কবি ও কবিতার হাত ধরেই জন্ম হয়েছিল প্রাচীন জাতির আদি ইতিহাস
পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী
কবিতার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে রবার্ট ফ্রস্ট বলেছিলেন, ‘আবেগ যখন ভাবনা খুঁজে পায় আর ভাবনা যখন খুঁজে পায় শব্দ, তখন জন্ম নেয় কবিতা।’ কিন্ত
কবিতা শুধুমাত্র ভাবনা, শব্দ বা ছন্দের বিন্যস্ত খেলা নয়, এটি একটি জাতির সম্মিলিত স্মৃতির ভাণ্ডারও। আজ যখন আমরা বিশ্বজুড়ে কবিতা দিবস উদযাপনে মগ্ন, তখন ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই প্রতিটি জাতির শেকড় প্রোথিত হয়ে রয়েছে কবিদের কালজয়ী সব সৃষ্টিতেই। সুদূর অতীতে
যখন ইতিহাসের একটি পাতাও লেখা হয়নি এবং তথ্যেরও লিখিত কোনও দলিল-দস্তাবেজও ছিল না, তখন চারণ কবিদের কণ্ঠে ধ্বনিত গাথাই হয়ে উঠেছিল একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয়। হোমারের মহাকাব্য থেকে বাল্মীকির রামায়ণ, বিউলফ, ইনফার্নো কিংবা ফেরদৌসীর শাহনামা—সবই প্রমাণ করে যে, ঐতিহাসিকরা আসার অনেক আগেই কবিরা তাঁদের দূরদৃষ্টি ও কলমের ছোঁয়ায় একটি জাতির আদি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বীরত্বের মানচিত্র অঙ্কন করে গিয়েছেন। যেকোনো সভ্যতার গোড়ার দিকে তাকালেই দেখা যাবে, মহাকবিদের হাত ধরেই সেই জাতির মূল্যবোধ ও ইতিহাস সংরক্ষিত হয়েছে।
ইংরাজি সাহিত্যের প্রখ্যাত রোমান্টিক কবি পার্সি বিশি শেলি তাঁর ' আ ডিফেন্স অব পোয়েট্রি' প্রবন্ধে লিখেছিলেন- 'পোয়েটস আর দ্য আন অ্যাকনলেজড লেজিসলেটরস অফ দ্য ওয়ার্ল্ড" অর্থাৎ, "কবিরাই হলেন এই বিশ্বের অলিখিত বা অস্বীকৃত বিধানদাতা।" বিশ্ব কবিতা দিবসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের স্বীকার করতেই হয় যে, দেশ ও কালের সীমানা ছাড়িয়ে কবিরাই হলেন মানবজাতির আদি ইতিহাসের প্রকৃত স্থপতি।কবিদের হাত ধরেই গড়ে উঠেছিল এক একটি জাতির প্রারম্ভিক ইতিহাস।
🍂
ইতিহাস তো শুধুমাত্র কিছু তথ্য বা দিনপঞ্জির সমাহার নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ও। তার সংগ্রাম , তার ঐতিহ্য, সবই নিহিত থাকে ইতিহাসের পাতায় পাতায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রাচীন জাতির আদি ইতিহাসের রূপকার কোনো পেশাদার ঐতিহাসিক ছিলেন না, বরং কোনো না কোনো কবিই ছিলেন সেই ইতিহাসের রচয়িতা। যখন লেখালেখির কোনো পদ্ধতিই ছিল না এমনকি শিলালিপিরও প্রচলন হয়নি , সেই অতীতেও, কবিরাই অলিখিত জনশ্রুতি, লোকগাথা এবং বীরত্বগাথাকে ছন্দে গেঁথে সংরক্ষণ করে গেছেন। কবিদের কল্পনা আর শব্দের বুননেই জন্ম নিয়েছে এক একটি জাতির প্রাথমিক কাঠামো।
প্রাচীনকালে ইতিহাসের এই ধারাকে টিকিয়ে রাখতেন যাঁরা, তাঁদের বলা হত চারণ কবি। চারন কবিরা ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে বেড়াতেন এবং রাজাদের বা বীরদের গুণগান করতেন। গ্রিসে তাঁরা পরিচিত ছিলেন ' র্যাপসোডস ' (Rhapsodes) নামে, স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় 'স্কাল্ডস' (Skalds) এবং প্রাচীন ভারতে ‘সূত’ বা ‘মাগধ’ নামে। তারা মুখে মুখে কাহিনী প্রচার করতেন। র্যাপসোডসেরা কেবল কবি ছিলেন না, বরং তারা ছিলেন দক্ষ পরিবেশক। তারা মূলত 'ইলিয়াড' ও 'ওডিসি' মুখস্থ করে আবৃত্তি করতেন। হোমারের 'ইলিয়াড' ও 'ওডিসি' কেবল মহাকাব্য নয়, এটি ছিল প্রাচীন গ্রিসের সমাজব্যবস্থা, যুদ্ধরীতি এবং মানুষের মনস্তত্ত্বের প্রথম প্রামাণ্য দলিল। হোমার না থাকলে ট্রোজান যুদ্ধ বা মাইসিনীয় সভ্যতার বীরত্বগাথা সম্পর্কে জানা যেত না। কবি হোমার গ্রিক জাতির ইতিহাস ও বীরত্বের মানচিত্র অঙ্কন করে গেছেন তাঁর লেখা মহাকাব্যে।
