চিত্রগ্রাহক - ঋপণ আর্য
খিল্লি
বিনোদ মন্ডল
আমি জানি! কে বলেছে?
ডাহা মিথ্যে। সবই মিথ্যে!
উষ্ণায়নের পড়াশোনা
কাজ না আমার। সত্রাদিত্যের।
সত্রাদিত্য -- সত্যিকারের --
বইপোকা তো, না আমি না,
অথরিটি আমি না রে ;
আমার মতটা -- না, দামি না !
কে বলেছে -- আমার নামটা ?
সে সন্তোষ স্যার, ভালোবাসে!
চারিদিকে কত লোক জন --
রিসার্চ করেন -- বারো মাসে।
আকাশের এই রহস্য ভেদ,
রামধনু রং -- মেঘলা দুপুর
আলো ঝলমল পালা বদ্ 'লে
নামল বৃষ্টি -- টাপুর টুপুর;
আমার লেখায় আলোর রেখা?
ভালো বললি । এটা খিল্লি!
পুরস্কারটা বড়ো কথা নয় ;
প্রত্যেক সালে দ্যায় তো দিল্লি!
একটু দিশা, হালকা হদিশ,
দিলাম মাত্র সৌরলোকের
প্লাটিনামপাত -- নিয়মিত,
কেন সরছে -- ভূগোলকের ?
বলবো এবার -- বছর দশেক
লাগবে আরও -- পরমায়ু
কেমন করে আনবো বশে
ঝঞ্ঝা ঝড় ও খরবায়ু!
তখন তোরা বন্ধুরা সব
ডাকিস সভা বলবো সবই
সত্রাদিত্য এখন হিরো ;
জয়দীপ সাহা
দশম শ্রেণি,সোদপুর হাই স্কুল, উত্তর ২৪ পরগণা
নির্মল স্যারের ক্লাস (৩)
বাইরের আলো, ভিতরের আলো
ধ্রুবজ্যোতি দে
সপ্তম শ্রেণী। গরমের ছুটি শেষ। প্রথম দিনের প্রথম পিরিয়ড। রমাদি ওদের ক্লাস টীচার এবং অঙ্ক করান। তাই ছেলেমেয়েরা ওঁকে একটু ভয় পায়। রমাদি ছুটি নেওয়ায় নির্মল স্যার এখন ‘পরিবেশ ও বিজ্ঞান’-এর ক্লাস নিচ্ছেন। নির্মল স্যারের কাছে ওরা নিচু ক্লাসেও পড়েছে। তাই স্যার ক্লাসে এলে সবাই আনন্দে হইচই করে উঠল। ওদের চুপ করিয়ে নির্মল স্যার নাম ডেকে হাতে বই নিলেন। আজ পড়াবেন ভৌত পরিবেশ-এর মধ্যে ‘আলো’ বিষয়ে। পড়ার বইয়ে ‘আলো’ পাঠ্যক্রমের প্রথমেই আছে প্রাত্যহিক জীবনে আলো সংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনা। সেখানে কয়েকটি নাম দিয়ে তাদের চোখে এই ঘটনাগুলোর বিবরণ ছিল। নির্মল স্যার মজা করার জন্য নামে মিল আছে এমন কয়েকজন ও আরও কিছু ছাত্রছাত্রীকে পর পর পাতাটি পড়তে দিলেন।
বইয়ে অনিরুদ্ধ নামের ছেলেটি ঝিলপাড়ে বটতলায় বসে ঢেউয়ে আলোর প্রতিফলন দেখেছিল। অনিরুদ্ধ নামে কেউ না থাকায় যখন অনিলকে পড়তে বলা হল সে বলল সে কোন দিন ঝিল দেখেনি। আর তার বাড়ির কাছের ছোট পুকুরটায় এত পানা যে জলই দেখা যায় না। কিন্তু প্রত্যুষ নামের বদলি প্রতীক জানাল তার ঘরের পাশের বোসবাবুদের পুকুর এত পরিষ্কার রাখা হয় যে তাতে বোসবাবুর বাড়ির ছবি আয়নার মতই দেখা যায়, ঠিক যেমন বইতে লেখা আছে। বইয়ে সুজাতার কথা লেখা থাকলেও ক্লাসের সুজাতা বলল সে মোটেও ছুটির দিনে দুপুরবেলা বিছানায় শোয় না। আর ঘুলঘুলি দিয়ে দুপুরে তাদের ঘরে মোটেও সূর্যের আলো আসে না। তবে শীতের সকালে সূর্য উঠলে বন্ধ জানলার ফুটো দিয়ে যখন রোদ এসে ঘরের দেওয়ালে পড়ে তখন পাশের বাড়ির ছাদের ছবি উল্টো দেখা যায়। তারপর প্রশ্ন করল, “স্যার, কেন এমন হয়?” নির্মল স্যার বললেন, “এই ব্যাপারটা বইয়ে কয়েক পাতা পরে যখন আমরা ‘দু’ নম্বর হাতে-কলমে’ কাজ করব তখন ভাল বোঝা যাবে”। 🍂
