কেদারনাথ মজুমদারের রামায়ণচর্চা
দিলীপ মজুমদার
[ ময়মনসিংহের কেদারনাথ মজুমদার ছিলেন সাহিত্যসাধক , পুরাকীর্তিসংগ্রাহক , বিখ্যাত ‘সৌরভ’ পত্রিকার সম্পাদক । প্রথাগত শিক্ষা তাঁর ছিল না । স্বশিক্ষিত এই মানুষটির জ্ঞানস্পৃহা ছিল প্রবল । রামায়ণচর্চা তারই নিদর্শন । কেদারনাথের মৃত্যু শতবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য এই প্রবন্ধটি লিখিত]
কেদারনাথ মজুমদার ১৩১০ বঙ্গাব্দে ‘রামায়ণের সমাজ’ লেখার কাজ শুরু করেন । প্রথমে তিনি দুটি রামায়ণের বঙ্গানুবাদ করেন , তারপরে আলোচনার ধারা ও বিষয়সূচি প্রস্তুত করেন । বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ‘রামায়ণ তত্ত্ব’ তাঁকে বিশেষভাবে সাহায্য করে । ১৩১৪ বঙ্গাব্দে ‘রামায়ণের সমাজে’র কিছু অংশ লিখিত হয় এবং সুরেশচন্দ্র সমাজপতির আগ্রহে ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় । ১৩১৭ বঙ্গাব্দে আরও কিছু অংশ হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষের ‘আর্য্যাবর্তে’ প্রকাশিত হয় । কেদারনাথের এই রচনার সমালোচনাও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয় । এতে কেদারনাথ উৎসাহিত হন । এই প্রবন্ধগুলিকে গ্রন্থাকারে রূপ দেবার পরিকল্পনা করে তিনি । তাই তিনি ১৩২১ সালের অগ্রহায়ণ মাসে কলকাতা যাত্রা করেন । উদ্দেশ্য উমেশচন্দ্র বিদ্যারত্নের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও তাঁর পরামর্শ প্রার্থনা ।
উমেশচন্দ্র পণ্ডিত মানুষ । বেদ , মহাভারত , পাণিনি , ব্রাহ্মণ্যসূত্র তাঁর কণ্ঠস্থ ছিল । কিন্তু তাঁর মতের সঙ্গে কোনদিন অন্য কারোর মতের মিল হত না । কেদারনাথ জানতেন সে কথা । কিন্তু তিনি যদি বিরুদ্ধ কথা বলেন , তাহলে কেদারনাথ নিজের ভুল-ভ্রান্তি সম্বন্ধে অবহিত হতে পারবেন , নিজের লেখা সংশোধন করে নিতে পারবেন । তাই প্রতিদিন সকালে কেদারনাথ উমেশচন্দ্রের সিমলা স্ট্রিটের বাড়িতে হাজির হতে লাগলেন । নিজের লেখা-পড়ার কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় উমেশচন্দ্র বিরক্ত হলেও কেদারনাথের রচনাগুলি পাঠ করে নিজের মতামত জানিয়েছিলেন উমেশচন্দ্র ।
উমেশচন্দ্রের পরামর্শ অনুযায়ী কেদারনাথ নতুন করে বেদ সংহিতা ও সূত্রগ্রন্থগুলি পড়তে শুরু করেন এবং নিজের লেখা সংশোধন করেন । কিন্তু পরবর্তী সাত বছর নানা সমস্যায় বিব্রত ছিলেন বলে কেদারনাথ ‘রামায়ণের সমাজ’ গ্রন্থাকারে প্রকাশ করতে পারেননি । ১৩২৮ সালে বন্ধুবর্গের পরামর্শে আবার নতুন করে সেই বইএর কাজ শুরু করেন।
🍂
পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত হবার পরে সুসঙ্গের মহারাজা , কেদারনাথের হিতৈষী ভূপেন্দ্রচন্দ্র সিংহ তাঁকে বলেন , ‘আপনার প্রবন্ধগুলি খুব interesting হচ্ছে বটে কিন্তু প্রচলিত সমাজধর্মের বিরোধী হচ্ছে । আপনি হিন্দুশাস্ত্রে বিশ্বাসী একজন সুপণ্ডিত ব্যক্তিকে আপনার বইএর পাণ্ডুলিপি দেখিয়ে নিন ।’
