জ্বলদর্চি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা— ১৯৬

ছোটোবেলা - ১৯৬

চিত্রগ্রাহক - সুশোভন সর

সম্পাদকীয়, 
ছোটোবন্ধুরা, পড়াশুনা মন দিয়ে করছ তো? না কি সুভাষের মতো পড়তে বসে খাতার পাতায় আঁকিবুকি কাটছো? সুভাষ মানে নেতাজী নন, সম্বিতের বন্ধু সুভাষ। আর আগের দিন যে নির্মল স্যারের ক্লাস শুরু করেছেন ধ্রুবজ্যোতি আঙ্কেল সেটা করছ তো? সেটা এ সপ্তাহে মন দিয়ে করে নিও। পরের সপ্তাহে পড়া ধরব কিন্তু। আগের সপ্তাহে ঈদে খুব মজা করেছো জানি। সেটা অর্ঘ্য আঙ্কেল ছড়াতে লিখেছে। আয়ুস্মিতা সরস্বতীর ছবি এঁকে পাঠিয়ে বলেছে তোমরা পড়া শুনা না করলে মা সরস্বতী সব দেখতে পাবেন। তখন কি হবে? কেন ভূতেরা এসে রাতের বেলা ভয় দেখাবে। তোমরা ভূতেদের দেখতে না পেলে ভয় পাবে না জানি তাই সুশোভন আঙ্কেলকে বলেছি ভূতেদের ছবি পাঠাতে। এ মা ভূতেদের দেখে ভয় পেলে না কি! তাহলে এসো রতনতনু জ্যেঠুর লেখা খেলার গল্প পড়ি সব ভয়কে জয় করে নেবে। মলয় জ্যেঠু দারুণ পাঠ প্রতিক্রিয়া পাঠিয়েছেন। এর পরেরবার তোমরা পাঠাও। -- মৌসুমী ঘোষ।
ধারাবাহিক উপন্যাস
গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ
পর্ব ১২

