আবীর ভট্টাচার্য্য চক্রবর্তী
কবিতা : শব্দের অতল অন্বেষণ
মানুষের মন সততই কল্পনাবিলাসী। জন্মমুহূর্তের অতল অন্ধকার থেকে মৃত্যুর গহন পর্যন্ত সমস্ত পথটুকুই তাই হয়তো সে আলোকসন্ধানী। ধ্বনির আলো, রঙের আলো, আনন্দের আলো, অন্তরের আলো, সৃষ্টির আলো—আলোর কি বৈচিত্র্যের শেষ আছে গো!
তাই হয়তো জীবনধারণের সামান্য প্রয়োজনটুকু মিটিয়ে সে তার অবসর মুহূর্তগুলি সবসময়ই অর্জনমাধুরীতে ভরিয়ে দিতে চায়। কখনও গানে, কখনও আঁকায়, কখনও কবিতায়, কখনও উচ্চারণে তার সুপ্রকাশ। তবে তার মধ্যেও তার আবেগের শ্রেষ্ঠতম প্রকাশ হয়তো ঘটে কবিতায়। কারণ, সভ্যতার আদিলগ্ন থেকেই মানুষের মুখনিঃসৃত ধ্বনি গুহাচিত্রে বিম্বিত হয়ে সর্বোত্তম প্রকাশমাধ্যম হিসেবে কাব্যরূপ ধারণ করেছে।
সভ্যতা যত এগিয়েছে, মানুষের ভাষা স্বাভাবিকভাবেই শুধু তথ্যের বাহক না থেকে তার প্রকাশের ভঙ্গি বদলেছে। দৈনন্দিন কর্মপ্রবাহের মধ্যেও শব্দের ভেতরের আবেগ, অনুভূতি, বোধ, প্রয়োজন ইত্যাদি লৌকিকতা স্মৃতি ও স্বপ্নের স্তরে জমতে থাকে—কোনও এক মহত্তম ক্ষণে, এক অপার্থিব রূপকল্পের মাধ্যমে জন্ম হয় কবিতার। কবিতা কেবল তাই বিশেষ একটি সাহিত্যরীতি নয়; এটি মানুষের অন্তরতম আত্মবোধের গভীরতম প্রকাশ। প্রকৃতির প্রতি মুগ্ধতা, প্রাত্যহিক যাপনের আনন্দ, বিনোদন অথবা বেদনা, বিস্ময় বা মুগ্ধতা, প্রেম কিংবা অস্তিত্বের প্রশ্ন, আত্মজিজ্ঞাসা—সবই কবিতার শরীরে নিজস্ব রূপ খুঁজে পায়। সমস্যা সমাধানে অথবা সংকটমোচনে আজন্মকাল থেকে মানুষ তাই কবিতার কাছেই তার আশ্রয় প্রার্থনা করে।
কারণ, সেই সুপ্রাচীন কাল থেকেই কবিতা মানুষের সহযাত্রী। যখন ইতিহাস লিখিত ছিল না, তখনও মানুষের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞান সংরক্ষিত থাকত ছন্দ ও গানের ভেতর। বৈদিক যুগের সামবেদ কিংবা নাইট যুগের ক্রবাদূরদের চারণগান তো সুললিত সুরেই গাঁথা স্মৃতি ও কল্পনার এক অনন্য মিলনক্ষেত্র। পৃথিবীর অপরাপর সভ্যতায়ও এর অন্যথা হয়নি।🍂
তবে এই আলোচনার ক্ষেত্রে অবশ্যই মনে রাখা প্রয়োজন—কবিতার ভাষা কখনও সাধারণ ভাষা হয় না। কথার অতলে কথার মতো, ছন্দের অতলে মিলের মতো, সঞ্চারীর পরে আভোগের মতো এটি সংযত, বিচিত্রমাত্রিক এবং বহুস্তরীয়। কখনও ইঙ্গিতের মাধ্যমে, কখনও বা ভাবমাধুর্যের ব্যবহারে একটি মাত্র চিত্র, একটি উপমা বা একটি শব্দ অনুভূতির এক সুবিশাল দিগন্ত খুলে দিতে পারে। এই কারণেই কবিতা পড়া অথবা লেখার অর্থ শুধুমাত্র আক্ষরিক উপলব্ধি নয়—বরং অনুভব করা, অনুরণন শোনা এবং নিজের ভিতরে তার প্রতিধ্বনিটিকে খুঁজে পাওয়া।
