জ্বলদর্চি

শিবশঙ্কর সেনাপতি (শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞান লেখক, দাঁতন) /ভাস্করব্রত পতি

মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২০০

শিবশঙ্কর সেনাপতি (শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞান লেখক, দাঁতন) 

ভাস্করব্রত পতি

সর্বভারতীয় পরীক্ষা দিয়ে সুযোগ পেয়েছিলেন পি এইচ ডি করার। দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদবিদ্যা বিষয়ে উচ্চ গবেষণা করার আকর্ষণীয় অফার ছেড়ে দেন বাবার নির্দেশে। আসলে সাত ভাই বোনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছেলে হওয়ার দরুন সংসারের যাবতীয় দায় দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর ঘাড়ে। ফলে জীবনের উচ্চতর আরও দৃষ্টান্তমূলক ক্যারিয়ারের হাতছানি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে বাধ্য হন একপ্রকার। গবেষণা করার চিরায়ত বাসনা ছেড়ে দাঁতন ১ এর কোটপাদা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাজে যোগ দেন ১৯৮৮ এর এপ্রিল মাসে। 
 
১৯৬২ এর ১০ ই ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন শিবশঙ্কর সেনাপতি। ওড়িশা সীমান্তবর্তী দাঁতন ব্লকের বরঙ্গী গ্রামে জন্ম। বাবা  সন্ন্যাসীচরণ সেনাপতি ছিলেন স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিনি নিমপুর বরঙ্গী উচ্চবিদ্যালয়কে উচ্চমাধ্যমিকে উন্নীত করেন। শিক্ষক বাবার অনুপ্রেরণায় নিজেকে পরিশীলিত করেছেন ছোট থেকেই। আজ অবসর জীবনেও নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন সেই শিক্ষা প্রসারের কাজে। আঁকড়ে ধরে রেখেছেন মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করার কাজে এবং বিজ্ঞানমনস্ক মানসিকতার প্রলেপ লেপনে। 🍂

মা জয়ন্তীরাণী সেনাপতির খুব আদুরে ছেলে তিনি। এককথায় রত্নগর্ভা এই মহিলার সকল ছেলে মেয়েই আজ স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। ছোট্ট শিবশঙ্করও সেই ছোটবেলা থেকেই বাবা মায়ের দেখানো পথেই হেঁটেছেন। আনন্দনগর শ্রীনাথ বিদ্যাপীঠে ১৯৭৮ এ মাধ্যমিক পাস করে ওড়িশার দীনবন্ধু কলেজে (ডি কে কলেজ) আই এস সি পড়েন। তখন এখানে প্রিন্সিপাল ছিলেন মৃত্যুঞ্জয় ভঞ্জ, যিনি কিনা তাঁর বাবার পরম বন্ধু। এরপর ১৯৮২ তে ভদ্রক কলেজ থেকে উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করার পর বিখ্যাত রাভেনশ কলেজে (১৯৮৩ - ১৯৮৪) ৬৯% নম্বর নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। পরবর্তীতে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এড. ডিগ্রী অর্জন করেন। 

১৯৮৮ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত সহকারী শিক্ষক হিসেবে কোটপাদা হাইস্কুলে শিক্ষকতার পর এখানেই প্রধানশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০০৩ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত সেই দায়িত্ব নিষ্ঠা সহকারে পালনের পর বীরভদ্রপুর উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ২০২২ এ অবসরগ্রহণের পরেও তিনি আজও সমানভাবে সচল এবং সজাগ। একসময় যে স্কুলে মাত্র ৩৫০ জন ছাত্রছাত্রী ছিল, সেখানে তিনি যোগদানের পর শ্রীবৃদ্ধি হতে শুরু করে। একদিকে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে তোলা, আর অন্যদিকে বিজ্ঞান চেতনার বিকাশ ঘটানো -- এই দুই লক্ষ্য নিয়ে তিনি ছিলেন একমেবাদ্বিতীয়ম প্রধান শিক্ষক। হারমোনিয়াম বাজিয়ে প্রার্থনা সঙ্গীত ও জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া, পৃথক গানের শিক্ষক নিয়োগ করা, ব্রম্ভসঙ্গীত গাওয়া চালু করেছিলেন বিদ্যালয়ে। যা ছাত্র ছাত্রীদের বৌদ্ধিক বিকাশের পাশাপাশি মানসিক বিকাশের পথ কুসুমাস্তীর্ণ করে তুলেছিল। তাঁদের আরও উন্নয়নের জন্য বিদ্যালয়ে এনেছিলেন যতীন মিশ্র, কালীপদ প্রধান, অন্নদাশঙ্কর পাহাড়ী প্রমুখ বিদগ্ধ ব্যক্তিত্বদের। এঁদের সাহচর্যে ছাত্র ছাত্রীদের মনন, জীবন, যৌবন, চিন্তন প্রস্ফুটিত হয়েছে নানাভাবে। 

