জ্বলদর্চি

ব্রহ্মসূত্র --- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি/পর্ব ৬/প্রীতম সেনগুপ্ত


ব্রহ্মসূত্র --- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি

পর্ব ৬

প্রীতম সেনগুপ্ত 


আর্য ভারতীয়রা খুবই বলিষ্ঠ ও সাহসিক চিন্তাবিদ ছিলেন। সত্যের তত্ত্ব নির্ণয়ে কারা কোনও কিছুকেই ধর্মবিরুদ্ধ কাজ বলে মনে করতেন না। বেদের মধ্যেই বৈদিক ধর্মাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সন্ধান পাওয়া যায়। যুক্তিবাদের প্রবল বন্যার ফলেই অতি বিরুদ্ধ চার্বাক দর্শনের মতো কতকগুলো মতবাদের আবির্ভাব ঘটে, যেসব দর্শন ছিল অত্যন্ত বস্তুবাদী এবং ধর্ম বিরোধী। লিপিকা চট্টোপাধ্যায় ‘চার্বাক দর্শন’ (রূপরেখা) গ্রন্থে লিখছেন --- ‘ভারতীয় অধ্যাত্মবোধের একক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সূত্র ধরে ভারতের দর্শন নীতির আসরে চার্বাক দর্শন প্রাচীনকাল থেকে তার নিজস্ব আসন সুপ্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছে। ভারতীয় দর্শনের বস্তুতান্ত্রিক বা জড়বাদী ধারার সঙ্গে অভিন্ন সত্তায় চার্বাক মতবাদ সাধারণতঃ আমাদের কাছে প্রতিভাত; কিন্তু কেবল এই পরিচয়েই চার্বাকী চিন্তা পূর্ণরূপে প্রকাশমান কিনা তার বিচারের অপেক্ষা রাখে। ভারতের আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির সঙ্গে গায়ে গা মিলিয়ে ভারতেরই মাটিতে এই মতবাদ স্বীয় বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে বহুদিন ধরে প্রবহমান। ভারতীয় দার্শনিকরা নিজ নিজ মতবাদের রূপায়ণে এই প্রতিপক্ষের কাছ থেকে অনেক ক্ষেত্রেই আপত্তির সম্ভাবনা অনুমান করে যুক্তি তর্কের সাহায্যে সেই আপত্তি খণ্ডনের যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। এ-ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের দ্বন্দ্বের স্বরূপ প্রধানতঃ একপক্ষের আয়োজন থেকে অনুমান করা ছাড়া আমাদের অন্য উপায় নেই, কারণ, অপরপক্ষের আবস্থানের জায়গাটা অন্ধকারে ঢাকা। কিন্তু ‘চার্বাক’ সংজ্ঞায় বিশেষিত এই অপরপক্ষ যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দাঁড়াবার যোগ্যতা রাখে, সমরায়োজনের প্রস্তুতি থেকে তা সহজেই বোঝা যায়। 

ভারতের দর্শন জগতে চার্বাক একটি পরিচিত নাম।... বৈদিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মধ্যে চার্বাক দর্শনের মূলধারার আবির্ভাবের যে ইঙ্গিত পণ্ডিতেরা দিয়েছেন তার উল্লেখ আগেই করা হয়েছে। এই বিদ্রোহের পটভূমিতে চার্বাক সিদ্ধান্তকে বিচার করতে গেলে বৈদিক চিন্তাধারার কিছু পরিচয় প্রয়োজন এবং আমাদের বর্তমান আলোচনা বৈদিক সংস্কৃতির এই প্রয়োজনীয় প্রসঙ্গকে কেন্দ্র করে।🍂

বেদের সংখ্যা চার --- ঋক, সাম, যজুস ও অথর্ব। “ত্রয়” এই নামের মাধ্যমে অবশ্য বেদ বহু ক্ষেত্রে পরিচিত, কারণ, অথর্ব বা চতুর্থ বেদকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে অনেক দেরীতে। প্রত্যেক বেদের আবার তিনটি বিভাগ --- মন্ত্র বা সংহিতা, ব্রাহ্মণ এবং উপনিষৎ। সংহিতা, ব্রাহ্মণ এবং উপনিষদে বিভক্ত বেদ এক  বিপুল সাহিত্য সম্ভার। বৈদিক সাহিত্য হিসাবে এর পরিচিতি এবং যে যুগের পরিধির মধ্যে এই সাহিত্যের সৃষ্টি বৈদিক যুগ বলতে সাধারণতঃ  তাকেই বোঝায়। সূক্ষ্ম বিচারের মাপকাঠিতে কিন্তু কেবল সংহিতা এবং ‘ব্রাহ্মণ’ই বৈদিক যুগের সাক্ষ্য বহন করে, কারণ বৈদিক মন্ত্র এবং ‘ব্রাহ্মণে’র অনুসরণে উদ্ভূত হলেও বৈদিক সাহিত্যের অন্তিম অংশ উপনিষৎ এক ভিন্নধর্মী ভাবের পরিচায়ক, যার অনুবৃত্তি পরবর্তী চিন্তাধারায় সুপরিস্ফুট। এই বিচারের পরিপ্রেক্ষিতে বৈদিক যুগ বিশিষ্ট অর্থে মন্ত্র এবং ‘ব্রাহ্মণে’র যুগকেই বোঝায় এবং চার্বাক দর্শনে বেদ প্রধানতঃ মন্ত্র এবং ‘ব্রাহ্মণ’ পর্যায়ের বৈদিক সাহিত্যের অর্থে ব্যবহৃত।

বৈদিক যুগের চিন্তাধারা মূলতঃ কামনাভিত্তিক। সাধারণ মানুষ সুখ, সম্পদ, ঐশ্বর্য ইত্যাদির অধিকারী হতে চায়। কামনার লক্ষ্য সেই সব বিষয়। বৈদিক যুগের সমস্ত চেষ্টা উদ্দেশ্য প্রথমতঃ এই কামনাগুলির পূর্তি এবং দ্বিতীয়তঃ কামনাপূর্তির পথের অন্তরায়গুলি দূরীকরণ। বৈদিক সংহিতার এই প্রয়াস রূপ পেয়েছে বিভিন্ন দেবদেবীর উদ্দেশ্যে রচিত প্রার্থনার মাধ্যমে। প্রকৃতির বিভিন্ন রূপে দেবত্বের মহিমা আরোপ করে মানুষ তাঁর পূজা করেছে ; দেবতার কাছে তাঁর প্রার্থনা, তিনি যেন তাঁর মঙ্গলময় প্রকাশের মধ্য দিয়ে সর্বদা আবির্ভূত হন এবং রুদ্ররূপকে সংবরণ করে ইন্দ্রদেবতার কাছে তার কামনা বৃষ্টি, কিন্তু সেই সঙ্গে এই অনুরোধও আছে যে দেবতা যেন সংহাররূপী ঝড়কে সঙ্গী না করেন। এই প্রার্থনা ছাড়া মানুষের কামনা পূর্তির উদ্দেশ্য সাধনের অঙ্গ হিসেবে যজ্ঞ ইত্যাদি নানারকম ক্রিয়াকর্মের বিধানও স্থান পেয়েছে সংহিতাতে।’

Post a Comment

0 Comments