জ্বলদর্চি

মেঘেদের বর্ণপরিচয় :দিলীপ মহান্তী / চিত্রা ভট্টাচার্য্য

মেঘেদের বর্ণপরিচয় / দিলীপ মহান্তী 

 চিত্রা ভট্টাচার্য্য 


কবি দিলীপ মহান্তীর লেখা মেঘেদের বর্ণপরিচয় ' নামে প্রকাশিত কবিতার বইটি হাতে পেলাম। কবিতা নিয়ে ভাবতে পড়তে আগ্রহে ভরা মন পাতা উল্টে উপলব্ধি করলাম এ কবিতার বইটি গোগ্রাসে এক নিমেষে পড়ে গিলে ফেলার  জন্য নয়। বরং সময় নিয়ে রসেবসে হৃদয় দিয়ে অনুভব করার। 'মেঘেদের বর্ণপরিচয় ' কবিতার বইয়ের এমন অদ্ভুত রোম্যান্টিক নাম।  বইটির নামকরণের মধ্য দিয়েই কবি যেন অনেক না বলা কথা বলেছেন। মেঘেদের সেই বর্ণপরিচয়ের আড়ালের ছদ্মবেশে লুকিয়ে আছে চলমান জীবন ধারার এক চরম কঠিন সত্য ,এক নীরব প্রকৃতির কাব্য। বই টি হাতে নিয়ে নীলভাস্করের তৈরী ঝকঝকে চমকপ্রদ সবুজ আলোর আবরণে মোড়া প্রচ্ছদপট টি প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। পাতা উল্টে দেখি দুই মলাটের ভিতর সাজানো রয়েছে ষাট পাতার বইটিতে একরাশ কবিতা অনুকবিতার গুচ্ছ। নির্ভুল বানান ও ছাপায় সুন্দর সুসজ্জিত অক্ষর রাশি কবিতা পড়তে মন কে উৎসাহিত করে আনন্দে ভরিয়ে দেয় প্রকৃতির অনুপম কাব্য গাঁথা।  🍂
  একথা একেবারে সত্য  যে ,রূপক কবিতায়  উপমা ও চিত্রকল্পের মাধ্যমে বিমূর্ত ধারণা বা নৈতিক বার্তা প্রকাশ করা হয়। রূপক কবিতা এমন এক ধরণের কাব্যিক রচনা যেখানে আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ কোনো কাহিনির আড়ালে একটি গভীরতর প্রতীকী বা অন্তর্নিহিত অর্থ লুকিয়ে থাকে। এতে বাইরের রূপ (বাচ্যার্থ) এবং ভেতরের রূপ (নিহিতার্থ) সমান্তরালভাবেই বোঝাযায় ।  যেমন এই বই টির প্রথম কবিতা 'মেঘেদের বর্ণপরিচয় ' কবি লিখলেন --''সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়েছে শরীরে ----কেউ ভাসতে চায় লবণ জলে /কেউ ডুবতে চায় চোখের জলে ''  কবিতার নির্মল ভাষা বা কাব্যবোধ পাঠক মনে সুললিত ছন্দ শ্রবণ মাধুর্য বা শব্দের ঝঙ্কারে এক দৃশ্যময় আবহ সৃষ্টি করেছে । 

   'মেঘেদের বর্ণপরিচয় ' এর কবিতা রাশি পাঠ করতে করতে মন কোনো এক অজ্ঞাত কারণেই প্রকৃতির মাঝে মেঘের মায়াময় প্রশান্তির দেশে হারিয়ে যায়। ' নির্বাক প্রকৃতির বাঙময় রূপ বর্ণনায় পটু কবি দিলীপ কখন যেন প্রকৃতির সাথে নিবিড় একাত্ম সম্পর্ক স্থাপন করে প্রকৃতির এক সত্তা হয়ে গিয়েছে।  আকাশে জমেছে মেঘ আসবে বৈশাখী /প্রতিটি লোমকূপে রাত জাগে বর্ষার আকুতি ! ' রোম্যান্টিক কবি অতি নিপুণতার সাথে তার প্রতিটি কবিতার বর্ণ , ধ্বনি ও শব্দের অনুভব পাঠক মনের মস্তিষ্ক ও হৃদয়ে সঞ্চারিত করেছেন । কবির ভাষায় হাত পেতে দাঁড়িয়ে পথে অভ্যর্থনা করে / অভুক্ত শরীরে কান্না বাতাসে ওড়ে ।

এই  কাব্যগ্রন্থ টি আধুনিক কবিতার গুণে সমৃদ্ধ।পটভূমিকায় প্রকৃতির অনুপম রূপ বর্ণনা প্রায় ক্ষণেক্ষণে বিশ্লেষিত হয়ে বইটির কাব্য সৌন্দর্য বহুক্ষেত্রে যথেষ্ট বাড়িয়ে দিয়েছে। যেমন মরীচিকার গানে,পলাশের লাল ভাষা জ্বলে আছে প্রান্তরে /অন্ধকার জাগে বইয়ের উদাস ঘরে '----