রতনতনু ঘাটী

লোকনের স্কুলে যাওয়ার জন্যে রেডি হওয়ার আগেই পারুলমণি তৈরি হয়ে লোকনকে বলল, ‘কী রে ভাই, তুই এখনও তৈরি হোসনি? অতখানি পথ হেঁটে যেতে হবে তো? আবার দেবোপমস্যার তোকে বলে দিয়েছেন, প্রেয়ারের আগে হেডস্যারের সঙ্গে দেখা যেন আমি দেখা করি।’
   লোকন ঘরের ভিতর তৈরি হতে-হতে বলল, ‘অ্যাই দিদি, দ্যাখ না, তোর চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই আমি রেডি হয়ে নেব।’
   তাড়া লাগাল পারুলমণি, ‘চল, চল! আমি উঠোনে গিয়ে তুলসী তলায় অপেক্ষা করছি!’ 
   চটপট লোকন তৈরি হয়ে উঠোনে নেমে এল। পারুলমণি ভাইয়ের সামনে এগিয়ে এসে মাথায়-গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে-দিতে বলল, ‘এই যাঃ! কাঁধে তোর স্কুল ব্যাগটা নেই তো? ব্যাগটা নিসনি কেন? যা, যা। বাড়ির ভিতর থেকে স্কুল ব্যাগটা এক্ষুনি নিয়ে আয়। উঃ! বড্ড দেরি হয়ে গেল রে!’
   লোকন উঠোনে নেমে এসে দিদির ডান হাতটা ধরে বলল, ‘চল রে দিদি। পা চালিয়ে চল!’
   পারুলমণি কিছুই দেখতে পায় না বটে, এতবার যাওয়া-আসা করতে করতে বিজনডিহি থেকে গগনজ্যোতি স্কুলের রাস্তাটা প্রায় মুখস্তই হয়ে গেছে! তবু লোকন বলল, ‘দিদি, তুই আমার হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চাইছিস কেন? আমাদের তাড়াতাড়ি স্কুলে পৌঁছতে হবে না?’
🍂
   ‘তুই এখন আমাকে একলা ছেড়ে দিয়ে দ্যাখ না ভাই, আমি কেমন গটগট করে একলা স্কুলে পৌঁছে যেতে পারি কিনা!’
   লোকন বলল, ‘সে আমি জানি, তুই অবশ্যাই পারিস, আমি জানি। আমাদের এখন তাড়া আছে তো রে দিদি! চল, আমার হাতটা ধরে পা চালিয়ে চল দিকি!’
   স্কুলে যাওয়ার রাস্তায় দু’-চারজন ছেলেমেয়েও স্কুলে যাচ্ছিল। দেখতে পাচ্ছিল লোকন। ওই তো স্কুলড্রেস পরে তিরুমণি হাঁসদা স্কুলে যাচ্ছে। ও ক্লাস এইটে পড়ে লোকনেরই সি-সেকশনে। ও লোকনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী গো লোকন, আজ দিদিকে নিয়ে স্কুলে যাচ্ছ যে বড়ো? হেডস্যার ডেকেছেন বুঝি?’
   লোকন বলল, ‘হ্যাঁ, হেডস্যার প্রেয়ারের আগে দিদিকে দেখা করতে বলেছেন!’
   ‘কেন রে?’
   ‘সে আমি তোকে বলব কেমন করে? আমি কি জানি?’
   ‘গিয়ে দ্যাখ, তোর কপালে মনে হয় দুঃখই লেখা আছে।’
   ‘না রে, তেমন কিছু নয়। হেডস্যার কী বললেন, তোকে ছুটির পর বলব।’ 
   তিরুমণি বলল, ‘মনে করে বলিস কিন্তু!’
   লোকন আর পারুলমণি তিরুমণিকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলল। আর খানিকটা গেলেই স্কুলের মাঠটা ছুঁয়ে ফেলবে ওরা। ছেলেমেয়েরা যে-যার ক্লাসে গিয়ে ঢুকে পড়ছে। এখন প্রেয়ারের কিছুটা দেরি আছে। পারুলমণি হেডস্যরের রুমটা ঠিক আন্দাজ করে চিনে এগিয়ে গেল। লোকন দিদিকে বলল, ‘দিদি, তুই হেডস্যারের রুমে চলে যা। আমি ক্লাস রুমে ব্যাগটা রেখে আসছি!’
   ‘তুই না এলে আমি হেডস্যারের রুমে যাব না। আগে তুই আয়।’
   ‘আচ্ছা, তুই তা হলে দাঁড়িয়ে থাক স্যারের রুমের সামনে। আমি আসছি!’
   তক্ষুনি স্কুলের করিডোরে মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল দেবোপমস্যারের সঙ্গে। স্যার জিজ্ঞেস করলেন, ‘লোকন, তুমি একা এসেছ? তোমার দিদি আসেনি?’
   লোকন দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দিদিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, ‘ওই তো আমার দিদি দাঁড়িয়ে আছে!’
   দেবোপমস্যার মুখ তুলে দেখলেন। ফুল-ফুল চুড়িদার পরে মেয়েটি হেডস্যারের রুমের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। স্যার নিজের মনেই বললেন, ওই তা হলে লোকনের সেই দিদি? যে চোখে দেখতে পায় না? স্যার বললেন, ‘যাও, দিদিকে নিয়ে হেডস্যারের রুমে নিয়ে গিয়ে বসাও। আমি এক্ষুনি আসছি!’
   লোকন হেডস্যারের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্যার ভিতরে আসতে পারি?’
   ‘কেন? কী দরকার?’
   ‘আপনি আমার দিদিকে নিয়ে আসতে বলেছেন। তাই এখন দিদি এসেছে। ভিতরে আসব স্যার?’
   হোডস্যার বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ। দিদিকে ভিতরে নিয়ে এসো!’ 
