জ্বলদর্চি

মধুবাবুর ভ্যালেন্টাইন ডে/কমলিকা ভট্টাচার্য

মধুবাবুর ভ্যালেন্টাইন ডে

কমলিকা ভট্টাচার্য

প্রায় পনেরো দিন মধুবাবু বাড়িতে থাকবেন না। তিনি যাচ্ছেন দুবাই। তাঁর খুব কাছের বন্ধু মনোতোষ ভীষণ অসুস্থ—অসুস্থ ঠিক নয়, মানসিকভাবে একেবারে ভেঙে পড়েছেন। স্ত্রী হঠাৎ করে মারা যাওয়ায় তিনি একেবারেই একা হয়ে পড়েছেন। মনোতোষের ছেলে তাই অনেক দিন ধরেই বাবার মন ভালো করার জন্য মধুবাবুকে আসতে বলছিল। শেষ পর্যন্ত সে নিজেই টিকিট কেটে পাঠিয়ে দিয়েছে।
মনোতোষ বহু বছর ধরেই দুবাইতে সেটেল। কল্যাণীদেবীকেও সঙ্গে যাওয়ার জন্য বহুবার অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু কল্যাণী নিজেই না করে দেন। বাহ্যিক কারণ—শরীরটা ভালো নেই। আসল কারণটা ছিল অন্য। মধুবাবু আর কল্যাণীকে একসঙ্গে দেখলে মনোতোষের মৃত স্ত্রীর কথা আরও বেশি করে মনে পড়বে—এই ভেবেই কল্যাণী যেতে চাননি।
তাই কল্যাণীদেবী মধুবাবুকে বললেন,
“তুমি ক’দিন ঘুরে এসো বরং। আমাকে এই ক’দিন সংসার করা থেকে রক্ষা দাও। আমি একটু একলা, মনের মতো করে বাঁচি।”
মধুবাবু বললেন,
“দেখো, আমার বন্ধু স্ত্রীর বিয়োগে কীভাবে ভেঙে পড়েছে, আর তুমি আমাকে বিদায় করতে পারলেই বাঁচো!”
কল্যাণীদেবী মুখ বেঁকিয়ে বললেন,
“অনিতা তো মরেই বেঁচেছে। এখন বুড়োটা নাকে কাঁদলে কী হবে! তোমার বন্ধু কি তাকে কম জ্বালিয়েছে? তোমার বন্ধু তো তোমারই মতো। আমি মরলে না জানি তুমি কত নাটক করবে!”
🍂

