জ্বলদর্চি

ছোটবেলা বিশেষ সংখ্যা : ২০৪

ছোটবেলা বিশেষ সংখ্যা : ২০৪ 
সম্পাদক : স্বাগতা পাণ্ডে 
চিত্রগ্রাহক: অমিতাভ সামন্ত

সম্পাদকীয় 

প্রিয় বন্ধুরা, 
কেমন আছো সবাই ?  দুসপ্তাহ হলো তোমাদের জন্য নতুন ক্যুইজ বিভাগ শুরু হয়েছে। কেমন লাগছে তোমাদের ? সবার নিশ্চয়ই স্কুল ছুটি পড়ে গেছে , কি করছো সবাই ছুটি তে, জানিও কিন্তু। মে মাস মানে যেমন রবি ঠাকুরের জন্মমাস,  তেমনই ফেলুদা, প্রফেসর শঙ্কুর রচয়িতা সত্যজিৎ রায়ের ও জন্মমাস। তাই এই ছুটি তে বাড়িতে বসে সত্যজিৎ রায়ের গল্প যেমন পড়বে, সেই সঙ্গে আর একবার গুপী-বাঘা অথবা সোনার কেল্লা ও দেখে নিও কিন্তু।  সবাই ভালো থেকো, এই গরমে  সাবধানে থেকো। আর হ্যাঁ ছবি এঁকে আমাকে পাঠাতে ভুলো না। সবাই আমার অনেক ভালবাসা নিও। 
ইতি - তোমাদের স্বাগতাদি।
পুণ্যজা পঞ্চাধ্যায়ী। lশ্রেণি-৫ সেকশন  - ডেল্টা , বিদ্যাসাগর শিশু নিকেতন, মেদিনীপুর


হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ 
অমিত কুমার রায়

বাবা বলল,  আজ পঁচিশ বোশেখ রবির জন্মদিন 
গল্প কবিতা নাটক আজ চলবে সারাদিন।
'গঙ্গা জলে গঙ্গা পুজো' মা বলল হেসে।
'এটাই ভালো' বললো বাবা দীর্ঘ একটা কেশে।
বেলি জুঁয়ের মালা গেঁথে পরায় দিদি মালা,
রবির ফটোয় চন্দন ফোঁটা ধূপ বাতিতে আলা।
বললো দিদি,  যা ছুটে আন সহজ পাঠের বই,
আজকে সভায় ফুল হয়ে সব আমরা ফুটে রই।
আসলো দাদু কাবুলিওলা দিদি সাজে মিনি,
ডাকঘরের আমি অমল সুধা হবে বিনি।
বাড়ির সামনে তরুছায়া বাড়িয়ে শাখার হাত
আমি দেখি অবাক চোখে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ।
দাদা এসে টেবিল রাখে বটবৃক্ষ তলে
পাড়ার যতো কচিপাতা সবুজ হয়ে জ্বলে।
আফ্রিকা বেশ আবৃত্তি করে সূর্য নামে তরুণ 
'হে নূতন দেখা দিক আরবার...." গাইল বেশ অরুণ।
কতো চরণ কতো ধরন ভেবে অবাক হই,
রবীন্দ্রনাথ' ঈশ্বর', 'ছায়াতরু ' প্রশ্ন মনে বই।
বাবা বলেন বন্ধু সখা, মায়ের আছে মর্মে
দাদু বলেন ঈশ্বর তিনি সকল কাজে কর্মে।
সুখে দুখে শক্তি সাহস শিক্ষা জ্ঞানে চেতনা 
মানুষ হবার মন্ত্র তিনি আজও তিনি প্রেরণা।
বৃক্ষ-তরু দাঁড়িয়ে আছে শাখায় শাখায় বাড়ায় হাত
দেখি আমার হৃদয় মাঝে বসে  হাসেন রবীন্দ্রনাথ।
গল্প (ছোটদের জন্য)   
হাতে হাত রাখো   
অসিতবরণ বেরা   

