ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখি
৪০ পর্ব
চিত্রা ভট্টাচার্য্য
(নজরুলের প্রমীলার পরবর্তী অংশ )
বিবাহিত কিশোরী প্রমীলা নতুন স্বপ্ন মাখা চোখে সংসার যাপনে প্রথম পা ফেলেই পড়লেন বিশাল সংকটে । তাঁর তরুণ স্বামী নজরুল ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে সকলের প্রিয় এবং '' বিখ্যাত হলে কী হবে—' ইসলাম পদবী '! তিনি যে মুসলমান ! হিন্দু কমিউনিটি তে কলকাতায় বাড়ি ভাড়া পাওয়া অসম্ভব। বিবাহ সংক্ৰান্ত সামাজিক সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তিনি হুগলী তে ঘর ভাড়া নিলেন। কিন্তু সেখানেও বিড়ম্বনা দেখা দিল । এ প্রসঙ্গে নাসিরউদ্দীন তাঁর 'সওগাত যুগে নজরুল ইসলাম' গ্রন্থে [পৃষ্ঠা: ৫৭-৫৮] লিখেছেন- ".হুগলীতে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা নজরুলকে বাড়ি ভাড়া দিতে অসম্মত হলে ও একজন বিপ্লবী দেশসেবক নজরুল পরিবারকে হামুদুন্নবী নামক এক মোক্তারের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দেন।..' এই সময় প্রমীলা অল্পস্বল্প কবিতা চর্চা করেছিলেন। তাঁর 'শঙ্কিতা' নামে কবিতাটি দ্বিমাসিক সাম্যবাদী পত্রিকার বৈশাখ সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়ার পর দ্বিতীয় বার সওগাতের মহিলা সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। এবং করুণা নামক কবিতা টি সাম্যবাদী পত্রিকার আষাঢ় ১৩৩২ সংখ্যায় প্রকাশ হয়েছিল।
সাংসারিক কর্তব্যে অবহেলা ,সম্পূর্ণ উদাসীন কবি নজরুলের জগৎটি ছিল চারদেওয়ালের নিয়মের ঘেরা টোপ থেকে অনেক দূরে—তিনি পছন্দ করতেন বন্ধু বান্ধবদের মাঝে গড্ডলিকা প্রবাহে চলতে। সময় কাটাতেন আড্ডায়, গান গেয়ে,গান লিখে শিখিয়ে কাব্যিক চর্চায় ।অথবা বৈপ্লবিক চিন্তায়। প্রমীলাদেবী বিয়ের পর কতটা আনন্দিত হয়েছিলেন অথবা সুখী হয়েছিলেন, তার খবর কবি রাখতেন না , তবে নজরুল জীবনীকার গবেষক দের মতে প্রমীলাদেবী নিঃসন্দেহে সেইসময় বিয়েতে নানা কারণে স্বস্তি লাভ করেছিলেন।
উদাসীন কবির প্রতিদিনের অভাবের সংসার। তাতে গুছিয়ে স্থিতু হওয়ার সময় টুকু ও পেলেন না , অসময়ে , ১৯২৪ সালের ২২ আগষ্ট ,জন্মাষ্টমী তিথিতে নজরুলের প্রথম সন্তানের জন্ম হলো। তাই হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে পুত্রের নাম রেখেছিলেন কৃষ্ণ মহম্মদ।