আশৈশব দারিদ্র্যলাঞ্ছিত শিবশঙ্করের জানা আছে অভাবের মর্ম। তিনি বুঝেছেন আর্তের বেদনা। তিনি উপলব্ধি করেছেন জঠরের জ্বালা। তিনি অনুভব করেছেন জীবনে বেঁচে থাকতে, টিকে থাকতে, জিইয়ে থাকতে কঠিন লড়াইই একমাত্র পথ। উত্তাল সংসার সমুদ্রের দক্ষ নাবিক হয়ে তিনি পেরিয়েছেন অনেক বাধার ঢেউ। সেইসব হিমশৈল ভেঙে এগিয়ে গিয়েছেন অভীষ্ট লক্ষ্যে। পেয়েছেন পরশপাথর। আসলে নীরবে নিভৃতে এবং নিরলসভাবে কর্মসম্পাদনেই তাঁর আনন্দ, তাঁর লক্ষ্য, তাঁর পথচলা। তাই সেই প্রথম যৌবন থেকেই মনের গভীরের সুসজ্জিত কক্ষে পরম যত্নে লালিত পালিত নিবিড় শপথের অন্যতম নির্যাস ছিল নানা ধরনের সামাজিক কাজকর্মের মধ্যে ডুবে থেকে মানুষের পাশে থাকা। এবং সে কাজে তিনি আজও সমানভাবে সচল এবং সজাগ। 

একসময় রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরশিক্ষার অধীন দাঁতন ভট্টর কলেজে পরিবেশবিদ্যা বিভাগের স্নাতকোত্তর স্তরে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে প্রায় ছয় বছর অধ্যাপনা করেন। বর্তমানে জনবিজ্ঞান আন্দোলন ও বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ কর্মসূচীতে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন তিনি। বহু বিজ্ঞান সংগঠনের সক্রিয় সদস্য তিনি। গাছপালা, রসায়নবিদ্যা, বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানী প্রসঙ্গ, কবি রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানমনস্কতা ও বিজ্ঞানী যোগ ইত্যাদি নানা বিষয়, নানা প্রসঙ্গ নিয়ে নিরন্তর গবেষণা, পড়াশোনা, অনুসন্ধানের পাশাপাশি লিখে চলেছেন বিজ্ঞানের তথ্য সমৃদ্ধ মূল্যবান প্রবন্ধ। 

প্রাবন্ধিক শিবশঙ্কর সেনাপতির তথ্যসমৃদ্ধ ১২ টি গবেষণামূলক বই এককথায় বিজ্ঞান বিষয়ের ছাত্র ছাত্রীদের কাছে তথ্যের আকর। সেই বইগুলি হল -- ১) আধুনিক জীব - পদার্থবিদ্যার জনক আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ২) পুষ্টিগুণে ভরপুর পরিবেশ বান্ধব গাছ পালা ৩) A Hand book of Pollution Chemistry ৪) Global Worming & Coastal Hazards ৫) Endangered Birds & Reptiles ৬) In quest of Swamiji's vedantic vision ৭) Life & Messages of Legendary figures ৮) সাহিত্যের দর্পণে পরিবেশ ভাবনা ৯) বাংলা আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাস ১০) বৈদিক ধর্ম-আদিতম মানব ধর্ম ১১) প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য বিজ্ঞানী বৃত্তে রবীন্দ্রনাথ এবং ১২) বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানী কথা। 

