কমলিকা ভট্টাচার্য
চতুর্থ খণ্ড
পর্ব ৭: আশার ভিতরে আলো
সময় ধীরে ধীরে এগোতে লাগল। যেন প্রতিটা দিন নিজের ভিতর এক একটা অপেক্ষা নিয়ে আসছে। প্রথম কয়েকটা সপ্তাহ সবাই যেন নিঃশ্বাস বন্ধ করে কাটাল। প্রতিদিন পরীক্ষা, প্রতিদিন রিপোর্ট—প্রতিটি সংখ্যার মধ্যে লুকিয়ে ছিল আশঙ্কা আর আশা।
ডক্টর সেন প্রায়ই এসে নাতাশার অবস্থা দেখতেন। তার চোখে সবসময় হিসেব চলত, কিন্তু কোথাও একটা মানবিক কোমলতাও ধরা পড়ত। একদিন সকালে তিনি রিপোর্ট হাতে নিয়ে হালকা হাসলেন।
“Embryo স্থায়ীভাবে বসে গেছে।”
ঘরের ভিতর যেন হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল। সেই আলো শুধুমাত্র খবরের নয়—একটা নতুন জীবনের নিশ্চিত অস্তিত্বের।
অনির্বাণ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। যেন কথাটা বিশ্বাস করতে পারছে না। এতদিনের ভয়, দুশ্চিন্তা, অনিশ্চয়তা—সবকিছু যেন এক মুহূর্তে থেমে গেল।
নাতাশা মৃদু হেসে বলল—
“দেখলে? আমি বলেছিলাম।”
অনির্বাণ তার হাতটা আলতো করে ধরল। তার স্পর্শে এখনও একটা কাঁপুনি।
“আমি এখনও ভয় পাচ্ছি।”
নাতাশা ধীরে বলল—
“ভয় থাকলেই তো ভালোবাসা থাকে।”
এই কথাটার মধ্যে যেন এক গভীর সত্য লুকিয়ে ছিল।
মাসগুলো ধীরে ধীরে এগোতে লাগল। ঋতু বদলাতে লাগল, আলো বদলাতে লাগল, আর সেই সঙ্গে বদলাতে লাগল নাতাশার শরীর। তার হাঁটা একটু ধীর হয়ে গেল, মাঝে মাঝে ক্লান্তি এসে ভর করত, কিন্তু চোখে একটা অদ্ভুত শান্তি—যেন সে নিজের ভিতরে একটা পৃথিবী ধারণ করে আছে।
এই সময় ইরা যেন পুরো দায়িত্ব নিয়ে ফেলল। ওষুধ খাওয়া, সময়মতো খাওয়া-দাওয়া, হাঁটা, বিশ্রাম—সবকিছুতেই সে নজর রাখে। এমনকি কখনও কখনও সে নিজেই ডাক্তারদের থেকেও বেশি কঠোর হয়ে ওঠে।
একদিন সকালে নাতাশা চুপিচুপি রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছিল।🍂
ইরা দেখেই চিৎকার করে উঠল—
“তুমি এখানে কি করছ?”
নাতাশা হেসে বলল—
“আমি একটু চা বানাব ভাবছিলাম।”
ইরা একেবারে হাত ধরে টেনে বলল—
“না! এখন তুমি শুধু বসে থাকবে।”
নাতাশা মজা করে বলল—
“তুমি তো আমাকে একেবারে বন্দি করে ফেলেছ!”
ঠিক তখন ঋদ্ধিমান পাশ থেকে বলল—
“ডাক্তারের নির্দেশ অনুযায়ী এটা ‘সুরক্ষা ব্যবস্থা’।”
ইরা হেসে বলল—
“দেখলে? সে-ও আমার পক্ষেই আছে।”
নাতাশা হেসে ফেলল। সেই হাসির মধ্যে ছিল স্বস্তি, ছিল নিজের মানুষদের উপর নির্ভর করার নিশ্চয়তা।
ঘরের ভিতর অনেকদিন পর এমন হালকা হাসির শব্দ উঠল। যেন এই হাসিই সবাইকে একটু করে বাঁচিয়ে রাখছে।
কয়েকদিন পরে এক বিকেলে সবাই বাগানে বসেছিল। হালকা বাতাস বইছে, সূর্যের আলো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে পড়ছে। পরিবেশটা শান্ত, কিন্তু তার ভিতরে একটা অদ্ভুত প্রত্যাশা কাজ করছে।
নাতাশা চুপ করে বসে ছিল। হঠাৎ সে একটু চমকে উঠে বলল—
“শুনছ?”
সবাই অবাক হয়ে তাকাল।
“কি?”