দহন কবিতায়  ,চারিদিকে বুনোমোষ ,হায়েনার ভিড়ে /গাছেরা নীরব হয় /নদীরা অশান্ত হয় অজগর শুয়ে আছে জলে। 
কবিতার ভাষায় দৃশ্যমান  হলো এক স্থির প্রাকৃতিক চিত্র।  রাত্রির স্বর কবিতায় ভাবুক কবির চোখে দূরের প্রকৃতি যেন ঢেউ ভেঙে নড়ে। কবির  ঘ্রাণেন্দ্রিয় অনুভব করে ঘুমন্ত রাত্রির। কোথাও  লিখলেন স্মৃতিরা চঞ্চল হলে বৃষ্টি হবে বন্যা হবে খুব। কোথাও বললেন পাথর কঠোর হয় জানি পাহাড়  ও অন্তরালে কাঁদে। কিম্বা খুব সাধারণ কথা ,যখন বৃষ্টি নামে ,মাটিও ভিজে ওঠে শ্রমে -- 
  কবিতা প্রেমী অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে  বারংবার কাব্য গ্রন্থটির আদ্যপ্রান্ত গভীর আগ্রহে সাথে পড়লাম।  মননশীল কবি কাব্যিক বর্ণনা করেছেন সাধারণ সহজ ভাষায়।  ' তুমি তো সুন্দর কত আমার দুচোখে /সবুজ গাছের পাতা বর্ষার জলে /ধোয়া হয় জ্বলে ওঠে আষাঢ়ের মাসে '।
 
 প্রকৃতিতে আত্মমগ্ন অনুভবী  মনে শুনতে পান রাত্রির নূপুর বাজে কক্ষপথ জুড়ে ' কখনো কবি দুঃখে নিমজ্জিত হন ,তার কান্না পায় !কাঁসাইয়ের চোরা স্রোতে স্মৃতি ভেসে যায়।কখনো কবি হেঁটে যায় আকাশের নীল সীমায় ,---অতল সাগরে ভেসে যাই চোখ বুজে। 'তার অসাধারণ প্রকৃতির বর্ণনার সাথে পাঠক মন স্পর্শ করে জীবনের বাস্তব চিত্র। বিবেকী সময় কাঁদে উন্মাদের রূপে। কবিতা পড়তে পড়তে বিভোর হয়ে যাই সৌন্দর্যের কোমল মায়াময় সুধায়।  উঠোনে রয়েছে সন্ধ্যা জড়ানো ছবি /হারিয়ে গিয়েছে বৃষ্টি ভেজা শহর। 

আধুনিক কবিতা রচনার ক্ষেত্রে দেখা যায় কবিদের কোন কঠোর বিন্যাস বা নির্দেশিকা সাধারণত থাকে না , সেই হিসেবে একটি কবিতা যে কোনও আকারে এবং যে কোনও বিষয়ে লেখা হতে পারে। কবির চোখে যা কিছুর সৌন্দর্য,যা কিছু সম্পর্কে আনন্দ অনুভব করা যায় তাই  কাব্যিক দার্শনিক মন প্রকাশের চিন্তার আতিশয্যে কবিতা রূপে ধরা দেয়।  যা প্রথাগত ছন্দ ও রোমান্টিকতাকে বর্জন করে ব্যক্তিমানুষের বিচ্ছিন্নতা, সংশয়, নৈরাশ্য এবং গভীর বাস্তবতাকে প্রকাশ করে।  
 এক্ষেত্রে আধুনিক কবি ও তার কাব্যতে যথেষ্ট রোমান্টিকতার পরিচয় দিয়েছেন । যার মূলে রয়েছে প্রকৃতির পূজারী কবি মনের ভাবনার বিশেষ প্রাধান্য। কবি দিলীপ মহান্তীর  কাব্যবোধ পাঠক মনে  নিঃসন্দেহে শ্রবণ মাধুর্য বা শব্দের ঝঙ্কারে বেশ আবহ সৃষ্টি করবে । এ কাব্য পাঠে  বারবার পাঠক হৃদয় উজ্জীবিত করে সঞ্চারিত করবে অপার শান্তিরস সুধা।  কবি দিলীপের মেঘেদের বর্ণপরিচয় কাব্য গ্রন্থটি এককথায় আধুনিক কবিতার এক প্রশংসনীয় প্রয়াস।পাঠক মনে মেঘেদের বর্ণ পরিচয়ের চাহিদা থাকবে অফুরান।

Post a Comment

0 Comments