জ্বলদর্চি

শচীনন্দন সামন্ত (বৃক্ষমিত্র, শিক্ষক, পাঁশকুড়া) /ভাস্করব্রত পতি

মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২০২
শচীনন্দন সামন্ত (বৃক্ষমিত্র, শিক্ষক, পাঁশকুড়া) 

ভাস্করব্রত পতি

অশ্বত্থ, আম, কদম, খেজুর, তাল, বট, অশোক, শিমুল, পলাশ, ছাতিম, কৃষ্ণচূড়া, নিম, ডুমুর, রাধাচূড়া, সেগুন, বাবলা, চাঁপা, পাকুড়, বেল, শিরীষ, তেঁতুল গাছের সঙ্গে তাঁর সখ্যতা। সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ লক্ষ। এগুলো আসলে বৃক্ষমিত্রের আদরের সন্তান। তাঁর স্নেহস্পর্শে এগুলো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রকৃতির অঙ্গনে। সবুজ ঝলমলে পাতা, রঙ বেরঙের ফুল আর ভিন্ন স্বাদের ফলের সমাহারে ভরা যৌবন তাদের। ক্লোরোফ্লুরোকার্বন আর কার্বন ডাই অক্সাইডের নির্মম আলিঙ্গন থেকে ধরাধামকে রক্ষা করছে এইসব বৃক্ষ বনবাদাড় আর বনাঞ্চলের নির্মল ছায়া। 

'বৃক্ষমিত্র' শচীনন্দন সামন্ত। যাঁর রক্তমাংস শিরা উপশিরা নেফ্রন লিগামেন্ট নিয়ে নিপাট মনুষ্যসুলভ অবয়বের অধিকারী হলেও আসলে যেন তিনি প্রকৃতির অভ্যন্তরে থাকা পাতাঝাঁঝি জলঝাঁঝি অ্যালগি ফানজাই স্পাইরোগাইরা। একজন আদ্যন্ত বৃক্ষপ্রিয় নির্লোভ নির্ভেজাল নিরেট মানুষ। 
অহিভূষণ পাত্রের সাথে বৃক্ষমিত্র শচীনন্দন সামন্ত

বাবা জগন্নাথ সামন্ত এবং মা রুক্মিণী সামন্ত। ১৯৪৩ এর ২৯ শে নভেম্বর পাঁশকুড়ার পশ্চিম চিল্কা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শ্রীরামপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ সম্পন্ন করে পূর্ব চিল্কা লালচাঁদ হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন ১৯৬০ সালে। ঠিক পরের বছর তথা ১৯৬১ তে রামচন্দ্রপুর রাইসুদ্দিন হাইস্কুলে করনিক পদে নিযুক্ত হন। এর ঠিক ছয় মাস পরে রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদের এলডিসি নিয়োগপত্র আসে। কিন্তু পারিবারিক সমস্যার দরুন তিনি সেখানে যোগদান করেননি। ১৯৬৯ এ বি এ পাস করেন। আর ১৯৭১ সালের ১ লা ডিসেম্বর এই স্কুলেই শিক্ষক পদে নিযুক্তি পান। ১৯৭৩ সালে পাঁশকুড়া বনমালী কলেজ থেকে পিজিডিএড পাস করেন এবং ১৯৭৬ সালে বাংলা ভাষা সাহিত্যে এম এ ডিগ্রী অর্জন করেন। একটা লড়াইয়ে সফল হলেন অবশেষে। এরপর দীর্ঘ শিক্ষকতার পর ২০০৩ সালে অবসরগ্রহণ করেন। কিন্তু ইত্যবসরে কেবলমাত্র নিজের স্কুলের পরিবেশে রোপণ করে দিয়েছেন দু'শোর বেশি গাছ। যেসব গাছ আজ মহীরুহ। সেইসব গাছের পাতা ফুল ফল মূল আজ স্কুলচত্বর জুড়ে স্নেহ মমতায় জড়িয়ে রেখেছে এখানকার ছাত্র ছাত্রী, শিক্ষক শিক্ষিকা অভিভাবক অভিভাবকদের। 