কিন্তু প্রমীলা দেবীর কোল শূন্য করে আকস্মিক সে শিশু টির ডিসেম্বর মাসে মাত্র চার মাস বয়সে মৃত্যু হলে মাতৃহৃদয় শোকাতুর হয়ে রইলো। নজরুলের বাইরের জগতে মিলন সভা , কাব্য সংগীতের সুর তাল ছন্দের বিশাল জগৎ ছিল। প্রমীলার অন্তর্লোক থাকলেও বাইরের জগৎ ছিল না, সামাজিক জগৎও ছিল না। প্রতিটি ঘটনাই প্রমীলাকে মর্মে মর্মে আঘাত করেছিল। তবুও এর দুবছর পর প্রমীলার কোল আলো করে তাঁদের বড়ো আদরের দ্বিতীয় পুত্র বুলবুল এলে শোক সন্তপ্ত পিতৃমাতৃ হৃদয়ে একটু শান্তি এল। কিন্তু সন্তান জন্মের পর দরিদ্র সংসারের খরচ ক্রমশঃ বেড়েই গিয়েছিল।
''সেইসময় ১৯২৪ থেকে ৩০ সাল পর্যন্ত আরো বেশ কিছু বছর , তখন নজরুলের একমাত্র আয়ের উৎস ছিল তাঁর কবিতা। তাতে সচ্ছলভাবে সংসার চালানো যথেষ্ট ছিল না। এমনকি সে আয় নিয়মিত ও ছিল না। সেই অপ্রতুল আয় দিয়েই নিজেদের খাওয়াদাওয়া, আহূত-অনাহূত যখন তখন আসা অতিথিদের আপ্যায়ন, কাপড়চোপড় ইত্যাদির ন্যূনতম চাহিদা মেটানোর অসাধ্য সাধন করতে হতো।
কান্দিরপাড়ে যে সংসারে প্রমীলা মানুষ হচ্ছিলেন, সে সংসারে আর যাই হোক, এমন দুঃসহ অভাব অভিযোগ ছিল না। কিন্তু কলকাতায় নিজের স্বামীর সংসারে প্রমীলাকে এবং মা গিরিবালা দেবীকে যে কখনো সম্পূর্ণ অনশনে ও কাটাতে হয়েছে। কৃষ্ণনগরে তাঁরা না মেশার সুযোগ পাচ্ছিলেন হিন্দু পাড়ায় -প্রতিবেশীদের সঙ্গে, না পারছিলেন মুসলমানদের সঙ্গে স্বচ্ছন্দে মিশতে। '' সংসারের মধ্যে থেকেই তাঁরা কালক্রমে একেবারে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লেন। হয়তো এই নিঃসঙ্গতা আংশিকভাবে তাঁরা কাটিয়ে উঠতে পারতেন নজরুল যদি ঘরমুখী হতেন। তাঁর ধারণা ছিল ‘বেলা যাবে এবে (গান গেয়ে আর) পান খেয়ে।’ স্ত্রীকে সঙ্গ দেবার মতো অফুরন্ত সময় ভাবুক কবির কখনো ছিল না।
''১৯২৬ সালের ৩ জানুয়ারি নজরুল হুগলী ছেড়ে সপরিবারে কৃষ্ণনগর যান। প্রথমে গিয়ে উঠেন শ্রী হেমন্ত কুমার সরকারের বাড়িতে। এরপর চাঁদ সড়কের পাশে বিরাট কম্পাউন্ডওয়ালা একতলা বাংলো ধরনের বাড়িতে থাকেন। বাড়ির নাম ‘গ্রেস কটেজ।’ বাড়ির পরিবেশ অত্যন্ত মনোরম ও আরামদায়ক ছিল। এই বাড়ির পাশেই ছিল লেখক সাহিত্যিক আকবর উদ্দিনের বাড়ি। আকবর উদ্দিন ছিলেন বিপত্নীক। আকবর উদ্দিনের দ্বিতীয় বিয়ের ঘটক ছিলেন প্রমীলা ও নজরুল। হুগলীতে থাকাকালীন প্রতিবেশী আখতারুন্নেসার সাথে আকবর উদ্দিনের এই বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল। আকবর উদ্দিন বলেছেন, আমার বিয়ের পর দোলনা (প্রমীলা) প্রায়ই আমাদের বাড়ি এসে আমার স্ত্রীর সঙ্গে গল্প করতেন। আর ১৯২৮ সালের প্রথম দিকে যে আড়াই মাস নজরুল ঢাকায় ছিলেন তখন দোলনা অনেকদিন সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত আমাদের বাসায় সময় কাটাতেন।''