   পারুলমণি হেডস্যারের ঘরে ঢুকে স্যারকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। লোকনও দিদির দেখাদেখি হেডস্যারকে প্রণাম করল। 
   হেডস্যার মুখে হাসি ছড়িয়ে  বললেন, ‘লোকন, তোমার একটা ভাল খবর আছে।’
   ‘কী খবর স্যার?’
   ‘তুমি এবার স্কুলের ক্রিকেট টিমে চান্স পেয়েছ।’ তারপর হেডস্যার পারুলমণিকে বললেন, ‘তুমি তো চাইছিলে, তোমার ভাই লোকন স্কুলের ক্রিকেট টিমে চান্স পাক? যেদিন অনুরোধ করেছিলে আমাকে, সেদিন আমি তোমাকে কথা দিতে পারিনি। কেননা, এই ক্রিকেট টিমে নেওয়ার ব্যাপারটা দেখেন দেবোপমস্যার। এবার তোমার ভাই লোকন চান্স পেয়েছে। কাল থেকে প্রতি শনিবার বিকেলে স্কুলের হাফ-ডে ছুটির পর লোকন ক্রিকেট কোচিংয়ে জয়েন করবে।’
   লোকনের মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ার পর তক্ষুনি মিলিয়ে গেল। লোকন বলল, ‘কিন্তু স্যার, আমার তো ক্রিকেট ব্যাট নেই। দেবোপমস্যার টিম ঘোষণার দিন সকলকে বলেই দিয়েছেন, যারা-যারা ক্রিকেট টিমে চান্স পেলে, তারা প্রত্যেকে বাড়িতে বলে একটা করে ক্রিকেট ব্যাট কিনবে। সেই ব্যাট থাকবে স্কুলের স্পোর্টসের স্টোর রুমে।’ বলেই থামল লোকন। তারপর দিদি পারুলমণির মুখের দিতে তাকাল। গলা নিচু করে লোকন হেডস্যারের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কিন্তু স্যার, আমার তো ক্রিকেট ব্যাট নেই। আমার ক্রিকেট না থাকলে আমি কি ক্রিকেট টিমে খেলতে পারব না?’ তারপর পারুলমণির দিকে তাকিয়ে লোকন জিজ্ঞেস করল, ‘দিদি, তুই আমাকে একটা ক্রিকেট ব্যাট কিনে দিতে পারবি?’ লোকনের মুখটা থমথম করে উঠল। চোখে জল ঝেঁপে এল। বাঁ হাতের চেটো দিয়ে লোকন চোখের জল মুছে তাকাল হেডস্যারের দিকে।
   তখনই পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন দেবোপমস্যার। হেডস্যারকে বললেন, ‘স্যার লোকন ক্রিকেট টিমে যখন চান্স পাচ্ছে, ওর জন্যে আমিই না হয় একটা ক্রিকেট ব্যাট কিনে দেব!’
   পারুলমণি উঠে গিয়ে দেবোপমস্যারের সামনে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে বলল, ‘স্যার, আপনি যদি ভাইয়ের জন্যে ক্রিকেট ব্যাট কিনে দেন, আমি প্রতি মাসে-মাসে কিছু-কিছু টাকা দিয়ে আপনার সে ঋণ শোধ করে দেব!’ 
   হেডস্যার গলা তুলে হা-হা করে হাসতে হাসতে বললেন, ‘শোনো পারুলমণি, জীবনে এমন ঋণ থাকে যা কখনও শোধ করা যায় না। বরং বলা ভাল সে ঋণ কখনও শোধ করতে নেই!’
   দেবোপমস্যার বলে উঠলেন, ‘লোকনের ব্যাট কেনার টাকা শোধ করতে হবে না। আমি ওকে এই ক্রিকেট ব্যাটটা উপহার দেব। ও ভূগোলে যেমন ভাল রেজাল্ট করে, ওরকমই ক্রিকেট টিমেও ভাল করুক! আমি আর কিচ্ছু চাই না!’
   লোকন দেবোপমস্যারকে ঢপ করে প্রণাম করল। দেবোপমস্যার বললেন, ‘আহাহা, প্রণাম করতে হবে না। তুমি ভাল ক্রিকেট খেলে ক্রিকেট খেলায় নিজের নাম স্কুলে অম্লান রেখো!’
   দেবোপমস্যার হেডস্যারের রুম থেকে বেরিয়ে গিয়ে স্পোর্টসের রুম থেকে একটা নতুন ব্যাট এনে লোকনের হাতে তুলে দিলেন। লোকন ব্যাটটা জাপটে ধরে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। হেডস্যা বললেন, ‘ব্যাস, মিটে গেল! পারুলমণি তুমি আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরে যাও। মনে-মনে চাইবে, তোমার ভাই যেন ভাল ক্রিকেটার হয়ে ওঠে!’
    মাখা নিচু করে পারুলমণি বলল, ‘সে কথা বলতে হবে না স্যার। ভাই রাতে কত কতদিন ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন দেখে জেগে উঠে কাঁদতে কাঁদতে। আমি বলি কী হয়েছে রে ভাই? কাঁদছিস কেন?’
   তখন লোকন আমাকে চোখে জল নিয়ে বলে, ‘আর মাত্র এক রানের জন্যে আমার সেঞ্চুরিটা হল না রে দিদি! আমি বোল্ট আউট হয়ে গেলাম!’ ও ক্রিকেটটাকে এতখানি ভালবাসে স্যার!’
    দেবোপমস্যার লোকনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমাদের ভারতের টিমের তুখোড় বোলার যশপ্রীত বুমরাহর নাম শুনেছ তো?’ 
