সুগম করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকা অপরিহার্য। একই সঙ্গে উপমহাদেশের দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা বাড়ানোও জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, কাশ্মীর সংহতি দিবস কাশ্মীরি জনগণের সংগ্রামের প্রতি এক দৃঢ় সমর্থনের প্রতীক। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে সংঘটিত অবিচার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে নীরব থাকা উচিত নয়। মানবতা, ন্যায়বিচার ও শান্তির পক্ষে অবস্থান নেওয়াই এই দিবসের মূল শিক্ষা। কাশ্মীর সংহতি দিবস সেই আশা জাগিয়ে তোলে একদিন কাশ্মীর উপত্যকায়ও শান্তি ফিরবে, আর কাশ্মীরি জনগণ তাদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারবে। তবে বর্তমানে পেহেলগাঁও হত্যাকাণ্ড হলেও আগের থেকে কাশ্মীর অনেকটাই শান্ত হয়েছে।
0 Comments