অপরদিকে স্কাল্ডেরা ছিলেন প্রাচীন স্ক্যান্ডিনেভিয়া বা ভাইকিং যুগের রাজকীয় চারণ কবি এবং ইতিহাসের রক্ষক। তারা মূলত বীরত্বগাথা, যুদ্ধ এবং দেবতাদের প্রশংসা করে কবিতা বা গান রচনা করতেন। স্কাল্ডরা কেবল বিনোদনের মাধ্যম ছিলেন না , তারা রাজদরবার বা অভিজাত বংশের প্রধানদের অধীনে উপদেষ্টা এবং ইতিহাসবিদ হিসেবেও কাজ করতেন। সেই সময়ে লেখার চল খুব একটা না থাকায় স্কাল্ডরা তাদের কবিতার মাধ্যমে রাজবংশের ইতিহাস, পূর্বপুরুষদের পরিচয় এবং যুদ্ধের জয়গান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দিতেন।
ভারতীয় উপমহাদেশের আদি ইতিহাসের ভিত্তি হলো মহর্ষি বাল্মীকি ও বেদব্যাসের রচনা। ‘রামায়ণ’ ও ‘মহাভারত’ শুধুমাত্র ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, বরং এটি আর্য সভ্যতার বিস্তার, সে সময়ের রাজনৈতিক কূটনীতি এবং সামাজিক বিন্যাসের এক জীবন্ত আলেখ্য। ঐতিহাসিকদের মতে, এই দুই মহাকাব্য থেকে প্রাচীন ভারতের জনপদ, রাজবংশ এবং যুদ্ধের বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায়। কবিদের এই শিল্পিত বয়ান ছাড়া ভারতের আদি সামাজিক বিবর্তন বোঝা কঠিন ছিল।
পারস্যের কথাই ধরা যাক। ইরানের জাতীয় ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হলো কবি ফেরদৌসীর ‘শাহনামা’। সপ্তম শতাব্দীতে আরব বিজয়ের পর পারস্য যখন নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি হারানোর সংকটে, তখন কবি ফেরদৌসী প্রায় ৩০ বছর পরিশ্রম করে ৬০ হাজার শ্লোকের এই মহাকাব্যটি রচনা করে পারস্যের কিংবদন্তি রাজাদের ইতিহাস পুনর্জীবিত করেছিলেন। সপ্তম শতাব্দীতে আরবদের পারস্য বিজয়ের পর ফারসি ভাষা ও সংস্কৃতি প্রায় বিলুপ্ত হতে বসেছিল। ফেরদৌসী সচেতনভাবে তার 'শাহনামা'য় আরবি শব্দের ব্যবহার এড়িয়ে খাঁটি ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন,"বসি রঞ্জ বর্ দর্ ইন সাল-এ সি, আজম জেন্দে কর্দম বদীন পারসি" ( বসিলাম দীর্ঘকাল এই পরিশ্রমে / পারস্যরে বাঁচালাম পারস্যের নামে।) আজ ইরান যে তার সুপ্রাচীন পারস্য ঐতিহ্যের গর্ব করে, তার মূল কারিগর কিন্ত মহাকবি ফেরদৌসী।ফেরদৌসী না থাকলে আজকের ইরান হয়তো তার প্রাচীন আর্য বা পারস্য ঐতিহ্য হারিয়ে পুরোপুরি আরব সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যেত। তিনি ইরানীদের মনে তাদের বীরত্বগাথা (যেমন রুস্তম-সোহরাবের কাহিনী) গেঁথে দিয়ে জাতীয়তাবোধের জন্ম দিয়েছিলেন।
আবার , অ্যাংলো-স্যাক্সন জাতির আদি ইতিহাসের পাঠ নিতে গেলে‘ বেউলফ’ কাব্যের দিকে তাকাতে হয়। অ্যাংলো-স্যাক্সন পটভূমি (আনুমানিক ৪৫০-১০৬৬ খ্রিস্টাব্দ) হলো ইংল্যান্ডের ইতিহাসের সেই সময়কাল, যখন জার্মানির বিভিন্ন উপজাতি , অ্যাঙ্গলস, স্যাক্সন এবং জুটস ব্রিটেন দখল করে সেখানে নিজেদের বসতি ও সংস্কৃতি স্থাপন করে। 'বেউলফ' মহাকাব্যটি এই যুগেরই শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। আনুমানিক অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে প্রাচীন ইংরেজি ভাষায় রচিত হয়েছিল 'বেউলফ'।