মহারাজার বক্তব্যের মধ্যে ‘প্রচলিত সমাজধর্মের’ বিরোধিতার কথাটি উল্লেখযোগ্য । তার মানে এতাবৎ রামায়ণকে যে ভাবে দেখা হচ্ছিল , কেদারনাথের দেখা তার বিপরীত । একদম সঠিক কথা । কেদারনাথের রামায়ণ বিচার প্রসঙ্গে তাঁর ব্যতিক্রমী দৃষ্টির পরিচয় লাভ করব আমরা । মহারাজার প্রস্তাব শুনে কেদারনাথের মনে পড়ে পণ্ডিত দুর্গাদাস রায়ের কথা । মেদিনীপুর সাহিত্য সম্মেলনে তাঁর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল কেদারনাথের । দুর্গাদাস রায় কেদারনাথের পাণ্ডুলিপি পাঠ করে লিখলেন :
“ আপনার এই গ্রন্থ বাঙ্গালা সাহিত্যে সম্পূর্ণ নতুন গ্রন্থ হইয়াছে । কাহাকেও এই গ্রন্থ দেখাইয়া কোন ফল পাইবেন না । কেন না , আপনি যেরূপ একাগ্র সাধনার সহিত রামায়ণ পাঠ করিয়াছেন ও তাহা হইতে ভাব উদ্ধার করিয়াছেন , অন্য কেহ তেমনভাবে তাহা পাঠ করেন নাই । ”
দুর্গাদাস রায় মুক্তকণ্ঠে কেদারনাথের স্বতন্ত্রদৃষ্টির কথা স্বীকার করেছেন :
“ আপনি অপরের মতের প্রতি লক্ষ্য না করিয়া যে নিজের স্বাধীন মত প্রচার করিতে চেষ্টা করিয়াছেন----আমার মতে তাহা ভালোই করিয়াছেন । আপনি এই সিরিজ শেষ করিয়া যাইতে পারিলে বাঙ্গালা সাহিত্যে প্রকৃতই রিসার্চ করিয়া যাইতে পারিলেন । ”
কিন্তু ‘ রামায়ণের সমাজে’র অর্ধাংশের কিছু বেশি মুদ্রিত হওয়ার পরেই কেদারনাথ প্রয়াত হন । ‘প্রকাশকের নিবেদনে’ নরেন্দ্রনাথ মজুমদার লিখেছেন :
“ তাঁহার স্বহস্তে লিখিত পাণ্ডুলিপি অবলম্বনে অবশিষ্টাংশ মুদ্রিত হইয়াছে । পাণ্ডুলিপির হস্তাক্ষরের অস্পষ্টতা হেতু স্থানে স্থানে মুদ্রণ কার্যে ভুল ভ্রান্তি ঘটিয়াছে । এই ত্রুটি অনিবার্য । গ্রন্থকার নিবেদনে বলিয়াছেন যে একটি শুদ্ধিপত্র প্রদান করা হইল । কিন্তু সেরূপ শুদ্ধিপত্র প্রস্তুত করিয়া যাইতে পারেন নাই । ইহা আমার ক্ষমতার অতীত, আর অপরের দ্বারা সম্ভবপরও নহে ।
গৌরচন্দ্র নাথ কেদারনাথের এই গ্রন্থের নামকরণ সম্বন্ধে একটি নতুন তথ্য যোগ করেছেন । ‘সৌরভ সাহিত্য সংঘে’র উৎস সম্বন্ধে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন :
“ সৌরভ সাহিত্য সংঘের প্রথম অধিবেশনের প্রায় এক ঘন্টা পূর্বে কেদারনাথ আমাকে রামায়ণের সমাজের প্রথম অধ্যায় পড়িতে দিলেন । তখন গ্রন্থের নাম ছিল ‘রামায়ণী সমাজ’ । আমি শিরোনাম দেখিয়াই বলিলাম, রামায়ণী সমাজ কথাটা ব্যাকরণসঙ্গত নহে । কারণ , প্রথম শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গ , দ্বিতীয়টি পুংলিঙ্গ ; গ্রন্থের নাম ‘রামায়ণের সমাজ’ হইলেই ভালো হয় । তিনি তৎক্ষণাৎ আমার হাত হইতে কপি নিয়া ‘রামায়ণী সমাজে’র পরিবর্তে ‘রামায়ণের সমাজ’ লিখিয়া লইলেন । ”
২.
কেদারনাথের ‘রামায়ণের সমাজ’ দুটি ভাগে বিভক্ত । প্রথম ভাগে সাধারণভাবে রামায়ণের বিভিন্ন দিকের আলোচনা আছে। উপক্রমণিকায় ( ১ম অধ্যায়) তিনি রামায়ণকে ধর্ম , কাব্য ও ইতিহাসের ত্রিবেণীসঙ্গম বলেছেন । তাঁর মতে রামায়ণ এক কল্পতরুসদৃশ :
“ রামায়ণ ধর্মগ্রন্থ , রামায়ণ মহাকাব্য , রামায়ণ ইতিহাস । আমরা দেখাইব রামায়ণ প্রকৃতই কল্পতরুসদৃশ । আমরা এই কল্পতরুসদৃশ রামায়ণের নিবিড় শাখা পল্লবাভ্যন্তর হইতে অমৃতফল চয়ন করিতে চেষ্টা করিব । সহৃদয় পাঠক , সেই অমৃত ফলের রসাস্বাদনে আপনাদের অতীত জাতীয় জীবনের প্রকৃত ঐতিহাসিক তত্ত্বের অনুরেণুও কিছু পাইয়াছেন মনে করিলে পরিশ্রম সার্থক মনে করিব । ”
