পুলককান্তি কর
– ডাক্তার বাবু, সত্যি সত্যি কি আমার বাবা হওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই? কাতর গলায় ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বলল সন্দীপন। ডাক্তার বাবু কিছুটা অসহিষ্ণু হয়ে বললেন, ‘আপনাকে তো আগেই বলেছি মিঃ বসু, আপনার টেস্টিসটা একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে। আপনার একটা মাম্পস এর হিস্ট্রি বলেছিলেন, আমি নোট করে রেখেছি।’
– না মানে ঈশ্বরের তো অনেক রকমের অভিপ্রায় থাকে। পঁচিশ বারের মধ্যে কোনও একবার কোনওভাবে ছিটে ফোঁটাও...
হাত তুলে ডাক্তারবাবু থামিয়ে দিলেন সন্দীপনকে। ‘শুনুন মিঃ বসু, ঈশ্বরের অভিপ্রায় তিনিই বলতে পারবেন। আমি কেবল মেডিক্যাল সায়েন্সের কথাই বলতে পারি। আপনার দ্বারা বাবা হওয়া কোনওভাবেই সম্ভব নয়।’
– তাহলে উপায়?
– আমি তো আগেই আপনাকে বলেছি মিঃ বসু। আপনি আপনার সমস্যা বাড়ীতে খুলে বলুন।
– অশান্তি হবে ডাক্তারবাবু।
– আজ যদি আপনি এড়িয়ে যান, কাল হবে। এর চেয়ে চটজলদি কিছু ডিসিশন নিয়ে আপনি এগোতে পারেন। বাই দা বাই আপনার বয়স তো দেখছি বিয়াল্লিশ। মিসেসের বয়স কত?
– সাঁইত্রিশ।
– এমনিতেই লেট। বিয়ে তো দেখেছি লেখা আছে পাঁচ বছর আগে। আপনি বরং স্পার্ম ব্যাঙ্ক থেকে স্পার্ম নিয়ে চেষ্টা করুন।
সন্দীপন মনে মনে বলল, ‘তার আর দরকার নেই।’ হাতজোড় করে বলল, ‘ঠিক আছে। আজ চলি।’
ডাক্তারবাবু বললেন, ‘আপনি যদি স্পার্ম নিয়ে আই. ইউ. আই’র কথা ভাবেন তবে রিসেপশন থেকে ফর্ম নিয়ে যান। ফিল আপ করে জমা করে যাবেন। ফোনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে দেওয়া যাবে অ্যাজ আরলি অ্যাজ পসিবল।’
চেম্বারের বাইরে এসে একটা সিগারেট ধরালো সন্দীপন। কলেজ স্ট্রিট থেকে কিছু বই কেনার ছিল, কিন্তু আজ আর যেতে ইচ্ছে করছে না। শালী, কার সাথে শুয়ে থাকিস হারামজাদী অফিসে গিয়ে? বসের সাথে? নাকি হারামী নেপালটাই কালপ্রিট? আমি কবে বাচ্চার জন্য তোকে খোঁটা দিয়েছি শুয়োরের বাচ্চা? বলেছি তোকে বাঁজা? শালা, ভালোবাসার বিয়ে! পেচ্ছাপ করি ভালোবাসার মুখে। সন্দীপন হঠাৎ খেয়াল করলো, তার মনে মনে এই আন্দোলনের অঙ্গভঙ্গি দেখে পথ চলতি এক ভদ্রমহিলা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চেয়ে আছেন ওর দিকে। ও দ্রুত একটা মিনিবাসকে হাত দেখিয়ে দাঁড় করালো। ছিঃ ছিঃ, নিজের মনে এ ধরনের ভাষা আসছে দেখে নিজেকেই ধিক্কার দিলে সন্দীপন। এতটা বিচলিত হবে না সে। দুদিন আগেই তনিমা যখন হাসি হাসি মুখ করে সুখবরটা দিয়েছিল, তখনই চোখে অন্ধকার দেখছিল সে। ভেবেছিল, বলেই দেয় ‘কী করে হল?’ কার সাথে লটঘট করে এসেছিস ভদ্রঘরের বেশ্যার বাচ্চা? সামনে নিয়েছিল নিজেকে। বিয়ের দু’বছর পরে বাচ্চা হচ্ছে না দেখে যখন ওরা ডাক্তার দেখিয়েছিল, তখনই ডাক্তারবাবু ওর সিমেন অ্যানালাইসিস করে ইউ.