কবিতার আরেকটি বিশেষ শক্তি হল তার অনির্বচনীয়তা। অনেক সময় কবিতা সরাসরি কিছু বলে না; বরং ইঙ্গিত করে, আভাস দেয়। পাঠকের কল্পনা তখন সেই ইঙ্গিতকে পূর্ণতা দেয়। ফলে একই কবিতা বিভিন্ন মানুষের কাছে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। এই বহুমাত্রিকতাই কবিতাকে চিরনতুন রাখে।
আরও বিশদে বললে, একটি দেশ অথবা সভ্যতা তার সূচনালগ্ন থেকে গৌরবপ্রাপ্তি পর্যন্ত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মতোই ভাষা ও সাহিত্যের কাছেও ঋণী থাকে। এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক পটপরিবর্তনের সমস্ত বিষয়ের প্রতিচ্ছায়া পড়ে কবিতায়। কারণ, কবি তো কোনও ইউটোপীয় আদর্শ নিয়ে বাঁচেন না; দৈনন্দিন লাভ-ক্ষতি-টানাটানির এই ঘাম-রক্ত-শ্রমের পৃথিবীতেই তাঁর বাস। বরং জাগতিক আবেগগুলি সংবেদনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ ও প্রকাশ করার যোগ্যতা আছে বলেই তিনি কবি।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, রোমান্টিক পিরিয়ডের কবিদের রচনায় art for art’s sake নীতি গৃহীত হলেও তৎপরবর্তী শিল্পবিপ্লব এবং যুদ্ধের ছায়া তৎকালীন কবি ও কবিতায় গভীর প্রভাব ফেলে। তখন art for life’s sake ধারণার বশবর্তী হয়ে ফুল-লতা-পাতার নান্দনিকতা ছেড়ে জীবনের বস্তুবাদী দিকগুলি কবিতায় এসে পড়ে। এটি শুধু ইংরেজি সাহিত্যে নয়, পৃথিবীর সব দেশের সাহিত্য বা কবিতার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এমনকি, রবীন্দ্রনাথ নামক মহীরুহেরও প্রথম দিকের রচনা এবং শেষ দিকের কবিতায় এই রূপান্তরের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
আবার সময়ের গতিময়তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আধুনিক কবিতার নির্মেদ গঠন, ছন্দ, রূপক এবং ভাষা ব্যবহারে যে ছকভাঙা পরিবর্তন আমরা আজ দেখি, তার বিবর্তনও কিন্তু এড়িয়ে যাওয়া যায় না। অসংখ্য বিদেশি শব্দের ব্যবহারেও মনগহনের গোপনটুকু প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনও অন্তরায় সৃষ্টি হয় না।
সবশেষে, কবিতা হয়তো মানুষের সেই চিরন্তন প্রয়াস—যেখানে সে নিজের অস্তিত্বকে বুঝতে চায়, অনির্বচনীয়কে নির্বাচিত ভাষায় ধরতে চায়। তাই কবিতার অমর্ত্য যাত্রাপথ কখনও শেষ হয় না; প্রতিটি নতুন কবির চিন্তনে ও মননে, প্রতিটি নতুন পাঠকের অনুভবে ও বোধগম্যতায় নতুন মুগ্ধতায় সুন্দরের অপেক্ষায় তার অবস্থান। রহস্যময়ী সেই চিরায়মানার প্রতি দুর্জ্ঞেয় আকর্ষণও তাই অশেষ…
1 Comments
ভালো লাগলো।
ReplyDelete