নাতাশা নিজের পেটের উপর হাত রেখে বলল—
“মনে হচ্ছে ও নড়ছে।”
অনির্বাণ যেন মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। তার মুখে অবিশ্বাস আর উত্তেজনা একসঙ্গে।
সে ধীরে হাতটা রাখল। কয়েক সেকেন্ড পরে তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
“আমি অনুভব করলাম…”
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
নাতাশা হেসে বলল—
“ওর বাবাকে চিনে ফেলেছে বোধহয়।”
ইরা পাশে বসে মুগ্ধ হয়ে দেখছিল। তার চোখে তখন অদ্ভুত কোমলতা—যেন সে এই মুহূর্তটার সাক্ষী হয়ে নিজেও বদলে যাচ্ছে।
এই সময় মাঝে মাঝে কয়েকজন পুরোনো বন্ধু আর সহকর্মীও দেখতে আসত। তাদের উপস্থিতি বাড়ির পরিবেশকে আরও জীবন্ত করে তুলত।
একদিন তিলকবাবা এলেন। বয়স হলেও চোখে সেই চেনা তীক্ষ্ণতা। তার উপস্থিতিতে যেন এক ধরনের অভিজ্ঞতার ভার এসে পড়ে ঘরে।
নাতাশাকে দেখে তিনি মৃদু হেসে বললেন—
“বিজ্ঞানীরা পৃথিবী বদলানোর চেষ্টা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জীবনই তাদের বদলে দেয়।”
অনির্বাণ হালকা হেসে বলল—
“আপনি আবার দার্শনিক হয়ে গেলেন।”
তিলকবাবা হেসে বললেন—
“নাতির অপেক্ষায় সবাই একটু দার্শনিক হয়ে যায়।”
সবাই হেসে উঠল।
একদিন বিকেলে ইরা একটা ছোট্ট বাক্স নিয়ে এল।
“এটা কি?” নাতাশা জিজ্ঞেস করল।
ইরা বাক্সটা খুলল। ভিতরে ছোট্ট একটা নরম খেলনা—একটা ছোট্ট রোবটের মতো, চোখে ছোট আলো জ্বলে।
নাতাশা হেসে বলল—
“এটা কি ঋদ্ধিমানের ছোট সংস্করণ?”
ঋদ্ধিমান একটু অবাক হয়ে বলল—
“আমার?”
ইরা বলল—
“হ্যাঁ। ভবিষ্যতের বেবি-সিটার।”
সবাই হেসে উঠল।
ঋদ্ধিমান খুব গম্ভীর মুখে বলল—
“আমি কিন্তু এই দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত।”
তার এই গম্ভীর কথাতেও সবাই আবার হেসে ফেলল।
এই হাসি-মজার মাঝেই সময় এগোতে লাগল। প্রতিটা দিন যেন একটু করে সাহস এনে দিচ্ছিল, একটু করে ভয় কমাচ্ছিল।
কিন্তু জীবনের গল্প কখনও একরেখায় চলে না।
একদিন ডক্টর সেন নতুন রিপোর্ট দেখে একটু চুপ করে গেলেন। তার চোখে সেই পুরোনো চিন্তার ছাপ ফিরে এল।
অনির্বাণ সেটা লক্ষ্য করল।
“কিছু সমস্যা?”
ডক্টর সেন ধীরে বললেন—
“শিশুর বিকাশ পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়।”
ঘরের ভিতর আবার নীরবতা। সেই নীরবতা আগের চেয়েও ভারী।
“হৃদযন্ত্র ঠিক আছে,” তিনি বললেন।
“কিন্তু স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ একটু দুর্বল মনে হচ্ছে।”
এই কথাগুলো যেন বাতাসকে ভারী করে দিল।
নাতাশা শান্তভাবে বলল—
“তবু সে বাঁচবে, তাই তো?”
তার কণ্ঠে ভয় নেই—শুধু একগুঁয়ে বিশ্বাস।
ডক্টর সেন ধীরে বললেন—
“আমরা চেষ্টা করব।”
সেই রাতে অনির্বাণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরে অন্ধকার, দূরে শহরের আলো জ্বলছে। তার মনে অদ্ভুত দ্বন্দ্ব—একদিকে অসীম আনন্দ, অন্যদিকে অজানা ভয়।
ঋদ্ধিমান পাশে এসে দাঁড়াল।
“তুমি চিন্তিত।”
অনির্বাণ বলল—
“আমি চাই ওর জীবনটা সহজ হোক।”
ঋদ্ধিমান ধীরে বলল—
“জীবনের শুরু কখনও সহজ হয় না। কিন্তু ভালোবাসা থাকলে পথ তৈরি হয়।”
এই কথাগুলো যেন অন্ধকারের মধ্যে একটা ছোট আলো জ্বালিয়ে দিল।
দূরে ঘরের ভিতরে নাতাশা ঘুমিয়ে আছে। তার মুখে শান্তি, তার শরীরে ক্লান্তি, আর তার ভিতরে বেড়ে উঠছে একটা নতুন জীবন।
যে আসতে চলেছে এই পৃথিবীতে—
আলো নিয়ে, প্রশ্ন নিয়ে, আর হয়তো নতুন লড়াই নিয়ে।
কিন্তু সেই আগমনের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে আরেকটা লড়াই—
জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই।
আর সেই লড়াইয়ে—
ভয় থাকবে, অনিশ্চয়তা থাকবে,
তবু থাকবে একটুখানি আলো—
যার নাম আশা।
0 Comments