এস.জি করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিছু ওষুধপত্র লিখে দিয়েছিলেন যদিও, তবু প্রাথমিক ভাবে তনিমাকে বলে ছিলেন ওর বয়স যেহেতু পঁয়ত্রিশ পেরিয়েছে, বাচ্চার সম্ভাবনা কম। সন্দীপন মনে মনে ওই বয়সের অজুহাতের আড়ালে নিজের সমস্যাটাকে লুকিয়ে এসেছে এতকাল। তনিমাও কখনও বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করেনি। প্রথমটা অদ্ভুত লাগলেও সন্দীপন খেয়াল করেছিল তনিমা আর ডাক্তার দেখানো নিয়েও আবদার করে না। এখন বুঝতে পারছে, আবদার করবেই বা কেন? অন্য জায়গায় যখন স্ট্যান্ড বাই ফিট করাই আছে, তখন আর চিন্তা কি? শালা বেশ্যার জাত। সন্দীপন হেঁটে হেঁটে গিয়ে পৌঁছালো দেশবন্ধু পার্কে। এই বয়সের লোক একা একা এমন জায়গায়, অবাক হল অনেককেই। একটা চেয়ারে গাছের আড়াল করে বসে অন্য মনে সিগারেট খেতে লাগলো। হঠাৎ খেয়াল করল, তনিমার ফোন। ওর জন্য বিশেষ একটা কলার টিউন সেট করে রেখেছিল সে; এখন মনে হচ্ছে জন্মের শত্তুর ওই গানটা। ইচ্ছে হল কেটে দেয়, তারপর কী মনে করে ধরল ‘হ্যালো?’
🍂
– কী গো, কোথায় তুমি? অনেকক্ষণ ট্রাই করছি, আউট অফ কভারেজ এরিয়া বলছে।
– আমি অফিস থেকে বেরোলাম এইমাত্র।
– তোমাকে যে একজন গাইনোকলজিস্টের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে বলেছিলাম, নিয়েছো?
কেন রে শালী, তুই নিজে নিতে পারছিস না? তোর নাগর কে বল না! কোকিলের বাচ্চাকে আমি তা দিতে যাব কোন দুঃখে? ‘না, করা হয়নি।’
– একটু খোঁজ খবর নাও। এখন তো শুনি অনেক রকম টেস্ট ফেস্ট করাতে হয়।
– তোমার কলিগদের জিজ্ঞাসা করো না! আমি এখন কোথায় খবর নেব?
– কেন? তোমার অফিস কলিগরা কি কেউ বাবা হয়নি? মিন্টুদাকেই জিজ্ঞাসা করো না!
– মিন্টু আজ আসে নি।
– আসেনি তো কী হয়েছে? আজকাল তো ফোন বলে একটা জিনিস আছে!
– আচ্ছা রাখো, আমি দেখছি।
– ফোনটা রাখতেই চোখে পড়ল একটু দূরেই ওর বন্ধু রূপেন। সে ওর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। এক নম্বরের আলুবাজ। সঙ্গের মহিলাটি বোধহয় নতুন আমদানী, নইলে এতটা উগ্র সাজগোজ হতো না। রূপেন এসে বলল, ‘কী বে শালা, কারোর জন্য ওয়েট করছিস না কি?’
– সবাই কি তোর মতো রূপেন?
– তা নয় জানি! তবে বাবা বিবাহিত পুরুষ মানুষ এসব পার্কে তো এ সময়ে সান্ধ্যভ্রমণ করতে আসে না! পরকীয়া করতেই আসে। তা তোর সাথে কেউ নেই যখন ধরে নিতে হবে ঘরে ঘোরতর দাম্পত্য কলহ! তাই কি?
– না ।
– তবে এখানে একা একা কী করছো চাঁদু? বউ এর মুখটা এতদিন চাঁদের সাথে তুলনা করাটা কত বড় ভুল ছিল, তার হিসেব করছিস বুঝি?
– তুই যা না। মহিলাটিকে বোর করছিস কেন?
– তোর লাগলে আজ ধার দিতে পারি । চোখটা টিপে হাসলো রূপেন।
– তুই কি মাইরি আজকাল রাস্তা থেকেও মাল তুলিস?