মধুবাবু হাসতে হাসতে বললেন,
“মানে আমি বুড়ো, আমি তোমাকে ভালোবাসি না—এইসব বলছ? আচ্ছা দেখি, আমাকে ছাড়া তুমি কত সুখে থাকো! তা অবশ্য থাকবে। একবার ডাক দিলেই মিস্টার ব্যানার্জী এক তোড়া ফুল হাতে হাজির হবেন!”
কল্যাণীদেবী ঠোঁট টিপে বললেন,
“বিপদে পড়লে বা একলা লাগলে ডাকব বৈকি! তুমি তো কোনোদিন একটা ঘাসফুলও আনলে না। উনি যদি এক তোড়া ফুল আনেন, ভালো তো লাগবেই।”
মধুবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“তা হলে ঠিকই—আমাকে ছাড়া তোমার ক’দিন বেশ ভালোই কাটবে।”
কল্যাণী সংক্ষিপ্ত গলায় বললেন,
“কাল ভোরে ফ্লাইট। ক্যাবটা বুক করে দিও। আর কথা বাড়িও না।”
রাত একটার সময় ট্যাক্সি এসে গেল। পাঁচটার ফ্লাইটে মধুবাবু দুবাই রওনা হলেন। প্লেনে বসে তিনি মেসেজ পাঠালেন—
“এবার প্লেন ছাড়বে। তুমি এখন আজাদ পাখি।”
কল্যাণী উত্তর দিলেন,
“ওষুধগুলো সময়মতো খেও। নিজে হাতে তো কোনোদিন এক গ্লাস জলও খেতে পারো না। সাবধানে থেকো। বন্ধুকে দেখতে গিয়ে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ো না।”
ফোন রেখে কল্যাণীদেবী পাশ ফিরে শুলেন। বিছানাটা হঠাৎ খুব ফাঁকা লাগল। সকালে ওঠার বিশেষ তাড়া নেই—এই ভেবে আবার ঘুমিয়ে পড়লেন।
হঠাৎ মনে হলো দরজায় বেল বাজল।
ভাবলেন, এত সকালে আবার কে আসতে পারে? তাড়াতাড়ি নাইটড্রেসের ওপর ওড়না জড়িয়ে দরজা খুললেন। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলেন না।
একটু অবাক হলেন। ভাবলেন—ভুল করে কেউ বেল টিপে দিয়েছে, নাকি তাঁরই ভুল ধারণা।
সারাদিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে মধুবাবুকে খুব মিস করছিলেন কল্যাণীদেবী। সকাল এগারোটা নাগাদ মধুবাবু খবর দিলেন—তিনি পৌঁছে গেছেন। মনোতোষের ছেলে নিজেই এয়ারপোর্টে এসেছিল।
একলা খেতে বসে আজ খাবার ভালো লাগল না। বিকেলে পড়তে আসা ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটলেও সন্ধ্যার পর একা থাকতে একদমই ভালো লাগছিল না কল্যানিদেবীর।
ভাবলেন, মধুবাবুকে ফোন করবেন। কিন্তু দুবাইতে তো হোয়াটসঅ্যাপ চলে না। যাওয়ার সময় মধুবাবু অন্য কোনো অ্যাপের কথা বলেছিলেন, কিন্তু তাড়াহুড়োয় ইন্সটল করা হয়নি।
অগত্যা টিভি চালিয়ে বসলেন। আর সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়লেন।
হঠাৎ আবার বেলের আওয়াজে চমকে উঠলেন। দরজা খুলে দেখলেন—আবার কেউ নেই। এবার তিনি সত্যিই অবাক হলেন।
পরদিন ভোরেও একই ঘটনা। কল্যাণীদেবী রীতিমতো টেনশনে পড়লেন। ভাবলেন, সকালে সিকিউরিটিকে বলবেন।
পরদিনও বেল বাজল। আজ কল্যাণী আগে থেকেই জেগে ছিলেন। দরজা খুললেন সঙ্গে সঙ্গে—হাতে নাতে ধরবেন বলে। কিন্তু আজও কাউকে দেখতে পেলেন না। তবে দরজার সামনে পড়ে ছিল একটা বক্স।
বক্সের ভেতর থেকে একটি কাগজ বেরোল। তাতে লেখা—
“কেমন আছো, কল্যাণী?”
কল্যাণীদেবী কিছুতেই বুঝতে পারলেন না, কে পাঠাচ্ছে এসব। মধুবাবুকে কিছু বললেন না—তিনি টেনশন করবেন ভেবে।
এরপর প্রতিদিনই একটা করে জিনিস আসতে লাগল। কোনোদিন নাম লেখা কাপ, কোনোদিন কলম, কোনোদিন বই, কোনোদিন ব্যাগ। আর প্রতিদিন একই লেখা—
“কেমন আছো, কল্যাণী?”
কারও সঙ্গে এসব কথা বলতে সাহস পেলেন না। একবার ভাবলেন ব্যানার্জী বাবুকে ফোন করবেন, কিন্তু ভেবে দেখলেন—উনি ভুল বুঝতে পারেন।
সিকিউরিটি জানাল, এত ভোরে কেউ আসে না। সিসিটিভিও চেক করা হয়েছে—কাউকে দেখা যায়নি।
কল্যাণীদেবী এবার সত্যিই ভয় পেতে লাগলেন। প্যাকেটগুলো খুলে দেখা বন্ধ করে দিলেন।