কাছে দূরে চার-পাঁচটি গ্রাম। একটা নদীর দুপাশে গ্রামগুলি। নদীর ধারে একটি প্রাইমারি স্কুল। গ্রামগুলি থেকে খুব বেশি হলে জন পঞ্চাশ ছাত্রছাত্রী আসে। একজন শিক্ষক ও একজন শিক্ষিকা চারটি ক্লাসে পড়ান। স্কুলটির দেওয়াল ইটের গাঁথনির, কিন্তু টিনের ছাউনি। দূর থেকেই ছাত্রছাত্রীদের জোরালো আওয়াজ পাওয়া যায়। আজ ব্যাপারটা উল্টো হল। বাইরে লোকজনের চেঁচামেচি। তারা স্কুলের দিকে ছুটে আসছে।    

যারা ছুটে আসছিল তারা বলছিল,"ওরে খোকা, ওরে খুকি একছুটে বাড়ি চল। প্রবল ঘূর্ণি ঝড় আসছে।"    

ঊর্ধ্বশ্বাসে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে শিক্ষকশিক্ষিকাও যে যার বাড়ির দিকে দৌড়াতে লাগল। কেবল দৌড়াল না পাঁচ-ছ'টি ছেলে। তাদের বাড়ি নদীর ওপাশে দু-তিন কিলোমিটার দূরে। রোহিত বলল,"সিরাজ, উমেশ, বিরাম মান্ডি, জন, হপন মাঝি, শিগ্গির আয়, এই দুটো ভারি টেবিল দেওয়ালের সঙ্গে লাগা।"       

সবাই হাত লাগিয়ে তাই করল। রোহিত রুদ্ধশ্বাসে বলল,"আয় এবার টেবিলের তলায় বসে পড়ি। একসাথে। জড়াজড়ি করে। কেউ ভয় পাস না।"    

কথা শেষ হতে-না-হতেই সোঁ-সোঁ শব্দ। মুহূর্তের মধ্যেই ঝড়ের দাপাদাপি।  একটু পরেই স্কুলের টিনের চাল উড়ে গেল। শূন্য ছাদ দিয়ে গাছের ডালপালা পড়তে লাগল। ইটের দেয়াল মিনিট দুই যুঝার পর পড়ে গেল। দেয়ালের একটা অংশ এসে পড়ল টেবিলের উপর।     

আর দু-এক মিনিটের মধ্যেই ঘূর্ণি ঝড় থেমে গেল। কিছুক্ষণ পরে হইহই করে গ্রামের লোকজন ছুটে এসে ভাঙা দেয়াল সরিয়ে ছেলেদের উদ্ধার করে। টেবিলের তলায় তখনও ছেলেগুলো গলা জড়িয়ে হাতে হাত ধরে বসেছিল।
গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ 

পর্ব : কুড়ি 

রতনতনু ঘাটী 

দেবেন মহাপাত্র জেঠুদের বাড়ির উঠোনের একপাশে একটা লম্বা শতায়ু গাছ আছে। লম্বা নেই-নেই করে প্রায় তিরিশ ফুটের মতো তো হবেই। লোকন গাছটায় কখনও ফুল ফুটতে দেখেনি। গাছটার এরকম নাম শুনলে লোকে ভাবে, গাছটা বোধ হয় একশো বছর আয়ু। আবার কেউ-কেউ ভাবে, এতদিন যখন ফুল ফোটেনি, তখন হয়তো একশো বছর বয়স হলে তবেই ওই গাছে ফুল ফুটবে।

    দেবেন মহাপাত্র জেঠুর খুব গাছের শখ। নবীনগঞ্জ জেলা-শহরের ফুটবল স্টেডিয়ামে প্রতি বছর পুষ্পমেলা বসে আষাঢ় মাসে। এক বছর ওই পুষ্পমেলা থেকে গাছটার অত সুন্দর নাম শুনে চারাটা কিনেছিলেন দেবেনজেঠু। ‘কিশলয়’ নার্সারির লোকটা বলেছিল, ‘একবার ফুল ফোটার পর গাছটা মরে গেলে কিন্তু চিন্তা করবেন না স্যার! আবার গাছের গোড়া থেকে পাতা বেরোবে। ফের ফুল ফুটবে! হয়তো খানিকটা সময় লাগবে!’