– যাঃ। বড় বাড়ীর বউ রে! বর সময় দেয় না। হিল্লি দিল্লি করে বেড়ায়। ভাগ্যিস বেড়ায়, নইলে এমন চাঁদ আর আমার কপালে জুটবে কী করে বল।
– যা তো তুই রূপেন! আমি দুটো সিগারেট টেনে এক্ষুনি কাট মারবো। তুই চিন্তা করিস না, আমি ওদিকে তাকাবো না।
– শালা তুই ওখানে গিয়ে বোস না। এই জায়গাটা বেশ আড়াল মতো। আমি এখানে বসব।
সন্দীপন কথা না বাড়িয়ে উঠে গেল। সত্যি, সমাজের আজ কী অবস্থা। পরকীয়ায় দেশটা ছেয়ে গেল। আগে ঘরে শাশুড়ী শ্বশুর জা-ননদদের পাহারা ছিল। এখন একলা ঘরে কে কাকে পাহারা দেয়! আচ্ছা, ও অফিস চলে গেলে তনিমা কি কাউকে ঘরে আনতো? অথবা অন্য কারোর ঘরে? অফিসে আর এসব সুবিধা কোথায়? তনিমার তো আর অফিস ট্যুর নেই। তনিমা এমন কেন করলে তুমি? আমি কি তোমায় আদর করতাম না? ভালবাসতাম না তোমাকে? তোমার কি মা হওয়ার এত শখ ছিল? তোমার কি একবারও সন্দেহ হয়নি যে আমি ধরে ফেলতে পারবো তোমার এই পদস্খলন? নাকি সহজে বিশ্বাস করেছিলে আমাকে? ভেবেছিলে আমি আমার রোগ সম্বন্ধে এমন কিছু জানলে গোপন করতে পারবো না তোমার কাছে? আমার লুকোনো নিশ্চই উচিৎ হয়নি, তাই বলে তার বদলে এতটা কি তুল্য মূল্য হল? দ্যাখ কেমন লাগে, আজকেই পর্দা ফাঁস করে দেবো। বাজারে কেমন ন্যাংটো হয়ে ঘুরবে, বুঝবে মজা তখন।
সন্ধ্যার কিছু পরে বাড়ী ফিরে এল সন্দীপন। ওর কাছে এক সেট চাবি থাকে। আজ চাবিটা ঢুকিয়ে বুঝল, দরজা ভেতর থেকে ছিটকিনি দিয়ে লাগানো। কলিং বেল বাজিয়ে মুখটা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করে দাঁড়িয়ে রইল সে। একটু বাদে মোবাইলে কথা বলতে বলতে দরজা খুলল তনিমা। সন্দীপন শুনতে পেল ‘এই তো তোমার ছেলে এসেছে।’ নির্ঘাত মা। এতক্ষণে খবরটা কি মাকে জানানো হয়ে গেছে? ‘নাও, নাও – তোমার মা।
– বলো মা, কেমন আছো?
– এত বড় সুখবরটা দিতে এত দেরী করলি বাবা? আর চার বছর ধরে এই দিনটার কথা ভেবে বেঁচে আছি।
– দেরি কোথায় মা? এই তো পরশুদিন জানা গেল ইউরিন টেস্ট করে। তারপর ডাক্তার দেখিয়ে কনফার্ম করে তবে না তোমায় বলা। আমি তো কাউকে বলতে বারণ করেছিলাম তোমার বউমাকে। ওই বা এত তাড়াতাড়ি ঢাক বাজাতে গেল কেন?
মনে হল মা ক্ষুন্ন হল। মা কি ‘কাউকের’ দলে পড়ে? তনিমা কি নিজের বাঁজা কলঙ্কের দায়মুক্তির আনন্দে এতখানি মাতোয়ারা? দুদিন সবুর ধরতে পারলো না? ফোনটা রেখে গম্ভীর মুখে সন্দীপন বলল, ‘এত হুড়োহুড়ির কী ছিল? আজকেই বলতে হল?’
– তোমাকে তো সাত সতেরো কথা শুনতে হয় না। প্রতিবার ফোন করলে তোমার মা কী বলেন, সেটা শুধু আমিই জানি সন্দীপ। অতএব সব না জেনে কথা বলো না।
এত আস্পর্ধা তোর? পাপ করেও মেজাজ নিয়ে কথা বলছিস হারামজাদী? ইচ্ছে করে পেটে একটা লাথি মেরে বাচ্চাটা খসিয়ে দিই। শালি বেইমান, নরকেও তোর ঠাঁই হবে না মরলে। গলাটা যতটা সম্ভব ঠান্ডা রেখে সন্দীপন বলল, ‘দু একদিন বাদে ফোনটা করলেই পারতে। এতদিন হজম করেছিলে যখন দু-একদিনে কী আসতো যেত?’
– প্রথম কথা আমি ফোন করিনি। উনি ফোন করে প্রথম কথাই জানতে চাইলেন, ‘কী বউমা, আমরা কি আর নাতি নাতনির মুখ দেখবো না?’ তখন আমি কী বলতাম?
