জ্বলদর্চি

জঙ্গলমহলের লোকগল্প : গাধার দুধ বিক্রেতা /সংগ্ৰাহক- পূর্ণিমা দাস /কথক- শুভময় দাস

জঙ্গলমহলের লোকগল্প 
গাধার দুধ বিক্রেতা 
সংগ্ৰাহক- পূর্ণিমা দাস 
কথক- শুভময় দাস, গ্ৰাম- যুগীশোল, থানা- নয়াগ্ৰাম, জেলা- ঝাড়গ্ৰাম 


অনেকদিন আগে ধানশোলা গ্ৰামে ভজা নামে এক গাধার দুধ বিক্রেতা বাস করত। সে গাধার দুধ বিক্রি করে সংসার চালাত।

এছাড়া তার এই ব্যবসা খুব ভালোই চলত। কারণ গাধার দুধ গরুর দুধের থেকে বেশি উপকারী। তাই গ্ৰামের সকলে ওর কাছ থেকে দুধ নিত। 

আর এই সুযোগে সে সবার কাছ থেকে বেশি বেশি করে দুধের দাম নিত। তাকে কেউ কিছু বলতেও পারত না। কারণ পুরো গ্ৰামে ভজা ছাড়া আর কারোর কাছে গাধার দুধ পাওয়া যেত না। এইভাবে ভজা সারা গ্ৰামে দুধ বিক্রি করে বেড়াত। 

একদিন এক বুড়ি ভজাকে বলল-“ও ভজা, আজ আমাকে একটু বেশি করে দিবি?”

তখন ভজা বলে-“কেন? আজ কী?”

বুড়ি বলে-“আসলে আমার বয়স হয়েছে, দাঁত নেই। তার উপর দুদিন হল শরীরটাও ভালো নেই। তাই কিছু খেতে পারছি না। দুধ একটু থাকলে নাহয় দুমুঠো ভাত খাওয়া যাবে। তাই বলছি আজ  একটু বেশি দুধ দিতে।”

ভজা তখন বলে-“আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু এর জন্য আলাদা দাম দিতে হবে বলে দিচ্ছি।”

বুড়ি বলে-“আচ্ছা বাবা দেব দেব। এখন দে দেখি।”

এরপর ভজা দুধ দিয়ে বাড়ি চলে আসে। আর বাড়িতে এসে গাধাটিকে খাবার দেয় ও মনের আনন্দে গান গাইতে থাকে।🍂

ঠিক সেইসময় গ্ৰামের এক লোক তার কাছে দুধ নিতে আসে। আর ভজাকে বলে-“কী রে ভজা। আজকাল দুধে জলটল মেশাচ্ছিস নাকি?”

ভজা বলে-“এ কী বলছ দাদা? না না একদমই না।”

তখন লোকটি বলে-“তাহলে কী তোর গাধাই জলের মতো দুধ দিচ্ছে?”

ভজা তখন বলে-“তা আমি কী করে জানব দাদা, ও তো গাধা জানবে। তোমার যদি ভালো না লাগে তাহলে দুধ নেওয়ার দরকার নেই।”

লোকটি তখন বলে-“আরে না না, তা বললে কী হয়। এই গ্ৰামে তুই ছাড়া আর কারো কাছে গাধার দুধ পাওয়া যায় না। তাই তোর কাছ থেকে দুধ না নিলে চলবে কী করে। আচ্ছা দে দে দুধ দে।”

এই শুনে ভজা মনে মনে হাসতে থাকে।

এদিকে গ্ৰামের সবাই গাধার দুধ নিতে রামুর গরুর দুধ কেউ নেয় না। তাই রামু মন খারাপ করে বাড়িতে বসে আছে। 

সেইসময় তার বউ তাকে বলল-“কী গো আজ দুধ দুইবে না?”