’আগষ্ট মাসে নজরুল কৃষ্ণনগরের 'গ্রস কটেজ'-এ চলে আসেন। সেপ্টেম্বর মাসে তিনি ডা আবুল কাসেমের আমন্ত্রণে খুলনায় যান এবং সেখান থেকে তিনি খুলনা, যশোর, বাগেরহাট, দৌলতপুর, বনগ্রাম প্রভৃতি স্থান ঘুরে কৃষ্ণনগরে ফিরে আসেন। ৯ই অক্টোবর ২৬সাল (শনিবার ২২ আশ্বিন ১৩৩৩)। দ্বিতীয় পুত্র বুল্বুল অরিন্দম খালেদের জন্ম হয়। নজরুল ফিরে এসে তাঁর সন্তানকে দেখতে পান। এই দিনই তিনি মুরলীধর বসুকে পুত্র সন্তান লাভের সংবাদ জানিয়ে একটি চিঠি লেখেন। 'প্রিয় মুরলীদা! আজ সকালে ৬টায় একটি 'পুত্ররত্ন' প্রসব করেছেন শ্রীমতী গিন্নি। ছেলেটা খুব 'হেলদি' হয়েছে। শ্রীমতীও ভালো। আমি উপস্থিত ছিলাম না। হয়ে যাওয়ার পর এলাম খুলনা হতে। খুলনা, যশোর, বাগেরহাট, দৌলতপুর, বনগ্রাম প্রভৃতি ঘুরে ফিরলাম আজ।...
নজরুল সে সময় ঢাকায় গান শেখানোর ‘কাজে’ মশগুল ছিলেন। কেবল ঢাকায় নয়, কলকাতায়ও একই অবস্থা। কলকাতার বাইরে—চুঁচুড়ায়ও তাই। গান শেখাতে গেলে সেখানেই আহার, সেখানেই নিদ্রা। এদিকে স্বামী হঠাৎ নিরুদ্দেশ হওয়ায় প্রমীলার প্রতিদিন প্রায় বিনিদ্র রজনী কাটে । যেমন ফুটবল খেলা পাগল নজরুল খেলার মাঠে গেলেন , কিন্তু খেলা শেষে চলে গেলেন কলকাতা থেকে ঢাকায়। — নজরুলের এমনই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য , কিন্তু তাঁর এই অবিবেচনার জন্য স্ত্রীর কত অশান্তির কত উদ্বেগের কারণ হতে পারে, কবির তাতে বিন্দুমাত্র চিন্তা ছিলনা। মা গিরিবালা দেবী সঙ্গে না থাকলে প্রমীলার যে কী সাংঘাতিক দুর্গতিতে জীবন কাটাতে হতো তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন ।
সেকালের সামাজিক জীবনে জাতপাতের প্রচন্ড বিভেদের সংঘাতের জেরে প্রমীলা মাতা গিরিবালা দেবীর ও দিন কাটতো ভয়ানক অশান্তিতে।
" মুসলমান ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে হওয়ায় গিরিবালা দেবী আত্মীয় স্বজনের দ্বারা সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত হয়েছিলেন। এমনকি ভাইয়ের বাড়ি সমস্তিপুরের দরজা ও ছিল চিরতরে বন্ধ। যদি ও মেয়ের পরিবারে তিনি ছিলেন রক্ষাকবচ হয়ে । সাংসারিক বোধ বুদ্ধি দায়িত্ব জ্ঞান হীন উদাসীন স্বামীর উচ্ছৃঙ্খল আচরণের হাত থেকে মা ছিলেন বলে কিশোরী প্রমীলা বাচ্চাদের নিয়ে কোনোমতে রক্ষা পেয়েছিলেন।
এরপর ২৯ সালে নজরুল কৃষ্ণনগর ছেড়ে আবার কলকাতায় ফিরে আসেন। কবি কোনো খবর না জানিয়ে হঠাৎ কোথায় উধাও হয়ে যান ? তবূও পুত্র বুলবুলের মুখ চেয়ে দিন কাটছিল প্রমীলা দেবীর। সেই সব কঠিন দিনের সংগ্রামের সাক্ষী ছিলেন নজরুলের সবচেয়ে কাছের দরদি বন্ধু —মুজফ্ফর আহমদ নজরুলের জীবনিতে সে কথা বিস্তারিত ভাবে লিখেছিলেন।