শচীবাবুর সংসারে আজ গাছই মূল উপজীব্য বিষয়। গাছের প্রতি এই অমোঘ ভালোবাসার পেছনে ছিল অন্য কারও হাত। তিনি অখণ্ড মণ্ডলেশ্বর শ্রীশ্রীমৎ স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেব। তাঁর বাণী ছিল 'দৃষ্টান্তের শক্তিতে মানুষকে অনুপ্রাণিত করো, বাগ্মীতার শক্তিতে নয়'। তিনিই ছিলেন বৃক্ষমিত্রের দীক্ষাগুরু এবং প্রকৃতিপ্রেমের প্রকৃত শিক্ষাগুরু। ১৯৬৪ সালে গুরুদেবের একটি পত্রিকা হাতে পেয়ে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন। কেশিয়াড়ীর বাসন্তী গ্রামে জনৈক মৃত্যুঞ্জয় জানার বাড়িতে প্রথম সাক্ষাৎ গুরুদেবের সাথে। গুরুদেব বলতেন বৃক্ষরোপনের কথা, শ্যামলিমায় পরিপূর্ণ পরিবেশের কথা। ১৯৬৮ সালে বিহারের পুপুনকিতে গুরুদেবের আশ্রমে গিয়ে  সরেজমিনে দেখেছেন বৃক্ষরোপনের নিদর্শন। সেসময় (১৩৩৪) গুরুদেব এক লক্ষ গাছের বীজ পুঁতেছিলেন পৃথিবীকে সবুজ করে তোলার ভাবনায়। যা তাঁকে বিগলিত করে, আপ্লুত করে, কর্মকুশলী করে তোলে। বাড়ি ফিরে এসে শুরু করেন গাছ লাগানোর মহাকর্ম। যা এতদিন পরেও সমানভাবে বিরাজমান। আজও তাঁর নেশা মাটি খুঁড়ে গাছ পোঁতার কাজের মধ্যেই বিদ্যমান। সেই গাছের গোড়ায় জল দিয়ে, বাঁশের বাখারির বেড়া দিয়ে তাকে সযতনে লালনপালন করার কর্মচঞ্চলতা আজও প্রথম দিনের মতোই প্রতীয়মান। 
শচীনন্দন সামন্তকে নিয়ে প্রকাশিত পুস্তক

একসময় পেটের ভাত জোগাড়ের জন্য খালি পায়ে হাঁটতে হয়েছে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। পথশ্রমে ক্লান্ত মানুষটি তখন দু'দণ্ড জিরোতে আশ্রয় নিতেন পথের প্রান্তে থাকা কোনও গাছের তলায়। সেসময় তাঁর জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লড়াইয়ের বন্ধু ছিল এই গাছগুলি। তাঁদের সেই অবদান তিনি ভোলেননি। একটা গাছ কিভাবে এবং কতভাবে মানুষের সঙ্গী হতে পারে, তা তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তিনি তখন থেকেই মনে মনে আত্মীকরণ করেছিলেন, এই ধরাভূমে গাছের সংখ্যা আরও বাড়ানো দরকার। যাতে আরও বেশি সংখ্যক মানুষ গাছের স্নিগ্ধ ছায়ায় অবগাহন করতে পারে, শরীর জুড়াতে পারে। 

কোথাও কোনও বৃক্ষছেদনের খবর পেলেই তিনি হাজির। বুক পেতে রুখে দাঁড়ান। একদিকে গাছ লাগানো, আর অন্যদিকে লাগানো গাছের পরিচর্যাতেই তিনি তাঁর কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় ব্যায়িত করেছেন অকাতরে। পাশে পেয়েছেন পরিবারের সদস্যদের। সকলের ঐকান্তিক সহায়তায় তিনি হতে পেরেছিলেন গাছেদের বন্ধু। 

তাঁর লাগানো গাছের পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে যখন সূর্যের নরম আলো চুঁইয়ে পড়ে মাটিতে, তখন তিনি তৃপ্তিবোধ করেন। তাঁর লাগানো গাছের ডালে যখন কোকিল, টিয়া, মোহনচূড়া, বুলবুলিদের কিচিরমিচির শোনা যায়, তখন তিনি আপ্লুত হয়ে ওঠেন। আসলে এসবই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্থায়ী উপহার। যা তিনি নিজের হাতে তৈরি করেছেন। এবং এখনও করে চলেছেন। 