সুজাতা যখন বইয়ের লেখা পড়ছিল তখন তার বইটা প্রায় নাকে ঠেকানো ছিল। স্যার ওকে সবসময় বই একটু দূরে রেখে পড়তে বলে ক্লাসের মৃণালকে বইয়ের মৃন্ময়ের কথা এবং অরুণাকে বইয়ের অরুণিমার কথা পড়তে বললেন। দুটি লেখাতেই লাঠি নিয়ে পরীক্ষা ছিল। নির্মলবাবু মৃণালকে স্কুলের অফিস ঘর থেকে দু’ ফুটের রুলটা আনতে বললেন। মৃণাল ভয়ে ভয়ে অফিস ঘরে গেল। অরুণা বলল, “স্যার আপনি তো মারেন না, তবে …।” নির্মলবাবু হেসে বললেন, “না রে, যা পড়লি সেটা পরীক্ষা করে দেখা হবে। তোরা দু’জনে ক্লাসের বাইরে বাগানে রুলটা নিয়ে যাবি। তারপর বলছি কী করতে হবে।”
বাগানে একটা বালতি রাখা ছিল গাছে জল দেওয়ার জন্য। এই ছোট বাগানটিতে উৎসাহী ছেলেমেয়েদের পরিচর্যায় আর শিক্ষক শিক্ষিকাদের তত্ত্বাবধানে সমসময়ের সবজি আনাজ ফলানো হয়। ‘মিড-ডে মিল’-এ মাঝে মাঝে এই আনাজ রান্না হয়। নির্মলবাবু বাগানে গিয়ে মৃণালকে বালতিতে জল ভরে ক্লাসের জানালার কাছে রাখতে এবং অরুণাকে রুলটা বালতির জলে ডোবাতে বললেন। রুল পুরো ডুবলো না। নির্মল স্যার বললেন, “কী দেখছিস?” অরুণা উত্তর দিল, “লাঠিটা যেখানে জলে ডুবেছে সেখান থেকে বাঁকা দেখাচ্ছে। তুলে নিলে সোজা।” মৃণালও তার কথায় সায় দিল। এবার ক্লাসের সবাই একে একে জানালায় এসে উঁকি দিয়ে দেখল। স্যার বললেন, “আধ গ্লাস জলে একটা পেন্সিল ডোবালেও এমনটা দেখা যাবে”।
এরপর নির্মলবাবু মৃণালকে রুলটা বাগানে রোদ্দুরে সোজা ভাবে অল্প পুঁতে দিতে বললেন। জৈষ্ঠ্য মাসের শেষে ভরা দুপুরে সূর্য প্রায় মধ্য গগনে। রুলের গোড়ায় একপাশে একটা গোল মতন ছায়া দেখা গেল। জানালা দিয়ে সবাই তা দেখল। স্যার জানালেন সূর্য একেবারে মাথার ওপর উঠলে কিছুক্ষণ কোনও ছায়া থাকবে না। কিন্তু জয়িতা বলল সে এখনই কোনও ছায়া দেখতে পাচ্ছে না। নির্মলবাবু আশ্চর্য হলেন। তিনি ব্ল্যাকবোর্ডে প্রথমে ছোট করে ‘পরিবেশ’ লিখলেন। তারপর জয়িতাকে সামনের বেঞ্চে বসিয়ে পড়তে বললেন। সে পড়তে পারল না। সবাই অবাক, কিন্তু নির্মল স্যার ঠোঁটে আঙুল রেখে চুপ থাকতে বললেন। স্যার লেখাটা বার বার মুছে অক্ষর একটু একটু বড় করে লিখতে লাগলেন। জয়িতা প্রথমে চোখ কুঁচকে ছোট করে পরে স্বাভাবিকভাবে পড়তে পারল। স্যার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “তোর চোখ দেখাতে হবে, বাড়িতে বলিস।”
পরের দিনের ক্লাসে নির্মল স্যার ‘স্বপ্রভ’ আর ‘অপ্রভ’ বস্তু পড়ানো শুরু করলেন। বললেন, যা থেকে আলো পাওয়া যাচ্ছে তাই স্বপ্রভ, যেমন আলোর বাল্ব, জ্বলন্ত বাতি। গরু, ছাগল, ইঁট, কাঠ, আয়না, অপ্রভ। আয়না নিজে আলো দেয় না, কেবল আলো প্রতিফলিত করে। স্বপ্রভ সাধারণত জড়বস্তু হয়, তবে কখনও কখনও জীবিতও হয়। যেমন জোনাকি পোকা। এই সময়ে অনিল বলে উঠল, “আলো দেওয়া ছত্রাক, যা গোপালচন্দ্র দেখেছিলেন”। নির্মল স্যার হেসে বললেন, “তোদের মনে আছে?” সকলে সমস্বরে “হ্যাঁ” বলল। প্রতিবছরই তিনি নিচু ক্লাসে গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের গল্প বলেন। এরপর তিনি সবাইকে বইয়ের পাতায় স্বপ্রভ ও অপ্রভ বস্তুর সারণি পূর্ণ করতে বললেন। এই সময়ে তাঁর চোখে পড়ল জয়িতা বইয়ে আবার নাক ঠেকিয়ে সারণিতে দাগ দিচ্ছে। চোখ দেখানোর কথা বাড়িতে বলেছে কিনা জিজ্ঞাসা করলে জয়িতা মাথা নেড়ে বলল, “আপনার কথা বলে বলেছি। বাবা বলল, তোর চোখের জ্যোতি কম। মা বাবাকে বলল, রোজ চুনো মাছ আনো, পুঁটি, মৌরলা, বেলে এইসব। চোখের জোর বাড়বে”। নির্মল স্যার জানতে চাইলেন, “খাচ্ছিস, চুনো মাছ?” জয়িতা বলে, “খাই, বড্ড কাঁটা”।
