কবি সুমন রায় বিরচিত "বুকে ধরে তোমার রুমাল" গ্রন্থ সম্পর্কে কিছু কথা
স্বাতী ভৌমিক
কবি সুমন রায়ের "বুকে ধরে তোমার রুমাল" গ্রন্থের কবিতা গুচ্ছগুলি অনবদ্য-অস্ফুট ভাষার নীরব প্রকাশ। কবিমন অকাতরে ছুঁয়ে যায় গভীরতম উপলব্ধির প্রতি রহস্যকোন।
আপন মননালোকে কবি সুমন রায়ের অনুভূতিপূর্ণ শব্দের সুসংহত প্রকাশ যে উপলব্ধি জাগিয়ে তুলেছে, জানিনা তা কতটা সঠিক। তবে প্রচেষ্টা প্রবাহে অনিচ্ছাকৃত ভুলভ্রান্তি উদার কবি হৃদয়ের কাছে মার্জনীয় হবে বলে আমি আশাবাদী।
সময়ের স্রোত অবারিত ভাবে বয়ে যায়। হৃদয়ের একটু থামার সকাতর আবেদনেও টলে না তার সুদৃঢ় পদ সঞ্চালন। কবি সুমন রায়ের ভাষায় "বুকের পাঁজরে টো টো করে রুমাল চুরি করা প্রেম"। কিন্তু পাঁজরের অলিগলি ভেদ করে বাস্তবের বাইরের শুষ্ক মরুপথে এসে সে প্রেমকেও মেনে নিতে হয়, "সিঞ্চনের সুখ সে বিরহে"।
একটুখানি সবুজের ছোঁয়া তথা প্রাণের স্পর্শ পেতে যে প্রেম অপেক্ষা করে থাকে, তার ব্যর্থ অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস মিশে যায় আমাদের জীবনবোধে।
কবির অনুভূতির আবিরে নানা রঙে বিচিত্রিত হয়েছে কবি হৃদয়ের আবেগের উচ্ছলতা। প্রকৃতির বর্ষা তো প্রায় সবার জানা। কিন্তু জীবনের চড়াই- উৎরাই এর ঢেউ খেলা পথে চলতে গিয়ে হৃদয় বর্ষার যে নীরব বর্ষণমুখর ধারা, তার খোঁজ কজন জানে! সে খবর জানে মরমী হিয়া- "প্রতিদিনের নিভৃতবেলায়" এর উপস্থিতি।
🍂
মনের পাঠ পড়ে ক'জন! তবুও কত কিছু লেখা হয় মনের নিভৃত প্রকোষ্ঠে। খসে পড়া জীর্ণ পাতায় লেখা থাকে কত অভিমান- কত না কঠিন ছবি আঁকা থাকে তার প্রতি শিরায়- কে খোঁজ রাখে তার! শুধু ঝরে পড়ার দলে নীরবে পারদ চড়ে। "অবাধ্য সব অশ্রুধারা" নিভৃত বেলায় ঝরে পড়ে ক্লান্ত অবকাশে।
জীবনে কিছু কিছু অকারণ...... না না, অকারণ নয় কারণ খুঁজে না পাওয়ার অনুভূতিগুলো মানুষকে তাড়া করে নিয়ে ফেরে। "শেষ বিকেলে দিগন্তের হাটে ফেরি করে ফিরে শ্রান্ত" মন- হৃদয় একদিন সমস্ত প্রথাগত ব্যাকরণ পাঠ ভুলে যায়। জীবনের ভাষাই তাকে বুঝিয়ে দেয় যতি- ছন্দ- লয়ের ব্যবহার।
মানুষ যখন নিজের কেন্দ্রে ভর রেখে আবর্তিত হয়, তখন সে স্থিতপ্রজ্ঞ মানুষের ভূমিকায় থাকে। তখন দুঃখ- কষ্ট- আনন্দ- তিরস্কার সবকিছুই তার কাছে স্থিতিশীল বলে মনে হয়। কবির এ হেন দার্শনিক অনুভূতি অনবদ্য।
