এপিলেপসি সচেতনতা দিবস
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ২৬শে মার্চ, বিশ্ব এপিলেপসি বা মৃগী দিবস।মৃগী কি, এটি কেন হয়, এটি হলে মানুষের কি, কি সমস্যা হতে পারে, এর কোন প্রতিকার আছে কিনা,আসুন এই সব কিছুই বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
মৃগী রোগ কোনোভাবেই ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগ নয়।এটি মস্তিষ্কের একটি দীর্ঘস্থায়ী স্নায়বিক ব্যাধি,যা ছোঁয়া, লালা, বাতাস বা রোগীর মেলামেশার মাধ্যমে ছড়ায় না। এটি মাথায় আঘাত, টিউমার, স্ট্রোক বা জেনেটিক কারণে হতে পারে, যা সাধারণত ওষুধের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
এপিলেপসি বা মৃগী একটি স্নায়বিক রোগ,যা মানুষের মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের কারণে ঘটে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি হঠাৎ খিঁচুনি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, বা আচরণগত পরিবর্তনের সম্মুখীন হতে পারেন। সমাজে এখনও এপিলেপসি নিয়ে অনেক ভুল ধারণা ও কুসংস্কার রয়েছে। তাই এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য প্রতি বছর ২৬শে মার্চ Purple Day পালন করা হয়, যা “এপিলেপসি সচেতনতা দিবস” হিসেবে পরিচিত।🍂
এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো,সাধারণ মানুষের মধ্যে এপিলেপসি সম্পর্কে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া, রোগীদের প্রতি সহানুভূতি বাড়ানো এবং কুসংস্কার দূর করা। অনেকেই এখনও মনে করেন যে এপিলেপসি কোনো অভিশাপ বা অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রভাব, যা সম্পূর্ণ ভুল। এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য স্নায়বিক সমস্যা এবং সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
এপিলেপসির লক্ষণ ব্যক্তি
ভেদে ভিন্ন হতে পারে। কারো, কারো সাধারণত খিঁচুনি হওয়া,কেউ আবার হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়া, কিছু সময়ের জন্য স্মৃতি হারিয়ে ফেলা বা অদ্ভুত আচরণ করা এর প্রধান লক্ষণ। খিঁচুনির সময় রোগীর শরীর শক্ত হয়ে যেতে পারে, হাত-পা কাঁপতে পারে এবং অনেক সময় মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে দেখা যায়। তবে সব খিঁচুনি একরকম নয়, কিছু ক্ষেত্রে রোগী শুধুমাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে যেতে পারেন।
এই রোগের কারণ বিভিন্ন হতে পারে। জন্মগত সমস্যা, মাথায় আঘাত, মস্তিষ্কে সংক্রমণ, টিউমার বা স্ট্রোকের কারণে এপিলেপসি হতে পারে। অনেক সময় সঠিক কারণ নির্ধারণ করা যায় না। তবে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় এপিলেপসির জন্য বিভিন্ন কার্যকর ওষুধ এবং থেরাপি রয়েছে,যা রোগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
এপিলেপসি নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো,সামাজিক অবহেলা ও ভয়। অনেক পরিবার এই রোগ লুকিয়ে রাখে, যার ফলে রোগী সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন। স্কুল, কর্মক্ষেত্র বা সমাজে এপিলেপসি রোগীরা অনেক সময় বৈষম্যের শিকার হন। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্যই সচেতনতা দিবস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই দিনে বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে। যেমন,সেমিনার, সচেতনতা র্যালি, স্বাস্থ্য পরীক্ষা শিবির এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচার। মানুষকে এই রোগ সম্পর্কে জানাতে বেগুনি রঙের ব্যবহার করা হয়, যা সহমর্মিতা ও সমর্থনের প্রতীক। অনেকেই এই দিনে বেগুনি পোশাক পরেন বা সামাজিক মাধ্যমে ছবি শেয়ার করে সমর্থন জানান।
এপিলেপসি রোগীর খিঁচুনি শুরু হলে কী করতে হবে, সেটিও জানা জরুরি। প্রথমত, রোগীকে নিরাপদ স্থানে শুইয়ে দিতে হবে এবং আশপাশ থেকে বিপজ্জনক জিনিস সরিয়ে ফেলতে হবে। রোগীর মুখে কোনো কিছু ঢোকানোর চেষ্টা করা উচিত নয় এবং তাকে জোর করে আটকে রাখা উচিত নয়। খিঁচুনি শেষ হলে রোগীকে পাশ ফিরিয়ে শুইয়ে রাখতে হবে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের সাহায্য নিতে হবে। এই সাধারণ জ্ঞান অনেক ক্ষেত্রে রোগীর জীবন রক্ষা করতে পারে।
এপিলেপসি নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো মানে শুধু রোগ সম্পর্কে জানা নয়, বরং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা। আমাদের উচিত রোগীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানো এবং তাদের সমাজের মূল ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা। পরিবার, বন্ধু এবং সমাজের সহযোগিতা একজন এপিলেপসি রোগীর জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
এপিলেপসি সচেতনতা দিবস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়,রোগ নয়, মানুষটিকেই আগে দেখুন। সঠিক জ্ঞান, চিকিৎসা এবং সহানুভূতির মাধ্যমে এপিলেপসি আক্রান্ত মানুষও স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবনযাপন করতে পারে। তাই আসুন,আমরা সবাই মিলে এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াই এবং একটি কুসংস্কারমুক্ত, সহমর্মিতাপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলি।
0 Comments