জয়িতা খুব বাধ্য আর শান্ত প্রকৃতির মেয়ে। লেখাপড়াতেও ভাল। অঙ্কে পুরো নম্বর পায়। ওর বন্ধুরা ভাবে ও মাথা নিচু করে খুব কাছ থেকে অঙ্ক দেখে বলে ভুল হয় না। জয়িতার পাশ থেকে অনিল বলল, “স্যার, জ্যোতি মানে তো আলো। তাহলে চোখ কি স্বপ্রভ?” অরুণা বলে, “তাহলে তো অন্ধকারে চোখ দেখা যেত”। জয়িতা বলল, “আমাদের বাড়িতে যে বেড়ালটা আসে রাতে ওর চোখ জ্বলতে দেখা যায়”। নির্মল স্যার বোঝালেন, চোখ অপ্রভ। চোখের ভেতরে একটা পর্দা আছে, সেখানে চোখের বাইরে থেকে আলো ঠিকভাবে এসে পড়লে ছবিটা দেখা যায়। আর যদি চোখের মণিতে অল্প আলোও প্রতিফলিত হয় তবে মনে হবে চোখ জ্বলছে। তাঁর মনে হল, চোখ নিয়ে জয়িতার বাবা মা-এর মনে কিছু অন্ধকার আছে, তাঁকে কথা বলতে হবে।
স্কুলের কাছে পাঁচ মিনিট দূরত্বে অফিস মোড়ের ফুটপাথে জয়িতার বাবা নবীনবাবুর একটা ছোট চায়ের দোকান আছে। নবীনবাবু আর জয়িতার ছয় বছরের বড় দাদা সুব্রত সারাদিন সেই দোকান চালায়। সুব্রতও এই স্কুলের ভাল ছাত্র ছিল। উচ্চ-মাধ্যমিক পাশ করে বাবার সঙ্গে দোকানে বসছে। অভাবের সংসার। মা গৃহবধু, কিন্তু সংসারের কাজের মধ্যেই ছোলা চিঁড়ে বাদাম ভাজেন, শাশুড়ি মা-র বড়ি আচার এসব তৈরি করেন এবং নবীনবাবু দোকানে সেগুলি বিক্রি করেন। নির্মলবাবু স্কুল ছুটির পর সাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে মাঝে মধ্যে নবীনবাবুর দোকানে চা বিস্কুট খেতেন। আজও ঠিক করলেন বিকালে ফেরার পথে নবীনবাবুকে জয়িতার চোখ দেখানোর কথা বলে যাবেন।
নবীনবাবুর দোকানে খরিদ্দারের ভিড় ছিল। তবু চা খাওয়ার সময় নির্মলবাবু বললেন, “জয়িতার চোখটা সত্যিই খুব খারাপ, একবার হাসপাতালে চোখের ডাক্তার দেখিয়ে নিন। এখনই ব্যবস্থা না নিলে হয়ত বেশি বেড়ে যাবে”। নবীনবাবু বললেন, “ঐ সবসময় বইয়ে মুখ ঢুকিয়ে পড়ে এই হাল করেছে। দেখি কবে সময় পাই। ছেলেটা যদি দোকান সামলাতে পারে নিয়ে যাব। হাসপাতালে যাওয়া মানেই একটা বেলা গেল।” জয়িতার দেখতে অসুবিধা হয় বলেই তো বইয়ে মুখ ঢুকিয়ে পড়ে, নির্মলবাবু মনে মনে বললেন, কিন্তু কথা বাড়ালেন না। ডাক্তার দেখালে চোখ ভাল হয়ে যাবে বলে আশ্বাস দিলেন। তাঁর হাত থেকে সুব্রত চায়ের কাপ নিলে নির্মলবাবু তার মাথায় হাত বুলিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।
পরের দিন নির্মল স্যার অস্বচ্ছ বস্তু এবং স্বচ্ছ ও ঈষৎ স্বচ্ছ মাধ্যম পড়াচ্ছিলেন। কাঁচ কাঠ, স্বচ্ছ ও অস্বচ্ছ। ক্লাস ঘরের ঘষা কাঁচের জানালা ঈষৎ স্বচ্ছ, যার ভিতর দিয়ে দেখা যায় কিন্তু চেনা যায় না। কারণ তার ভিতর দিয়ে আলো ভালভাবে যেতে পারে না। অনিল জিজ্ঞাসা করল, “স্যার, জয়িতার চোখ কি অস্বচ্ছ? ও দেখতে পায়, অথচ চিনতে পারে না।” নির্মল স্যার বললেন, “না, এটা আলোর বিন্দু উৎস, লেন্স আর ছায়া উপচ্ছায়ার ব্যাপার, যা আমরা পরে পড়ব। এখন আমরা বইয়ের ‘এক নম্বর হাতে-কলমে’ কাজ করব” - বলেই তাঁর খেয়াল হল আজ জয়িতা আসেনি। জয়িতার প্রতিবেশী অরুণা জানাল তাকে চোখ দেখাতে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