   ফুল নাই ফুটুক, সকাল সাড়ে ন’টার সময় গাছটার লম্বা ছায়া এসে পড়ে লোকনদের উঠোনে তুলসী মঞ্চের গা ঘেঁষে। তখন লোকন বুঝে যায়, এবার স্কুলে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। এবার স্নান করতে যেতে হবে দক্ষিণ পুকুরে। এই ছায়াটাকে লোকন বলে ‘ছায়া-ঘড়ি’। স্নান করে ফিরে লোকন দেখবে, দিদি তার জন্যে ভাত বেড়ে বসে আছে। দিদি দৃষ্টিহীন হলে কী হবে, সব কেমন করে যেন দেখতে পায়। আগুনে, উনুনে শুধু রান্নাটা করতে পারে না। বাবা বেঁচে থাকতে বলে দিয়েছিল পারুলমণিকে, ‘তুমি কখনও উনুনের কাছে যাবে না!’ 

   রাধাপিসি সকালে এসে লোকনদের রান্না করে দিয়ে যায়। দিদি বেড়ে না দিয়ে আবার লোকনের পেট ভরে না। দিদিকে বছরখানেক আগে একদিন লোকন বলেছিল, ‘দিদি, আমার জন্যে তুই রাধাপিসিকে ভাত বেড়ে রাখতে বলিস না তো! তোর হাতের বাড়া ভাত না খেলে আমার পেট ভরে না রে দিদি!’

   আজ তাড়াহুড়ো করে স্নান করে ফিরে লোকন দেখল, গায়ে যতই জ্বর থাকুক না কেন, দিদি কখন উঠে ঠিক ওর জন্যে ভাত বেড়ে বসে আছে। খেতে বসে লোকন বলল, ‘দিদি, আজ আমাদের স্কুলে আমার ক্রিকেট কোচিংয়ের প্রথম দিন, ভুলে গেছিস নাকি? তুই তো আগে থেকে বলে রেখেছিস, প্রথম দিন আমার ক্রিকেট খেলা দেখতে যাবি! তারপর ধুম জ্বর বাধিয়ে বসে আছিস! তবে থাক! তোকে অত জ্বর নিয়ে মাঠে যেতে হবে না দিদি! আমি চলে গেলে, পরে তুই গায়ে-মাথায় জল দিয়ে ভাত খেয়ে নিস।’ ভাত খেতে-খেতে লোকন বলল, ‘জানিস দিদি, আজ দেবোপমস্যার আমাকে ব্যাট করতে দিলে আমি একটা হলেও ছক্কা মারব! বাড়ি এসে তোকে বলব সব।’

   লোকন স্কুলব্যাগটা নিয়ে পারুলমণিকে বলে দৌড় দিল স্কুলের দিকে। পারুলমণি উঠোনে তুলসীতলায় এসে আকাশের দিকে হাত তুলে প্রণাম করে বাবার উদ্দেশে বলল, ‘বাবা, তুমি তো আকাশে মেঘের দেশে চলে গেলে? ভাইয়ের ব্যাটিং দেখতে পেলে না। তুমি ভাইকে আজ অন্তত একটা ছক্কা মারার শক্তি দিও!’

   তখনই মনে-মনে পারুলমণি ঠিক করে নিল, গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট কোচিং শুরু হয় তো শনিবারের হাফ-ডে স্কুলের  ছুটির পর। তার আগে পারুলমণি হাতড়ে হাতড়ে ঠিক পৌঁছে যাবে গগনজ্যোতি স্কুলের মাঠে। চুপিচুপি। ভাইকে জানাবেই না। 

   লোকন স্কুলে গিয়ে ক্লাস রুমে ব্যাগটা রেখে ছুটল ক্রীড়াকৌমুদী রুমে। দেখল, দেবোপমস্যার ব্যাট-বল গুছিয়ে রাখছেন। আজ কোচিং আছে না? তাই এখন থেকেই স্যারের ব্যস্ততা। লোকন জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, আমি আজ কোচিংয়ে জয়েন কবর তো?’

