সালেহা খাতুন
কবি দিলীপ মহান্তীর "মেঘেদের বর্ণপরিচয়" গ্রন্থখানি বারকয়েক পড়েছি। অপেক্ষা করেছি এর অন্তহীন রহস্য উদ্ঘাটনের। যা আমাদের মুগ্ধ এবং আবিষ্ট করেছে। "মেঘেদের বর্ণপরিচয়" প্রত্যেক মুহূর্তে পাঠককে কবি করে তুলেছে। এবং আমাদের বিশ্বাস তা অনন্তকাল ধরে করবে। কবির যাপনের প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গে নিজস্ব কবি পরিচয় খুঁজে পাওয়ার প্রক্রিয়ায় কেমন অজান্তেই সম্পৃক্ত হয়ে গেছি। আসলে পাঠকের কাছে কবিতাকে জানা মানেই নিজেকে জানা। কবিকে ঘিরে আছে যে আপেক্ষিক সময়ের বিচ্ছুরণ, নিজের সঙ্গে নিজের প্রতিযোগিতা, ভাষা দিয়ে নৈঃশব্দ্যকে কথায় প্রকাশ করা তা পাঠক মানসে আলোড়ন তোলে বৈকি। টি.এস.এলিয়ট বলেছিলেন পুরোপুরি বোঝার আগে যে কবিতা কমিউনিকেট করতে পারে তা ভালো কবিতা। শিক্ষিত পাঠক তা বারবার পড়ে। পরতের পর পরত উদ্ঘাটন করে উচ্চারিত শব্দের মধ্যে নিরুচ্চার বার্তার ভালোবাসায় পড়েন। এলিয়ট, জীবনানন্দ, বেন জনসন , কোলরীজ এঁরা প্রত্যেকেই বলেছিলেন কবিতার শ্রেষ্ঠ সমালোচনা কবিরাই করতে পারেন। আসলে কবিতা রসাস্বাদন মূলক রচনা।
ব্যক্তিগত ভালো লাগা না লাগার দিকটা ছাড়িয়ে সৃষ্টির প্রেক্ষিত হিসেবে সমাজ ইতিহাসের চেহারা ধরে রাখার যে চেষ্টা "মেঘেদের বর্ণপরিচয়" - এ লক্ষ করা যায় সে আলোচনায় আমরা এবার প্রবৃত্ত হবো। বাংলা কবিতার পাঠকরূপে আমরা জানি, পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে কবিতা মনস্ক পাঠকরা কবিতার আলোচনায় যুক্ত হয়েছেন।কবিতা বিষয়ে একটি যুক্তি অনুসারী বিচারশীল মনোভঙ্গি তাঁরা সজাগ রেখেছেন। ব্যক্তিগত আবেগকে সরিয়ে রেখে, সংযত রেখে নিরপেক্ষ ও তথ্যাশ্রয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করেছেন। কবিতা নিয়ে গবেষণা শুরু হয়ে গেল। কবির কাল, জীবন পরিবেশ, কবিমানস আলোচনায় এসে গেলো।🍂
একবিংশ শতাব্দীর কবি দিলীপ মহান্তীর "মেঘেদের বর্ণপরিচয়" কাব্যগ্রন্থে তাঁর প্রিয় বিষয়/প্রিয় শব্দ 'মেঘ' বারবার এসেছে। উপমা-প্রতীক-রূপকরূপে ব্যবহৃত হয়েছে 'মেঘ'। এ কাব্যের মোট বাহান্নটি কবিতার মধ্যে মেঘ সংক্রান্ত কবিতাগুলি তালিকাবদ্ধ করে ফেলতে পারি আমরা -
১.মেঘেদের বর্ণপরিচয়
২.মেঘেদের সঞ্চার
৩.মেঘের অক্ষর
৪.মেঘেদের সভ্যতা
৫.রাত্রির মেঘ
৬.মেঘ পদাবলী
৭.মেঘেদের ঠিকানা
৮.মেঘেদের জন্ম
৯.মেঘেদের সংবাদ
১০.মেঘেদের স্বর
১১.মেঘেদের মিছিল
১২.মেঘেদের পাড়া
১৩.মেঘ ছিল,অন্ধকারও
দশ পংক্তি বিশিষ্ট প্রথম কবিতা 'মেঘেদের বর্ণপরিচয়' - এ দুবার মেঘ শব্দের উচ্চারণ আছে। দ্বিতীয় পংক্তিতে - 'উপত্যকা জুড়ে মেঘেদের মিছিল, এবং শেষ পংক্তি 'স্নান সেরে মেঘেরা ফিরে আসে'।
'মেঘেদের সঞ্চার' কবিতার শেষ দুই পংক্তি - 'আকাশে জমেছে মেঘ আসবে বৈশাখী/প্রতিটি লোমকূপে রাত জাগে বর্ষার আকুতি!' কদিন ধরে লালন ও কুবির গোঁসাইয়ের চর্চা করে এই অংশকে কেমন যেন দেহতত্ত্বের গান বলে মনে হচ্ছে। এ ভাবনাকে সমর্থন করে কবিতার দ্বিতীয় স্তবকের শব্দদ্বয়'শরীরে শরীর'! বিমূর্তকে ধরার জন্য কবি এখানে ইমোটিভ শব্দরূপে 'মেঘ'কে ব্যবহার করেছেন। জীবনের যে নানান ওঠাপড়া উপত্যকা, স্নান সেরে ফিরে আসা,এলোমেলো বয়সের নীড় প্রভৃতি শব্দ, শব্দগুচ্ছে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