এবার স্যার তাঁর ঝোলা থেকে শরবৎ খাওয়ার স্ট্র-এর একটা অর্ধেক খালি প্যাকেট বের করলেন। গত মাসে মাস্টারমশাই মাধববাবু অবসর নিয়েছেন। সেই উপলক্ষ্যে সামান্য কিছু খাবার আর শরবতের ব্যবস্থা হয়েছিল। আর সেজন্য স্ট্র আনা হয়েছিল। বাকি স্ট্রগুলো নির্মলবাবু অফিস থেকে এনেছিলেন। এখন সেগুলো সবাইকে বিলি করে ক্লাস ঘরের আলোর বালবটা জ্বালিয়ে দিলেন এবং প্রত্যেককে স্ট্রর ভিতর দিয়ে আলোর বালবটা দেখতে বললেন। তারপর স্ট্র ভাঁজ করে আবার দেখতে বললেন। বালবটা দেখা গেল না। প্রমাণ হল আলো সরল রেখায় চলে। অরুণা জানতে চাইল সব সময়েই তা হয় কিনা। “পৃথিবীর বুকে তাই হয়”, বলে বাকি স্ট্রগুলো অরুণাকে দিয়ে জয়িতাকে বাড়িতে করে দেখাতে বলে দিলেন।
(পরের পর্বে সমাপ্ত)
ধারাবাহিক উপন্যাস
গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ
পর্ব ১১
রতনতনু ঘাটী
এখন সবে শুরু হয়েছে গগনজ্যোতি স্কুলের টিফিন ব্রেক। দেবোপমস্যার বসে ছিলেন স্কুলের স্পোর্টস রুমে। এই রুমটা আগে এমনিই পড়ে থাকত। তখন স্পোর্টস রুমের লেভেল পায়নি।
দেবোপমস্যার স্কুলে জয়েন করার পর, সে আজ কয়েক বছর হয়ে গেল। একদিন হেডস্যার স্কুলের জেনারেল মিটিংয়ে বললেন, ‘আমাদের স্টাফ রুমের পাশে একটা ছোট রুম খালি পড়ে আছে। আমি ভাবছি, দেবোপম যখন স্কুলের স্পোর্টস নিয়ে এতখানি ইনভলভ, তা হলে ওই রুমটাকে আমরা এখন থেকে স্পোর্টস রুম বানিয়ে ফেলতেই পারি? ওখানে স্কুলের ভলিবল, নেট, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন খেলার সরঞ্জাম—সব জড়ো করে রাখা যাবে। ওখানে একটা বড়ো টেবিল এবং দুটো চেয়ার পেতে দিক ঘন্টিদাদু।’
সব স্যারই এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। মনে-মনে দেবোপমস্যার বেজায় খুশি হলেন। হেডস্যারের মুখের কথা পড়তে না-পড়তে ঘন্টিদাদু ঘরটাকে পরিষ্কার করে খেলার সব সরঞ্জাম দিয়ে সাজিয়ে ফেললেন। এমনকী, অ্যানুয়াল স্পোর্টসের লঙজাম্প আর হাইজাম্পের জন্যে মাটি কোপানো কোদাল, দড়ি, মাঠের চারধারে মার্কিং করার গুঁড়ো চুনের বালতি, আরও কত টুকিটাকি জিনিসে ভরিয়ে তুললেন রুমটা। এখন আবার ক্রিকেট যুক্ত হয়েছে গগনজ্যোতি স্কুলে। ক্রিকেট ব্যাটও সাজিয়ে রাখা হয়েছে সেই রুমে।
দেবোপমস্যার ক্লাস নেওয়ার ফাঁকে বেশিরভাগ সময় সেই স্পোর্টস রুমে গিয়ে বসেন। সেদিন হেডস্যারে ওই রুমের সামনে দিয়ে যেতে গিয়ে দেখলেন, দেবোপমস্যার রুমের ভিতর বসে কিছু একটা কাজ করছেন। ওঁকে দেখে হেডস্যার বললেন, ‘এটা তোমার একটা স্বপ্নের রুম হল, বলো দেবোপম?’
দেবোপমস্যার চেয়ার ছেড়ে উঠে রুমের বাইরে এসে বললেন, ‘তা যা বলেছেন স্যার! ক’টা স্কুলে এমন একটা স্পোর্টস রুম আছে বলুন তো? আমার এই রুমটা ভারী প্রিয় স্যার।’
হেডস্যার বললেন, ‘জানো দেবোপম, আমি এই রুমটার একটা নামও দেব বলে ভেবেছি!’
‘কী নাম দেবেন স্যার?’
‘আমি এই রুমটার নাম রাখব ভেবেছি ‘ক্রীড়াকৌমুদি’! খেলাধুলো আমাদের গগনজ্যোতি স্কুলে জ্যোৎস্নার মতো ছড়িয়ে পড়ুক, এটা আমি চাই! নামটা কেমন হবে বলো দেখি?’