   ঘাড় নেড়ে সায় দিল লোকন। দেবোপমস্যার বললেন, ‘খুব ছোটবেলায় বুমরার বাবা গুজরাতের আহমেদাবাদে একটি রামগড়িয়া শিখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা জসবীর সিং রাসায়নিক জিনিষের ব্যবসা করতেন, আর তাঁর মা দলজিৎ বুমরাহ স্কুলশিক্ষিকা ছিলেন। বুমরাহর যখন পাঁচ বছর বয়স, তখন তাঁর বাবা হেপাটাইটিস বি- তে মারা যান। মা বুমরাহকে এবং তাঁর বড় দিদি জুহিকাকে নিয়ে খুব দারিদ্রকে সঙ্গী করে বড় করে তুলেছেন। বুমরাহ আহমেদাবাদের বস্ত্রপুরের নির্মাণ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন।’ 
   লোকনের চোখের পাতা পড়ছিল না। জানতে চাইল, ‘তিনি কখন ক্রিকেটে চান্স পেলেন?’
   দেবোপমস্যারের মুখে আনন্দ খেলা করছিল। স্যার বললেন, ‘দু’ হাজার দশ সালে বুমরাহ গুজরাত ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের অনূর্ধ্ব-উনিশ জেলা নির্বাচন ট্রায়ালে নির্বাচকরা তাঁকে পনেরো জনের মূল দলে নেননি। বরং তাঁকে রিজার্ভ হিসেবে বাইরে রেখেছিলেন। জেলা দল প্রথম তিনটি ম্যাচ জেতার পর, চতুর্থ তিন দিনের ম্যাচে তিনজন রিজার্ভ খেলোয়াড়কেই সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে বুমরাহ ছিলেন একজন। সেই ম্যাচে বুমরাহ সাত উইকেট নিয়েছিলেন।’ 
   বুমরাহর দরিদ্র পরিবারের গল্প শুনে স্যারের সামনে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছিল লোকন দাস। হেডস্যার বললেন, ‘বড় হতে চাইলে, চেষ্টা করলেই বড় হওয়া যায় লোকন। চেষ্টাটা চাই! তুমিও অনেক বড় হবে!’
   তবু কেন যেন লোকনের মনটা ভার হয়ে উঠল। দেবোপমস্যারের দিকে তাকিয়ে লোকন বলল, ‘স্যার, আমাকে যে ক্রিকেট টিমে নিলেন, আমার জন্যে কেউ কি বাদ পড়ল?’
   ‘বাদ তো কাউকে না কাউকে পড়তেই হল লোকন। তবে তোমাকে টিমে নেওয়ার জন্যে দ্বক সাহা কে বাদ দিতে হল।’
   ‘না স্যার। আমার জন্যে দেবক টিম থেকে বাদ পড়ুক, এ আমি চাই না! দেবক তো ভাল ক্রিকেট খেলে? ওকে বাদ দিলেন কেন?’
   ‘তোমাকে টিমে নেওয়ার জন্যে দেবককে বাদ দেওয়া হচ্ছে, তা নয়।’ হেডস্যার বললেন।
   মুখ নিচু করে লোকন জানতে চাইল, ‘তা হলে কেন দেবককে বাদ দেবেন স্যার?’
   হেডস্যার হা-হা করে হাসতে হাসতে বললেন, ‘দেবক যে মেজদি অনুলেখার বিয়েতে মধুপুর যাচ্ছে? পনেরো দিন ছুটিতে যাচ্ছে। এর মধ্যে দেবোপমস্যার সপ্তীহে দু’ দিন করে কোচিং করাবেন ঠিক করেছেন। তা হলে দেবকের এই পনেরো দিনে চারদিন কোচিং কামাই হয়ে যাবে। তাই দেবকের জায়গায় তোমাকে নেওয়া হচ্ছে।’
   ‘দেবক ফিরে এলে, তখন আমি ফের টিম থেকে বাদ পড়ব?’
   লোকনের কথার উত্তরে দেবোপমস্যার বললেন, ‘না। তোমাকে টিমে নেওয়া হচ্ছে যখন, তুমি খুব খারাপ না খেললে টিম থেকে বাদ পড়বে না!’ 
   ছলছল চোখে লোকন বলল, ‘ঠিক বলছেন তো স্যার? আমি কথা দিচ্ছি, মন দিয়ে ক্রিকেট প্র্যাকটিস করব!’
   দেবোপমস্যার বললেন, ‘লোকন, যাও। এখন ক্লাসে যাও। এই সপ্তাহ থেকে বুধবার আর শনিবার ক্রিকেট কোচিং ক্লাস হবে। আজ বুধবার। তুমি আজ থেকে কোচিং ক্লাস অ্যাটেন্ড করো!’ 
   খুব আনন্দিত লোকনের মুখটা হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। হেডস্যারের দিকে তাকিয়ে লোকন বলল, ‘স্যার, আমি ক্লাসে যাচ্ছি?’ তারপর পারুলমণিকে বলল, ‘দিদি, তুই তা হলে তোর স্কুলে চলে যা?’
   ‘পারুলমণি একা অতটা পথ যাবে কেমন করে? তুমি এগিয়ে দিয়ে এসো লোকন!’ হেডস্যার বললেন।
   পারুলমণির মুখে একটা মেঘলা দিনের ছায়া দুলে উঠল। পারুলমণি বলল, ‘না, স্যার, আমি একাই যেতে পারব! একাই পথ হাতড়ে-হাতড়ে এগিয়ে চলাই তো আমার জীবন! এতদিন তাই করে চলেছি! আপনি কিছু চিন্তা করবেন না!’ বলে পারুলমণি এগিয়ে গেল করিডোরের দিকে। 
   হেডস্যার চেয়ার ছেড়ে উঠে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে গেলেন! পিছন পিছন দেবোপমস্যার। দেখতে দেখতে পারুলমণি খেলার মাঠে নেমে শর্টকাট রাস্তা বেছে নিল। সেদিকে পলকহারা চোখে তাকিয়ে থাকলেন হেডস্যার। তারপর অস্ফুটে বলে উঠলেন, ‘মানুষের জীবন বড় মায়ার ঘেরা, বুঝলে দেবোপম!’
   অমন সময় প্রেয়ারের ঘন্টি বাজিয়ে দিলেন ঘন্টিদাদু। সকলে চললেন অ্যাসেম্বলি হলের দিকে।
(এর পর তেরো পর্ব)