‘রামায়ণের সমাজে’র প্রথম ভাগের মোট অধ্যায় ১২টি। প্রথম অধ্যায় উপক্রমণিকা । দ্বিতীয় অধ্যায়ে কবি ও কাব্যের পরিচয় দেওয়া হয়েছে । লেখকের মতে বাল্মীকির কাব্যের নাম ছিল ‘পৌলস্ত্যবধ’ এবং তাঁর রচনার পরিমাণ অজ্ঞাত । তৃতীয় অধ্যায়ে লেখক বলেছেন বাল্মীকি যেমন আদি কবি নন , তেমনি রামায়ণও আদি কাব্য নয় । চতুর্থ অধ্যায়ে আলোচিত রামায়ণের সমাজ ও রামায়ণের কবির সমসাময়িকতা । পঞ্চম অধ্যায়ে রামায়ণের ছন্দ ও রচনারীতির আলোচনা করা হয়েছে । ষষ্ঠ অধ্যায়ে রামায়ণে আর্ষপ্রয়োগ, সপ্তম অধ্যায়ে রামায়ণের উপাদান , অষ্টম অধ্যায়ে রামায়ণোক্ত ঘটনাসমূহের ব্যাপ্তিকালের আলোচনা আছে ।
রামায়ণে বাল্মীকির রচনার পরিমাণ নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন লেখক নবম অধ্যায়ে । দশম অধ্যায়ে আছে রামায়ণের প্রক্ষিপ্ত রচনার কথা । এই অধ্যায়ে অবতারবাদ নিয়ে মনোজ্ঞ আলোচনা আছে । একাদশ অধ্যায়ের শিরোনাম হল : প্রক্ষিপ্ততায় ক্ষতি কি ? দ্বাদশ অধ্যায়ে বিভিন্ন অঞ্চলে ( ভারত ও ভারতের বাইরে ) রামায়ণ কথার প্রচার ও প্রসার নিয়ে আলোচনা করেছেন কেদারনাথ ।
গ্রন্থের দ্বিতীয় ভাগে রামায়ণের সমাজের আলোচনা আছে মোট সাতটি অধ্যায়ে । প্রথম অধ্যায়টি গুরুত্বপূর্ণ। এতে কেদারনাথ আলোচনা করেছেন রামায়ণের ঐতিহাসিকতা নিয়ে । তাঁর মতে কবির কাব্য নিখুঁত ইতিহাস নয় , তবে তার ভিতর থেকে ঐতিহাসিক উপাদান সংগ্রহ করা যায় ।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে রামায়ণের সমাজধর্ম নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে । যার মধ্যে আছে পণপ্রথা , স্বয়ম্বর প্রথা , বিবাহের বয়স , বিধবার অবস্থা , দেবর-ভাসুর সম্পর্ক , অবরোধ প্রথা , বহুবিবাহ , সতীদাহ প্রথা , সহমরণ , সপত্নী পীড়ন প্রভৃতি ।
চতুর্থ অধ্যায়ে সামাজিক ক্রিয়া ও অনুষ্ঠানের কথা আছে । যেমন – উপনয়ন , আহ্নিকতত্ত্ব , কন্যাসম্প্রদান , মাতৃবাচ্যা ও পিতৃবাচ্যা পরিবার , বধূবরণ , অভিষেক , অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া , শবানুগমন , নবান্ন , পুত্রেষ্টি যজ্ঞ, বাস্তু শান্তি , বলি , প্রত্যুপবেশন , প্রায়োপবেশন ।
পঞ্চম অধ্যায়ে সমাজের দেবতাদের নিয়ে চমৎকার আলোচনা করেছেন লেখক । বেদে দেবতা বলত কি বোঝায়, রামায়ণের দেবতা কারা , শিব অনার্য দেবতা কি না , রামায়ণে ঈশ্বরজ্ঞানের অভাব , লিঙ্গপূজা , পুরাণে ভগবতীর আরাধনা , সূত্রযুগে দেবীকথা প্র্ভৃতি এই অধ্যায়ের বিষয় ।
পঞ্চম অধ্যায়ের আলোচ্য বিষয় আহার্য্য ও আহার । এই অধ্যায়ে ঋষি , সাধারণ মানুষ , বানর , রাক্ষসদের খাদ্য ও পানীয়ের উল্লেখ করেছেন লেখক । তাঁর দুটি মত উল্লেখযোগ্য । প্রথমত রামায়ণের সমাজ চাতুর্বণ্যসমাজের প্রাথমিক অবস্থার সমাজ । এখানে পানীয় হিসেবে মদের ব্যাভিচার ছিল না , যা পরবর্তীকালে মহাভারতের যুগে আমরা দেখতে পাই। দ্বিতীয়ত বৈদিক যুগের শেষভাগে ও কৃষিকাজের বিস্তৃতির জন্য গোরক্ষার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় । সেইজন্যই বোধ হয় তৎপরবর্তীকালের ঋকসমূহে গো-কে ‘অঘ্ন্য’ ও রামায়ণে ‘গোঘ্নে’র অর্থ অন্যরূপ হয় ।
ষষ্ঠ অধ্যায়ের বিষয় সামাজিক নিয়ম ও লৌকিক আচরণ । সপ্তম অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে শাস্ত্রানুশাসন।
৩.