স্মৃতির নকসী কাঁথায় লেখা মনের গভীর যে অনুভূতির রূপচিত্র, তা কখনো কখনো তার প্রবহমানতা ছেড়ে আশ্রয় নেয় নির্ভেজাল অনুভূতির গভীর অন্তঃপুরে , প্রকাশিত হবার পথ পায়না খুঁজে। অবাধ্য অশ্রুধারা সলজ্জ আবেগে আবরিত হয় রোদ চশমায়- কবির ভাষায়, "রোদ চশমায় ঢেকে নেব অবাধ্য অশ্রুধারা। "
চির পরিচিত প্রাকৃতিক পরিবেশে লেখা থাকে অনেক না বলা কথা। কিন্তু তা পড়া সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। কারণ প্রকৃতির গল্প পড়ার মতো দৃষ্টি সবার থাকে না। কবি সুমন রায় ঠিকই বলেছেন, "তোমরা আসলে দেখার মতো করে কিছুই দেখনি।" প্রাণোচ্ছল জীবনও একদিন নীরব হয়ে যায় সময়ের অনুশাসনে।
মনের দাগ মেটেনা সহজে। আবেগের বিহ্বলতা যে ছাপ রেখে যায় মনের প্রাঙ্গণে, তার মানস ছবি অঙ্কিত হয়ে যায় মনের প্রতি কোণে। ভুলে যাওয়ার পরশমণি স্পর্শ করতে পারেনা মনের সেই গহনকোণ।
শূন্যতায় কে বলে শুধু শূন্য থাকে! শূন্যতাতেই পূর্ণতার সম্ভাবনা থাকে সবচেয়ে বেশি। কবির ভাষায়, "শূন্যতা বড় বেশি ছুঁয়ে থাকে।"
কুবাই নদীর সাথে কবির এক সুনিবিড় সম্পর্ক রয়েছে যা কবিতা গ্রন্থটির স্থানে স্থানে ফুটে উঠেছে। প্রকৃতির সাথে কবিমনের এক সুগভীর অন্তর দৃষ্টি সমন্বিত যে সম্বন্ধ রয়েছে তা অনেকটা আন্তরিক টানের মত। তাই কুবাই নদীর প্রসঙ্গ বারবার ফিরে ফিরে এসেছে বিভিন্ন কবিতায়।
যোগ বিয়োগের জটিল অংকের হিসেবে জীবনের অংকটাও যদি মেলানো যেত! কিন্তু তা হয় না। মেলেনা জীবনের সব হিসেব। আর বেহিসেবী মন হিসেবের প্রথাগত ধারায় নিজেকে খুঁজে পেতে নারাজ। কবির কথায়, "জীবন অংকে যন্ত্রনার দর্শন" বেহিসেবী ব্যক্তি মনকে করে তোলে দার্শনিক।"
জীবনের শত শত ব্যস্ততা একদিন থেমে যায়। "ভোকাট্টা ঘুড়ি"র মত জীবনের ঘাত প্রতিঘাতে কেটে যাওয়া সুতোর টান তথা জীবনের টান মানুষকে নিয়ে উপস্থিত করে "মৃত্যুর বিজন পথে" একাকী। কী গভীর দার্শনিক উপলব্ধি কবির!
জীবনের হাতে খড়ির সেই প্রথম দিনের সহজ সরল জীবন বোধ সময়ের স্রোতে ভেসে যেতে যেতে এক সময় পৌঁছে যায়- একাকীত্বের নির্জন প্রদেশে। যেখানে সম্বল থাকে জীবনস্মৃতি- যা বয়ে নিয়ে যায় ব্যক্তি চেতনাকে জন্ম থেকে জন্মান্তরে।।
--------
0 Comments