সুভাষের ঠিক-বেঠিক
সম্বিত মাহাত
সপ্তম শ্রেণি, পিএমশ্রী জওহর নবোদয় বিদ্যালয়, পশ্চিম মেদিনীপুর

সুভাষ বলে আজ থেকে আমি একদম ঠিক,
ভোরে উঠে পড়বে বই এই তার ট্রিক।
কিন্তু খুলতে বই দেখে ক্রিকেটের কথা,
ব্যাট, বল নাচল মাথায়, উধাও সব ব্যথা।

স্কুলে স্যার বললেন, পড়া কটা হল?
সুভাষ মনে মনে হেসে মাথা চুলকায়।
খাতায় সে তো এঁকেছে ছবি, বল, ব্যাট আর স্ট্যাম্প,
স্যার বলেন, এটা অঙ্ক? সুভাষ ভাবে, মনের জাম্প!

কিন্তু সত্যি কথাটা সবাই জানে ভালো,
সুভাষ চাইলে পারে সব, হয়ে ওঠে আলো।
একটু মজা, একটু হাসি, পড়াও তার সাথী,
এই নিয়ে সুভাষ-আমাদের সহপাঠী।

নির্মল স্যারের ক্লাস (৩)
বাইরের আলো, ভিতরের আলো

ধ্রুবজ্যোতি দে

(শেষ পর্ব)
গরমের ছুটি পড়ার আগের দিন টীচার্স রুমে অবসরপ্রাপ্ত মাধববাবুকে নিয়ে স্কুলে একটা ঘরোয়া অনুষ্ঠান হয়েছিল। সকলেই 
বলছিলেন কীভাবে মাধববাবু কখনও অভাবী ছাত্রছাত্রীর পরীক্ষা ফী মিটিয়ে, খাতা বই কিনে দিয়ে, কখনও পিছিয়ে পড়া ছেলেমেয়েদের আলাদা পড়িয়ে সাহায্য করেছেন। উত্তরে মাধববাবু বলেছিলেন, “জানো তো একসময় মাস্টারিতে একটা কথা চালু ছিল যে দশ বছর পড়ালে মানুষ গাধা হয়। যখন প্রথম স্কুলে যোগ দিই এই কথা একজন প্রবীণ শিক্ষক আমাকে বলেছিলেন। কেননা প্রতি বছর একই পাঠ্যসূচী পড়াতে পড়াতে কেমন একঘেয়ে হয়ে যায়। এখন আমার মনে হয় কথাটা ঠিক নয়। প্রতি ক্লাসের প্রত্যেক পড়ুয়া নিজেই যেন এক একটি পাঠ্যবই। আমরা যদি তাদের ঠিকমতো পড়তে পারি তবে যেজন্য আমাদের এখানে আসা, শিক্ষার আলো দেওয়া, তা সার্থক হয়”।  
  আজ টিফিনের সময় টীচার্স রুমে সেই কথা উঠল, যখন জয়িতার চোখের সমস্যার কথা নির্মলবাবু জানালেন। ডাক্তারবাবু ওকে চশমা দিতে বলেছেন, যদিও এখনও তা করতে দেওয়া হয়নি। ক্লাস টীচার রমাদি বললেন, “জয়িতার চোখের সমস্যা আমার আগেই ধরতে পারা উচিৎ ছিল। কিন্তু সংসারের চিন্তা মাথায় নিয়ে সবদিক খেয়াল রাখতে পারি না। তবে সহজে জয়িতার চশমা হবে মনে হয় না”। নির্মলবাবু বলেন, “খরচের জন্য অসুবিধা হলে আমি কিছু দেব”। রমাদি বললেন, “সেটা আসল কারণ নয়। আমি তো জয়িতার পাড়ায় থাকি, আমি জানি।”  
  তবু রমাদি রবিবার জয়িতার বাড়ি খোঁজ নিতে গেলেন। জয়িতার মা আপ্যায়ন করে চা দিলেন। তবে চশমার ব্যাপারে বললেন, “দেখুন দিদি মেয়ে বড় হচ্ছে। এখন শরীর খারাপ হয়। এই বছরই ওকে স্কুল ছাড়িয়ে দেওয়ার কথা হয়েছিল। আপনাদের নতুন বাথরুম হওয়ায় রেখে দেওয়া হয়েছে। তবে দশ ক্লাস পেরোলে তো বিয়ে দিতে হবে। আমার ওর বয়সেই বিয়ে হয়েছিল। আমাদের মতো ঘরে চশমাওলা মেয়ের পাত্র পাওয়া মুস্কিল।” রমাদি জয়িতার প্রেসক্রিপশন চেয়ে দেখলেন মাইনাস সাড়ে ছয় পাওয়ার, মানে দূরদৃষ্টি বেশ দুর্বল। রমাদির মনে পড়ল তাঁরও ক্লাস সেভেনে প্রথম চশমা হয়েছিল। 
  রমাদি বললেন, “আপনাকে দুটো কথা বলব। এক, আঠারো বছরের আগে একটা মেয়ের বিয়ে দেওয়া আইনত অপরাধ। আর যে মেয়ে লেখাপড়ায় ভাল সে তো অনেক দূর এগোবে। তাকে বাধা দেবেন কেন? দুই, ওর এখনই চশমা না হলে ক্রমশ ঝাপসা দেখতে দেখতে একসময় অন্ধ হয়ে যেতে পারে। তখন কী হবে?” জয়িতার মা বললেন, “ওর ঠাকুমা টোটকা করতে বলছে। চুনো মাছ খাওয়ানো, ঝিনুক গুগলি ছাড়িয়ে চোখে তার জল দেওয়া, এইসব কিছুদিন করে দেখা যাক ভাল হয় কিনা। একটা ধন্বন্তরি মাদুলিও করে দেওয়া হয়েছে”। রমাদির মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো, “সর্বনাশ ! ঝিনুক গুগলি মুখে খাওয়ান ঠিক আছে, প্রোটিন পাবে, তাই বলে সরাসরি চোখে ! যদি সংক্রমণ হয়ে যায় ! চশমায় কি সমস্যা? ওটাই তো একমাত্র সমাধান, মাদুলি নয়।” এই বলে রমাদি নির্মলবাবুর ও তাঁর প্রস্তাব শুনিয়ে চশমা করানোর পরামর্শ দিয়ে বেরিয়ে আসেন।               
