জ্বলদর্চি

শুভেন্দু অধিকারী (মুখ্যমন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গ সরকার) /ভাস্করব্রত পতি

মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২০৮
শুভেন্দু অধিকারী (মুখ্যমন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গ সরকার) 

ভাস্করব্রত পতি

'হে নূতন, দেখা দিক আর বার 
জন্মের প্রথম শুভক্ষণ। 
তোমার প্রকাশ হোক কুহেলিকা করি উদঘাটন সূর্যের মতন। 
রিক্ততার বক্ষ ভেদি আপনারে করো উন্মোচন ব্যক্ত হোক জীবনের জয়, 
ব্যক্ত হোক তোমামাঝে অসীমের চিরবিস্ময়।
উদয়দিগন্ত শঙ্খ বাজে, মোর চিত্তমাঝে
চিরনূতনেরে দিল ডাক
পঁচিশে বৈশাখ।।'

পঁচিশে বৈশাখ বাঙালির ভাগ্যাকাশে দেখা দিয়েছিল নতুন সূর্যের আলো। স্নিগ্ধ শিশিরভেজা সেই রবির কিরণে আলোকিত হয়েছিল আসমুদ্রহিমাচল। বহু বছর পরে আবারও এক পঁচিশে বৈশাখ বাঙালির মননে, বাঙালির স্বপনে, বাঙালির যাপনে জাগরিত করল গেরুয়া রঙের মোলায়েম আলোকবর্তিকা। যাবতীয় কুহেলিকা, যাবতীয় প্রহেলিকা, যাবতীয় অমানিশার বাঁধন ছিঁড়ে সনাতনী ঐতিহ্যে স্নাত হল বাংলার আকাশ বাতাস পাতাল ভূমি। পাহাড় থেকে সাগরে, জঙ্গল থেকে শহরে ধ্বনিত হল নবজাগরণের সুর -
'কে তুমি গো খুলিয়াছ স্বর্গের দুয়ার
ঢালিতেছ এত সুখ...!'
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করছেন শুভেন্দু অধিকারী

তিনি হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা। তিনি আপামর বাঙালির কাছে তমিস্রা পরিবর্তনের কাণ্ডারী। তিনি আশার সঞ্চারী। তিনিই আলোর দিশারী। পঁচিশে বৈশাখ কবিগুরুর জন্মদিনেই তিনি শপথ নিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে। 'মেদিনীপুরের মাটি বিপ্লবের ঘাঁটি' - এই আপ্তবাক্য আবারও বিশ্বসভায় জানান দিলেন যিনি, তিনি শুভেন্দু অধিকারী। মেদিনীপুরের বীর সন্তান। 

'ভাসাও তরণী হে কর্ণধার।
তুমি হবে চিরসাথি, লও লও হে ক্রোড় পাতি
অসীমের পথে জ্বলিবে জ্যোতি ধ্রুবতারকার।
মুক্তিদাতা, তোমার ক্ষমা তোমার দয়া 
হবে চিরপাথেয় চিরযাত্রার।
হয় যেন মর্তের বন্ধনক্ষয়, বিরাট বিশ্ব বাহু মেলি লয়
পায় অন্তরে নির্ভয় পরিচয় মহা অজানার।।'
     -- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৩. ১২. ১৯৩৯) 
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাহচর্যে

জনতার সাথে মিশে থেকে, লেপটে থেকে, জড়িয়ে থেকে জনতার সম্মুখে কথা দিয়ে কথা রাখার মানুষই প্রকৃত 'জননেতা' হয়। আকাশের বুক থেকে কোনও প্যারাসুটে নামা, হেলিকপ্টার থেকে নামা, জনতা জনার্দন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া, অলীক ক্ষমতার আস্ফালন দেখানো কোনও মানুষ কখনও জননেতা হতে পারে না। এই অমোঘ সত্যটা তিনি জানেন। তিনি মানেন। তিনি বোঝেন। জীবনের পরতে পরতে তিনি বিশ্বাস করেন ভূমিতে থেকেই মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব। মানুষের মন পাওয়া সম্ভব। মানুষের ভালোবাসা অর্জন সম্ভব। হঠাৎ কোনও 'ভুঁইফোঁড়' নেতা হয়ে সাধারণ 'নেতা' হওয়া যায়, কিন্তু সর্বসাধারণের 'জননেতা' হওয়া যায় না। পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে ভারতীয় জনতা পার্টির প্রথম মুখ্যমন্ত্রী পূর্ব মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র শুভেন্দু অধিকারী আদপে একজন 'জননেতা' হতে পেরেছেন তাঁর কর্মগুণে। তিনি মেদিনীপুরের সত্যিকারের 'মানুষ রতন' হতে পেরেছেন তাঁর নাছোড় লড়াইয়ের গুণে। তাঁর ক্ষুরধার বুদ্ধির ওপর ভরসা করে। আর বাংলার মানুষের প্রতি তাঁর নিপাট ভালোবাসার ঝর্ণাধারায় সূর্যস্নাত হয়ে। 
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের স্নেহস্পর্শে