তাঁর বইয়ের মুখবন্ধ লিখে দিয়েছেন বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক, পদার্থবিদ ও বিজ্ঞান বিষয়ক প্রাবন্ধিক ড. সন্তোষ কুমার ঘোড়াই। তাঁর লেখা HANDBOOK ON POLLUTION CHEMISTRY বইটি বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের রেফারেন্স বই হিসেবে গৃহীত হয়েছে। উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে পড়ার সময় স্পেশাল পেপার ছিল বায়োকেমিস্ট্রি। তাই তিনি তাঁর নানা লেখায় Pollution Hazards লিখতে গিয়ে যাবতীয় তথ্য ব্যাখ্যা করেছেন রসায়নের দৃষ্টিতে। তাই এই লেখাগুলি হয়ে উঠেছে আরও প্রাঞ্জল, আরও বিজ্ঞানসম্মত। শিক্ষা প্রসারে এবং বিকাশে তাঁর নিরন্তর কাজের জন্য অবশ্য কোনও সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার জোটেনি তাঁর। তাতে অবশ্য কোনও আক্ষেপ নেই তাঁর। বিজ্ঞান বিষয়ক লেখার জন্য চলতি বছরে পেয়েছেন 'শিবকালী মিশ্র স্মৃতি পুরস্কার'। কাঁথির ডি এস ফাউন্ডেশন থেকেও পেয়েছেন সম্মাননা। 

বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ক কর্মশালায় তাঁর অংশগ্রহণ অন্য মাত্রা এনে দেয়। বিভিন্ন আঞ্চলিক পত্রিকা কাঁথি বিজ্ঞান অ্যাকাডেমী থেকে প্রকাশিত 'বর্ণালী', এগরা বিজ্ঞান সংস্থা ও. সি. এস. থেকে প্রকাশিত 'প্রতিফলন' এবং মোহনপুর থেকে প্রকাশিত 'পথিকৃৎ'- এ নিয়মিত লেখেন বিজ্ঞানধর্মী নানা লেখা। এছাড়াও রাজ্যস্তরীয় পত্রিকা কিশোর বিজ্ঞান এবং বাংলা দৈনিক স্টেটসম্যান -এ তাঁর বহু লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর লেখায় সমৃদ্ধ হয় এবং সায়ক, দণ্ডভুক্তি, রিফর্মার, অন্বেষা পত্রিকাগুলি। বর্তমানে দাঁতন থেকে প্রকাশিত সম্পাদক স্বপন দাসের 'ইতিহাস দর্পণ' পত্রিকার মুখ্য উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত। দাঁতন মানব কল্যাণ কেন্দ্রের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হিসেবে কাজ করছেন অনাথ শিশুদের নিয়ে। নিজেকে নিমজ্জিত রেখেছেন সেবামূলক ভাবনার পরিসরে। মানব কল্যানের সাথে হেঁটে চলতেই তাঁর আনন্দ। বিখ্যাত ভেটিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার। তাঁকে নিয়ে বড়মপুরা গ্রামে মৈত্রী উৎসবে টানা আট বছর নানা অনুষ্ঠান করেছিলেন তিনিই। আজ মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারকে নিয়ে অন্যত্র যে অনুষ্ঠান নিয়মিত হচ্ছে, তাঁর প্রথম রূপকার ছিলেন শিবশঙ্কর সেনাপতি। 

শিক্ষকতার পেশায় যুক্ত হয়ে এই মানুষ রতনটি ছাত্রছাত্রীদের জন্যেই নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। মেদিনীপুরের বুকে সযত্নে গড়ে তুলেছেন অসংখ্য গুণমুগ্ধ ছাত্র-ছাত্রী। পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের হাতে কলমে বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য নিজের গাঁটের কড়ি খসিয়ে অবলম্বন করেছেন নানা কৌশল। পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের উদ্যোগে শিশু বিজ্ঞান উৎসবের আয়োজন করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন। বিজ্ঞান বিষয়ক নানা প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীর স্বার্থে। আসলে নিজে একজন বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন বলেই নয়, তিনি মানেন তিনি জানেন তিনি উপলব্ধি করেন যে, মানুষ বিজ্ঞানমনস্ক না হলে সমাজের উন্নতি কোনওভাবেই সম্ভব নয়। 

স্বামীজীর ভাবনার আলোকে সমাজের চালিকাশক্তি যুবসমাজকে সারাবছর বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশীদার হতে অগ্রণী পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ এই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। আসলে তিনি বিশ্বাস করেন, স্বামী বিবেকানন্দের ভাবনার আত্মীকরণই এই সমাজকে সুস্থ করে তোলার অন্যতম পথ। সেই পথকে আশ্রয় করেই তাঁর নিরন্তর পথচলা।

Post a Comment

1 Comments

  1. সুন্দর লিখেছেন ভাস্করব্রতবাবু।

    ReplyDelete