রামু বলে-“দূর দূর,দুধ দুয়ে আর কী হবে। গরুর দুধ আর কেউ নেবে না। সবাই ওই ভজার গাধার দুধই নেবে।”

তখন তার বউ বলে-“হ্যাঁ গো, আমরা যদি একটা গাধা কিনি?”

রামু তখন রেগে গিয়ে বলে-“উমমম, খেতে পারছি না। তার উপর আবার গাধা কিনব। যাও তো এখানে থেকে। আমার চোখের সামনে থেকে দূর হয়ে যাও।”

শুধু রামু নয়। এই গ্ৰামে যত গোয়ালা আছে সবার রুজি রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। কারণ ভজা ছাড়া গ্ৰামের আর কারোর কাছে গাধা নেই।

এইভাবে সবার দিন কাটতে থাকে। হঠাৎ একদিন গ্ৰামের জমিদারের অনেক বড়ো রোগ দেখা দেয়। কবিরাজ বলে গাধার দুধ খাওয়ালেই জমিদারের রোগ সেরে যাবে। 

তখন নায়েব কবিরাজকে বলে-“ও গাধার দুধ। সে তো পাওয়া যাবে। কারণ এ গ্ৰামে তো ভজা গাধার দুধ বেচে।”

তখন কবিরাজ বলে-“হ্যাঁ, আর একটা কথা, ওই দুধে যেন জল মেশানো না থাকে। খাঁটি গাধার দুধই লাগবে।”

তখন নায়েব বলে-“আচ্ছা ঠিক আছে।”

এরপর নায়েব গাধার দুধ আনতে ভজার বাড়ি যায়। 

নায়েবকে দেখে ভজা বলে-“এ কী বাবু, তুমি হঠাৎ এখানে? কিছু দরকার থাকলে তো আমাকে ডাকতে পারতে, আমি চলে যেতাম। তুমি আবার কষ্ট করতে গেলে কেন?”

তখন নায়েব বলে-“আরে না না ঠিক আছে। আচ্ছা শোন, যে কাজের জন্য তোর কাছে এসেছিলাম। শুনেছিস তো আমাদের জমিদারবাবুর শরীর খুব খারাপ। কবিরাজ বলেছে গাধার দুধ খেলেই নাকি জমিদারবাবুর রোগ সেরে যাবে। আর একটা কথা ওই দুধে যাতে জল না থাকে। আর এই গ্ৰামে একমাত্র তোর কাছেই গাধা আছে। তাই যা দুধ লাগবে তুই দিবি।”

ভজা তখন আমতা আমতা করে বলে-“আজ্ঞে বাবু দুধের দামটা?”

নায়েব বলে-“হ্যাঁ হ্যাঁ দুধের দাম দেব। তা কত বল?”

ভজা বলে-“আজ্ঞে পঞ্চাশ টাকা।”

এই শুনে নায়েব বলে-“কী! পঞ্চাশ টাকা।”

কিন্তু কিছু করার নেই। জমিদারকে সুস্থ করতে গেলে গাধার দুধ লাগবেই। তাই নায়েব আর কিছু না বলে পঞ্চাশ টাকা ভজাকে দিয়ে দেয়।

আর মনে মনে বলে-“দাঁড়া বেটা, একবার জমিদারকে সুস্থ হতে দে। তারপর তোর হচ্ছে। দুধের দাম বেশি নিয়ে মানুষ ঠকানো তোর বের করছি।”

এরপর নায়েব গাধার দুধ এনে জমিদারকে দেয়। আর কবিরাজের কথামতো গাধার দুধ খেয়ে জমিদারও সুস্থ হয়ে যায়।

আর জমিদার সুস্থ হতেই নায়েব জমিদারকে ভজার লোক ঠকানো ব্যবসার কথা বলে। 

সব শুনে জমিদার বলে-“না না, এটা হতে দেওয়া যায় না। এইভাবে দুধের দাম বেশি নিলে গ্ৰামের সবাই বিপদে পড়বে। কিন্তু কী করা যায় বলো তো?”