‘বেশ ভাল নাম হবে স্যার!’
দেবোপমস্যার টিফিন ব্রেকে ক্রীড়াকৌমুদি রুমে অ্যানুয়াল স্পোর্টসে কী কী নতুন খেলা যোগ করা যেতে পারে, এই নিয়ে খাতায় লিখে রাখছিলেন। এমন সময় ক্লাস এইট সি-সেকশনের দেবক সাহা এসে বলল, ‘স্যার, আমার একটা কথা আছে। ভিতরে আসব স্যার?’
দেবোপমস্যার ক্রিকেট বলগুলো গুনে-গুনে ব্যাগে ভরে রাখার জন্যে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। দরজার দিকে তাকিয়ে দেবককে দেখে বললেন, ‘এসো! ভিতরে এসো! বলো কী বলবে?’
দেবক মুখটা নিচু করে বলল, ‘স্যার, আমার মেজদির বিয়ে ঠিক হয়েছে। মেজদি থাকে আমার মামার বাড়িতে, মধুপুরে। বাবা হেডস্যারকে এবং আপনাকে বলতে হয়তো কালই আসবেন। আমার পনেরো দিন স্কুল কামাই হয়ে যাবে স্যার! আমার ক্রিকেট কোচিংও অতগুলো দিন বন্ধ হয়ে যাবে যে। কী করব স্যার?’
‘আমি তো আগামী দু’ মাস সপ্তাহে দু’ দিন করে ক্রিকেট কোচিং করাব বলে ঠিক করেছি। ঠিক এমন সময় তুমি না থাকলে মানে মাসে চারদিন অ্যাবসেন্ট হলে মেকআপ দেওয়া তোমার পক্ষে কঠিন হয়ে যাবে দেবক! তোমার বাবাকে হেডস্যারের সঙ্গে আলোচনা করতে বলো।’ একটু থেমে তারপর স্যার বললেন, ‘তুমি তো আবার সি-সেকশনের ক্রিকেট টিমের নির্ভর করার মতো উইকেটকিপার! তুমি তো উইকেটকিপিংটা ভালই করো! আচ্ছা, হেডস্যারের সঙ্গে আলোচনা করে দেখি!’
দেবক আমতা আমতা গলায় জানতে চাইল, ‘আমাকে ফাইনালে খেলতে নেবেন তো? আমার যে এতগুলো দিন কোচিং প্র্যাকটিস হবে না? কী হবে? এই ফাঁকে আমাদের দলের উইকেটকিপিং কে করবে স্যার?’
‘তুমি যাও! আমি হেডস্যারের সঙ্গে কথা বলে দেখি, কী ব্যবস্থা করা যায়?’
দেবক মাঠে চলে গেল বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে। অমন সময় দেবকের বাবা স্কুলের দিকেই আসছেন, চোখে পড়ে গেল দেবকের। দেবক ছুটতে-ছুটতে মাঠ ভেঙে বাবার কাছে গিয়ে বলল, ‘বাবা, আমি দেদোপমস্যারকে গিয়ে বলেছিলাম মেজদির বিয়ের কথা। স্যার বললেন, আগে হেডস্যারের সঙ্গে কথা বলে দেখি! তুমি হেডস্যারকে অনুরোধ কোরো, যাতে কোচিংয়ে কামাই হলেও আমাকে ফাইনাল খেলার টিম থেকে যেন বাদ না দেন!’
দেবকের বাবা ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘দেখি হেডস্যারের কথা বলি গিয়ে। তুমি চিন্তা কোরো না!’
দেবকের বাবা হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে ঢুকলেন হেডস্যারের ঘরে। তাঁর দিকে তাকিয়ে হেডস্যার জিজ্ঞেস করলেন, ‘আসুন বিবেকবাবু! বসুন, বসুন! আমাকে কি কিছু বলবেন?’
বিবেকবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ স্যার! আমি একটা কথা বলার জন্যে এসেছি। আমার মেজো মেয়ে অনুলেখার বিয়ের পাকা দেখা চলছে। মনে হয় ওখানেই বিয়েটা পাকা হয়ে যাবে! অনুলেখা মধুপুরে ওর মামার বাড়িতে থেকে মধুপুর পাইলট গার্লস হাই স্কুলে পড়াশোনা করত। এবার ওখান থেকে পাশ করে মধুপুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ইলেভেনে ভরতি হয়েছিল। হঠাৎ ওর মামারা অনুলেখার বিয়ে ঠিক করেছেন। দেবককে তো দিন পনেরো ছুটি দিতে হবে স্যার। অত দূরে মামার বাড়ি। ওখানে গিয়ে বিয়ের সব আয়োজন আমাদেরই করতে হবে তো? মেয়ের বিয়েটা মামার বাড়িতে থেকে হবে বলে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কারণ, ছেলেটি মধুপুরেরই বাসিন্দা। সব দিক থেকে কাজের এবং যাতায়াতের সুবিধে হবে। আমি দেবকের ছুটির অ্যাপ্লিকেশন এনেছি। আপনার কাছে রেখে যাব স্যার?’