এবার অবতারের কথা । ভাগবতপুরাণ , গরুড়পুরাণ প্রভৃতিতে রামকে বিষ্ণুর অবতাররূপে কল্পনা করা হয়েছে । তুলসীদাস ও কৃত্তিবাসের রামায়ণেও রাম বিষ্ণুর অবতার । কেদারনাথ বলেছেন বাল্মীকির কাব্যে রাম একজন মহৎ মানুষ , কোন অবতার নন । বেদে অবতারের কথা নেই । অবতার কথার প্রথম আভাস পাওয়া যায় শতপথব্রাহ্মণে । সেখানে আছে : মৎস্য মনুকে সাবধান করে দিয়েছিলেন জলপ্লাবনের ব্যাপারে। তদনুসারে মনু মৎস্যের শরণাগত হয়ে সৃষ্টি রক্ষা করেন । শতপথের এই কাহিনি অন্যান্য পুরাণে পল্লবিত হয়ে প্রকাশ পায় ।
কেদারনাথের মতে ব্রাহ্মণ্যগ্রন্থে প্রজাপতির মৎস্য , কূর্ম প্রভৃতি রূপে প্রকাশিত হবার ভাব অপেক্ষা মানব সমাজে ভগবানের অবতাররূপ পরিগ্রহ করে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের ভাব বহু পরবর্তী । গীতায় শ্রীকৃষ্ণের একটি উক্তিকে আশ্রয় করে মহাভারত ও পুরাণগুলিতে বিষ্ণুর অবতাররূপে জন্মগ্রহণের কল্পনা বিকশিত হয় । কালে কালে মূল বাল্মীকি রামায়ণে প্রবেশ করে অনেক প্রক্ষিপ্ত বিষয় । অবতারবাদও এমনিভাবে পরবর্তীকালে প্রবিষ্ট হয়েছে ।
দেবতারা যজ্ঞস্থলে ষজ্ঞভাগ গ্রহণ করতে সমবেত হয়েছেন , এ রকম কলপনা বৈদিক হওয়া অস্বাভাবিক নয় ; আর এরকম সময়ে দেবতাদের মন্ত্রণাও অস্বাভাবিক নয় । কিন্তু সেখানে পৌরাণিক দেবতা ব্রহ্মা-বিষ্ণু প্রভৃতির আবির্ভাব মোটেই স্বাভাবিক নয় । কারণ এই সব দেবতা বেদের দেবতা নন ।
তাছাড়া , দেবতাদের মন্ত্রণার বিষয় ও কার্যপ্রণালী একেবারেই অস্বাভাবিক । বর্ণনাটা এই রকম :
দেবতারা যজ্ঞস্থলে সমবেত হয়ে ব্রহ্মাকে বললেন , ‘ভগবান! আপনার বর লাভ করে রাবণ নামে এক রাক্ষস আমাদের পীড়িত করছে । আপনি তার নিধনের উপায় নির্ধারণ করুন । ’ তখন ব্রহ্মা রাবণ বধের উপায় নির্দেশ করেন । ইত্যবসরে বিষ্ণু সেখানে উপস্থিত হলে দেবতারা তাঁকে রাজা দশরথের পত্নীদের গর্ভে চারভাগে জন্মগ্রহণ করতে অনুরোধ করেন । এর ফলে রাম বিষ্ণুর অর্ধাংশরূপে , ভরত সিকি অংশরূপে , লক্ষণ ও শত্রুঘ্ন মিলিতভাবে বাকি সিকি অংশরূপে আবির্ভূত হন ।
এই বর্ণনার মধ্যে কেদারনাথ ভাবের অসামঞ্জস্য দেখে একে প্রক্ষিপ্ত বলে মনে করেছেন । রামায়ণের ১৫শ সর্গ থেকে ১৮শ সর্গ পর্যন্ত এই রকম প্রক্ষিপ্তভাব বিস্তৃত ।
রাম যে বিষ্ণুর অবতার এ কথা যদি বাল্মীকির কথা হত তাহলে ৯ম সর্গে সুমন্ত্র যখন দশরথকে তাঁর পুত্রপ্রাপ্তির কল্পিত প্রাচীন ইতিহাস বিবৃত করছিলেন , তখনই তার আভাস পাওয়া যেত । কিন্তু সে আভাস পাওয়া যায় নি । যেমন আভাস পাওয়া যায় নি ১২শ সর্গেও । এই সর্গে ঋষ্যশৃঙ্গ রাজা দশরথকে বলেছিলেন তিনি বিক্রমশালী চারটি পুত্রের জনক হবেন । সেখানে বিষ্ণুর অবতারের কোন কথা নেই ।
কেদারনাথ বলেছেন :
“ রামকে অবতার প্রতিপন্ন করিবার ইচ্ছা বাল্মীকির থাকিলে , তাঁহার অন্তরের ভাব রামায়ণের সর্বত্র ফুটিয়া উঠিত । অধ্যাত্ম রামায়ণের কবির মনে সেরূপ ভাব ছিল , তাঁহার গ্রন্থে তাহা ফুটিয়া উঠিয়াছে । কৃত্তিবাসের হৃদয়ে যে প্রকৃতই রাম-সীতা প্রভাব বিস্তার করিয়া বসিয়াছিলেন , তাহার নিদর্শন কৃত্তিবাসী রামায়ণের পাতায় পাতায় বিদ্যমান রহিয়াছে । তাহার প্রভাবে সরল বিশ্বাসী বাঙ্গালি পাঠকের হৃদয়েও কৃত্তিবাসী রাম-সীতা লক্ষ্মী-জনার্দন রূপে আসন পাতিয়া বসিয়া আছেন । বাল্মীকির রাম-সীতা তাঁহার রচনায় আদর্শ দম্পতিরূপে প্রদর্শিত হইয়াছেন । ”
কেদারনাথের মতে ভারতীয় আর্য সাহিত্যে অবতারবাদের কল্পনা প্রাচীন হলেও রামকে অবতাররূপে প্রচার করার ভাব খুব প্রাচীন নয় । বুদ্ধদেব যখন হিন্দুর চিন্তায় অবতারের মধ্যে পরিগণিত হন, রামও তখন অবতার বলে গৃহীত হন । বৌদ্ধযুগের পূর্বে আর্য সাহিত্যে রাম অবতার বলে গৃহীত হন নি ।
৪.