তখন নায়েব বলে-“আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। আচ্ছা বাবু, গ্ৰামের যত গোয়ালা আছে আমরা যদি সবাইকে একটা করে গাধা কিনে দি তাহলে তো ভজা আর নিজের ইচ্ছামতো কারোর কাছ থেকে দাম নিতে পারবে না। আর সব গোয়ালাকে আমরা দুধের একটাই দাম ঠিক করে দেব। তাহলে তো আর কেউ বেশি দাম নিতে পারবে না।”

তখন জমিদার বলে-“হ্যাঁ, এইটা একদম ঠিক বলেছ। আচ্ছা কাল সব গোয়ালাকে জমিদার বাড়িতে আসতে বলো। তাদের বলে দাও কাল সবাইকে একটা করে গাধা দেওয়া হবে।”

নায়েব বলে-“আচ্ছা ঠিক আছে বাবু।”

এরপর জমিদারের কথামতো নায়েব পুরো গ্ৰামে খবর রটিয়ে দেয়। আর এই শুনে গ্ৰামে যত গোয়ালা আছে সবাই জমিদার বাড়িতে চলে আসে। 

গোয়ালাদের জমিদার বাড়িতে যেতে দেখে ভজা রামু গোয়ালাকে বলে-“এই তোরা জমিদার বাড়ি কী করতে যাচ্ছিস রে?”

তখন রামু বলে-“কেন তুই জানিস না। জমিদারবাবু আমাদের সবাইকে ডেকেছে। আজ আমাদের সবাইকে জমিদারবাবু গাধা দেবে বলেছে।”

এই শুনে ভজা বলে-“ও এই ব্যাপার। তাহলে আমিও যাই। এমনিতেই আমার একটা গাধা আছে। আর একটা গাধা হলে ভালোই হবে। আরও বেশি বেশি টাকা ঘরে আসবে।”

এই ভেবে ভজাও তাদের সঙ্গে জমিদার বাড়ি যায়।

এরপর সব গোয়ালা জমিদার বাড়ি এলে জমিদার এক এক করে সবাইকে গাধা দেয়‌। কিন্তু ভজাকে গাধা দেয় না।

তখন ভজা জমিদারবাবুকে বলে-“এ কী জমিদারবাবু, আমাকে গাধা দিলে না?”

তখন জমিদার বলে-“তোকে কেন দেব রে। তোর কাছে তো গাধা আছে।”

এরপর জমিদার সমস্ত গোয়ালাকে বলে-“আর একটা কথা। তোরা সবাই শোন। কেউ কিন্তু নিজের ইচ্ছামতো দুধের দাম নিতে পারবি না। আমি একটা দাম ঠিক করে দিচ্ছি। এই দামে তোরা সবাই দুধ বিক্রি করবি। আর ভজা এই কথাটা তুইও শুনে রাখ।”

তারপর থেকে গ্ৰামের সব গোয়ালা জমিদারের কথামতো দুধ বিক্রি করতে থাকে। 

এদিকে গ্ৰামের সব গোয়ালাদের কাছে গাধা থাকায় ভজার কাছ থেকে আর কেউ দুধ নেয় না। যে সব লোকেদের ভজা দুধ দিত তারাও এবার বেশি দাম দিয়ে আর তার কাছ থেকে দুধ নেয় না। এতে করে ভজার ব্যবসা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। 

এমনকি সেও নিজে বুঝতে পারে এ হল তার বেশি লোভের ফল। তাই সে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগে-“ঠিক হয়েছে আমার সঙ্গে ঠিকই হয়েছে। এইজন্য সবাই বলে অতি লোভ করা ভালো না। এবার বোঝো ঠেলা। হায় হায় হায়, এবার আমার কী হবে? হে ভগবান।”

এইবলে সে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে।

Post a Comment

0 Comments