– এতদিন যা বলেছ।
– ছাড়ো তো! বেশ করেছি বলেছি। দুদিন আগে আর পরে। অকারণ মাথা গরম করিও না। এবার একটু হেসে সন্দীপনের গা ঘেঁষে এসে দাঁড়ালো তনিমা। বললো ‘জানো তো ‘সোনু’, মুন্নি বলছিল এসময়ে ঝগড়াঝাঁটি করতে না। ঝগড়াঝাঁটি করলে নাকি বাচ্চার উপর এফেক্ট পড়ে। আর এসময় বউ এর সব ইচ্ছা পূর্ণ করতে হয়। বুঝলে চাঁদু – বলেই সন্দীপনের নাকটা টিপে একটু ঝাড়া দিয়ে দিল তনিমা।
তনিমা এতটা নির্লজ্জ, ভাবতেই পারছে না সন্দীপন। এখনও ওর সাথে চোখ মিলিয়ে কথা বলছে। দেবে ভান্ডা ফুটিয়ে?
– কী গো, ডাক্তারের অ্যাপয়েনমেন্টটা করিয়েছো?
– না।
– কেন, মিন্টুদা কে ফোন করতে বললাম, যে!
– মিন্টু বলল ও এম.সি.আর.আই তে দেখিয়েছিল। ওতো সাউথে। এতদূর উজিয়ে যাবে মাসে মাসে? ঠান্ডা গলায় বলল সন্দীপন।
– তুমি পাড়াতেই দ্যাখো না হয়! পাড়াতেই তো দাশগুপ্তদের নার্সিংহোম আছে।
– ঠিক আছে, কালকে কথা বলে নেবো।
হঠাৎ তনিমা এসে সন্দীপনের বুক ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আলতো করে জড়িয়ে ধরল ওকে। ‘কী গো ‘সোনু’, খুশী হয়েছ?’
সন্দীপন কোনও মতে বলল, ‘হুঁ’।
– তবে বলছ না কেন? পরশুদিন শোনার পর থেকে আমাকে একবারও আদর করোনি। বলেই হালকা করে ঠোঁটটা বাড়িয়ে দিল তনিমা। সন্দীপন কোনও রকমে গালটা একটু নীচে নামালো শুধু। ইস। কী ঘেন্না! এই ঠোঁটে অন্য কেউ গাল ঘসেছে ভেবে কেমন একটা দলা পাকিয়ে উঠল গলার কাছে। বলল, ‘ছাড়ো’।
– না ছাড়ব না। আদুরে গলায় জবাব দিল তনিমা। ‘জানো তো ‘সোনু’, আমি তো আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। এতদিনে কার্তিক ঠাকুর দয়া করেছেন।
এত বিরক্তির মধ্যেও হাসি পেল সন্দীপনের। ভাগ্যিস কার্তিক এসে অন্য কারোর শরীরে ভর করেছিলেন। কজনের মধ্যে করেছিলেন কে জানে?
তনিমা বলল, ‘কী গো, কথা বলছ না কেন?’
– ছাড়ো এবার।
– বললাম তো, ছাড়বো না। সন্দীপনের বুকে মুখটা আরোও গুঁজে দিল তনিমা।
তনিমার এই এক দোষ। বড় অবুঝ আর একগুঁয়ে। এখন কড়া কিছু একটা বলে হাটিয়ে দিতে পারতো সন্দীপন। কিন্তু গার্হস্হ্য অশান্তিকে বড় ভয় তার। এসব গাল ফোলাফুলি, কথা বন্ধ ইত্যাদি – ওর মনকে বড় পীড়িত করে। সর্বোপরি অভিমান ভাঙানোর দায়টা এতদিন ওর ঘাড়েই পড়তো প্রতিবার। তাই সে এরকম সম্ভাবনা হলে সতর্ক হয়ে যায়। অবশ্য এখন ওর মন মেজাজকে থোড়াই কেয়ার করবে সে। এখন না হয় একটু পরে তো আসল কথাটা ঝাঁপি থেকে বার করবে সে। একটু শক্ত হাতেই তনিমাকে সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘বাইরে জামাকাপড় এখনও খোলা হয়নি। তোমাকে এখন খুব সাবধানে থাকতে হবে। চট করে ইনফেকশন হয়ে গেলে মুশকিল।’
কথাটা মনে ধরল তনিমার। বলল, তাহলে এই টোটাল পিরিয়ডটা ছুটি নিয়ে নেব বলছ?