শচীনন্দন সামন্তের এই কাজ দৃষ্টান্তমূলক। অনুপ্রেরণামূলক। যা কিনা সমাজ সংসার আর পরিবেশ প্রকৃতিকে রাখতে পেরেছে নির্মলতার ঘেরাটোপে। শুধু নিজের গ্রাম নয়, সারা মেদিনীপুরের কোনায় কোনায় তাঁর হাতে লাগানো গাছ আজ 'বৃক্ষ' হয়ে উঠেছে। বিদ্যালয়ের পরিসর, হাসপাতাল চত্বর, রাস্তার প্রান্ত, রেলওয়ে স্টেশন, সরকারি অফিস, বাসস্ট্যান্ড, নদীর পাড় থেকে বাড়ির বাগান -- সবেতেই তাঁর হাতের ছোঁয়া। 

১৯৯৯ সালে বন ও পরিবেশ মন্ত্রকের অধীনস্থ NATIONAL AFFORESTATION AND ECO DEVELOPMENT BOARD এর প্রতিনিধিরা তাঁর কাছে এসে তার কাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ এবং ছবি তুলে নিয়ে যান। যা পরবর্তীতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মরণিকা 'One Man Mission In Afforestation And Eco Development : A Case Of Success' শীর্ষক এক লেখায় গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়। সেটিই হয়ে ওঠে টার্নিং পয়েন্ট। সারা দেশের বিদগ্ধ মানুষজন জানতে পারেন শচীনন্দন সামন্তের কীর্তি। 

তাঁর এই কীর্তিকে মান্যতা দিয়ে ভারত সরকারের বন ও পরিবেশ দপ্তর গত ২০০২ সালের ১৬ ই সেপ্টেম্বর তাঁর সেই গাছ লাগানো হাতে তুলে দিয়েছে 'ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী বৃক্ষমিত্র পুরস্কার ২০০০'। যা তাঁর কাজের ক্ষেত্রে এক অনন্য স্বীকৃতি। এই পুরস্কার বাবদ পেয়েছিলেন ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু তিনি তা গুরুদেবের আশ্রমে গিয়ে দান করে এসেছিলেন। যেখানে তিনি পেয়েছিলেন বৃক্ষরোপণের অনুপ্রেরণা। এছাড়াও ২০১১ তে পেয়েছেন নারায়ণ চৌবে পুরস্কার। 

চাকরিরত অবস্থায় বেতনের টাকায় গাছ লাগাতেন। এখন অবসরের পর পেনশনের টাকায় সবুজ বিপ্লবের ঘেরাটোপে আবদ্ধ। আর গাছ লাগানোর প্রয়োজনীয়তা জনগনকে বোঝাতে নিজেই লিফলেট 'প্রকৃতি ঋণ' ছাপিয়ে বিতরণ করছেন জনগণের কাছে। বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করতে 'বৃক্ষমিত্র' নামে একটি পুস্তিকাও লিখেছেন শচীনন্দন সামন্ত। তাঁকে নিয়ে 'গাছের ঠাকুর' নামে একটি জীবনীগ্রন্থ লিখেছেন বীতশোক পট্টনায়ক এবং অমরাবতী হোসেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন, যেন ভারতের প্রতিটি মানুষ সারাজীবনে অন্তত ১৫ টি করে গাছ লাগাক। এটিই ভারতের একটি আইন হিসেবে চিহ্নিত করা হোক। পাশের দেশ বাংলাদেশেও তিনি গিয়েছেন গাছ লাগানোর বার্তা প্রচারে। 

তিনি মানেন তাঁর গুরুদেবের কথা। তিনি বুঝেছেন, গুরু বিনে কি আর গন্তব্যের হদিস মেলে? মহাপুরুষের আশীর্বচনেই উদ্ভাসিত হয় জীবনের চলার পথ। যা আসলে কারও কাছে বিভূতি লাভ, কারও কাছে প্রেরণা। আর তিনি দুটোই পেয়েছেন। শষ্য শ্যামলা এই ধরাভূমির রক্ষাকর্তা তো বৃক্ষরাজীই। মানুষ যখন নির্বিচারে বৃক্ষছেদনে রত, তখন তিনি যেন গাছেদের জীবন বাঁচানোর দূত। গাছেদের বন্ধু। বৃক্ষমিত্র।
🍂

Post a Comment

0 Comments