জ্বলদর্চি

জঙ্গলমহলের লোকগল্প :কিপটে বুড়ি/সংগ্ৰাহক- পূর্ণিমা দাস/ কথক- ঊষা রানী দাস


জঙ্গলমহলের লোকগল্প 
কিপটে বুড়ি
সংগ্ৰাহক- পূর্ণিমা দাস 
কথক- ঊষা রানী দাস, গ্ৰাম- ডুমুরিয়া, থানা- নয়াগ্ৰাম, জেলা- ঝাড়গ্ৰাম 


বহুকাল আগে ভাদুপুর গ্ৰামে এক কিপটে বুড়ি বাস করত। বুড়ি এতটাই কিপটে ছিল যে একটা ছোটো পুঁটি মাছও দুদিন ধরে খেত। 

ওই কিপটে বুড়ির নাম ছিল চঞ্চলা। কিন্তু গ্ৰামের সবাই তাকে কিপটে বুড়ি বলেই ডাকত। বুড়ির নিজের বলতে কেউ ছিল না। তবুও সে যে এত কেন কিপটে ছিল তা কেউ বুঝতে পারত না। বুড়ি একা একাই বাড়ির সব কাজ করত‌। এছাড়া প্রতিদিন বাড়িঘর ঝাঁট দিলে নতুন ঝাঁটা লাগবে বলে সে প্রতিদিন বাড়িঘর ঝাঁটও দিত না। মাসে এক দুবার ঝাঁট দিত। এরফলে দূর থেকে ওর বাড়ি দেখলে মনে হত যেন ভূতের বাড়ি। 

এমনকি বুড়ির একটি ছোটো বাগানও ছিল। সেই বাগানে নানারকম ফুল ফলের গাছ ছিল। কিন্তু বুড়ি ওই বাগান থেকে একটা ফুল কী ফল কাউকেই দিতো না। ফলগুলো মাটিতে পড়ে পচে যেত, তবুও কাউকে দিত না। এই বুড়ি এতটাই কিপটে ছিল। 
🍂

এইভাবে বুড়ির দিন কাটছিল। 

একদিন বুড়ি দেখল তার ঘরে কোনো আনাজপাতি নেই। তাই সে ভাবল-“না যাই গ্ৰামের হাট থেকে কিছু নিয়ে আসি। বাড়িতে তো কিছুই নেই।”

এরপর বুড়ি হাটে যায়। বুড়িকে হাটে আসতে দেখে সবাই তো অবাক। কারণ বুড়ি আজ একমাস পর হাটে এসেছে। তারা ভেবেছিল হয়তো বুড়ি আর নেই। কিন্তু হঠাৎ বুড়িকে দেখে সবাই অবাক হয়ে যায়।

একজন তো বুড়িকে বলেই বসে। সে বলে-“কী গো বুড়ি, বলি এতদিন কোথায় ছিলে?”

বুড়ি তখন রেগে গিয়ে বলে-“যেখানে থাকি তাতে তোর কী রে?”

বুড়ির এই কথা শুনে লোকটি তাকে আর কিছু না বলে চলে যায়। 

এরপর বুড়ি এক সবজিওয়ালার কাছে আসে। 

আর একটা কথা এই বুড়ি কিন্তু হাটের শুরুতে আসেনি। এসেছে হাট যখন শেষ হতে যায় তখন। কারণ আগেই বলেছি বুড়ি কিপটে। তাই কিপটে মানুষ কী আর দামী দামী বা তাজা তাজা আনাজপাতি নেবে? না না সে তো নেবে সব শেষে পড়ে থাকা পচা সস্তা জিনিসপত্র। 

এরপর বুড়ি ওই সবজিওয়ালাকে বলে-”এই যে ভোলা তা তোর কাছে কী আছে শুনি?”

ভোলা তখন বলে-“আমার কাছে ঘরবাড়ি আছে।”

বুড়ি তখন বলে-“আ মরণ। বলি তোর কাছে কী কী আনাজপাতি আছে বল?”

ভোলা বলে-“ওওও, তুমি আনাজের কথা বলছিলে। আমি বুঝতে পারিনি। তা এই শেষের মাথায় আর কী থাকবে? এই যে কিছু পোকা বেগুন ও আধপচা আলু পড়ে আছে।”

বুড়ি বলে-“ও ঠিক আছে, তাতেই হবে। দে দে ওইগুলো সব এই থলিতে ঢুকিয়ে দে।”

এরপর ভোলা ওই পোকা বেগুন ও আধপচা আলু বুড়ির থলিতে ঢুকিয়ে দেয়। 

এরপর বুড়ি ওইগুলো নিয়ে চলে যেতে থাকে। 

তখন ভোলা বুড়িকে বলে-“এই যে বুড়ি, তা এইগুলোর দাম কে দেবে শুনি?”

বুড়ি বলে-“এই আধপচা জিনিসের আবার কিসের দাম। সেই তো ফেলে দিতিস। না হয় সেগুলো আমিই নিয়ে গেলাম। এর আবার দাম কিসের রে?”

এই বলে বুড়ি চলে যায়।

ভোলা তখন বলে-“সত্যিই এত কিপটে মানুষ আমি জীবনে দেখিনি।”

এরপর একইভাবে বুড়ি মাছের দোকানে গিয়ে কয়েকটি আধপচা ট্যাংরা মাছ নিয়ে বাড়ি চলে আসে।

বুড়ির এইসব কান্ডকারখানা দেখে হাটের সবাই অবাক হয়ে যায়। তারা সবাই ভাবতে থাকে-“মানুষ কিপটে হয় শুনেছি। তাই বলে এত কিপটে!”

