পঞ্চদশ পর্ব(জীবন-দর্শন )
স্বাতী ভৌমিক
দর্শন মানে আমার কাছে নেহাৎ-ই একটা বিষয় নয়, দর্শনের অর্থ আমার কাছে অনেক বিস্তৃত। অনেকখানি বিস্ময়,অজানাকে জানার- অদেখাকে দেখার মানসিক প্রস্তুতি। দৃশ্যমান জগতের ছোটোখাটো নানা ঘটনা থেকে আরম্ভ করে বিশ্বজগতের অতীন্দ্রিয় জগতকে অনুভব করার মুক্ত দৃষ্টিশক্তিপ্রদায়ী জাদুকাঠি হোলো দর্শন।
আজকের পর্বের আলোচিত বিষয় হোলো, জীবন- দর্শন তথা জীবনের পথে চলতে গিয়ে জীবনের যে ভাবরূপ অদ্যাবধি ফুটে উঠেছে তার কিছু রূপরেখা।
বড্ড অদ্ভুত এই জীবন। জগতে আসা,যাওয়া এবং আসা- যাওয়ার মাঝের অধ্যায় গুলোর ঘটমান ক্রমমানতা-সবই অজানা। কিন্তু তাও কত জোর দিয়েই ব্যক্তি বলে-" আমার জীবন"। আমার অথচ আমারই অজানা। শুধু জীবন কেন, শরীর,-তারই বা কতটুকু খোঁজ খবর সঠিক জানতে পারে ব্যক্তি! কতটাই বা নিজের তথা এই "আমার" জীবন- শরীর চলে ব্যক্তির ইচ্ছেমতো! তাও কত অহংকার- কত "আমার আমার" রব চারিদিকে! নিজেই নিজের কাছে এত অজানা-অচেনা অথচ বাইরের জগতের বিষয় সম্পর্কে সবজান্তা কত মন্তব্যই না করে ফেলে ব্যক্তি! আবার দাবিও করে যে, তার বিচারের কাছে সবকিছু কতটা অহেতুক-নগণ্য! এসবই গভীরে ভাবতে গেলে বড় বিস্ময় জাগে। প্রশ্ন জাগে মনে- তাহলে কি চূড়ান্ত বা চরম বলে জড় জগতে আদৌ কিছু আছে? যে যুক্তিতে আজ কোন বিষয়ে সঠিক, পরবর্তীকালে অন্য যুক্তিতে সেই বিষয় বেঠিক হয়ে যায়। আজ ব্যক্তি যা ভাবে, জীবনের পথে চলতে গিয়ে পরবর্তী কোনো পর্যায়ে তার নিজের কাছেই নিজমত পরিবর্তনীয় বলে মনে হয়। জীবনের পথে সহজ ভাবে হেঁটে চলা ব্যক্তিও সময়ের স্রোতে কোনো এক সময় জটিল বলে পরিগণিত হয়। বাধ্য হয় নিজেকে কিছুটা জটিল করে নিতে- জগতে অস্তিত্বের লড়াইয়ে টিকে থাকার জন্য।🍂
বড্ড বিস্ময়কর জীবনের ব্যাপারগুলো।গভীর মননে মান্যতা পায় জীবনের উপলব্ধি। বাক্য সেখানে হেরে যায়। শূন্যতা পায় পূর্ণতার পরিভাষা।"চাই চাই" রব স্তব্ধ হয়ে জাগে গভীর আত্মজিজ্ঞাসা-কে এই আমি? এই শরীর? এই মন? নাকি অন্য কিছু? অতৃপ্তির ছাই চাপা আগুনে তিলে তিলে পুড়ে মরার থেকে সন্তুষ্টির প্রশান্তিতে জীবন কি বেশি মধুর নয়?
জীবনে নানা অন্বেষণের ব্যস্ততার মাঝে ব্যক্তি "প্রকৃত আমি"র খোঁজ নিতেই ভুলে যায়। অন্যের ভিড়ে অনন্যতার কথা ভুলে গিয়ে অন্যের মতো হয়ে বাঁচতে গিয়ে অনেক সময় নিজের সত্তাকেই ভুলে যায় ব্যক্তি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতে একসময় ব্যক্তি সেই নিজের সত্তাকেই খুঁজে ফেরে একটু স্বস্তির শ্বাস নেবার জন্য।
এই জগতে প্রত্যেক জীবনযাত্রা আলাদা উপলব্ধির কাহিনী রচনা করে। কেউ কারোর মতো নয়। সাদৃশ্য,বৈসাদৃশ্যের শ্রেণীবিন্যাসে ব্যক্তি নিজ অভিমত প্রদান করে। কিন্তু বাস্তব ব্যাপার হোলো, ব্যাখ্যা যাই হোক না কেন, ঘটনা ঘটনাই। জীবন যখন শুরু হয়েছে, যে পথেই ব্যক্তি যাক্ না কেন, সব পথ একদিন জীবনের পারে গিয়েই তো মিশবে। তাই দুঃখে,কষ্টে দিশেহারা হয়ে পথ খোঁজার এত প্রয়োজন কি প্রকৃতই আছে! সবাই তো জীবন পথেরই পথিক, পথেই তো ঠিকানা।
তিক্ততার তপ্তশ্বাসে
বাষ্পীভূত স্বস্তি -
বিব্রত জীবনমাঝে,
একি অনাসৃষ্টি!
পথ খুঁজে ফেরে পথিক,
পথের মাঝে হায়!
পথই যে ঠিকানা সবার-
সেই কথাই সে ভুলে যায়।।
ধীর শান্তভাবে পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে স্বীয় জীবনকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জীবনে যেকোনো পরিস্থিতিতে শান্ত থাকাটা খুব প্রয়োজন। তবে এই "শান্ত থাকা" কথাটা শুনতে যত সহজ,প্রায়োগিক দিক থেকে ততটা সহজ কিন্তু নয়। এর জন্য প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস, আত্মজ্ঞান,আত্মসংযম ও আত্মপর্যালোচনার। ব্যক্তির অন্তরে সকল প্রশ্নের উত্তর থাকে। শুধু বাইরের দুনিয়ার চাকচিক্যময়তায় ভুলে না গিয়ে অন্তরের রত্নভান্ডারের দিকে সচেতন দৃষ্টি প্রদানের প্রয়োজন।
সুখ,দুঃখ,শান্তি,সমৃদ্ধি- এই সমস্ত যা কিছু অনুভূতি ও বোধগম্যতার ব্যাপার, এসবের পূর্ণতা শুধু বাহ্যজগতে অন্বেষণ করলে কি পাওয়া যায়! অন্তরের সাহচর্য্য তো এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চাহিদার অতৃপ্ত অনলে সব প্রাপ্তিসুখ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কিন্তু অনুভবের শান্ত- স্নিগ্ধময়তার ছায়ায় জীবন শান্তি খুঁজে পায়।।
ক্রমশঃ...
0 Comments