জ্বলদর্চি

তরমুজ/ভাস্করব্রত পতি

বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১১৬
তরমুজ

ভাস্করব্রত পতি

ভোটের দামামা বেজে গিয়েছে এরাজ্যে। আর এক প্রতিপক্ষ অন্য প্রতিপক্ষকে 'তরমুজ' নামে ডেকে গালিগালাজ করতে উঠে পড়ে লেগেছে। আসলে যাঁরা দুই দলের জামা গায়ে রেখে রাজনীতি করেন, তাঁরাই 'তরমুজ'। অর্থাৎ বাইরে সবুজ, ভেতরে লাল! 

চরকের সূত্রস্থানের ২৭ তম অধ্যায়ের ৮৩/৮৪ শ্লোকে বলা হয়েছে -
'ত্রপুষৈর্বারুকং স্বাদু গুরু বিষ্টম্ভি শীতলম্। মুখপ্রিয়ঞ্চ রুক্ষঞ্চ মুত্রলং ত্রপুষংত্বতি। এর্বারুকংঞ্চ সম্পক্কং দাহতৃষ্ণা ক্লমার্ত্তিনূৎ। কালিঙ্গং চিভির্টংচৈব তদ্বর্চো ভেদহিতেতু তে।'
কাটা তরমুজ

আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য এর বাংলা অর্থ করেছেন - 'ত্রপুষ (শসা) ও এর্বারুক (কাঁকুড়) এ দুটি ফল স্বাদু, তবে গুরুপাক, এবং পেটে বায়ু করে, কিন্তু শীতবীর্য', আর এ দুটি ফল মুখপ্রিয় কিন্তু রুক্ষ, তবে শসা (ত্রপুষ) ফলটি মৃতকরও বটে। তাছাড়া যেটি এর্বারুক বা কাঁকুড় সেটি পাকলে ওর আময়িক প্রয়োগ করা হয় দাহ, তৃষ্ণা এবং ক্লান্তি দূর করতে। এর পরই বলা হ'য়েছে, ওই দুটি ফলের মত আর দুটি ফল, সেদুটিও পাকলেই ব্যবহার করতে হয়, তবে যাদের ভেদ অর্থাৎ দাস্ত হচ্ছে, তার সঙ্গে দাহও আছে, সেক্ষেত্রে খুবই ফলপ্রদ। ওসময় ব্যবহার করলে ভেদ, দাহ, তৃষ্ণা, ক্লান্তি সবই দূর হবে। একটির নাম কালিঙ্গ, একটির নাম চির্ভিট।' উপরিউক্ত 'কালিঙ্গ' বা 'কলিঙ্গ' হল তরমুজ (Watermelon)। আর 'চির্ভিট' হল খরমুজ (Muskmelon)। নিঘণ্টু রত্নাকর (১৮৬৩) ও শালিগ্রাম নিঘণ্টুর (১৮৯৬) পাদটীকাকারদের রচনায় উল্লিখিত হয়েছে তা - 'কলিঙ্গং তরমুজং চির্ভিটম্ খর্বুজং'। 

তরমুজ বা তরবুজকে ইংরেজিতে Watermelon, সংস্কৃতে কালিঙ্গ, শীর্ণবৃন্ত, সুখবাস, মাংসলফল, হিন্দিতে তরবুজ, মারাঠীতে কলিঙ্গউ, গুজরাটিতে তরপুজ, কন্নড়ে কৌন্তে, ফারসিতে হিন্দজনা, তরবুজ, অসমীয়াতে বত্তিথহিন্দী বলে। এছাড়াও পারস্যতে দিল সপঙ্গ ওকচরেহন নামে পরিচিত। কালিন্দক, কৃষ্ণবীজ, ফল বতুল নামেও তরমুজকে চেনা যায়। এর বিজ্ঞানসম্মত নাম Citrullus vulgaris এবং Citrullus lanatus। এটি Cucurbitaceae পরিবারের অন্তর্গত। বোঁটাবিহীন এই তরমুজকে নিয়ে রাজশাহীর লোকেদের মুখে শোনা যায় -
'হায় আল্লা করি কি
বোঁটা নাই তার ধরি কি'। 
পশ্চিম মেদিনীপুরের কুলটিকরির রোহিনী এলাকাতেও প্রচলিত রয়েছে এরকমই একটি ধাঁধা --
'হায় তরমুজ করব কি
বোঁটা নেই তো ধরব কি'। 
বিক্রির অপেক্ষায় তরমুজ

ভারত এবং আফ্রিকাই তরমুজের প্রথম জন্মস্থান। তবে লিনিয়াসের মতে তরমুজ নাকি দক্ষিণ ইটালি থেকে পৃথিবীর সর্বত্র বিস্তৃতি লাভ করেছে। বেশ কিছু ভারতীয় গ্রন্থে তরমুজের কথা পাওয়া যায়। মিশরের প্রাচীন চিত্রে তরমুজ চাষের উল্লেখ রয়েছে। মিশরের ফ্যারাও তুতেনখামেনের সমাধির গায়ে তরমুজের ছবি রয়েছে। ইসরায়েলের গবেষক হ্যারি প্যারিসের মতে উত্তর আফ্রিকার স্থানীয় ‘গুরুম’ (Citrullus lanatus var. citroides) হল আধুনিক তরমুজের পূর্বপুরুষ। দশম শতাব্দীর আগে চিনে তরমুজ চাষ হতনা। ষোড়শ শতাব্দীর আগে গ্রেট বৃটেনে তরমুজের অস্তিত্ব দেখা যায়নি। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি তরমুজ উৎপাদিত হয় চিন, তুরস্ক, ইরাণ, ব্রাজিল, মিশর এবং ভারতে। 
হলুদ তরমুজ