একদিন হঠাৎ একটি প্যাকেট খুলে বেরোল একজোড়া নূপুর।
মধুবাবুর সঙ্গে ফোনে কথা হলে তিনি অনুরোধ করলেন, এবার যেন তিনি ফিরে আসেন।
মধুবাবু হাসতে হাসতে বললেন,
“এই ক’দিনেই তোমার ছুটির সুখ মিটে গেল? আমার শরীরটাও ভালো নেই। যদি এখানে আমার কিছু হয়ে যায়, আমার বডিটা কীভাবে তোমার কাছে পৌঁছাবে—তার ব্যবস্থা করছি!”
কল্যাণীদেবী বিরক্ত হয়ে বললেন,
“আমি এমনিতেই চিন্তায় আছি, আর তুমি মজা করছ! আর তোমার সঙ্গে কথা বলব না।”
এই বলে ফোন রেখে দিলেন।
তিন দিন মধুবাবুর সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হলো না।
রোজ সকালে জিনিস আসা চলতেই থাকল।
একদিন সকালে বেল বাজতেই দরজা খুলে কল্যাণীদেবী দেখলেন—একটা বিরাট কফিনের মতো বাক্স। সাদা কাপড়ে ঢাকা।
নিমেষে তাঁর পায়ের তলার জমি সরে গেল। মনে পড়ল মধুবাবুর শেষ কথাগুলো।
কল্যাণীদেবী চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন। তারপর অজ্ঞান।
চোখ খুলে দেখলেন—ব্যানার্জী বাবু ফুলের তোড়া হাতে দাঁড়িয়ে।
তিনি বললেন,
“মধুবাবু! ওনার জ্ঞান ফিরেছে।”
মধুবাবু ছুটে এসে বললেন,
“কল্যাণী, ঠিক আছো?”
কল্যাণীদেবী কাঁপা গলায় বললেন,
“তুমি ঠিক আছো? তবে ওই কফিনের বাক্সে কী?”
মধুবাবু হেসে বললেন,
“আরে ওটা কফিন নয়! গ্র্যান্ডফাদার ক্লক। তোমার কত দিনের শখ ছিল। ভ্যালেন্টাইন ডে-তে গিফট দেবো বলে এনেছি।”
তারপর ব্যানার্জী বাবুর হাত থেকে ফুলের তোড়াটা নিয়ে কল্যাণীর হাতে দিয়ে বললেন,
“হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন ডে।”
কল্যাণীদেবী ব্যানার্জী বাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“এবার বুঝেছি—এই রোজ যে গিফটগুলো আসছিল, আপনারা দু’জনে মিলে করেছেন। আমি ভয়ে প্রায় মরেই যাচ্ছিলাম! এই বয়সে এসব কাণ্ড! ছিঃ ছিঃ!”
ব্যানার্জী বাবু হেসে বললেন,
“মধুবাবু, এবার আপনি সামলান। আমি আসি।”
কল্যাণীদেবী বললেন,
“যাবেন কোথায়? রোজ সকালে এত কষ্ট করেছেন—এক কাপ চা খেয়ে যান।”
ব্যানার্জী বাবু বললেন,
“ম্যাডাম, কী বাত! সর আঁখো পর।”
কল্যাণী চা বানিয়ে আনলেন।
ব্যানার্জী বাবু চলে গেলে মধুবাবু বললেন,
“কল্যাণী, তুমি সব গিফট খোলোনি।”
একটা একটা করে খুলতে লাগলেন। তারপর বললেন,
“তোমার পা দাও। নূপুর দুটো পরিয়ে দিই। তোমার পায়ে রিনি ঝিনি বাজবে।”
কল্যাণীদেবী হেসে বললেন,
“তোমার বুড়ো বয়সে ভীমরতি হয়েছে। আমার তো হয়নি!”
“আবার বুড়ো বলছ! দেখো তো, চুল কী সুন্দর কালো করেছি। কে বলবে পঁয়ষট্টি? বলো তো, কেমন লাগছি?”
কল্যাণী মজা করে বললেন,
“আবার টোপর পরে বিয়ে করতে পারবে মনে হচ্ছে!”
মধুবাবু মুচকি হেসে বললেন,
“তার আর দরকার নেই, কল্যাণী। ইউ আর মাই ভ্যালেন্টাইন।”
কল্যাণীদেবী বললেন,
“মরণ! আদিখ্যেতা দেখলে আর বাঁচিনা,এই বয়সে এসে কোথা থেকে যে এসব শিখছো কে জানে!"

দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পর মধুবাবু বললেন,
“কল্যাণী, কত দিন পাকা চুল তুলছ না। খুব কামড়াচ্ছে।”
কল্যাণীদেবী হেসে বললেন,
“এখন কী করে সাদা চুল বাছব? ওরা তো আজ ভ্যালেন্টাইন ডে মানাচ্ছে—কালো হয়ে!”
ঠিক সেই সময় গ্র্যান্ডফাদার ক্লক ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজিয়ে উঠল—
যেন সময় নিজেই হেসে উঠল।

Post a Comment

2 Comments

  1. খুব সুন্দর লেখা।

    ReplyDelete
  2. Happy Valentine's day to Madhubabu and Kalyani devi

    ReplyDelete