তাহলে তোমার নাগরদের কী হবে? তারা তোমার চাঁদ বদন না দেখলে তাদের ভাত হজম হবে? নাকি মনের বালাই নেই কিছু? শুধু দেহে দেহে ধার, ছুঁয়েই পগার পার...। বাথরুমে ঢুকতে ঢুকতে বলল, ‘আমি কী বলব? ডাক্তারবাবুকে জিজ্ঞাসা করে ডিসিশান নিও।’
ডাক্তার দেখিয়ে বাইকটায় স্টার্ট দিল সন্দীপন। পেছনে তনিমা বসে ওর ডান হাতটা দিয়ে সন্দীপনের পেটের উপরে জড়িয়ে রেখেছে। ওর বুক পেট নির্ভর করে ছেড়ে দিয়েছে ওর পিঠে। সন্দীপনের মনে পড়ল ও যখন ছোট ছিল, ওর বাবার স্কুটারের পেছনে এভাবেই বসত সে। ওদের একটা ভেস্পা স্কুটার ছিল। দুদিকে পা দিয়ে বসলে ওর কুঁচকিতে ব্যথা হত বলে একদিকে পা দিয়েই বসত ছোটবেলায়। বাবার সাথেই ওর খুব ভালো বোঝাপড়া ছিল। মা তুলনায় অনেক কড়াধাতের। বাবা অফিস থেকে ফিরলেই ওকে নিয়ে বেরিয়ে যেতেন কাঁসাই নদীর ধারে। আসার সময় দুটো গরম রসগোল্লা খাওয়া ছিল ওর বাঁধা। ক্যান্সার হয়ে যখন মারা গেলেন, তখন বয়স হয়েছিল আটান্ন। মরার আগে একবার শুধু বলেছিলেন, ‘তোর ছেলেমেয়ে নিয়ে আর খেলা হলো না রে দেবু এবারে। কত গল্প জমিয়ে রেখেছিলাম ওদের জন্য।’ বাবা এমন লোক ছিলেন না। নিজের মনের কথা পারতপক্ষে বলতেন না কখনও। হয়তো মৃত্যুর নিশ্চিত ঘন্টা শুনতে পেলে মানুষের মন দুর্বল হয়ে যায়। সন্দীপন তখন জেনে গিছিল বাবার এই সুপ্ত আশা কোনওদিনই পূর্ণ হবার নয়। তবু বলতে পারেনি। ও একমাত্র ছেলে। বাবারও কোনও ভাই বোন ছিল না। ওর পরে বংশ নির্বংশ হয়ে যাবে – এমন সম্ভাবনায় ওর মায়ের হার্টের রোগ ধরা পড়ল। অনেক জোরাজুরি করেও ছেলে বউমার সংসারে বাঁধা তিনি পড়লেন না ঠিক কথা; কিন্তু নাতি নাতনির ব্যাপারে তার দাবি দাওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতেও তিনি ছাড়লেন না। শেষের দিকে তো তাঁকে ফোন করলেও বিড়ম্বনা বোধ করত সন্দীপন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই একই ন্যাগিং – যেন সে বা তনিমা ইচ্ছা করেই সন্তান নিচ্ছে না! সে নিজের অক্ষমতার কথা যদি সাহস করে বলে দিত একবার, তবে হয়তো কোনও সমস্যা হত না। কিন্তু মা এই ধাক্কা ঠিক কীভাবে সামলাতে পারবেন – এই আশঙ্কাও একসময় সন্দীপনের মনোপীড়া কমানোর একটা বড় অজুহাত হয়ে দাঁড়ালো। বেচারা তনিমাকে নিশ্চই তিনি শাশুড়ীর অধিকার ফলিয়ে চিরাচরিত নারী-সুলভ গঞ্জনা অনেক বেশী করে দিতেন। আজ তনিমা বিরক্ত হয়ে যদি নিজের বন্ধ্যাত্বের অপবাদ ঘুচানোর জন্য এমন কিছু করে থাকে তাকে খুব দোষ দেওয়া যায় কী? ওর তো কোনও সমস্যা ছিল না। না হে সন্দীপন, এতটা উদার হওয়া ঠিক না। এটা কোনও বাহানা হতে পারে না। এই অপবাদ ঘোচানোর জন্য অন্য পুরুষের সাথে শুয়ে পড়াটা কোনওভাবে জাস্টিফায়েড করতে যেও না। তাহলে সমাজ, বিশ্বাস কিছুই টিকে থাকবে না। তনিমা বলল, ‘কী গো কোন দিকে চলে যাচ্ছ? বাড়ীর গলি ছেড়ে এলে তো।’
– মেডিসিন শপে যাচ্ছি। ওষুধ গুলো কিনে নিয়ে যেতে হবে না?