অ্যাংলো-স্যাক্সন সমাজে 'স্কপ' (Scop) বা চারণ কবিদের খুব সম্মান ছিল। তারা রাজদরবারে বসে বীরদের কাহিনী শোনাতেন। 'বেউলফ' আসলে বহু বছর ধরে মুখে মুখে প্রচলিত হওয়ার পর লিপিবিদ্ধ হয়েছে। তখনকার দিনে যেহেতু ইতিহাস লিখে রাখার চল ছিল না। স্কপরা রাজবংশের ইতিহাস, পূর্বপুরুষদের বীরত্ব এবং যুদ্ধের কাহিনী ছন্দবদ্ধ কবিতার মাধ্যমে মনে রাখতেন এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দিতেন।
একইভাবে ইতালির কবি, দার্শনিক এবং রাজনৈতিক চিন্তাবিদ দান্তে আলিগিয়েরি তাঁর ‘ডিভাইন কমেডি’র মাধ্যমে মধ্যযুগীয় ইউরোপের চেতনার যে রূপান্তর ঘটিয়েছেন, তা আধুনিক ইতালির ভিত্তি নির্মাণ করেছে। মধ্যযুগে সব সিরিয়াস সাহিত্য লাতিন ভাষায় লেখা হতো। কিন্তু দান্তে তার 'ডিভাইন কমেডি' লিখেছিলেন সাধারণ মানুষের কথ্য ভাষা 'টাস্কান' উপভাষায়। এর ফলে ইতালীয় ভাষা একটি শক্তিশালী সাহিত্যের ভিত্তি তৈরি করে।
প্রাচীন ‘চর্যাপদ’ও কেবল ভাষার আদি নিদর্শন নয়, তা তৎকালীন বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার একমাত্র বিশ্বস্ত প্রতিচ্ছবি, যার রচয়িতা ছিলেন বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য কবিরা।
ইতিহাসবিদেরা সাধারণত তথ্য আর প্রমাণের ওপর নির্ভর করেন, কিন্তু কবিরা ধরেন জাতির ‘স্পন্দন’। ইতিহাসের তথ্য হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু হৃদয়ে গেঁথে থাকা ছন্দ আর উপমা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বাহিত হয়। কবিরা যখন কোনো বীরের বীরত্বগাথা লেখেন, তখন তা কেবল একজনের কাহিনী থাকে না, তা একটি সমগ্র জাতির আদর্শ হয়ে দাঁড়ায়। এভাবেই কবির কলমে একটি জনগোষ্ঠী তাদের পরিচয় খুঁজে পায় এবং একটি ‘জাতিতে’ রূপান্তরিত হয়।
প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক ও কবি অ্যারিস্টটল তাঁর সাহিত্যতত্ত্বে বলেছিলেন-
"পোয়েট্রি ইজ সামথিং মোর ফিলোসফিক অ্যান্ড অফ গ্রেভার ইমপোর্ট দ্যান হিস্ট্রি" এর অর্থ হলো, "কবিতা ইতিহাসের চেয়েও অনেক বেশি দার্শনিক এবং গভীর তাৎপর্যপূর্ণ।"
ইতিহাস শুধু যা ঘটেছে তা বর্ণনা করে, কিন্তু কবিতা সেই চিরন্তন সত্যকে তুলে ধরে যা একটি জাতির আত্মিক সত্তাকে গঠন করে। কবিরা কেবল কল্পনার রাজ্যে বিচরণ করেন না, বরং তারা জাতীয় স্মৃতির রক্ষক। কোনো জাতির ইতিহাস যখন কুয়াশাচ্ছন্ন থাকে, তখন কবিরাই সেই অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখান। তাঁদের সৃষ্টি থেকেই পরবর্তীতে সমাজতত্ত্ববিদ ও ঐতিহাসিকরা সত্যের সন্ধান পান। তরবারি দিয়ে সাম্রাজ্য গঠিত হলেও, একটি জাতির মনন এবং তার আদি ইতিহাসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন কবিরাই আর সম্ভবত এই কারনেই পৃথিবীর প্রতিটি সভ্যতায়, দর্শনে কবিতাকে স্থান দেওয়া হয়েছিল একেবারে উপরে।
1 Comments
লেখাটি খুবই সমৃদ্ধ একটি লেখা। কবিতা ইতিহাস আর কবি ঐতিহাসিক এইভাবে সত্যি আগে ভাবিনি।খুব ভালো লাগলো।
ReplyDelete