অপরপক্ষে নজরুল জীবনীকারদের মতে , মা সঙ্গে থাকায় কমবয়সী প্রমীলা অনেক সময়ই মায়ের বুদ্ধিতে কাজ করেছেন। ফলে প্রমীলার সঙ্গে তাঁর স্বামীর সম্পর্ক যতটা প্রত্যক্ষ এবং নিবিড় সম্পর্ক হতে পারত, ততটা হতে পারেনি । একে অন্যকে বুঝতে পারার যে সম্পর্ক তৈরি হতে পারত, তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতিতে তা-ও হতে পারেনি। সবথেকে বড়ো প্রশ্ন জীবন ধারণের স্বল্পতম উপকরণের অভাব, স্বামীর কাছ থেকে যথেষ্ট সঙ্গ না পাওয়া, আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধব বর্জিত থেকে দিনের পর দিন তিনি মানসিক অবসাদ ও ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছিলেন।
সর্বোপরি প্রশ্ন আসে স্বামীর একনিষ্ঠতা এবং আনুগত্যের অভাবে প্রমীলা কত টা সুখী হয়েছিলেন? একেবারে প্রথম দিক ছাড়া স্বামীর ভালোবাসা তিনি কতটুকু পেয়েছিলেন? কবির উদাসীনতায় তাতেও যথেষ্ট সন্দেহ জাগে। তবুও প্রমীলা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা এপ্রাত্যহিক জীবন মানিয়েই নিয়েছিলেন।
কিন্তু সর্বাপেক্ষা দূর্ভাগ্য প্রমীলার জীবনে আবার এসে থাবা বসিয়েছিল যখন ১৯৩০সালের ৭ই মে বিনামেঘে বজ্রপাতের মত তিন বছর আট মাসের শিশু পুত্র বুলবুল নিদারুন বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে সব রকম চিকিৎসা ব্যর্থ করে অকালে মারা গেল। তখন তাঁদের তৃতীয় পুত্র সব্যসাচীর বয়স মাত্র পাঁচ মাস। নজরুল–প্রমীলা আবার দুঃখের সাগরে ভাসলেন। বুলবুলের অন্তিম যাত্রায় পুত্রশোকে নজরুল প্রমীলা যে মানসিক শারীরিক দুঃখ কষ্ট পেয়েছিলেন, তা তাঁরা কোনোদিনই কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
নজরুল মন্দিরে মসজিদ নানা স্থানে ঘুরে আধ্যাত্মিক পথে নিজেকে সমর্পন করে সঙ্গীত সৃষ্টির মাঝে নিজেকে ডুবিয়ে রাখলেন। তাঁর রচিত হৃদয়ভাঙা গানে সেই শোকের প্রকাশ পাওয়া যায় । কিন্তু প্রমীলার আঘাত ? কতটা মর্মান্তিক ছিল তা কল্পনা ও করা যায়না। প্রমীলার নয়নমণি বুলবুলের মৃত্যু দিনেই ছিল তাঁর জন্মদিন। পুত্রশোকে মাতৃহৃদয়ের বুক ভাঙা আঘাত নীরবে সয়েছিলেন। তাঁর শোকাচ্ছন্ন হৃদয়ে নরম পরশ বুলিয়ে আঁখি জল মোছানোর মত সমব্যথী হয়ে আপনজন পাশে কে ছিল ? তিনি তো নজরুলের মত গান অথবা কবিতার মধ্য দিয়ে তাঁর শোক প্রকাশ করতে পারেন নি। কারোর কাছে পুত্র হারা মা তাঁর তপ্ত মনের অন্তর্জ্বালার নালিশ জানিয়ে নিজের ভার লঘু করতে পারেননি।
