'মেঘেদের বর্ণপরিচয়' নিয়ে লিখলেন সোমদত্তা
"বিশ্বজোড়া ফাঁদ পেতেছো কেমনে দিই ফাঁকি,
আধেক ধরা পড়েছি গো আধেক আছে বাকি "
কবি দিলীপ মহান্তীর "মেঘেদের বর্ণপরিচয় " কাব্যগ্রন্থটি পড়তে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই পংক্তিটি ভীষণ ভাবে মনে পড়লো। মনে হল কবিও ধরা পড়ার ছন্দে বাঁধা পড়েছেন।
দিলীপ মহান্তীর "মেঘেদের বর্ণপরিচয় " প্রকাশিত হয়েছে জানুয়ারি, ২০২৫- এ।
কাব্যগ্রন্থটি সমকালীন বাংলা সাহিত্যের এক নিবিড় নন্দনতাত্ত্বিক ও বৌদ্ধিক দলিল।কাব্যসংকলনটি কেবল অক্ষর বিন্যাস, ছন্দ নয়, প্রকৃতি, শহরায়ন, রাজনীতি এবং আমাদের অস্তিত্বের সঙ্কটের এক উপাখ্যান।
বইটির নামকরণে কবি এক গূঢ় তত্ত্বের অবতারণা করেছেন। 'বর্ণপরিচয়' সাধারণত প্রথাগত শিক্ষার আদিপাঠ বা বলা যায় শৃঙ্খলাবদ্ধ শিক্ষার শুরু। কিন্তু কবি এখানে তাকে যুক্ত করেছেন মেঘেদের সাথে, যা মূলত অস্থিতিশীলতা,ক্ষণস্থায়িত্ব এবং প্রতিনিয়ত রঙ বদলের রূপকল্প।কবির মন যেন মেঘের মত ভাসমান ও এক অস্পষ্ট অনুভূতির ব্যাকরণ পাঠ করতে চেয়েছেন। মিলিয়ে যেতে চেয়েছেন মেঘের রাজ্যে। কবির ভাষায়,
"মেঘেরা অক্ষর লেখে দিন রাত জেগে।"
এখানে মেঘ কেবল বিজ্ঞান তত্ত্ব মেনে জলীয় বাষ্প নয়, বরং সময়ের অববাহিকায় জমে থাকা স্মৃতির এক চলমান লিপি।
🍂
গ্রন্থটিতে রাঙামাটির ধুলো, জঙ্গল এবং আদিবাসী জনপদের এক গভীর প্রভাব অনুভব করা যায়।"বুরুডির কাছে " কবিতায় কবি বিভূতিভূষণের " আরণ্যক "চেতনার উত্তরসূরির ভূমিকা নিয়েছেন। তিনি লিখেছেন,
" ফুলডুংরি পাহাড় ছেড়ে এগিয়েছি পাথরে জঙ্গলে
তারার মত ফুটে উঠেছে এক একটি আদিবাসী গ্রাম"। এখানে প্রকৃতির আদিম রূপের পাশাপাশি প্রান্তিক মানুষের অভাবী জীবনের এক রুক্ষ বাস্তবচিত্র চিত্রিত হয়েছে। কবির দৃষ্টিতে জঙ্গল শুধু ভ্রমণ পিপাসু মনের রসদ জোগায় না, তা বিপ্লব ও বেঁচে থাকার সংগ্রামের এক বিশ্বস্ত ক্ষেত্র। মহাশ্বেতা দেবীর " অরণ্যের অধিকার " এর সুরে মিশে গেছেন কবি।
কবির কবিতায় প্রচ্ছন্নভাবে রাষ্ট্র ও ক্ষমতার প্রতি এক তীক্ষ্ণ বৌদ্ধিক অবজ্ঞা ও কটাক্ষ রয়েছে। "শাসন" কবিতায় তিনি রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বগ্রাসী রূপকে তুলে ধরেছেন।
"সবার চোখের আলো চুরি করে,
আরো পোক্ত হোক ক্ষমতার রথ "।
" ভগবান কত ভালো , অপরের চোখ অন্ধ করে আমাকে দিলেন আলো "
কবীর সুমনের কথার অনুরণন কবির কথামালায়। আবার "বেহুলা " কবিতায় পৌরাণিক প্রেক্ষাপটকে আধুনিক প্রশাসনিক দুর্নীতির বিরূদ্ধে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে তিনি বলেন,
"বেহুলার পথে দলের দালাল বাধা দেয় প্রতি পায়ে
বেহুলার ভেলা এগিয়ে চলেছে প্রশাসন কাঁপে ভয়ে। "
কবিতা কখনো সমকালের বাইরে নয়, এটি কবির সমকাল সচেতনতা ও নির্ভীক কাব্যিক উচ্চারণের পরিচয় দেয়।
গ্রন্থটিতে বারবার ফিরে এসেছে "দহন " এবং "বিস্তৃতির কথা "।" রাত্রির মেঘ" কবিতায় অতিমারির পরবর্তী পৃথিবীর এক রুগ্ন ও বিষণ্ণ রূপ ধরা পড়ে,
"পঁচিশটি বসন্ত এসে মর্গে চলে গেছে
পৃথিবীর বুকে করোনার দিন রাত। "
জীবনের জয়ের চেয়েও এখানে মৃত্যুর নীরবতা ও শ্মশানের হাহাকার বেশি সোচ্চার। কবির কলমে উঠে আসে,
"যত আলো, লোক তত কম
পৃথিবীর ঘাস পুড়ে যায় "
কবির শব্দচয়ন অক্ষর বিন্যাস অত্যন্ত ঋদ্ধ। তিনি "বিশল্যকরণী ", " মরীচিকার গান " "মেঘ পদাবলী " বা "মেঘেদের স্বরলিপি " র মত কাব্যিক শব্দবন্ধ ব্যবহারের মাধ্যমে এক ধরনের লিরিক্যাল ইন্টালেকচুয়ালিজম তৈরি করেছেন। তাঁর কবিতায় সমুদ্রের ঢেউ শরীর স্পর্শ করে আর রাতের নূপুর বেজে ওঠে আবর্তিত গ্রহের কক্ষপথ জুড়ে।
"মেঘেদের বর্ণপরিচয় " কাব্যগ্রন্থটি পাঠককে এক ধোঁয়াশার মধ্যে দিয়ে চালিত করে, যেখানে প্রতিটি বাঁকে লুকিয়ে আছে এক একটি ধ্রুব সত্য। কবি দিলীপ মহান্তী এখানে শুধু একজন কবি নন, বরং তিনি সময়ের একজন নির্মোহ ভাষ্যকার, যিনি প্রকৃতি আর মানুষের সম্পর্কের এক নতুন ব্যাকরণ রচনা করেছেন, যা আদি, যা সত্য,যা সুন্দর। এটি বাংলা কাব্যজগতে এক অনন্য সংযোজন যা বিদগ্ধ পাঠকদের চিন্তার খোরাক জোগাবে।।
0 Comments