জ্বলদর্চি

'সরস্বতী সম্মান' পেলেন সাহিত্যিক রামকুমার মুখোপাধ্যায় /পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী

'সরস্বতী সম্মান' পেলেন সাহিত্যিক রামকুমার মুখোপাধ্যায় 

পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী

ভারতীয় সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরস্কার 'সরস্বতী সম্মান' এবার এল বাংলা ভাষার ঝুলিতে। শঙ্খ ঘোষ ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পর দীর্ঘ ২২ বছর পরে তৃতীয় বাঙালি সাহিত্যিক হিসেবে রামকুমার মুখোপাধ্যায় তাঁর কালজয়ী উপন্যাস 'হর-পার্বতীর কথা'-র জন্য ২০২৫ সালের মর্যাদাপূর্ণ 'সরস্বতী সম্মান' লাভ করেছেন।কে.কে. ফাউন্ডেশন কর্তৃক এই সম্মাননা ভারতীয় সংবিধানের অষ্টম তফশিলভুক্ত যেকোনো ভাষায় গত ১০ বছরে প্রকাশিত অসামান্য সাহিত্যকর্মের জন্য প্রদান করা হয়। এই পুরস্কারের অর্থমূল্য ১৫ লক্ষ টাকা, সঙ্গে দেওয়া হয় একটি মানপত্র ও স্মারক। সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি অর্জুন কুমার সিক্রির নেতৃত্বাধীন এক উচ্চপর্যায়ের কমিটি এই নির্বাচনের দায়িত্বে ছিলেন । 
এর আগে ১৯৯৮ সালে কবি শঙ্খ ঘোষ তাঁর কাব্যগ্রন্থ 'গন্ধর্ব কবিতা গুচ্ছ'-র জন্য এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ২০০৪ সালে তাঁর 'প্রথম আলো' উপন্যাসের জন্য এই পুরস্কার পেয়েছিলেন। 
২০২০ সালে কলকাতার বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত
রামকুমার মুখোপাধ্যায়ের 'হর-পার্বতীর কথা' উপন্যাসটি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি বহুমাত্রিক সৃজন, যা পৌরাণিক প্রেক্ষাপটকে এক নতুন সামাজিক ও দার্শনিক মাত্রায় উপস্থাপন করেছে।উপন্যাসটির মূল ভিত্তি হল শিব ও পার্বতীর চিরন্তন পৌরাণিক আখ্যান। লেখক এখানে কেবল দেব-দেবীর অলৌকিক মহিমা বর্ণনা করেননি , তিনি তাঁদের মানবিক সত্তা, প্রেম, মান-অভিমান এবং পারস্পরিক সম্পর্কের গভীর মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলিও লেখার মধ্যে তুলে ধরেছেন । পুরাণকে সমকালীন জীবনদর্শনের সঙ্গে মিলিয়ে একটি আধুনিক 'মিথ' হিসেবে উপন্যাসটি লেখা হয়েছে । লেখক বইটিতে তার নিজস্ব স্টাইলে চেনা পৌরাণিক গল্পের আড়ালে প্রচ্ছন্নভাবে প্রান্তিক সমাজ ও রাঢ় বাংলার লোকসংস্কৃতির উপাদান ব্যবহার করেছেন। শিব-পার্বতীর কথোপকথনের মাধ্যমে তিনি সৃষ্টি, বিনাশ এবং অস্তিত্বের গূঢ় রহস্যগুলোকে সহজভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই উপন্যাসে রামকুমার মুখোপাধ্যায় অত্যন্ত মার্জিত ও ধ্রুপদী গদ্য ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা পাঠককে এক অন্য জগতে নিয়ে যায়।
রামকুমার মুখোপাধ্যায় আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যের একজন শক্তিমান লেখক । তিনি সাহিত্যচর্চা শুরু করেছিলেন বিশ শতকের সত্তরের বছরগুলিতে। তাঁর জন্ম কলকাতায় হলেও  শৈশব-কৈশোর কেটেছিল বাঁকুড়া জেলার গেলিয়া গ্রামে, যা তাঁর সাহিত্যে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তাঁর অধিকাংশ আখ্যানের কেন্দ্রেই উঠে এসেছে গ্রামের কথা। তাঁর লেখায়  কীর্তন-বাউল-কথকতার মত দেশজ সাংস্কৃতিক উপাদানগুলি ফিরে ফিরে এসেছে।🍂

রামকুমার মুখোপাধ্যায় সাহিত্য অকাদেমির সহকারী সম্পাদক ছিলেন এবং পরে দীর্ঘ ১৪ বছর পূর্ব ভারতের সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ভারতীয় ভাষা পরিষদের সভাপতি এবং সাহিত্য অকাদেমির বাংলা উপদেষ্টা পর্ষদের আহ্বায়কও ছিলেন তিনি। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক হিসেবেও  দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি 'ইন্ডিয়ান ফোক ন্যারেটিভস' (Indian Folk Narratives)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংকলন সম্পাদনা করেছেন।
রামকুমার মুখোপাধ্যায়  ২০০০ সালে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অকাদেমির সোমেনচন্দ্র পুরস্কার , ২০০৬ সালে বঙ্কিম পুরস্কার এবং ২০১৩ সালে আনন্দ পুরস্কারেও সম্মানিত হয়েছেন। 
'হর-পার্বতীর কথা' ছাড়াও তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে 'ধনপতির সিংহলযাত্রা' , যা চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের আধুনিক বিনির্মাণ। উপন্যাস ছাড়াও তিনি  প্রায় শতাধিক ছোটগল্প লিখেছেন। তাঁর  প্রথম প্রকাশিত গল্পসংকলন— ‘মাদলে নতুন বোল’ (১৯৮৪)।

রামকুমার মুখোপাধ্যায়ের 'সরস্বতী সম্মান' প্রাপ্তি বাংলা সাহিত্যের সমকালীন ইতিহাসে এক উজ্জ্বল মাইলফলক। তাঁর এই সম্মাননা কেবল একজন সাহিত্যিকের ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং এটি বাংলা ভাষার ঐতিহ্য ও কথাসাহিত্যের উৎকর্ষকে ভারতের জাতীয় স্তরে পুনরায় গৌরবের সাথে প্রতিষ্ঠিত করল।

Post a Comment

0 Comments