এক মিনিট কিছু ভেবে নিলেন হেডস্যার। তারপর বললেন, ‘বিকাশবাবু, আপনি একটু বসুন। ছুটি দেব আমি দেবককে নিশ্চয়ই। কিন্তু তার আগে যে একটা সমস্যা দেখতে পাচ্ছি?’
‘কী সমস্যা স্যার?’
‘আপনি শুনেছেন নিশ্চয়ই, আমাদের স্কুলে ক্রিকেট কোচিং শুরু হয়েছে? ক্লাস এইটের ছেলেমেয়েদের নিয়ে এখন প্রতি শনিবার করে বিকেলে স্কুলের মাঠে দেবোপমস্যার ক্রিকেট কোচিং শুরু করেছেন। দেবক তো ক্লাস এইট সি-সেকশেন টিমের উইকেটকিপার? শুনেছি দেবক দারুণ উইকেটকিপিং করে। এখন দেখি, দেবোপমস্যার কী বলেন?’ এ কথা বলেই হেডস্যার ঘন্টিদাদুকে কলিংবেল বাজিয়ে ডাকলেন।
ঘন্টিদাদু হেডস্যারের ঘরে ঢুকতে স্যার বললেন, ‘তুমি দেবোপমকে আমার রুমে আসতে বলো তো!’
অমনি ছুটলেন ঘন্টিদাদু স্পোর্টসকৌমুদি রুমে। ডেকে আনলেন দেবোপমস্যারকে। হেডস্যারের রুমে তখনও দেবকের বাবা বিবেকবাবু বসে আছেন।
হেডস্যার বললেন, ‘দ্যাখো দেবোপম, ইনি ক্লাস এইটের দেবকের বাবা বিবেকবাবু। ইনি এসেছেন দেবকের জন্যে ছুটি চাইতে পনেরো দিনের। দেবকের মেজদি অনুলেখার বিয়ে ঠিক হয়েছে। অনুলেখা থাকে মধুপুরে মামার বাড়িতে।’
বাকি কথাটুকু বললেন, বিবেকবাবু নিজেই। বিবেকবাবুর মুখ থেকে সব শুনে দেবোপমস্যারের মুখে চিন্তায় ছায়া ছড়িয়ে পড়ল। বললেন, ‘আমি তো এবার থেকে সপ্তাহে দু’ দিন করে কোচিং করব বলে ভেবেছি স্যার। সে কথাটা আজই আপনাকে বলতে আসতাম ।’
হেডস্যার মুখে হাসি ছড়িয়ে বললেন, ‘দেবকের মেজদির বিয়ে তো আর পিছিয়ে দেওয়া যাবে না দেবোপম। অথছ আমাদের ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে স্কুলের সকলেই যেভাবে মেতে উঠেছে দিন-দিন। ঠিক আছে, তুমি সপ্তাহে দু’ দিন করে ক্রিকেটের কোচিং নিয়ে প্ল্যান করে ফ্যালো! আমি দেখছি কী করা যায়।’ তারপর বিবেকবাবুর দিকে তাকিয়ে হেডস্যার বললেন, ‘তা হলে ওই কথাই থাকল বিবেকবাবু! দেবকের মেজদির বিয়েটা ভালভাবে সম্পন্ন হোক। দেবক দিদির বিয়েতে মজা করে কাটিয়ে আসুক। আমি দেখছি কীভাবে ক্লাস এইট সি-সেকশনের উইকেট কিপারের সমস্যাটা কাটিয়ে ওঠা যায়!’
বিবেকবাবুর হাত থেকে দেবকের ছুটির অ্যাপ্লিকেশনটা নিয়ে টেবিলে রেখে দিলেন হেডস্যার। মাথা নেড়ে বললেন, ‘তা হলে বিবেকবাবু মেজো মেয়ের বিয়েটা সমাধা করে ফিরে আসুন। দেবকও সঙ্গে যাক! আনন্দ করে আসুক মেজদির বিয়েতে।’
বিবেকবাবু খুশি মনে হেডস্যারের রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। এবার দেবোপমস্যার মুখে চিন্তার ছায়া ছড়িয়ে বললেন, ‘কী হবে স্যার? দেবক চলে গেলে ক্লাস এইট সি-সেকশনের উইকেট কিপারের সমস্যাটা তো থেকেই গেল?’
হেডস্যার বললেন, ‘তুমি অত চিন্তা কোরো না তো দেবোপম! ক’ দিন আগে আমার কাছে এসেছিল পারুলমণি। লোকনের দিদি!’
‘লোকন? মনে পড়ছে না তো?’
‘আহা লোকনকে মনে পড়ছে তোমার? ওই যে, বিজনডিহি গ্রামের যে ছেলেটির জন্মের পর থেকেই মা-বাবা নেই। তার দিদিই তাকে স্কুলে পড়াচ্ছে।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়বে না কেন? লোকন নাকি নাম যেন ছেলেটির? একদিন টিফিন ব্রেকে ছেলেটি এসেছিল আমার কাছে।’
‘তোমার কাছে কেন?’ হেডস্যার মুখ তুলে জানতে চাইলেন।
‘লোকন ক্রিকেট খেলতে চায় সি-সেকশনের দলে। কিন্তু সি-সেকশনের টিম তো আগেই তৈরি হয়ে গেছে? ওকে নেওয়া যাবে না, এ কথা আমি লোকনকে বলে দিয়েছি!’