রামায়ণ কি নিছক কবি-কল্পনার ফসল ? না কি এর মধ্যে ঐতিহাসিক উপাদান আছে ?
নিছক কবি-কল্পনা বলে কিছু নেই । কবি হয়তো দাবি করেন যে তিনি অপূর্ববস্তু নির্মাণ করেছেন । কিন্তু সন্ধান করলে দেখা যাবে সেই অপূর্ববস্তুর কোন না কোন উপাদান পৃথিবীতে আছে । একজন শিল্পী পক্ষীরাজ ঘোড়ার ছবি এঁকে দাবি করেছিলেন তিনি এক সম্পূর্ণ নতুন প্রাণীর ছবি এঁকেছেন । কিন্তু আখেরে তাঁর দাবি ধোপে টিকল না । দেখা গেল তাঁর পক্ষীরাজ আসলে পাখি ও ঘোড়ার সম্মিলিত রূপ । বাস্তব জগতের কোন না কোন উপাদান অবলম্বন করে শিল্পী অপূর্ববস্তু নির্মাণ করেন । বাস্তবের অনুকরণকারী বলে দার্শনিক প্লেটো তাঁর রিপাবলিক থেকে শিল্পীদের নির্বাসন দিয়েছিলেন ।
ঠিক একই কথা বলেছেন কেদারনাথ মজুমদার :
“ কাব্য কল্পনার সৃষ্টি হইলেও কল্পনা যে প্রকৃত সৃষ্টিকে বা দেশকালপাত্রকে অতিক্রম করে না , ইহা অস্বীকার করা যাইতে পারে না । স্বপ্ন যেমন দ্রষ্টার চিন্তার বা্হিরের কোন অদৃষ্টপূর্ব অপ্রত্যক্ষ পদার্থের কল্পনা করিতে অসমর্থ , কবিও সেইরূপ তাঁহার কল্পনাকে অবাস্তবের উপর প্রতিষ্ঠিত করিতে পারেন না । আকাশকুসুম কল্পনায় উপনীত হইতে হইলে আকাশর সহিত ও কুসুমের সহিত পরিচয় থাকা প্রয়োজন । ইহার পর এই কল্পনা এই দুই পদার্থের সামঞ্জস্যে অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য হইয়া প্রকাশিত হইতে পারে—ইহা অসম্ভব নহে । ”
রামায়ণের মূল আখ্যানভাগ বাল্মীকি সংগ্রহ করেন নারদের কাছ থেকে । কেদারনাথের সিদ্ধান্ত রাম এবং বাল্মীকি সমসাময়িক মানুষ । বাল্মীকির প্রামাণ্য জীবনী পাওয়া গেলে রামের ঐতিহাসিকতার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যেত । কিন্তু সে আশা আর পূর্ণ হবার নয় । তবে বাল্মীকি রামের জীবনের ব্যাপ্তিকালের কিছু প্রমাণ দিয়ে গিয়েছেন তাঁর কাব্যে :
ক] আদিকাণ্ডে রামের জীবনের ১৫-১৬ বছরের কথা বিবৃত । রামের জন্ম সম্বন্ধে বলা হয়েছে : যজ্ঞের পর ছয় ঋতু অতীত হলে চৈত্রের নবমী তিথিতে পুর্নবসু নক্ষত্রে , রবি-মঙ্গল-শনি-বুধ-শুক্র এই পক্ষগ্রহের মেষ-মকর-তুলা-কর্কট-মীন এই পঞ্চরাশিতে সঞ্চার হলে এবং বৃহস্পতি চন্দ্রের সঙ্গে কর্কটরাশিতে উদিত হলে কৌশল্যার গর্ভে রাম জন্মগ্রহণ করেন ।
খ] অযোধ্যাকাণ্ডে রামের জীবনের আনুমানিক ১ সপ্তাহের কথা বিবৃত হয়েছে ।
গ] অরণ্যকাণ্ডে রামের জীবনের ১৩ বছরের কথা বিবৃত হয়েছে ।
ঘ] কিষ্কিন্ধাকাণ্ডে আনুমানিক ১০ মাসের কথা বিবৃত হয়েছে ।
ঙ] সুন্দরকাণ্ডে আনুমানিক এক মাসের কথা বিবৃত হয়েছে ।
চ] লঙ্কাকাণ্ডে বিবৃত হয়েছে মাসাধিককালের কথা ।
রামায়নের ছয়টি কাণ্ডে বাল্মীকি রামের ৩০-৩২ ( বা, ৪০-৪২) বৎসরের বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন । (ক্রমশ )
৫.