– ওঃ। আমি ভাবলাম তোমার পুরনো স্বভাব মাথা চাড়া দিল বুঝি।
– কী স্বভাব?
– ওই যে পথ ভুল করার।
অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সন্দীপন। আশেপাশের আওয়াজে খেয়াল করতে পারল না তনিমা। বলল, ‘ডাক্তারবাবু বললেন তো এলডারলি প্রাইমি। সুতরাং আমাকে খুবই সাবধানে থাকতে হবে। মাসে মাসে ডাক্তারবাবুকে দেখাতে হবে। আমি কি ছুটির অ্যাপ্লিকেশন করে দেব সোনু?’
ঈশ্বরকে প্রার্থনা করলে হয় না – এই বাচ্চাটা যেন গর্ভপাত হয়ে মারা যায়? অন্যের রক্ত নিজের নামে বয়ে বেড়াবে কেন সে? প্রেমিক কুকুর বা হুলো বিড়াল প্রেমিকা কুকুরী বা বিড়ালের ছোট বাচ্চাগুলোকে মেরে ফেলে না? ও তো নিজের হাতে মারতে পারবে না, সেরকম মানুষ সে নয়। দৈববশে এমন ঘটনা ঘটলে তার কী দায়! বলল, ‘এত ছুটি কি পাবে?’
– মাইনে কাটলে কাটবে। এটা বেশী গুরুত্বপূর্ণ।
– তাহলে ছুটির অ্যাপ্লাই করে দাও। প্রাইভেটে হলে ভয় ছিল। সরকারী চাকরী, যাবে না।
হঠাৎ সামনে একটা রিক্সা এসে পড়ায় জোরে ব্রেক চাপল সন্দীপন। তনিমা হঠাৎ ব্রেকের কারণে আরও বেশী ওর ঘাড়ে এসে পড়ল। ‘সরি হঠাৎ করে রিক্সাটা এসে পড়ল। তুমি আর বাইক টাইকে বোসো না, পড়ে গেলে অনর্থ ঘটবে।’
– আমি আর বাইক চড়ে কোথায় বের হই ‘সোনু’! তোমার সাথেই যাই। তুমি যথেষ্ট কেয়ারফুল ড্রাইভ করো। আমার ও চিন্তা নেই।
এজন্যই কি শাস্ত্রে বলেছে স্ত্রী চরিত্র দেবতাদেরও অগম্য? কী সরল বিশ্বাসে কথাগুলো বলছে তনিমা। ও কি একবারও ভাবছে না আমি সন্দেহ করতে পারি? যাকগে যাক, গাড়ী থেকে পড়লে অনেক হ্যাপা। বাথরুমে পা পিছলেও তো পড়ে যেতে পারে। সিনেমা থিয়েটারে তো এরকম আকছার ঘটে। আচ্ছা, বাচ্চাটার কী দোষ? বাচ্চা মরে গেলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? তখন কি তনিমাকে সে আগের মতো আদর করতে পারবে? তখন কি একবারও মনে হবে না এই দেহ অন্য কারোর আবিষ্কৃত? মিছিমিছি মনের পাপ বাড়িয়ে লাভ নেই সন্দীপন। এমন কামনা করো না তুমি। পাঁচ বছর ওর সাথে ট্রায়াল দিয়ে তনিমা নিশ্চই বুঝে গেছিল ওর দ্বারা সন্তান উৎপাদন হবে না। সেজন্যই অন্য ব্যবস্থা করে নিয়েছে সে। কী অপরাধ এতে? এটা তো শাস্ত্র সম্মত। আগে নিয়োগ প্রথা ছিল না? মহাভারতে যুধিষ্ঠিরের বাপ জ্যাঠারা তো নিয়োগ প্রথার দান। বিচিত্রবীর্য মারা যেতে অম্বিকা অম্বালিকার শাশুড়ী স্বয়ং উদ্যোগ নিয়ে মহামুনি বেদব্যাসকে আমন্ত্রণ জানান নি, মেটিং করার জন্য? কুন্তীর ছয় ছয় পুত্রও তো নিয়োগেরই ফসল। পান্ডুর থ্যালাসেমিয়া রোগের জন্য সন্তান দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না। সরকারী মতে পাঁচ পাঁচটা পুরুষের সাথে সঙ্গম করেনি কুন্তী আর মাদ্রি? সন্দীপন এত কেন জাজমেন্টাল হয়ে যাচ্ছে তনিমার ব্যবহারে? ওর অ্যাঙ্গেলে ও নিশ্চিত ভাবেই ঠিক। ও নিশ্চিত জানে এসব কথা তুলতে গেলে পয়েন্টের প্যাঁচে তনিমাই জিতবে। ওর অপরাধ বেশী হলেও সন্দীপন ওর অক্ষমতাটা লুকিয়ে রেখেছিল বলে পয়েন্টে পয়েন্টে পরাজিত হবে। এসব বড় লজ্জার। এসব নিয়ে ঝগড়া করতে রুচিতে বাধে ওর। হে ঈশ্বর, কী দোষ ছিল আমার? মাম্পস তো কতজনের হয়! আমারই মাম্পস অর্কাইটিস হতে হল?