‘তুমি তো জানো না দেবোপম, ওর দিদি পারুলমণি আসলে জন্ম দৃষ্টিহীন। কোনওভাবে প্রাইমারি স্কুলের বেড়া টপকেছিল।
তারপর আর তার পড়া এগোয়নি। গ্রামে তো আর ব্রেইল পদ্ধতির সুযোগ নেই? আর...’
দেবোপমস্যার দুঃখী গলায় বললেন, ‘আর কী স্যার?’
‘যেসব ছেলেমেয়েরা জন্মের পর-পরই মাতৃপিতৃহীন হয়ে যায়, তাদের জীবনের কষ্ট, সে পারুলমণি দাস ছাড়া আর কে তত ভালভাবে বুঝবে বলো?’
একটা কষ্ট বুকের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল দেবোপমস্যারের। তাঁরও মা-বাবা খুব ছোট বেলাতেই আকাশের তারা হয়ে গিয়েছেন। মনে পড়ে গেল সেদিনের কথা। ছেলেবেলায় ক্রিকেটের খুব শখ ছিল স্যারের। তাই দেখে স্যারের বাবা বলতেন, ‘তুমি বড় হলে দেবোপম, তোমাকে আমি ক্রিকেটার তৈরি করব। ভরতি করে দিয়ে আসব আমাদের নবীনগঞ্জ জেলার সব চেয়ে বড়ো ক্রিকেট শেখার স্কুলে।’
ও কথা শুনে দেবোপমস্যারের মা বলেছিলেন, ‘ওখানে কত বড়ো-বড়ো বাড়ির ছেলেরা ক্রিকেট শিখতে যায়, তুমি জানো? শুনেছি আজকাল নাকি বড়োলোকের বাড়ির মেয়েদেরকেও ওই ক্রিকেট কোচিংয়ে ভরতি করছে। আমদের কি অত টাকার জোর আছে? তুমি যে জেগে-জেগে কেমন স্বপ্ন দ্যাখো!’
সত্যি, সেটাই স্বপ্নই ছিল। সে স্বপ্ন সত্যি হয়নি দেবোপমস্যারের। তাই খেলার দিকে বেশি নজর ছিল স্যারের। গগনজ্যোতি স্কুলে চাকরিটা পেয়ে গেলেন অঙ্কের স্যার হিসেবে ঠিকই। কিন্তু খেলাধুলোয় তাঁর ছোটবেলার আগ্রহের কথা শুনেই প্রথম দিনই হেডস্যার বললেন, ‘তা হলে আমাদের স্কুলের জন্যে একজন গেমসটিচার চেয়ে-চেয়ে এখনও তো পেলাম না। তুমি তা হলে অঙ্ক ছাড়াও গেমসটাও দেখো। আমাদের স্কুলে দু’জন অঙ্কের স্যার আছেন যখন, তোমাকে গেমসেরও দায়িত্ব দিয়ে রাখলাম!’
হেডস্যারের সেদিনের কথা মনে পড়ে গেল দেবোপমস্যারের। হেডস্যারকে বললেন, ‘তাহলে আমি কি স্যার লোকনকে দেবকের জায়গায় সি-সেকশানের টিমে নিয়ে নেব?’
হেডস্যার খানিক চুপ করে থাকার পর বললেন, ‘তুমি লোকনকে বোলো, তার এই টিমে আসাটা পার্মানেন্ট হয়তো হবে না। দেবক ফিরে এলে তখন কী হবে কে জানে? বরং লোকনের দিদিকে কাল একবার স্কুলে ডেকে পাঠাও! তুমি তো নিয়ম বেঁধে দিয়েছ, ক্রিকেটারদের সকলকে একটা করে ব্যাট কিনতে হবে। সে কি আর লোকন কিনতে পারবে? পারুলমণিকে ডেকে জেনে নিও!’
‘আচ্ছা স্যার। লোকন যদি ক্রিকেট ব্যাট নাও কিনতে পারে, আমিই না হয় ওর ব্যাটটা কিনে দেব!’
দেবোপমস্যারের কথায় খুব খুশি হলেন হেডস্যার। তাঁর মুখটায় আনন্দের ঝিকিমিকি খেলে গেল। হেডস্যারের রুম থেকে আকাশটা পুরোটাই দেখা যায়। তিনি দেখলেন, আকাশে বিকেল-বিকেলই আবছা এককানা চাঁদ আজ সাত তাড়াতাড়ি আকাশে ভেসে উঠেছেন!
(এর পর বারো পর্ব)
সাপ্তাহিক কেলেঙ্কারি
শ্রেয়া দত্ত
দ্বাদশ শ্রেণি (বিজ্ঞান বিভাগ), পিএমশ্রী জওহর নবোদয় বিদ্যালয়, পশ্চিম মেদিনীপুর
Monday সকাল বলিহারিযাই
কেনোই তুমি আসো!
Sunday টা তো চলছিল বেশ, নষ্ট কেন করো?