   স্যার হেসে বললেন, ‘করবে না কেন? তোমাকে যে ব্যাটটা গিফট করেছি, সেটা ক্রীড়াকৌমুদী রুম থেকে নিয়ে যেও কোচিংয়ের সময়। আজ ব্যাটিংয়ে সকলকে চমকে দিতে হবে কিন্তু, মনে রেখো লোকন! না হলে দেবক মেজদির বিয়েটা সেরে মধুপুর থেকে ফিরে এসেই তার প্লেসটা নিয়ে নেবে যে? ’ 

   আজ ঘন্টিদাদু মনে হয় হাফ-ডে’র ছুটির ঘন্টা বাজাতে ভুলে গেছেন। না হলে এক-একটা ক্লাস অমন লম্বা হয়ে যাচ্ছে কেন? লোকন ক্লাস রুমে বসে ছটফট করছিল, কখন চারটে ক্লাস শেষ হবে? দেখতে-দেখতে সত্যি-সত্যি হাফ-ডে ছুটির ঘন্টা বেজে উঠল। মনে-মনে ঘন্টিদাদুকে বলল, ‘ওগো সম্মতিচরণদাদু, তুমি হাফ-ডে ছুটির ঘন্টা বাজাতে যে ভুলে যাওনি, সেই জন্যে তোমাকে প্রণাম!’ 

   হইহই করে ক্লাস এইট সি এবং ডি-সেকশানের ক্রিকেটাররা মাঠে এসে হাজির। লোকনও দেবোপস্যারের কাছ থেকে উপহার পাওয়া ব্যাটটা নিয়ে টংটং করে মাঠে চলে এল। সি-সেকশানের সুরথ দিন্দা দেবোপমস্যারের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, আমাদের দেবক সাহা তো এখনও ফেরেনি? আমরা কি একজন কম ক্রিকেটার নিয়ে খেলব আজ?’

   তখন দেবোপমস্যার সকলকে শুনিয়ে বললেন, ‘তোমাদের দেবক তো ছুটি নিয়ে মধুপুরে দিদির বিয়েতে গিয়েছে। পনেরো দিনের ছুটি ইয়ে গেছে। ও না ফেরা পর্যন্ত তোমাদের টিমে প্র্যাকটিস করবে লোকন দাস।’

   তাই সকলেই স্যারের কাছ থেকে শুনে নিল, আজ দেবকের জায়গায় খেলবে লোকন দাস। তাহিরা দত্ত লোকনের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘কী রে লোকন, এটা তোর নতুন ব্যাট? কবে কিনলি? ‘মাই স্পোর্টস’ দোকান থেকে কিনেছিস?’

   ‘আমাকে ব্যাটটা দেবোপমস্যার প্রেজেন্ট করেছেন। আমার দিদির কি আর ব্যাট কিনে দেওয়ার মতো টাকা আছে নাকি?’

   লোকনের হাত থেকে ব্যাটটা নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখল তাহিরা। দেবোপমস্যার ক্রিজে দাঁড়িয়ে তক্ষুনি ঘোষণা করলেন, ‘আজ আর টস হবে না। প্রথমে এইট সি-সেকশান ব্যাটিং করবে। ডি-সেকশান করবে বোলিং। তাহিরা আর লোকন ব্যাট করো প্রথমে। পজিশন নিয়ে নাও। দু’জনে চটপট ক্রিজের দু’ দিকে দাঁড়িয়ে পড়ো!’ 

   এ-সেকশানের রোরো মজুমদার উইকেট বসাচ্ছিল ক্রিজে। স্যার তাগাদা দিলেন, ‘রোরো, তাড়াতাড়ি করো!’ ডি-সেকশান, তোমরা প্রথমে বোলিং করবে। প্রথমে বল হাতে নাও সাদিয়া। তুমি বল করো লোকন দাসকে। ক্রিজের ওদিকে বোলিং করতে যাও চন্দ্রেশ সূত্রধর।’

   আজও মাঠের একধারে গোটা পাঁচেক চেয়ার পেতে দিয়েছেন ঘন্টিদাদু। অলরেডি হেডস্যার এসে হাতল-দেওয়া চেয়ারে বসে পড়েছেন। তাঁর পাশের চেয়ারে বসেছেন মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি। তিনি কখন চলে এসেছেন! বড় ক্রিকেট-পাগল মানুষ! তক্ষুনি অন্য চেয়ার দুটের দিকে চোখ চলে গেল লোকনের। দেখল, একটা চেয়ারে বসেছেন বাংলার গীতিকাম্যাম। তাঁর পাশের চেয়ারের দিকে তাকিয়ে লোকন অবাক হয়ে গেল। এ কী, পাশের চেয়ারটায়  বসে আছে তার দিদি পারুলমণি! চমকে গেল লোকন। ওমা, দিদি কখন একা-একা বাড়ি থেকে অতখানি পথ হাতড়ে-হাতড়ে চলে এসেছে স্কুলের মাঠে? গায়ে অত জ্বর ছিল যে? নিজের মনেই বলল, দাঁড়াও, খেলাটা শেষ হোক। আজ দিদিকে বকে দিতে হবে খুব করে!