  সোমবার নির্মলবাবু ক্লাসে ছড়িয়ে পড়া অপসারী আলো, কেন্দ্রীভূত অভিসারী আলো ও সমান্তরাল আলোকগুচ্ছ পড়ালেন। তারপর ব্যাগ থেকে টর্চ বার করে দেয়ালে আলো ফেলে সামনে একটা কয়েন ধরে আগুপিছু করে গাঢ় প্রচ্ছায়া ও হাল্কা উপচ্ছায়া দেখালেন। এবার টর্চের আলোকে বিস্তৃত উৎস ধরে বই দেখে খাতায় প্রচ্ছায়া উপচ্ছায়া তৈরির নকশা আঁকতে দিলেন। জয়িতার চশমা নেই বলে ওকে বোর্ডে আঁকতে বললেন। সে মহানন্দে নকশা আঁকল। সেই ছবি দেখিয়ে নির্মলবাবু পড়া বোঝালেন। বললেন পরের দিন ‘দুই নম্বর হাতে-কলমের কাজ’ সূচীছিদ্র ক্যামেরা তৈরির জন্য যে যে পারবে যেন একটা করে পিজবোর্ডের বাক্স নিয়ে আসে। জয়িতা তার ঘরের দেওয়ালে উল্টো ছায়া কেন হয় জানতে পারবে বলে উৎসাহী হয়ে বাক্স আনবে বলল। নির্মলবাবু তাকে চশমার কথা জিজ্ঞাসা করলেন। সে জানাল তার চশমা করতে দেওয়া হয়নি।  
  পরের দিন জয়িতা ক্লাসে আসেনি। অরুণা নির্মল স্যারকে জানাল জয়িতার ঠাকুমা হঠাৎ অসুস্থ হয়েছেন, তাই বোধ হয় সে আসেনি। কিন্তু অনিল বলল সাইকেলে স্কুল আসার সময় সে জয়িতাকে পিঠে ব্যাগ আর হাতে একটা জুতোর বাক্স নিয়ে বাসস্টপে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। অনিল জয়িতাকে সাইকেলের কেরিয়ারে উঠতে বলায় সে বলেছিল, “তুই ফেলে দিবি। আমি বাসে যাব”। তবে কি সে বাবার দোকানে গেল ঠাকুমার খবর দিতে? কিন্তু তাহলে তো বাবা কি দাদা বাড়ি ফেরার সময় তাকে স্কুলে দিয়ে যেত। অন্যদিন সাধারণত সুব্রত সাইকেলে তাকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে দোকান যায়। তবে এক একদিন তার কাজ থাকলে মা জয়িতাকে বাসে তুলে দেন। বাসে মিনিট দশ সময় লাগে। সে স্কুল এলে নেমে পড়ে। তবে আজ কী হল?  
  দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন নির্মল স্যার। নিজের সাইকেলটা দারোয়ান মিশ্রজিকে দিয়ে নবীনবাবুর দোকানে পাঠালেন। কিছু পরে মিশ্রজি ফিরে এসে জানালেন জয়িতা দোকানে যায়নি। ওর দাদা বাড়ি গেছে খোঁজ নিতে। অরুণা কাঁদতে শুরু করল। ছেলেমেয়েরা হতবাক। এটা ছিল টিফিনের আগের পিরিয়ড। নির্মল স্যার টিফিনের ছুটি দিয়ে দিলেন। অনিলকে বললেন অরুণাকে বাড়ি দিয়ে আসতে। তারপর নবীনবাবুর দোকানে যাবেন বলে বেরোবেন, এমন সময় সুব্রতর সঙ্গে জয়িতার মা কাঁদতে কাঁদতে স্কুলে এসে রমাদির খোঁজ করলেন। তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না জয়িতা স্কুলে আসেনি। স্কুলের কাজের জন্য সে নিজের প্রাণের চেয়ে প্রিয় পুতুলের বাক্সটা খালি করে নিয়ে বেরিয়েছে। তবে কি সে স্কুলে এসে আবার বেরিয়ে গেছে? যে মেয়ে বাইরের লোকের সামনে মুখ তুলে কথা বলে না সে কোথায় যাবে ! নির্মলবাবু তাঁকে ভরসা দিয়ে বাড়ি পাঠালেন। কিন্তু রমাদিকে বললেন নবীনবাবুকে নিয়ে থানায় যেতে হবে। খোঁজার জন্য প্রথম কয়েক ঘন্টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 
  এদিকে জয়িতা যে বাসে উঠেছিল তার নম্বর ভুল ছিল। ঠাকুমা অসুস্থ হওয়ায় মাকে সে ছেড়ে দিয়েছিল। বলেছিল সে একাই যেতে পারবে। বাসের নম্বর সে আন্দাজে দেখেছিল। টোটকা আর মাদুলিতে তার পরিবারের অগাধ বিশ্বাস থেকে সে নিশ্চিত ছিল তার চোখ ভাল হয়ে এসেছে, সে নম্বর ঠিক দেখছে। তার স্বাভাবিক জড়তায় সে আর কন্ডাক্টারকে কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। বাস অনেকটা পথ যাওয়ার পর স্কুল এল না বরং বাসে যাত্রী কমে এল। যখন একটা শুনশান রাস্তায় ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে বাস যেতে শুরু করল জয়িতা ভয় পেয়ে গেল। কন্ডাক্টারকে বলাতে তিনি ওকে একটা তিন মাথার মোড়ে নামিয়ে উল্টো দিকের বাস ধরতে বলে দিলেন। জয়িতা উল্টোদিকে একটা গাছতলায় খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর কোনও বাস না পেয়ে সে ভর দুপুরে বাক্সটা মাথায় ধরে রোদ আড়াল করে একদিকে হাঁটতে থাকল।   