তুমি আসলেই মনে পড়ে যায় সাপ্তাহিক কাজের চাপ ,
স্কুল ,অফিস, টিউশনির মাথার ওপর নাচের তাল।
সকাল থেকে সন্ধেটাতো ব্যস্ততাতেই কাটছে দিন,
Tuesday টা আসলে ভাবি,
কাটল বাবা একটা দিন।
Wednesday টা আসলে ভাবি সপ্তাহের মাঝামাঝি,
কাটবে আর তিনটে দিন দেখতে দেখতে কাজের চাপেই।
Thursday টাতো নিরামিষ,
পড়বে মার, ঘরে ঢুকালেই আমিষ
Friday টাতো উইকেন্ড প্ল্যানিং ,
আর কাজ সারবার তাড়াতাড়ি ,
পরের দিনই বাড়ি ফেরবার হুড়োহুড়ি,
নেটফ্লিক্স, মুভি আর মশলা মুড়ি,
Saturday কেই উইকেন্ড মানি।
চলবে নাকি weekly mems!
পাঠ প্রতিক্রিয়া: ছোটবেলা বিশেষ সংখ্যা ১৯৪
বন্দনা সেনগুপ্ত
ছোট্ট বন্ধুরা, কেমন আছো? সবার পরীক্ষা হয়ে গেছে? না কি কেউ কেউ এখনও পড়া নিয়ে ব্যস্ত? অবশ্য, পরীক্ষা হয়ে গেলেই বা কি! আজকাল পড়াশোনার কক্ষণও ছুটি হয় না।
তার মধ্যে একটা অন্তত ভাল খবর আছে। ছোটবেলা বিশেষ সংখ্যা এসে গেছে। প্রথমেই মন ভাল করা পদ্ম কুঁড়ি। অবশ্য, এর এখন ফুটতে দেরি আছে। সেই কাশ ফুল যখন ডাক পাঠাবে আর মা আসবেন, তখন এই কুঁড়ি চোখ মেলবে।
তারপর তো তোমাদের মৌসুমী আন্টি সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়ে এবারের ছোটবেলায় কি কি আছে,তার মূল সুরটি ধরে দিলেন। এ ব্যাপারে মৌসুমীর কোন জুড়ি আছে বলে, আমি অন্তত শুনি নি।
তারপর স্বপন কুমার বিজলী আমাদের চৈতালি হাওয়ায় উত্তপ্ত শরীর ঠান্ডা করে দিলেন “বৃষ্টি এল" কবিতা শুনিয়ে। তাছাড়াও আশা দিলেন যে এই গরমে এবার আর গাছ পালার কষ্ট হবে না। পাখ পাখালি কচি কাঁচা সবাই ভাল থাকবে।
দেবোপম বাবুর কোচিং ক্লাসে কে কে যেতে চাও? হাত তোলো। এটা সত্যি কথা যে পড়াশোনা ছাড়া উন্নতি করার অন্য রাস্তা কমই আছে। এখানে দেখা গেল একটা রাস্তা আছে। সেটা হল খেলা। রতন জেঠু অনেক গুলো উদাহরণ দিয়েছেন। এঁদের আমরা সবাই চিনি। এঁরা দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। আমি আশা করছি গগনজ্যোতি স্কুল থেকে এবং তোমাদের মধ্যে থেকেও কেউ কেউ দেশের এবং দশের নাম উজ্জ্বল করবে। তবে কিনা, সব সময় মনে রেখো অগ্রগতির পথ কিন্তু প্রায় কখনোই মসৃণ হয় না। নিজের মেধা, প্রতিভা ও কঠিন পরিশ্রম দিয়ে সেই রাস্তা তৈরি করতে হয়।
দেবোপম বাবুর আকাশ দেখার গল্প পড়ে মন খারাপ হয়ে গেল। এমন কত বাচ্চা আছে যারা অন্ধকার ঘরের কোণে দিন কাটাতে বাধ্য হয়!
ষষ্ঠ শ্রেণির ছোট্ট অনন্যা একটা সামাজিক সমস্যার কথা তুলে ধরেছে। এই রকম মানুষ কিন্তু খুব সহজে বন্ধুর বেশ ধরে মনের গোপন কথা জেনে নিতে পারে। তারপর, “গোপন কথাটি রবে না গোপনে"। খুব সাবধান।
দশম শ্রেণির সৃজা মাইতির আঁকা পিঁপড়ে আমার মন জয় করে নিয়েছে। খুব সুন্দর চিত্র হয়েছে। তাছাড়া, জানো নিশ্চয় যে পিঁপড়ে সারা জীবন নিরলসভাবে কাজ করে চলে। নিঃস্বার্থ ভাবে নিজের দলের সঙ্গে থাকে। আবার, বিপদ বুঝলে রুখে দাঁড়াতেও পিছপা হয় না। তোমরা যখন কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডে যাবে, টিম ওয়ার্ক করবে, তখন এই গুণগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে।
তারকনাথ মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের পাঠ প্রতিক্রিয়া খুব ভালো লাগলো। সুন্দর সুন্দর উদ্ধৃতি দিয়ে বিশদে আলোচনা করেছেন।
জ্বলদর্চি পত্রিকার এবং এই বিশেষ ছোটবেলা সংখ্যার উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করছি। ভবিষ্যতে আরও অনেক বেশি লেখা ও আঁকার কামনা জানিয়ে শেষ করলাম।
0 Comments