– ভিটামিনের বড়িটা কদ্দিনের স্যার?
– আপাতত একমাসের দিন।
– আর এই প্রজেস্টেরনের পিলটা?
সন্দীপন তনিমার দিকে চেয়ে বলল, ‘হর্মোন কেন?’
তনিমা বলল, ‘আমার বয়সের জন্য। ডাক্তারবাবু বললেন রিস্ক নেওয়ার দরকার নেই।’
– কদিনের নেব তাহলে?
– পরের মাসে তো আবার ডাক্তার দেখানো। আপাতত এক মাসেরই নাও।
২
দেখতে দেখতে ন’মাস কেটে গেল। তনিমা বড় কাহিল হয়ে পড়েছে। এমনিতেই ক্ষীনাঙ্গী ও। এত বড় পেট নিয়ে বড় দিশেহারা হয়ে পড়েছে সে। প্রথম চার মাস যেমন বমি, তেমনি কোমরে ব্যথা। সন্দীপনের মা আর তনিমার মা পালা করে করে এসে থাকেন। কিন্তু সবকিছু তো তাঁদের আয়ত্তেও থাকে না। অগত্যা সন্দীপনকে মাঝে মাঝেই অফিস ডুব দিতে হয়েছে। সহকর্মীরা অভিনন্দন জানাতে এলে তেতো মুখে দাঁতও দেখাতে হয়েছে সবাইকে। ঘটা করে সাধভক্ষণ অনুষ্ঠানে দাড়ি-টাড়ি কামিয়ে ভালো পাজামা-পাঞ্জাবী পরে ফটোস্যুটও করেছে সে। শুধু একটা বাঁচোয়া, তনিমার পাশে এতদিন শুয়ে থাকলেও প্রেগনেন্সির অজুহাতে ওসব কিছু করতে হয়নি তাকে। তখন নিশ্চই ক্ষোভ বেরিয়ে যেত – যা কিছু এতদিনের পোষা। এই তো ডাক্তার ডেট দিয়েছে। আজকেই সিজারিয়ান হবে, এই বাহানায় আরও চার-পাঁচ মাস কাটিয়ে দেওয়া যাবে। তারপর? তনিমার মা বললেন, ‘আমি কি বাড়ী থেকে ন্যাপি ট্যাপি বানিয়ে নিয়ে যাবো?’
– নার্সিংহোমে এসব কিছুই অ্যালাউ করবে না মনে হয়। ঠিক আছে, আগে তো হোক। আপনি রেডি করে টেবিলের উপর রেখে যান, দরকার পড়লে আমি বাইকে করে এসে নিয়ে যাবো। বেশী দূর তো নয়।
– ওর খাবার কি যাবে আজ?
– না, না। সকাল থেকে স্যালাইন চালু হয়ে গেছে। এখন নাথিং পার মাউথ।
– তনুর বাবাকে কি সোজা নার্সিংহোমে চলে যেতে বলব? এখানে তো কেউ থাকবে না!