শোনা যায় , তাঁদের নয়নের মণি বুলবুল ছিল অসাধারণ প্রতিভা সম্পন্ন ভারী আদুরে। তিন বছর বয়সে নজরুল হারমোনিয়ামে কোনো সুর বাজালে সে বলে দিতে পারত সুরটা কোন রাগরাগিণীর। জীবজন্তুর নাম ও ছবি দেখলে ইংরেজিতে বলে দিত ।
নজরুল ছাত্রী প্রতিভা সোম --একটি প্রত্যক্ষ ঘটনার বিবরনে লিখেছিলেন, ''যেদিন তিনি নজরুলের সঙ্গে তাঁর বাসায় গিয়েছিলেন, সেদিন সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় বুলবুল দৌড়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ‘এই যে কাজীদা, কোথায় ছিলে?’ নজরুল তাকে বুকের মধ্যে ধরে হেসে বলেন, ‘আবার কাজীদা বলেছিস!’ এ রকম অজস্র স্মৃতি প্রমীলা এবং নজরুলকে তিলে তিলে দংশন করছিল। '
' দৌলতপুরে কবির বিয়ে ভেঙে যাবার পর কান্দিরপাড় থেকে নজরুলকে কলকাতায় নিয়ে যেতে এসেছিলেন মুজফ্ফর আহমদ। তিনি বলেন ,তখন যে প্রমীলাকে দেখেছিলেন ,সে ছিল এক হাসিখুশি চঞ্চলা চপলা কিশোরী দুলি । কিন্তু সেই প্রমীলা নজরুল কেই ১৯২৬ সালে যখন দ্বিতীয় বার দেখলেন তখনো তার আঠারো পূর্ণ হয়নি। কিন্তু সে কিশোরী বয়সের তুলনায় বেশ ‘ধীর, স্থির প্রাজ্ঞ এবং শান্ত। তাঁর উজ্জ্বল হাসি ময় মুখের ছবি মুছে গিয়ে করুণ বিষণ্ণতার ছবি স্পষ্ট . ।--
এরপর কবির আর্থিক অনটনের দুঃসময় কিছুটা কেটেছিল।নজরুলের তাঁর প্রতিভার গুণে সেই সময়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন। গ্রামোফোন কোম্পানি, সাহিত্য পত্রিকা আর রাজকীয় সম্মান সবই ছিল। কিন্তু কবির ছিল ‘ভোলাভালা’ স্বভাব। বিষয়বুদ্ধি বা সঞ্চয় করার মানসিকতা তাঁর কোনোকালেই ছিল না। অনেকে মনে করেন এর প্রধান কারণ হতে পারে তাঁর ভবঘুরে জীবন। আশৈশব পিতৃ হীন তিনি দুঃখ দুর্দশার সাথে সংগ্রাম করে সংসারের বন্ধন স্নেহ বাৎসল্য রসের ধারা থেকে বঞ্চিত হয়ে জীবন কাটিয়েছেন চরম অনিশ্চয়তায় । তিনি কখনো লেটো দলে, কখনো রুটির দোকানে, কখনোবা অনাথ আশ্রমে কাটিয়েছেন। ঘরসংসারের কেমন মায়া কেমন ,করে সামলাতে হয়, সেই পারিবারিক শিক্ষা তাঁর ছিলনা ।
কিন্তু প্রমীলার সবচেয়ে বড় বিপদ ঘনায় ১৯৩০-এর দশকে কবির বেহিসাবী বিলাসিতা এবং অপব্যয় থেকে। কারণ, এ সময় গ্রামোফোন কোম্পানির জন্য গান লেখা, তাতে সুর দেওয়া এবং সে সুর গায়ক-গায়িকাদের শেখানো বাবদ নজরুল বহু টাকা উপার্জন করেছিলেন । বেতারের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ ঘটেছিল। এমনকি মঞ্চের সঙ্গেও। এতটাই স্বচ্ছল হয়েছিলেন যে, তিনি একটা বড় গাড়িও কিনেছিলেন ১৯৩১ সালে। গাড়ি কেনার জন্য অবশ্য অগ্নিবীণার গ্রন্থস্বত্বও বিক্রি করতে হয়েছিল। কিন্তু ১৯২৬-২৭ সালের আর্থিক অনটনের কথাকে তখন প্রমীলা এবং গিরিবালা দেবী হয়তো কেবল দুঃস্বপ্ন বলেই বিবেচনা করতেন।আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যই সুখ আনতে পারে না। ওদিকে নজরুল গান-বাজনার আসরে মত্ত থাকলেন। পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ল না। উচ্ছৃঙ্খল জীবনে শৃঙ্খলা এল না । যে নজরুল কয়েক হাজার গান লিখে হাজার হাজার টাকা আয় করেছিলেন, ১৯৪০ সাল আসার আগেই তিনি প্রায় নিঃস্ব হয়ে গেলেন ।
তার চেয়েও বড় বিপদ প্রমীলার দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা—যার পরিণতিতে তিনি তাঁর নিম্নাঙ্গে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হলেন। মা গিরিবালা দেবী তখন তাঁর একমাত্র সহায় হয়েছিলেন। স্বামী নজরুল ও তাঁকে সেই সময় রোগমুক্ত করার জন্য অবশ্যই প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন—প্রথমে চিকিৎসা, তারপর টোটকা চিকিৎসা এবং সবশেষে যোগ, পুজো ও নামাজের আশ্রয় নিয়ে। তবু প্রমীলা আরোগ্যলাভ করেননি।
কিন্তু প্রমীলার দুর্ভাগ্যের তখনো শেষ হয়নি। সেটা হলো স্বামী যখন ১৯৪২ সালের গোড়া থেকেই রোগাক্রান্ত হলেন। সেই রোগ জুলাই মাসে নজরুলকে অপ্রকৃতিস্থ এবং উন্মাদে পরিণত করে। ক্রমে তিনি বাক্রুদ্ধ হন। সে সময় প্রথম চার বছর পক্ষাঘাতগ্রস্ত প্রমীলাকে এবং সংবিৎহারা নজরুলকে সর্বশক্তি দিয়ে সাহায্য করেছেন গিরিবালা দেবী। তারপর গিরিবালা দেবী একদিন নিরুদ্দেশ হওয়ার পর সংসারের কী দুঃসহ পরিবেশে অসুস্থ প্রমীলা তাঁর স্বামী এবং দুই কিশোর পুত্রকে নিয়ে বেঁচে ছিলেন, তা বর্ণনাতীত। এভাবেই কবির সংসারে সুগন্ধি ধূপের মত ছাই হয়ে পুড়ে গেলেন ,চন্দনের কাঠের টুকরোর মত ক্ষয় হয়ে গন্ধ বিলিয়ে গেলেন কবির দোলন দিনেরাতে সপ্তাহ মাস শেষে বছরের পর বছর।
সারাটি জীবন দু:খ-দুর্দশা আর সংগ্রামের মধ্যে কাটিয়ে নজরুলের প্রেরণা দায়িনী প্রমীলা অসুস্থ অবস্থায় ৩০ জুন,১৯৬২ সালে কলকাতার বাড়ি তে নির্বাক কবিকে নি:স্ব রিক্ত অসহায় করে অমৃত লোকে পাড়ি দিলেন। এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর দুঃসহ জ্বালা যন্ত্রনা থেকে বিদায় নিলেন । তাঁর ইচ্ছা অনুসারে চুরুলিয়ায় কবির জন্মস্থানে তাঁকে কবর দেওয়া হয়। এবং পাশের জায়গা রাখা হয় স্বামীর জন্য। প্রমীলা ভেবেছিলেন মৃত্যুর পরও তিনি থাকবেন তাঁর স্বামীর পাশে। কিন্তু প্রমীলার সেই অন্তিম স্বাদ পূর্ণ হয়নি।
0 Comments