রামায়ণে প্রক্ষিপ্ত রচনার বিচার করেছেন কেদারনাথ । লঘু রামায়ণের রচয়িতা আদি কাণ্ডকে প্রক্ষিপ্ত রচনা বলে মনে করেন, কিন্তু কেদারনাথ সে মত গ্রহণ করেন নি । তবে তিনি মনে করেন যে আদি কাণ্ডের মূল ঘটনাবলি প্রক্ষিপ্ত না হলেও অনেক উপঘটনা প্রক্ষিপ্ত ।
১৫দশ সর্গ থেকে রাম প্রভৃতির জন্মকথার সূচনা হয়েছে । এই পর্বে রাম , লক্ষণ , ভরত , শত্রুঘ্নকে বিষ্ণুর অবতার বলে প্রচার করার চেষ্টা হয়েছে । এই অবতারবাদকে প্রক্ষিপ্ত বলে রা্য় দিয়েছেন কেদারনাথ । তাঁর যুক্তি : ‘ রামকে অবতার প্রতিপন্ন করিবার ইচ্ছা বাল্মীকির থাকিলে , তাঁহার অন্তরের ভাব রামায়ণের সর্বত্র সমানভাবে ফুটিয়া উঠিত । ’ এই সর্গের ৮,৯,১০ শ্লোকে রাম, লক্ষণাদির জন্মের যে লগ্নমান প্রদত্ত হয়েছে , তা প্রক্ষিপ্ত ।
২০ ও ৭৫ সর্গে দশরথের চরিত্রে যে হীনভাব প্রকাশিত হয়েছে , যেখানে তিনি কম্পিত কলেবরে রামের জীবনভিক্ষা প্রার্থনা করেছেন , তা তাঁর ক্ষত্রিয়োচিত চরিত্রের বিরোধী । এই কারণে এই অংশ প্রক্ষিপ্ত ।
৩৮ থেকে ৪৪ সর্গে সগর বংশের বিবরণ দেওয়া হয়েছে । পদ্মপুরাণ , মহাভারত ও রামায়ণে সগর বংশের বিবরণ তিনভাবে বিবৃত হয়েছে । এই কাহিনিটি নিশ্চয়ই প্রাচীন । কিন্তু কপিলের অবতারত্বসহ অনেক ঘটনা প্রক্ষিপ্ত ।
৪৮ ও ৪৯ সর্গে আছে ইন্দ্র-অহল্যা সংবাদ । কেদারনাথের মন্তব্য , ‘রাম যে বিষ্ণুর অবতার তাহা প্রমাণের জন্য এই গল্পটি কল্পিত হইয়াছে । চেষ্টা সফল হয় নাই । কেবল সমসাময়িক সামাজিক রুচিরই পরিচয় দেওয়া হইয়াছে মাত্র । অবতারবাদ কল্পনাটি যেমন ১৮ সর্গে তিনটি মাত্র পংক্তিতে প্রাণহীনভাবে উক্ত হইয়াছে , এই গল্পটিও ঠিক সেইরূপ হইয়াছে । গল্পের কোন স্থানেই উজ্জ্বল ভাব ফুটিয়া উঠে নাই । ’ কেদারনাথ বলেছেন , ‘রামায়ণের এই অহল্যাকথা পুরাণে আছে । পুরাণের পক্ষে এ গল্প পুরাতনই বটে , কিন্তু রামায়ণের পক্ষে তাহা নহে । অহল্যার পুত্র শতানন্দ বিদেহ রাজজনকের পুরোহিত, রাম-লক্ষণাদির বৈবাহিক ব্যাপারের প্রধান কর্মকর্তা । এরূপ সাক্ষাৎ একজন ঋষির মাতার সম্বন্ধে বক্তা বিশ্বামিত্রই বা এসকল অপবাদ কথা প্রকাশ করেন কিভাবে ?’