এইরকম করে বুড়ির কিপটামি আরও বাড়তে লাগল। গ্ৰামের কেউ যদি কোনো ভালো খাবার দিত। সেই খাবারও বুড়ি দু-তিন দিন ধরে খেত। 

কিন্তু বুড়ি এটা বুঝতে পারত না যে এইসব বাসি পচা খাবার খেয়ে সে নিজেই তার নিজের ক্ষতি করছে। 

গ্ৰামের লোকেদের কথাও সে শুনতো না। সে ভাবত সবাই তার সবকিছু নিয়ে নেওয়ার জন্য এইসব বলছে। তাই সবাইকে সে অপমান করত।

এইরকম চলতে চলতে সত্যিই বুড়ি একদিন অসুস্থ হয়ে পরল। 

দু-তিন দিন বুড়িকে বাড়ি থেকে বেরোতে না দেখে গ্ৰামের সবাই ভাবল-“এ কী বুড়ি বাড়ি থেকে বেরোচ্ছে না কেন? বুড়ির কিছু হয়ে টয়ে গেল নাকি? যে বুড়ি প্রতিদিন বাগানে পাহারা দিত। আজ তিনদিন হল সে ঘর থেকে বেরোচ্ছে না। চল তো সবাই মিলে গিয়ে দেখি বুড়ির হল কী?”

এরপর গ্ৰামের সবাই বুড়ির বাড়ি যায়। আর গিয়ে দেখে বুড়ি বিছানায় শুয়ে আছে। কোনো সাড়াশব্দ নেই।”

সবাই তখন ভাবল-“বুড়ি মরে গেল নাকি?”

তখন তাদের মধ্যে একজন বুড়ির কাছে গিয়ে বলল-“বুড়ি, ও বুড়ি। তোমার কী হয়েছে?”

বুড়ি তখন আধো আধো গলায় বলল-“কিছু না রে। ওই একটু জ্বর হয়েছিল।”

তখন লোকটি বলল-“তা ওষুধ-পত্তর কিছু খেয়েছো?”

বুড়ি তখন বলে-“না না, এইটুকুর জন্য আবার ওষুধ খেতে হবে। ও এমনি ঠিক হয়ে যাবে। বেকার বেকার এইসবে পয়সা নষ্ট করে কী হবে বল। এমনিতেই সেরে যাবে।”

তখন লোকটি বলে-“বুড়ি মরতে বসল, তবু ওর কিপটামি গেল না।”

তখন আর একজন লোক বুড়িকে বলল-“তা বলছি কী বুড়ি এত পয়সা রেখে কী করবে শুনি। মরে গেলে কী ওগুলো সঙ্গে নিয়ে যাবে নাকি? আমি বলি কী যদি চাও আরও দুদিন বেঁচে থাকতে তাহলে কিছু ভালো ভালো খাবার ও ওষুধ পত্তর খাও। তাহলে হয়তো আর কিছুদিন বাঁচবে। আর তা না হলে তোমার যা অবস্থা দেখছি আজকের রাত পেরোতে না পেরোতেই তুমি মরেই যাবে।”

এইকথা শুনে বুড়ি রেগে যায়। রেগে গিয়ে সে বলে-“কী! কী বললি তুই? দূর হয়ে যা আমার চোখের সামনে থেকে। উমম… আমার পয়সার উপরে তোদের ভারী নজর দেখছি। সব কটা আমার পয়সা গুলো নিতে চায়। আমি মরি বাঁচি তাতে তোদের কী? দূর হয়ে যা এখান থেকে।”

বুড়ির এইরকম কথা শুনে গ্ৰামের সবাই খুব রেগে যায়। তারা বলে-“শালা, বুড়ির ভালো করতে আসাটাই আমাদের ভুল হয়েছে। এই বুড়ি মরুক বাঁচুক এরপর থেকে আমরা আর দেখতে আসব না। এই কিপটে বুড়ি মরতে বসল তবু তার কিপটামি গেল না। এই চল চল সবাই চল। এই বুড়ি মরুক।”

এই বলে গ্ৰামের সবাই সেখান থেকে চলে আসে।

এইভাবে কিছুদিন কেটে যায়। কিন্তু বুড়ি আর ঠিক হয় না। দিনে দিনে বুড়ি আরও অসুস্থ হয়ে যায়। কিন্তু তাকে দেখতে আর কেউ আসে না।

এইভাবে কিছুদিন যেতে না যেতেই বুড়ি মারা যায়। বুড়ি মারা যেতে গ্ৰামের সবাই মিলে বুড়ির শেষ কাজ করে। কারণ বুড়ির কেউ ছিল না। 

কিন্তু গ্ৰামের সবাই এটা মনে রাখে যে, বুড়ি মরে গেল তবু তার কিপটামি গেল না। যদি কিপটামি ছাড়তে পারত তাহলে হয়তো আরও কিছুদিন বুড়ি বেঁচে থাকত। 
বুড়ি মরে যেতে গ্ৰামের সবাই বুঝতে পারে যে কোনো কিছু জমিয়ে রাখা ভালো তবে তার নিজের ক্ষতি করে নয়। নিজেকে বাঁচিয়ে সবকিছু করা উচিত। 

 সঞ্চয় করা ভালো তবে তা নিজের জীবন দিয়ে নয়‌। কারণ মরে গেলে ওইসব সঞ্চিত জিনিস কেউ সঙ্গে নিয়ে যায় না। তাই সবদিক ভেবে সঞ্চয় করা ভালো।

Post a Comment

0 Comments