  একটা পরিত্যক্ত বাজারের পাশ দিয়ে যেতে যেতে জয়িতা দেখল রাস্তা ক্রমে সরু হয়ে আসছে। সেটা নদীর দিকে শ্মশানে যাওয়ার রাস্তা ছিল। দূরে হালকা ধোঁয়া দেখা যাচ্ছিল। একটা ক্ষীণ কান্নার স্বর ভেসে আসছিল। জয়িতার কেমন অস্বস্তি হল। মনে হল এটা ভুল রাস্তা। সে আবার মোড়ের দিকে ফিরতে থাকল। বাজারটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখল কয়েকটা কুকুর একটা হাড় ধরে টানাটানি করছে। জয়িতার ঐরকম বাক্স মাথায় ধরে হাঁটা তাদের অদ্ভুত লাগল। তারা ওর পিছু নিল। জয়িতা দৌড়ল না। সে জানত দৌড়লে কুকুররা তেড়ে আসে। সে বাসস্টপে এসে একটা ধাপিতে উঠে দাঁড়াল। কুকুররা ধাপিটা ঘিরে বসে গেল। কয়েকটি ডাকতে লাগল। জয়িতা ভাবল হয়ত বাক্সটা দেখে ওরা এমন করছে। সে বাক্সটা রাস্তার দিকে ছুঁড়ে দিল। ওরা ছুটে গিয়ে বাক্সটা ধরে ছিঁড়তে লাগল। জয়িতার কষ্ট হল, ভয়ও করছিল। সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। 
  এমন সময় কেউ একজন সামনের রাস্তা দিয়ে সাইকেলে যাওয়ার সময় একটা মেয়ের কান্নার শব্দ শুনে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তিনি সাইকেলে একটা বড় ক্যাম্বিস ব্যাগ ঝুলিয়ে এক হাতে ছাতা খুলে যাচ্ছিলেন। জয়িতাও তাঁকে দেখেছিল। ছাতা খোলা থাকায় তাঁর মুখে ছাওয়া ছিল। জয়িতা তাঁকে ডাকতে গিয়ে থমকে গেল। কোনও অজানা মানুষের সঙ্গে সে কিছুতেই যাবে না। কিন্তু তিনি সাইকেল স্ট্যান্ড করিয়ে কুকুরগুলোকে তাড়িয়ে জয়িতার কাছে এলেন। এবার জয়িতা চিনতে পারল। ময়রা সুবল কাকা, যিনি বাড়িতে গজা লাড্ডু বানিয়ে অফিস মোড়ের দোকানগুলোতে বিক্রির জন্য দেন, তার বাবাও রাখেন। আজও সেই জন্যই সুবলকাকা যাচ্ছিলেন। তিনিও জয়িতাকে চিনতে পেরে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী হয়েছে?” তারপর আদ্যোপান্ত শুনে জয়িতাকে সাইকেলের কেরিয়ারে বসিয়ে তার হাতে ছাতাটা দিয়ে নবীনবাবুর দোকানের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিলেন।
  তিন দিন পর স্কুলে নির্মল স্যারের ক্লাস। স্যার তাঁর ব্যাগ থেকে কয়েকটা ট্রেসিং পেপার আর একটা কাগজ কাটা ছুরি বার করে টেবিলে রাখলেন। আজ সেই হাতে-কলমে সূচীছিদ্র ক্যামেরা তৈরি হবে। জয়িতা প্রথম নতুন চশমা পড়ে এসেছে। তাকে দেখে স্কুলে সবার চোখে স্বস্তি ফুটে উঠেছে। নির্মল স্যার জিজ্ঞাসা করলেন, “কী রে, কেমন দেখছিস?” জয়িতা হাসি মুখে উত্তর দিল, “জীবনে কখনও এত ভাল দেখিনি স্যার। এখন লাস্ট বেঞ্চ থেকেও বোর্ডের লেখা পড়তে পারি।” তারপর একটা জুতোর বাক্স দেখিয়ে বলল, “অরুণা দিয়েছে। আমরা দু’জনে মিলে ক্যামেরা তৈরি করব”। নির্মল স্যার হেসে বললেন, “কিন্তু তোর প্রিয় পুতুলের বাক্সটা তো গেল”। এবার জয়িতা একটা প্লাস্টিকের ওষুধের বাক্স দেখাল, রমাদি তাকে দিয়েছেন। স্যার জানতে চাইলেন, “মাদুলিটা পড়ছিস?” জয়িতা বলল, “না, আমি সেদিনই খুলে ফেলেছি, রাগে। বাবা বলল, বেশ করেছিস। অযথা দু’শো টাকা নষ্ট হল। যত রাজ্যের অন্ধবিশ্বাস। শুনে মা, ঠাকুমাও চুপ করে গিয়েছিল।” নির্মল স্যার বললেন, “ঠিক, শুধু বাইরের আলোকে জানলেই হবে না, ভিতরের অন্ধকারটাও সরাতে হবে।” তারপর সবাই সূচীছিদ্র ক্যামেরা তৈরি শুরু করল। 
(শেষ)
আয়ুস্মিতা সামন্ত
 দ্বিতীয় শ্রেণী, সরস্বতী শিশু মন্দির, মেদিনীপুর