'মেঘের অক্ষর' কবিতার রাত্রির নূপুরের বেজে ওঠা, স্মৃতির মেঘের উড়ে চলা আমাদের ভাবাচ্ছে। আশ্চর্যজনকভাবে 'মেঘেদের সভ্যতা', 'রাত্রির মেঘ' এবং 'মেঘেদের ঠিকানা' কবিতায় একবারও মেঘ শব্দের উল্লেখ নেই।
'মেঘেদের জন্ম' কবিতায় পরিবেশ সচেতন এক কবিকে আমরা পাই। তিনি উচ্চারণ করেন - 'আকাশ জুড়ে ধোঁয়ার বন্যা/ ক্রমে জমে হয় মেঘ'। কলকারখানার ধোঁয়ার দূষণ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, কবির সঙ্গে পাঠকও চিন্তিত।
'মেঘেদের সংবাদ' - এ মেঘ শব্দের উচ্চারণ একবারও নেই অথচ ব্যয়বহুল চিকিৎসায় পরিবারের নিঃশেষিত হওয়ার সংবাদ জুড়ে রয়েছে সমগ্র কবিতায়। এরই সঙ্গে 'অসুখ' কবিতাকে মিলিয়ে পড়লে দেখি এখানে মেঘের উচ্চারণে কবি বুঝিয়ে দিয়েছেন হাসপাতালে অসুখ সারে না।'মেঘেদের স্বরলিপি'তে তিনি আসলে অনুভূতিপ্রবণ এবং সংবেদনশীল সব মানুষের ব্যথার গানের স্বরলিপি লিখেছেন। 'গান' কবিতাতেও আকাশ জুড়ে মেঘের কথা আছে।
'মেঘেদের মিছিল' কবিতায় প্রতিবাদী কবিকে আমরা পাই। শুরুতেই তিনি উচ্চারণ করেছেন - 'মেঘ জমে আছে লাল ধুলো মাখা পথে/প্রশাসন নড়ে বসে'। রাষ্ট্র, প্রশাসনের কথা 'শাসন','বেহুলা','ঝড়' প্রভৃতি কবিতাতেও আছে।
'মেঘেদের পাড়া'য় মেঘ নেই কিন্তু আছে ফুলের কথা, যে ফুল ফোটায় সেই মানুষের কথা। রাধামণি হাট, দেউলিয়া বাজার যেখানে বিকায় ফুলের মালা সেই সব স্থান নামও উঠে এসেছে। 'বসন্ত:এক' কবিতাতেও আছে পলাশ শিমূল ফুলের কথা।
'মেঘ ছিল, অন্ধকারও' কবিতায় মেঘ শব্দের উচ্চারণ নেই ঠিকই তবে মনে মেঘ জমতে থাকে। সমাজ ইতিহাস রাজনীতির কত কত ঘটনায় সংবেদনশীল কবি ইনফর্মেটিভ ভাষা ব্যবহার না করে ইমোটিভ ভাষা ব্যবহার করলেন -
' এখনো নূপুর ধ্বনি দেওয়ালের গায়ে/ইঁটেরা ব্যথিত হয়ে মূক ও বধির/প্রাচীন তৈলচিত্ররা কথা বলতে চায়/শিল্পীর হাতেই বর্ষা মুখ লুকায় '
বাস্তব ঘটনার অনুভবকে কবি পাঠকের কাছে পৌঁছে দিলেন। মহাবিশ্বলোকের মেঘকে কাব্যের বিষয় করেও তার অতিরিক্ত বহুস্বরের ব্যঞ্জনা তিনি দিলেন।
আর 'নীলকান্ত মণি' কবিতার নকল বুর্জ খলিফা দেখতে ছোটা হুজুগে মানুষের দলের অনেকেই আজ যুদ্ধধ্বস্ত পৃথিবীতে AI দিয়ে বানিয়ে ফেলছে বুর্জ খলিফা ধ্বংসের ফেক ভিডিও।
কবি লিখেছিলেন -
'নকল বুর্জ খলিফা দেখতে ছোটে মানুষের দল/আকাশ জোড়া রংয়ের মিছিলে/উড়ানের দিশেহারা পথচলা/বলতে চায় যাও দুবাই।'
ভিন্ন প্রেক্ষাপটে লেখা এ কবিতার অর্থ যেন আজ বদলে গেলো। 'আকাশ জোড়া রংয়ের মিছিলে'এখন মিসাইল উড়তে দেখা যাচ্ছে। 'দুঃসময়' বিভিন্নভাবে আমাদের মনকে ছেয়ে ফেলছে। তবুও আমরা আকাশদীপ জ্বালি। আশায় বাঁচি।
'আমিও আকাশদীপ জ্বালি' কবিতায় সংখ্যা নির্দেশিত চার পংক্তি সম্বলিত ২৫টি কবিতায় কবি ব্যথার গানই গেয়েছেন। সেখানে আছে - জঙ্গলের বিষাদ, বিদ্বেষের শব্দরাজি, বন্দুকের বেপরোয়া ডাক, বেদনার রাত, আকাশ জুড়ে ছোপ ছোপ কালি, হিংস্রতার কণা, দগ্ধদেশ, থ্যাঁতলানো দেহ, শকুনের চোখ, ভ্রাতৃহত্যা, বসুন্ধরার ধর্ষিতা রূপ, অভাবের দেহ, কালনাগিনীর বিষ ঢালা, বারুদ বুলানো বুক, যৌথবাহিনী, পীড়িত দেশ - এতো এতো ক্ষতচিহ্ন।
'মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থেকে যায়' জীবনানন্দীয় এ উচ্চারণের মতোই কবি দিলীপ মহান্তীও "মেঘেদের বর্ণপরিচয়" কাব্যগ্রন্থের একেবারে শেষে উচ্চারণ করলেন -
1 Comments
ভালো আলোচনা। পড়ে সমৃদ্ধ হলাম।
ReplyDelete