এগুলো কি খেজুর করা কথাবার্তা নয়? এটা তো কমনসেন্স। মেয়ের অপারেশন হবে, মূর্তিমান বাবা হেলতে দুলতে অফিসে খোঁচা মেরে এখানে টাইম মতো ঢুকবেন। ওর তো নিজের মেয়ের বাচ্চা! আর আমি শালা পরের বাচ্চার জন্য দশ দিন অফিস ছুটি নিয়ে কর্তব্য ফলাচ্ছি। ধিক আমাকে ধিক। নিজের পেছন ভেবে ড্রইং রুমের দেয়ালটায় একটা লাথি মারল সন্দীপন।
ডাক্তারবাবু অতি আধুনিক। সন্দীপনকে ও.টি রুমেই ড্রেস ট্রেস পরে ঢোকার আমন্ত্রণ জানিয়ে বসলেন। রসিকতা করে বললেন, ‘সাক্ষী রাখলাম, পরে বলতে পারবেন না নার্সিংহোমে বাচ্চা বদলে নিয়েছে।’ ওটির টেবিলে তনিমার সম্পূর্ণ নিরাবরণ শরীরটায় একেবারের জন্য চোখ পড়তেই বুকের ভেতর কেমন তোলপাড় করে উঠল সন্দীপনের। সেই প্রথম আবিষ্কারের দিন... পেটটা বেশ বড় হয়েছে। ডাক্তার অবশ্য বলছেন যমজ নয়। শরীরের উপর দু তিন প্রস্থ সবুজ চাদর চাপা পড়ল। ডাক্তারবাবু কী একটা সলিউশন পেইন্ট করার মতো করে বুলিয়ে দিচ্ছেন তনিমার কোমর থেকে নীচে। স্পাইন্যাল হবে। তনিমা চোখের ইশারায় কাছে ডাকলো সন্দীপনকে। ডাক্তারবাবু অভয় দিলেন। তনিমা, ডান হাত দিয়ে শক্ত করে আঁকড়ে রইল সন্দীপনের হাত। এত নির্ভরতা ছিল তোমার? সন্দীপন আস্তে করে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘চিন্তা করো না। এই অপারেশন রোজ শয়ে শয়ে হচ্ছে। কিছু হবে না।’
বাচ্চা দেখে সবাই বলল, মুখটা নাকি অবিকল সন্দীপনের মতো। শালা, কানা নাকি সবাই? ওর মা আবার এক কাঠি উপরে, আদলটা নাকি পুরো সন্দীপনের বাবার মতো; তনিমার মা বললেন, চোখগুলো তনিমার মতো, বড় বড়। ডাক্তারবাবু বললেন, কর্ড ব্লাড কি প্রিজার্ভ করবেন?
– কী হবে ওতে?
– এর ভবিষ্যতে কোনও ভয়ানক রোগ টোগ হলে এটা কাজে আসতে পারে।
– করিয়ে দিন তাহলে।
আয়া বলল, আরো দুটো নাইটি, দুটো প্যান্টিজ আর মাদার্স ব্রা এনে দিয়ে যাবেন। কিছু পুরোনো নরম সুতোর শাড়ী নিয়ে আসবেন বাচ্চার লাগবে। মাদার্স ব্রা’র সম্পর্কে ধারণা ছিল না সন্দীপনের। সাইজ টাইজ নিয়ে তনিমার সাথে কথা বলতেই হল। নাইটিগুলো কোথায় আছে তার জানা। কিন্তু পুরোনো নরম শাড়ী কোথায় পাবে? মা বা শাশুড়ী তো কদিনের জন্য এসেছেন, তাঁদের কাছে কি থাকবে? তনিমার আলমারীতে থাকবে না নিশ্চই, ও আর শাড়ী পরে কোথায়? তাও কী মনে করে আলমারিটা খুলল সন্দীপন। কোণা টোনাগুলো হাতিয়ে দেখতে গিয়ে একটা ফাইল চোখে পড়ল সন্দীপনের। তিতলি আই.ভি.এফ সেন্টার। চক্ষু চড়ক গাছ হওয়ার যোগাড় তার। ওকে না জানিয়েই স্পার্ম ব্যাঙ্ক থেকে স্পার্ম নিয়ে আই.ভি.এফ করিয়েছে সে? সন্দীপনের সইও তো রয়েছে ফর্মগুলোতে? কাকে দিয়ে সই নকল করিয়েছে তনিমা? কেন করেছ সোনা? বুক থেকে যেন মস্ত একটা পাথরের চাঙড় সরে গেল তার। ওর স্পার্ম কাউন্ট এবং ইউ.এস.জির রিপোর্টটা ও কী করে জানলো? সন্দীপন তো রিপোর্টগুলো অফিসের ড্রয়ারে লুকিয়ে রেখেছে। ডাক্তারের চেম্বার থেকে যে ল্যাবের কথা বলে দিয়েছিল, সেখান থেকে কি ডুপ্লিকেট জোগাড় করে নিয়েছিল? নাকি আই.ভি.এফ সেন্টারে নকল কোনও রিপোর্ট জমা করেছে সে? এত গোপনীয়তা কি সন্দীপনকে অস্বস্তির হাত থেকে বাঁচাতে? তাকে নতুন করে লজ্জা না দিতে? আলমারীর ন্যাপথ্যালিনের গন্ধের আড়াল থেকে হঠাৎ করে তনিমার গায়ের গন্ধ নাকে পেলে সন্দীপন। ওর নাইটি গুলো নাকের মধ্যে চেপে খুব করে তনিমার ঘ্রাণ নিতে লাগলো সে।
0 Comments