🍂

   দেবোপমস্যার বললেন, ‘আজও আমাদের তিন বলের প্রতিটা ওভার হবে। প্রথমে ব্যাট করবে লোকন।’

   মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি গলা নিচু করে হেডস্যারকে বললেন, ‘আমি লোকনের খেলা কিন্তু কখনও দেখিনি। ও তো আজই প্রথম কোচিংয়ে এসেছে? দেখি ছেলেটা কেমন শুরু করে!’

   হেডস্যর বললেন, ‘হ্যাঁ। ক্লাস এইট সি-সেকশানের দেবক সাহা মেজদির বিয়ের জন্যে ছুটি নিয়ে গেছে। ওর দিদির বিয়ে এখানে নয় তো! সুদূর মধুপুরে। তাই দেবকের জায়গায় লোকনকে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছে দেবোপম। আমি না করিনি। লোকনের দিদি পারুলমণি আমার কাছে একদিন অনুরোধ করতে এসেছিল, ওর ভাইকে যাতে ক্রিকেট টিমে নিই। খন টিম তৈরি হয়ে গেচে। টিম একবার তৈরি হয়ে গেলে হুটহাট টিমে কাউকে নেওয়া যায় না। অথছ, দৃষ্টিহীন মেয়েটার অনুরোধ রাখতে পারলাম না বলে আমার মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তারপর দেবক ছুটি নিয়ে চলে গেল। সেই জায়গায় লোকন চান্স পেয়ে গেল!’

   মুকুলকৃষ্ণবাবুর মনে ধরল কথাটা। ঘাড় নাড়তে লাগলেন। ততক্ষণে ক্রিজে দাঁড়িয়ে লোকন ব্যাটটাকে জড়িয়ে ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রণাম করল বলে মনে হল। সকলের গলায় আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ল গোটা মাঠে। মাঠে আজ কেন যেন অনেক দর্শক। কেমন করে আন্দাজ করে পারুলমণি বুঝে গেল প্রথম বলটা এবার খেলার জন্যে তৈরি হয়েছে লোকন। সাদিয়া ক্রিজে অনেকটা দৌড়ে এসে বল করল লোকনকে। ঘূর্ণি বল করতে ওস্তাদ সাদিয়া। সকলেই জানে! আগে থেকে বলটা কোন দিকে ঘুরবে বোঝা যাচ্ছিল না। লোকন সপাটে বলটাকে মেরে আকাশ পথে পাঠিয়ে দিল একেবারে বাউন্ডারির বাইরে!

   সঙ্গে-সঙ্গে মুকুলকৃষ্ণবাবু দু’ হাত তুলে আম্পায়ারের ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘ছক্কা!’ তারপর হেডস্যারের দিকে তাকিয়ে মুকুলকৃষ্ণবাবু বললেন, ‘দেখলেন তো, কেমন কায়দা করে বলটা মারল লোকন? একদম ঠিক বৈভবের ঢঙে। এ বছর সাত এপ্রিল গুয়াহাটিতে মুম্বই ইন্ডিয়ান্স বনাম রাজস্থান রয়্যালসের ম্যাচটা আমি টিভিতে দেখেছি। ঠিক এরকমই ঘটনা ঘটেছিল। আই পি এল ম্যাচে রাজস্থান রয়্যালসের পনেরো বছর বয়সি ক্রিকেটার বৈভব সূর্যবংশী মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের বোলার জসপ্রিত বুমরাহকে ওভারের প্রথম বলেই ছক্কা মেরেছিলেন। ওঃ! সত্যিই দেখার মতো ছিল সেই ওভার বাউন্ডিরিটা। আপনি ওই খেলাটা দেখেননি মনে হয় স্যার?’