রামায়ণে জাতিবিদ্বেষের ভাব প্রক্ষিপ্ত । কেদারনাথের মত এই যে রামায়ণের আদি স্তরের রচনায় জাতিবিদ্বেষের ভাব নেই, স্মৃতিতে নিম্নজাতিসমূহের কোন উদ্ভবের আভাস নেই । যে সময়ের ঋষি অযোধ্যার রাজা রামচন্দ্র দ্বারা তাঁরই রাজধানীর অদূরবর্তী নিষাদজাতীয় রাজাকে আলিঙ্গনে বদ্ধ করিয়েছেন , সে সময়ের রচনায় জাতির উচ্চ-নীচ বিষয়ক কোন মাপকাঠি ছিল না , চণ্ডাল বলে কোন শ্রেণি ছিল না ।
হরধনু ব্যাপারটিকে প্রক্ষিপ্ত মনে করেন কেদারনাথ । কারণ বাল্মীকির যুগের দেবতা বরুণ । বৈদিক দেবতা তিনি । বাল্মীকি বরুণের ধনুর কথাই বলতে চেয়েছেন । শৈবমতের প্রভাবে বরুণধনু রূপান্তরিত হয়েছে হরধনুতে ; ঠিক যেমন বৈষ্ণবপ্রভাবে রাম হয়েছিলেন বিষ্ণুর অবতার । বিশ্বামিত্র ও বশিষ্ঠ ঋষির কথা রামায়ণে আছে । কিন্তু কেদারনাথের মতে বিশ্বামিত্র ও বশিষ্ঠ কোন নাম নয় , উপাধি । বেদে তার প্রমাণ আছে ।
৭৪ ও ৭৫ সর্গে রাম ও পরশুরামের কাহিনি আছে । কেদারনাথের ধারণা ব্রাহ্মণ অপেক্ষা ক্ষত্রিয়ের প্রভাব অধিক প্রমাণের জন্য রামায়ণে বশিষ্ঠ-বিশ্বামিত্রের গল্পের মতো রাম-পরশুরামের প্রতিযোগিতার কথা প্রবেশ করানো হয়েছিল । কেদারনাথের উক্তি , ‘ ভারতবর্ষ বিরোধেরই দেশ । দেশে যখন শৈব ও বৈষ্ণব প্রভাব বৃদ্ধি হইয়াছিল , তখন এই উভয় ভক্তদলের মধ্যে ভীষণ প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাইয়াছিল । এই সর্গগুলিতে সেই যুগপ্রভাবের চিহ্ন , রুদ্র-বিষ্ণুর বিরোধের বর্ণনায় প্রকাশিত হইয়াছে । ’
অযোধ্যাকাণ্ডের ১০৮ ও ১০৯ সর্গে বর্ণিত রাম-জাবালির কথাকে প্রক্ষিপ্ত মনে করেন কেদারনাথ । এই কাহিনিতে যে যুক্তিবাদ প্রকাশিত হয়েছে , তা রামায়ণী যুগের ধর্ম হতে পারে না । এতে যুক্তির অবতারণার দ্বারা বুদ্ধের মতকে নিন্দা করা হয়েছে । এক জায়গায় ‘তথাগত’ নামটিও স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে । অযোধ্যাকাণ্ডের অন্যান্য সর্গের ভিতরেও বহু প্রক্ষিপ্ত শ্লোক ও শব্দ প্রবেশ করেছে ।
এর পরে উত্তরকাণ্ডের কথা । এটি যে বাল্মীকির রচিত নয় , তার প্রমাণ পাওয়া যাবে ৪৮ সর্গ পাঠ করলে । শত্রুঘ্ন বাল্মীকির আশ্রমে গিয়ে রামায়ণ গান শুনে এসেছিলেন ; রামায়ণ পূর্বে রচিত না হলে তিনি রামায়ণ গান শুনতে পারেন কিভাবে ?
তাছাড়া , উত্তরকাণ্ডের বহু বর্ণনার সঙ্গে মূল রামায়ণের কোন ঐক্য নেই , যেমন অহল্যা উদ্ধার ।
মহাভারতের বনপর্বে বর্ণিত রামায়ণ কথায়ও উত্তরকাণ্ডের বর্ণিত বিষয়ের কোন আভাস নেই । যাঁরা রামায়ণকে মহাভারতের পূর্বের রচনা বলতে দ্বিধাবোধ করেন , তাঁদের পক্ষে এই বিষয়টি লক্ষ্য করার মতো । আসলে মহাভারতে রামায়ণের কাহিনি গৃহীত হবার পরে উত্তরকাণ্ড রামায়ণে যুক্ত হয় । (ক্রমশ )
৬.
অবতারবাদ , ষষ্ঠীদেবী , ভৌতিক ব্যাপার , তন্ত্র-মন্ত্র , কর্ণভেদ প্রথা, মূর্তিপূজা, সরস্বতীদেবীকে ফুল-ফল দ্বারা নৈবেদ্য প্রদান , বর্ণমালা শিক্ষা প্রভৃতি পরবর্তীকালের অনেক ঘটনা বাল্মীকি রামায়ণে প্রবেশ করেছে । যথোচিত বিচার না করে অনেকে সেইগুলিকে বাল্মীকির রচনা বলে গ্রহণ করেছেন এবং সেইভাবে রামায়ণের ব্যাখ্যা করেছেন । কিন্তু প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন না করলে বাল্মীকির প্রতি অবিচার করা হবে । ভারতীয় সাহিত্যে প্রক্ষিপ্ততার অত্যাচার লক্ষ্য করেছিলেন প্রাচ্যতত্ত্ববিদ বেন্টলি । তিনি বলেছিলেন যে সাহিত্যের জালিয়াতি ভারতে এত অধিক প্রচলিত ছিল যে কোন গ্রন্থ কৃত্রিম আর কোনটা অকৃত্রিম তা বোঝার উপায় ছিল না । ভারতে এমন কোন বিধান নেই যাতে জালিয়াতরা বুঝতে পারে এই interpolation অন্যায় ।
