মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২০১
প্রিয়নাথ জানা (সাহিত্যসাধক, স্বাধীনতা সংগ্রামী, ভগবানপুর)
ভাস্করব্রত পতি
তাঁর লেখা 'বঙ্গীয় জীবনীকোষ (আদি - অষ্টাদশ শতাব্দী)' বইটি একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ জীবনীকোষ সংকলন। আদিকাল থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বাংলার নানা ঐতিহাসিক ব্যাক্তিত্বদের জীবনের নানা তথ্য তিনি তুলে ধরেছেন এই বইতে। ভারত সরকারের আর্থিক অনুদানে মুদ্রিত হয়েছিল এটি। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ভগবানপুরের প্রিয়নাথ জানা ছিলেন সেই বিখ্যাত বইয়ের লেখক। কিন্তু আজ তিনি বিস্মৃতপ্রায়। অনেকেই তাঁর নামটুকুও শোনেনি।
ভগবানপুরের ভবানীচক গ্রামে ১৯২১ সালের ৯ ই জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন গিরিধর জানা এবং মায়ের নাম তিলোত্তমা দেবী। তাঁর বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মসূচি মেদিনীপুর জেলায় হলেও পরবর্তীকালে তাঁর বাসস্থান হয়ে ওঠে পার্শ্ববর্তী হাওড়া জেলার আন্দুলে। বাংলা ভাষায় প্রবন্ধ পঞ্জীকরণের পথিকৃৎ এই মানুষটির জীবনাবসান ঘটে ২০১৭ এর ৬ ই ফেব্রুয়ারি।
মেধাবী প্রিয়নাথ জানা পড়তেন তমলুকের বিখ্যাত হ্যমিলটন হাইস্কুলে। এখানকার কৃতী ছাত্রই ছিলেন। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি দেশমাতৃকার সেবায় নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন। এখানে দশম শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালীন ১৯৪২ এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। সামনে থেকে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। সেসময় তমলুক শহরের বুকে যে ঘটনা ঘটেছিল, তা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যুগান্তকারী ঘটনা।
১৯৪২ এর ২৯ শে সেপ্টেম্বর তমলুক শহরের বুকে বিপ্লবীরা এক অভূতপূর্ব কীর্তি স্থাপন করেছিল। থানা দখলের জন্য সেদিন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তিরিশ হাজার মানুষ। মাতঙ্গিনী হাজরা সহ বহু মানুষ সেদিন মৃত্যুবরণ করেন। এই আন্দোলনে সর্বাগ্রে ছিলেন প্রিয়নাথ জানা। ব্রিটিশ পুলিশের হাতে তিনি গ্রেপ্তার হন। বিচারে তাঁর দু বছরের কারাদণ্ড হয়। পরবর্তীতে তিনি হয়েছিলেন বিখ্যাত তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারে তমলুক থানার দ্বিতীয় অধিনায়ক।
কলকাতার বেলগাছিয়া বেঙ্গল ভেটেরেনারী কলেজের প্রধান গ্রন্থাধ্যক্ষ পদে চাকরি পান। গ্রন্থের পাহাড়ের মধ্যে তাঁর জীবনের সময় কাটতে থাকে। ক্রমশঃ হয়ে ওঠেন বইপোকা। বাংলার এক বিশিষ্ট সাহিত্যসাধক। তাঁর লেখা 'এভারেস্ট কাহিনি' (ভ্রমণকাহিনি/অভিযান) বইটিও পাঠকসমাজে সমীহ আদায় করে। 🍂
মেদিনীপুরের গর্ব প্রিয়নাথ জানার অন্যান্য বইগুলি হল 'জাতীয়তার মন্ত্রগুরু যাঁরা', 'আমাদের বিদ্যাসাগর', 'ভারতের জোয়ান অব আর্ক বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনী', 'বিষণ্ণ বিশ্বে বেদান্ত বাণীঃ সত্য শান্তি ও মুক্তির কাহিনি' ইত্যাদি। তবে আরুণি আচার্য ছদ্মনামে তিনি লিখেছিলেন 'ছাত্র জীবন সংগঠন' বইটি।
0 Comments