   ততক্ষণে মাঠের ওপার থেকে বলটা দর্শকরাই পাঠিয়ে দিল বোলার সাদিয়ার কাছে। চারদিক থেকে চিৎকার শোনা গেল, ‘ছক্কা! ছক্কা!’ পরের বলটা আবার একই ভঙ্গিতে ঘূর্ণিবল করল সাদিয়া। লোকনকে যেন অলীক শক্তি ভর করেছে আজ। আবারও সজোরে বলটাকে আকাশে উড়িয়ে দিল লোকন। আবারও ছক্কা! এবার চিৎকার শুনে কী বুঝল পারুলমণি কে জানে! চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে লাগল, ‘ভাই, ছয় মার। আরও জোরে! আরও জোরে!’

   মুকুলকৃষ্ণবাবু চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। হেডস্যারের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘স্যার দেখলেন, লোকনের পাঠানো বলটা কোথায় গিয়ে পড়ল?’

   এবার যেন সাদিয়া খানিকটা ঘাবড়ে গিয়েছে। সাদিয়ার তিন বলের ওভারের এবার লাস্ট বল। সে মনে-মনে ভেবে নিল আর ঘূর্ণি বল নয়। এবার ফুলটস বল দেওয়ার চেষ্টা করল সাদিয়া। এবারও লোকন উইকেট কিপার অর্ক ধাড়ার মাথার উপর দিয়ে বলটাকে পাঠিয়ে দিল। বল চলে গেল বাউন্ডারি সীমানা টপকে। এক ওভারে লোকনের ষোলো রান হয়ে গেল। 

   পরের ওভারের বল করতে তৈরি হল চন্দ্রেশ সূত্রধর। এবার ব্যাট হাতে তুলে নিল তাহিরা। মুকুলকৃষ্ণবাবু দেবোপমস্যারকে গলা তুলে বললেন, ‘দেবোপম, তোমার ক্রিকেট কোচিংয়ের সেরা আবিষ্কার হল লোকন। দেখো, ও একদিন দারুণ ক্রিকেট খেলবে! তোমাদের ফাইনাল খেলায় লোকনই হবে ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’!—এই আমি বলে রাখলাম!’

   এবার চন্দ্রেশ সূত্রধরের ওভারের প্রথম বল। তাহিরা ঠিকমতো বলটা দেখতে পেল না মনে হল। উইকেটের পাশ দিয়ে বলটা চলে গেল উইকেট কিপার অর্ক ধাড়ার হাতে। এবার দ্বিতীয় বল খেলল চন্দ্রেশ। স্পিন বল। তাহিরা কোনও রকমে ব্যাটটা ঠেকাল। বলটা গড়িয়ে চলে গেল ফিল্ডারের হাতে। না, এই বলেও রান নিতে পারল না তাহিরা। 

   দেবোপমস্যার রাগ দেখিয়ে বললেন, ‘তাহিরা, তুমি দু’-দু’টো বলে একটাও রান করতে পারলে না? ওরকম খেললে হবে না তাহিরা। তোমাকে মেয়েদের বিশ্বকাপ দলের শেফালি বর্মার মতো আক্রমণাত্মক ব্যাটি করতে হবে। পাওয়ারপ্লেতে শেফালি বর্মার বিধ্বংসী ব্যাটিং দ্যাখোনি টিভিতে?’

   তখনই মাঠে নেমে ক্রিজের কাছে এসে মুকুলকৃষ্ণবাবু বললেন, ‘শোনো তাহিরা। আমাদের ইন্ডিয়ান ক্রিকেটের শেফালি বর্মার কথা তোমাকে বলি। আট বছর বয়সে শেফালির ক্রিকেটে হাতেখড়ি। কিন্তু হরিয়ানার প্রত্যন্ত গ্রামে মেয়েদের ক্রিকেট খেলার চলই ছিল না। বাবা সঞ্জীব বর্মা তাঁকে ছেলে সাজিয়ে মাঠে খেলতে পাঠাতেন ছেলেদের সঙ্গে। দাদাদের সঙ্গে দিব্যি ছেলে সেজে ছেলেদের টুর্নামেন্টেও খেলতে যেতেন। তাঁর বাবা মেয়ের চুল ছেলেদের মতো ছোট করে কেটে দিয়েছিলেন। ছদ্মবেশে স্থানীয় অ্যাকাডেমিতে যাতে কোনও সমস্যা না হয়, তাই তাকে তার ভাই সাহিল বর্মার নামে ‘ছেলে’ হিসেবে ভর্তি করানো হয়েছিল। স্ট্রাগলটা একবার ভেবে দ্যাখোদিকি?’