বিলাতের ‘ওয়েস্টমিনিস্টার রিভিউ’ পত্রিকায় এই প্রক্ষিপ্ততার আলোচনা করে বলা হয়েছে :
“ রামায়ণের আদি রচনার ভিতরে যুগে যুগে বহু পরবর্তী সাময়িক চিন্তা ও ভাব প্রক্ষিপ্ত হয়েছে । বিশেষ যত্নের সঙ্গে তা বিচার করে পরিত্যাগ করলে তবেই কবির প্রাচীন মৌলিক সম্পদ লাভ করা যেতে পারে। কিন্তু এই রকম পরীক্ষার ব্যাপার অত্যন্ত কষ্টসাধ্য এবং প্রায় অসম্ভব । ঠিক হোমারের রচনা উদ্ধারের মতো অসম্ভব । ”
ব্যাপারটা অসম্ভব হলেও প্রক্ষিপ্ততা উদ্ধারের চেষ্টা দরকার । কিন্তু ভারতীয়দের মধ্যে সেই চেষ্টা দেখতে না পেয়ে উক্ত পত্রিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে :
“ যখন আদি সংগীতগুলি সংগৃহীত ও গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ হয়েছিল , তখন সেই অকৃত্রিম গাথার সঙ্গে বহু কৃত্রিম গাথাও তার ভিতরে যুক্ত হয়ে যায় । কিন্তু এই যে একটা অন্যায় কাজ হয়েছিল , কোন ভারতীয় সমালোচকই এর সংস্কারের জন্য অনুমাত্র সচেষ্ট হলেন না । ”
মনিয়র উইলিয়ামসও বলেছেন যে বৌদ্ধমতের আলোচনা ও রামের অবতারবাদের মতো বহু পরবর্তী চিন্তা রামায়ণের ভিতর প্রচুর পরিমাণে থাকার ফলে রামায়ণের সময় নিরুপণের চেষ্টা অসাধ্য হয়েছে । তবে সহমরণ প্রসঙ্গে কোন উল্লেখ না থাকায় এবং দাক্ষিণাত্য জনপদে আর্যবসতির চিহ্ন লক্ষিত না হওয়ার ফলে রামায়ণের রচনাকাল সম্বন্ধে একটা সাধারণ ধারণায় উপনীত হওয়া যায় ।
পরবর্তীকালের কবি ও লেখকরা রামায়ণের উপর এই যে প্রক্ষেপ আরোপিত করেছেন , অধিকাংশস্থলেই তাঁরা জাতির অথবা সম্প্রদায়ের ধর্মের অনুকূলে এবং রুচির অনুকূলে তা করেছেন । সেই জন্য তা অনিষ্টকারী হলেও , জাল-জুয়াচুরি হলেও সমাজের প্রতিবাদের বিষয় হয় নি । এরকম কাজকে সমাজ দূষনীয় বলে নির্দেশ করে নি । একে আমরা কৃত্রিম উপায়ে উদ্দেশ্য লাভের চেষ্টা বলতে পারি ।
কেদারনাথ বলেছেন :
“ কৃত্রিম উপায়ে উদ্দেশ্য লাভের যে চেষ্টা , সেই চেষ্টা উচ্চ উদ্দেশ্য লাভে সমর্থ হয় না , বরং তাতে অপকারই হয়ে থাকে অধিক । রামায়ণে পরবর্তীকালের যে সকল সাময়িকভাব প্রক্ষিপ্ত হইয়াছিল , তাহা দ্বারা সমাজ বা সম্প্রদায় সাময়িকভাবে উপকৃত হইলেও রামায়ণের প্রাচীনত্বের গৌরব সাধারণ শিক্ষিত সমাজের নিকট প্রভূত পরিমাণে হ্রাস হইয়াছে এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রক্ষিপ্ত বিষয়সমূহও জগতের সম্মুখে হেয় এবং অর্বাচীন বলিয়া শ্রদ্ধা হারাইতে বসিয়াছে ।
“ রামায়ণের প্রাচীন রচনার ভাব পরিবর্তন ও প্রাচীন রচনার মধ্যে নতূন রচনার সমাবেশ যাঁহারা করিয়াছেন , নিন্দুকের নিকট এবং সাধারণ পাঠকের নিকট রামায়ণের গৌরব তাঁহারাই হ্রাস করিয়াছেন । সাধারণ পাঠক বা ছিদ্রান্বেষী সমালোচকের অপরাধ তাঁহাদের তুলনায় সামান্য । অকৃত্রিমতা গৌরবের এবং সম্মানের নিদান , কৃত্রিমতা তাহার বিরোধী । ”
রামায়ণের প্রাচীন রচনার ভিতরে প্রক্ষিপ্ত রচনা প্রবেশ করানোর ব্যাপারে খুব যে যত্ন ও কৌশল অবলম্বিত হয়েছিল তা নয় এবং তার স্পষ্ট প্রমাণ আছে । সেজন্য প্রক্ষিপ্ত রচনা চিহ্নিত করা খুব কষ্টকর নয় । তাই কেদারনাথ বলেন :
“ যেমন যত্ন , চেষ্টা ও কৌশল প্রয়োগ প্রাচীন ও নূতন ভাবের অভিজ্ঞতা প্রদর্শনে প্রয়োজন , তেমন যত্ন , চেষ্টা ও কৌশল অবলম্বন করিয়া এই সকল পরিবর্তন করা হয় না ; সুতরাং এইরূপ চিন্তাহীনতার পরিচায়ক যে পরিবর্তন ও সংযোজন তাহা সহজেই ধরা পড়ে ।’’
0 Comments