মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ১৯৪
রমেশচন্দ্র নন্দ পঞ্চতীর্থ (পণ্ডিত, রামনগর)
ভাস্করব্রত পতি
রামনগরের মৈতনা গ্রামে ১৮৮৮ সালের ১৫ ই সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন পণ্ডিত রমেশচন্দ্র নন্দ পঞ্চতীর্থ। পিতার নাম দ্বারকানাথ নন্দ এবং মাতার নাম ব্রহ্মময়ী দেবী। সংস্কৃত সাহিত্যে অগাধ পাণ্ডিত্যের দরুন 'স্মৃতিরত্ন' উপাধী লাভ করেছিলেন এই অধ্যাপক দ্বারকানাথ নন্দ। এহেন পিতার যথার্থ সন্তান রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন রমেশচন্দ্র নন্দ।
সেসময়ের বাংলার বৃহৎ পণ্ডিত সমাজের কাছে তিনি ছিলেন 'নিখিল শাস্ত্রাধ্যাপক'। আসলে নানা ধরনের বেদ বিদ্যালয় এবং চতুষ্পাঠীর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নিজের উদ্যোগে। দেশের এবং সমাজের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারে তাঁর আগ্রহ এবং ভূমিকা ছিল অনন্য। তিনি চেয়েছিলেন অন্ধকার যুগের অবসান ঘটুক। শিক্ষার আলোয় আলোকিত হোক সর্বত্র।
পিতাই ছিলেন তাঁর বড় হওয়ার মূল অনুপ্রেরণা। শিক্ষিত পিতার হাত ধরেই তাঁর এগিয়ে চলা। যার ফলে গ্রামের চতুষ্পাঠীতেই শুরু হয় তাঁর বিদ্যারম্ভ। বাহারী গ্রাম বাহিরীতে ছিল মামাবাড়ি। সেখানে পণ্ডিত পঞ্চানন ন্যায়রত্নের কাছে তাঁর পাঠক্রম চলতে থাকে। এরপর তিনি ভর্তি হন বলাগেড়িয়া গ্রামের পণ্ডিত শ্রীপতিচরণ কাব্যতীর্থের কাছে। সংস্কৃত পাঠগ্রহণের পাশাপাশি বলাগেড়িয়ার বিখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবী দিগম্বর নন্দ বিদ্যানিধির সংস্পর্শে আসেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর কাছে তিনি স্বদেশমন্ত্রের দীক্ষা পান। মনের মধ্যে জেগে ওঠে স্বদেশপ্রেমের আগুন। পরবর্তীতে রাজা দুর্গাদাস রায়ের সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে আকৃষ্ট হন। যার পরিপ্রেক্ষিতে সমাজ থেকে অস্পৃশ্যতা বর্জন, হরিজনদের নিয়ে আন্দোলন ইত্যাদি কাজে তিনি যুক্ত ছিলেন আজীবন।
রমেশচন্দ্র নন্দ পঞ্চতীর্থ ক্রমশঃ নিজেকে পরিশীলিত করতে থাকেন নিবিড় শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে। কাঁথি ভবসুন্দরী চতুষ্পাঠীতে পণ্ডিত দিবাকর বেদান্ত পঞ্চাননের কাছে শিক্ষালাভ করেন বেদ, ব্যাকরণ, স্মৃতি এবং দর্শনের নানা বিভাগ। পরবর্তীতে ভাটপাড়ায় গিয়ে পঞ্চানন তর্করত্ন এবং বর্ধমানে গিয়ে বিশ্বেশ্বর তর্করত্নের কাছে বিভিন্ন বিষয়ে পাঠগ্রহণ করেন। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন একজন সত্যিকারের পণ্ডিত নৈয়ায়িক।
পাঠগ্রহণ শেষের পর ১৯১২ - ১৯১৩ পর্যন্ত কাঁথি মডেল ইনস্টিটিউশনে শিক্ষকতা করতে শুরু করেন। এরপর তাঁকে আহ্বান জানান শ্রীমৎ স্বামী পরমানন্দ পুরী। তাঁর আমন্ত্রণে কাঁথি থেকে চলে যান হাওড়া। এখানকার রামরাজাতলার 'বঙ্গীয় শঙ্করমঠ চতুষ্পাঠী'তে প্রধান অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯১৩ - ১৯১৫ পর্যন্ত এখানে থাকাকালীন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, বাসন্তী দেবীকে বেদ, উপনিষদ, গীতার বাণী শোনাতেন। ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন তখন।
আবারও কর্মস্থলের পরিবর্তন হয় তাঁর। এবার তিনি আমন্ত্রণ পান এগরার গড়বাসুদেবপুরের রাণী হরিপ্রিয়ার কাছ থেকে। রামরাজাতলা থেকে চলে যান এগরা। সেখানে তিনি রাজসভার প্রধান পণ্ডিতের পদ অলঙ্কৃত করেন এবং রাজকীয় দর্শন চতুষ্পাঠীর প্রধান অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্তি পান।
তিনি ছিলেন যথার্থই একজন পণ্ডিত মানুষ। বেদ, পুরাণ, ব্যাকরণ, শাস্ত্র ইত্যাদি নিয়ে তাঁর পাঠদানে উপকৃত হতে থাকে মেদিনীপুরের মাটি। ওড়িশা সীমান্তবর্তী মেদিনীপুরের প্রান্তিক এলাকার এই সন্তান তাঁর জ্ঞান গরিমা আর পাণ্ডিত্যের বহর নিয়ে সমীহ আদায় করে নিয়েছিলেন সর্বত্র। শিক্ষিত বোদ্ধাদের কাছে তিনি ছিলেন যথার্থ গুণি মানুষ। তাঁর পাণ্ডিত্যের দরুন বিভিন্ন স্থান থেকে পেয়েছেন অসংখ্য স্বর্ণ ও রৌপ্যপদক সহ বৃত্তিলাভ। এছাড়াও অসংখ্য সম্মান, পুরস্কার এবং উপাধি পেয়েছেন তিনি। তাঁর জ্ঞানের পরিধির জন্য পণ্ডিতকূল তাঁকে দেয় 'বেদান্ত বিদ্যার্ণব' উপাধি। এছাড়াও অযোধ্যা সংস্কৃত কার্যালয় থেকে তিনি পান 'বিদ্যালঙ্কার' উপাধি। ১৯৬৬ সালের ১৭ ই আগস্ট মৃত্যু হয় মেদিনীপুরের এই পণ্ডিতপ্রবর মানুষটির।
🍂
0 Comments