সারা পৃথিবীতে প্রায় হাজারের বেশি প্রজাতির তরমুজের চাষ হয়। আমাদের দেশে জ্যাম্বো কুইন, কিং সুগার, নদী রানী, সুগার বেবি (ছোট, লাল), বিগ বাইট, মুন অ্যান্ড স্টারস, চার্লসটন গ্রে (লম্বা, হালকা সবুজ), রেড চিফ, ডেনসুক (কালো খোসা) ইত্যাদির চাষ হয়। এছাড়াও বিশ্বজুড়ে চাষ হওয়া তরমুজের আরও কয়েকটি বিখ্যাত প্রজাতি হল Melitopolski, Cream of Saskatchewan, Moon and Stars, Golden Midget, Tom Watson, Georgia Rattlesnake, Black Diamond, Orangeglo, Carolina Cross ইত্যাদি। 

উত্তর ভারত এবং পশ্চিম ভারতের তরমুজের স্বাদ অপেক্ষাকৃত স্বাদু। তরমুজের মধ্যে মেলে জল। যা খুব পুষ্টিকর এবং Tasty। তরমুজের মধ্যেকার ৯২ শতাংশই সুমিষ্ট জল রয়েছে। খুলনা এলাকার একটি ধাঁধাতে সেই বিষয়টিই উল্লিখিত হয়েছে এইভাবে -
'কোথাও পানি নাই
ঢেলা (মাটির পাত্র) বনে পানি'।

বেলেমাটিতেই তরমুজের বৃদ্ধি এবং ফলন ভালো হয়। তাই নদী বা সাগর উপকূলবর্তী চরে তরমুজের ফলন বেশি। গ্রীষ্মকালীন ফল এটি। প্রবল গরমে ওষ্ঠাগত মানুষজনের কাছে অন্যতম উপাদেয় ফল। ছড়াকার ত্রিপর্ণা পতির লেখা ছড়ায় পাই -
'আম জাম লিচু বেল তরমুজ ফল!
গরমেতে এগুলোই বুকে দেয় বল!!'
মিড ডে মিলের মেনুতে এক্সট্রা নিউট্রিশনে দেওয়া হয়েছে তরমুজ

তরমুজের রস খুবই সুমিষ্ট। শক্তিদায়ক, পিত্ত বৃদ্ধিকারক, কামোদ্দীপক, শীতগুণসম্পন্ন, গুরুপাক এবং মেদোকারক। গ্রীষ্মকালেই এই তরমুজের ফলন নিয়ে ঢাকার ধাঁধা রচয়িতাদের লেখনিতে পাই -
'ইল শুকালো বিল শুকালো
ইটের জমি পানি বাজালো'। 
এই ধাঁধাটিই অন্যভাবে বগুড়ার লোকেদের মুখে শোনা যায় -
'ইল শুকালো বিল শুকালো
ইটার ভিরোত (জমিতে) পানি'। 
চলনবিল এলাকায় শোনা যায় -
'ইল বিল শুকায়ে গেল
ঢিলের ভুঁয়ে পানি রলো'। 

পাকা ফলের ভেতরের রঙ টকটকে লাল হলেও অপক্কাবস্থায় ভিতরের রঙ সাদা। চ্যাপটা বীজগুলি কালো বা লালচে রঙের। তরমুজের বীজ কামোদ্দীপক, বলকারক, মেদোজনক ও মূত্রকারক। এই বীজ থেকে ভোজ্যতেল পাওয়া যায়। তরমুজের মধ্যেকার গঠনগত এই বিষয়টি সিলেটের লোকেদের ধাঁধার মধ্যে শোনা যায় --
'কুন্দুস কুন্দুস কালা মুরগী লাল গোশত'। 

তরমুজের মধ্যে ক্যালরির পরিমাণ খুব কম। তাই তরমুজ খেলে ওজন বৃদ্ধির সম্ভাবনা নেই। শরীরের ক্লান্তি দূরীকরণ, টাইফয়েড, প্রস্রাবের স্বল্পতায়, শুক্র বৃদ্ধি, হৃদরোগের উপশম, অপুষ্টি নিরসনে তরমুজের রস খুব উপকারী। মুসলিমরা রোজা ভাঙার সময় তরমুজ খায় শরীরের শক্তি সঞ্চয়ের জন্য। গাজনের ভক্তা এবং শিবের ব্রতীনীরা তাঁদের সান্ধ্যকালীন উপবাস ভাঙার সময় অন্যান্য ফলের সাথে তরমুজ রাখে। তরমুজের মধ্যে রয়েছে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম, কার্বোহাইড্রেট, অ্যামাইনো অ্যাসিড, গ্লুটেলিন, প্রোপায়নিক অ্যাসিড, পেপটোন,  ক্যারোটিনয়েড ইত্যাদি। জীবনানন্দ দাশ তাঁর 'নগ্ন নির্জন হাত' কবিতায় উল্লেখ করেছেন তরমুজের কথা -
'পর্দায়, গালিচায় রক্তাভ রৌদ্রের বিচ্ছুরিত স্বেদ,
রক্তিম গেলাসে তরমুজ মদ!
তোমার নগ্ন নির্জন হাত;
তোমার নগ্ন নির্জন হাত।'
🍂

Post a Comment

2 Comments

  1. কমলিকাMarch 22, 2026

    তরমুজের আখ্যানে শাস্ত্র থেকে বিজ্ঞান
    সত্যিই মুগ্ধ করে লেখকের জ্ঞান।
    স্বীকার করুন আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম 🙏
    আর একটুকরো ঠান্ডা তরবুসানি খান।🍉

    ReplyDelete
  2. অত্যন্ত আলগোছে লেখা একটি নিবন্ধ। পাঠক হিশেবে প্রাপ্তি যৎসামান্য।

    ReplyDelete