   মুকুলকৃষ্ণবাবুর কথায় তাহিরার চোখ-মুখ যেন জ্বলে উঠল। দেখে মনে হল, এবারের বলটা প্রাণপণ শক্তি দিয়ে খেলবে, এমন ঝলক চলকে উঠল তার চোখে-মুখে। ভীষণ জোরে বল করল চন্দ্রেশ। চন্দ্রেশের বলে বেশির ভাগ সময় অদ্ভুত একটা গুগুলি লুকিয়ে থাকে। এবারও তেমনই ছিল। তবু মরিয়া হয়ে তাহিরা ব্যাট চালাল। এবার আর ব্যাট ফসকে গেল না। বলটা উইকেট কিপারের মাথার উপর দিয়ে চলে গেল সীমানার বাইরে। চার রান তুলল তাহিরা।

   দেবোপমস্যার বললেন, ‘তুমি আর এক ওভার খেলো। দেখি কেমন করতে পার!’

   বাতাসে ক্রিজের উইকেট একটু নড়ে গেল। তখন তাহিরা ব্যাট দিয়ে ঠুকে ঠুকে উইকেটটা শক্ত করে বসিয়ে দিল। সত্যিই আজ বাতাস যেন ঝড়ের বেগে বইছে! স্যার আকাশে চোখ মেলে বোঝার চেষ্টা করলেন, বৃষ্টি নামবে কিনা! কোত্থেকে একটা নীল-গলা বসন্তবৌরি পাখি উড়ে এসে আশ্রয় খুঁজে নিল কর্পূর গাছের দু’ ডালের মাঝের খাঁজটায়। মুকুলকৃষ্ণবাবুর মনটা চলে গেল বসন্তবৌরি পাখিটার দিকে। 

   হেডস্যারকে বললেন, ‘জানেন নবনীতস্যার, আমি এক সময় ভবানীপুরের যে মেসে থাকতাম, তার সামনের রাস্তার উলটো দিকের একটা উঁচু বাড়ির তিনতলার বারান্দায় একটা খাঁচায় রাখাছিল একটা বসন্তবৌরি পাখি। পাখিটার কালো ভুরুদুটো ছিল দেখবার মতো! ওই ফ্ল্যটের বালিন্দা অমূল্য সেনবসু হাতিবাগানের পক্ষীমেলা থেকে পাখিটা কিনে এনেছিলেন।’ একটু থেমে জানতে চাইলেন, ‘এই বসন্তবৌরির ডাক এখন মোবাইল ফোনের রিংটোন হিসেবে ব্যবহার হতে আমি শুনেছি ক্যালকাটা প্রেস ক্লাবের একজনের মোবাইলে।’

   পাখিটা তখনও উড়ল না। চুপটি করে বসে থাকল কর্পূর গাছের পাতার আড়ালে। 

( এর পর একুশ পর্ব)

ক্যুইজ 

১. সিল্কের শাড়ি তৈরীর সুতো পাওয়া যায় কোন পোকার থেকে? 

2. "গালা" পাওয়া যায় কোন পোকার থেকে ? 

3. ৭৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে কুষাণ সম্রাট কণিষ্ক এক নতুন অব্দের প্রচলন করেন, তার নাম কি? 

4. বাংলার চির বিদ্রোহী কবি কাকে বলা হয়? 

5. ভারতের প্রথম মানব বাহী  মহাকাশ যান প্রকল্প যা ISRO  পরিচালিত, তার নাম কি? 

গতসপ্তাহের ক্যুইজ এর উত্তর: 

১. হলুদ 

2. বাবুই ও টুনটুনি 

3. প্রকৃতি ও শাল গাছের 

4. আরশোলা বা তেলাপোকা 

5. মৌমাছি

Post a Comment

0 Comments