ইদের চাঁদ   
অর্ঘ্য দে

এক ফালি চাঁদ মারছে উঁকি
মেঘের আড়াল যাচ্ছে সরে
অন্ধ রাতের নেই তো ঝুঁকি
আলোয় ভুবন যাচ্ছে ভরে।

আমরা ক'জন মিলেমিশে
চাঁদের আলো মাখছি গায়ে
খুশির প্লাবন সকল দিশে
নেই তো বিভেদ ডাইনে বাঁয়ে। 

ইচ্ছেমতির এ কূল ও কূল
যায় ছাপিয়ে চাঁদনি লহর
সুবাস ছড়ায় রাতের মুকুল
আজকে খুশির ইদের প্রহর।

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১৯৫ এর পাঠ প্রতিক্রিয়া -
মলয় সরকার

একটা বইয়ের কিংবা পত্রিকার প্রচ্ছদের যে একটা আলাদা মূল্য থাকে, অর্থ থাকে তা আমার বরাবরই মনে হয়েছে এই জ্বলদর্চি ছোটবেলা সংখ্যার প্রচ্ছদ দেখে।
এই সংখ্যাতেও দেখছি ঋপণ আর্যের ছবি সেই কথাই বলছে। ছেলেমেয়েরা স্কুলের ইউনিফর্ম পরে ভদ্রভাবে বসে আছে ঠিকই। কিন্তু তাদের ভিতরের মনের কথাটা সবার হয়ে জানিয়ে দিয়েছে ছেলে দুটি। তারা ঘুড়িকে সবার মাথার উপর তুলে বলতে চেয়েছে, যে তারা আর স্কুলের নিয়ম বাঁধনের মধ্যে থাকতে চায় না, তারা বলতে চায়, “মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম, মোরা ঝর্নার মত চঞ্চল। মোরা বিধাতার মত নির্ভয়, মোরা প্রকৃতির মত সচ্ছল॥ আকাশের মত বাধাহীন, মোরা মরু-সঞ্চর বেদুঈন,”। সত্য আর সুন্দর তো কারো বাধায় কিংবা বাঁধায় বদ্ধ নয়। আর তা এই শিশুদের ক্ষেত্রেই সঠিক ভাবে প্রযোজ্য। 
এর পর আসি ভিতরে। 
বিনোদ মণ্ডলের ‘খিল্লি’ তে সত্রাদিত্য তার নামের পিছনে অত্যাধিক বাড়াবাড়ি তে হয়ত লজ্জা পাচ্ছে, তারই ছবি তুলে ধরেছেন। তবে শেষে,  বছর দশেক বাদে এটাকে সত্যি করে তোলার মত মনের জোর সংগ্রহ করেছে, এটাই বড় কথা।
নির্মলস্যরের ক্লাশে লেখক ধ্রুবজ্যোতির কাছে অনুরোধ রাখি, আলোর এই বিচিত্র খেলা,  যা শিশুমনকে জিজ্ঞাসু বা চঞ্চল করে তোলে তার যখন অবতারণাই করলেন, এগুলোকে ধীরে ধীরে আরও বেশি পর্ব নিয়ে আলোচনা করে বুঝিয়ে দিলে পারতেন। এভাবে এর পর অন্য বিষয়, যেমন তড়িত,  চুম্বক ইত্যাদি চলতেই পারত।
 এভাবেই তো শিক্ষক জগদানন্দ রায়, কিংবা চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য,  কিংবা যাঁর নাম করেছেন সেই গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য বিজ্ঞান শেখাতেন। 
এত তাড়াতাড়ি পর্ব শেষ না করে,  প্রত্যেকটি প্রক্রিয়া বুঝিয়ে দিন না ছোটদের। ভালই হবে মনে হয়।
আর রতনতনু ঘাটী স্কুলে স্পোর্টস রুম করার কথা বললেন। ভাবছিলাম৷ আজ বাংলার প্রত্যেক স্কুলে,  যেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, সেগুলো যদি না হত, এরকম খেলার চর্চা সত্যিই হত, আমরা কি আরও অনেক  চুণী গোস্বামী, পি কে ব্যানার্জি,  প্রদীপ চৌধুরী (ইনি আমার সহপাঠী)দের পেতাম না! 
এতে মনের কোণে দুঃখটা পাকিয়ে উঠল।
চলুক ধারাবাহিক। 
তবে শ্রেয়া দত্তের লেখাটি দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রী হিসাবে আরও ভাল হওয়া উচিত ছিল।আর একটা কথা শ্রেয়াকে বলি,  লেখায় বাংলা ইংরাজী না মেশালে কি হত না? পুরো বাংলায় লিখে দেখ না, খারাপ হবে না।
আশা রাখব,,আগামী দিনে আরও ভাল লেখা পাওয়া যাবে শ্রেয়ার কাছে।
জয়দীপ সাহার ছবি একেবারে মন ভাল করা স্কেচ একটি।  খুব সুন্দর এঁকেছে। আমরা চাই আরও ছোট্ট বন্ধুরা এখানে তাদের আঁকা পাঠাক, আমরা দেখে আনন্দ পাই।
সব শেষে বলি, মৌসুমীর এই জ্বলদর্চি আরও বেশি করে ছোট্ট লিখিয়ে আঁকিয়েতে ভরে উঠুক। আগামী দিনের ভবিষ্যত শিল্পী আর লেখক কবিদের ছোঁয়ায় ঊজ্বল হয়ে উঠুক পত্রিকা। তবেই এই প্রচেষ্টা সার্থক হবে। সার্থক হবে সম্পাদিকা মৌসুমীর এই পরিশ্রম।

সংগ্রহ করতে পারেন। হোয়াটসঅ্যাপ -৯৭৩২৫৩৪৪৮৪

Post a Comment

0 Comments