১৯৭০ এর ১৫ ই ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের 'মেদিনীপুরিয়ান' মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জন্মগ্রহণ করেন কাঁথির করকুলিতে। বাবা শিশির অধিকারী জেলার অন্যতম বর্ষীয়ান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। একসময় কাঁথি পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিধায়ক এবং সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন নিষ্ঠার সাথে। এহেন পিতার যোগ্য উত্তরসুরী বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মা গায়ত্রী দেবীর স্নেহের মেজোছেলে 'বুড়ি'ই আসলে সকলের ভালোবাসার 'বুবাই'। কাঁথি হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করে ১৯৮৮ সালে কাঁথির প্রভাতকুমার কলেজে (পি. কে. কলেজ) একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হন। এখানেই ১৯৮৯ তে ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তাঁর দক্ষ নেতৃত্বের দরুন তখন থেকেই যুবসমাজের চোখে বিশেষ আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। তখন কাঁথি এলাকার ৭০ টি ক্লাবের সভাপতির পদে আসীন ছিলেন স্রেফ নিজের গ্রহণযোগ্যতাকে পাথেয় করে। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করা এই জননেতার বুদ্ধি, মেধা এবং প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের ঝলক বারবার বর্ষিত হয়েছে জনগণের স্বার্থে নানা উন্নয়নমূলক কাজের ধারার মাধ্যমে। এখন তিনি মুখ্যমন্ত্রী। তিনি সবার মুখ্যমন্ত্রী। আগামী পাঁচ বছর এ রাজ্যের ব্যাটন থাকবে তাঁর শক্ত হাতের তালুর অন্দরমহলে। যার নিদর্শন ইতিমধ্যেই রেখেছেন মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানেই। 

কাঁথি পৌরসভা নির্বাচনে ১৬ নং ওয়ার্ডে সর্বকনিষ্ঠ কাউন্সিলার হলেন প্রথমবার। সেই শুরু। ১৯৯৫-২০০০ পর্যন্ত এই পদে আসীন ছিলেন। সেদিনের সাধারণ একজন কাউন্সিলর থেকে পরবর্তীতে তিনি হতে পেরেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। এটা আসলে যোগ্যতার উত্তরণ। মনের কোণে জমিয়ে রাখা স্বপ্নের 'মেটামরফোসিস'। যাঁর অন্তরে ছিল ছাইচাপা আগুন। অনেকেই সেই আগুনকে অবদমিত করতে চেয়েছিল। নিভিয়ে দিতে চেয়েছিল। পারেনি। আসলে তিনি আগুনের গোলা। যার তাপে যাবতীয় কুমন্ত্রণা, কুযুক্তি, কুবুদ্ধি, কুডাক - ধুয়ে মুছে সাফ! 
মেদিনীপুরের দুই ভূমিপুত্র শুভেন্দু অধিকারী এবং দিলীপ ঘোষ

অভাবনীয় জেদ আর লক্ষ্যে পৌঁছানোর তীব্র বাসনা থেকে আসে সাফল্য। তিনি তা পেরেছেন। ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত ছিলেন ভারতের জাতীয় কংগ্রেস দলের সদস্য। এরপর ১৯৯৮ এর ১ লা জানুয়ারি তৃণমূল কংগ্রেস গঠিত হলে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য হন। ১৯৯৮ থেকে ২০২০ পর্যন্ত এই দলের অন্যতম সৈনিক হিসেবে ছাপ রেখেছেন। হয়েছেন সাংসদ, হয়েছেন মন্ত্রী। এরপর সেই দল পরিবর্তন। অনেক কষ্ট, উপেক্ষা আর যন্ত্রণা বুকে চেপে তিনি সরে গেলেন রাজ্যপাট ছেড়ে। 

'একদিন যারা মেরেছিল তাঁরে গিয়ে 
রাজার দোহাই দিয়ে
এ যুগে তারাই জন্ম নিয়েছে আজি, 
মন্দিরে তারা এসেছে ভক্ত সাজি
ঘাতক সৈন্যে ডাকি 
'মারো মারো' ওঠে হাঁকি।
গর্জনে মিশে পূজামন্ত্রের স্বর-
মানবপুত্র তীব্র ব্যথায় কহেন, হে ঈশ্বর!
এ পানপাত্র নিদারুণ বিষে ভরা
দূরে ফেলে দাও, দূরে ফেলে দাও ত্বরা।'
      - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারীর পথচলা কিন্তু পরাজয়কে সঙ্গী করেই। ২০০১ এ মুগবেড়িয়া বিধানসভা নির্বাচনে সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রার্থী তথা প্রাক্তন মৎস্যমন্ত্রী কিরন্ময় নন্দের কাছে হেরে যান মাত্র ৪৬৯১ টি ভোটে। সেবার কিরন্ময় নন্দ পেয়েছিলেন ৬৪৪১৫ টি ভোট (৫০.৫৮%)। আর শুভেন্দু অধিকারী পেয়েছিলেন ৫৯৭২৪ টি ভোট (৪৬.৯০%)। আবারও পরাজয় বরণ করেন ২০০৪ এর লোকসভা নির্বাচনে। সেবার তিনি তমলুক লোকসভা আসনে ৫৭৩৮০ ভোটে হেরে যান দোর্দণ্ডপ্রতাপ সিপিআইএম নেতা লক্ষ্মণ শেঠের কাছে। এই নির্বাচনে লক্ষ্মণ শেঠ পান ৫০৭২২৮ টি ভোট (৪৯.২০%)। আর শুভেন্দু অধিকারী পেয়েছিলেন ৪৪৯৮৪৮ টি ভোট (৪৩.৬০%)। এই জোড়া হার তিনি মাথা পেতে নিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে এই পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে জয়মাল্য পরার শক্তি এবং সামর্থ্য অর্জন করেছিলেন রাজনীতির মেঠোপথে দৃপ্ত পদসঞ্চারের মাধ্যমে। স্বামী বিবেকানন্দের জীবনী আত্মীকরণ করেছেন। অনুসরণ করতেন। ফলে একটা অদম্য জেদের জন্ম হয়েছিল তাঁর শিরা উপশিরার শোনিতধারায়। 
মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার জন্য ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে অভিনন্দন বার্তা আসছে।

পরাজয়ের গ্লানি কাটিয়ে ২০০৬ সালে প্রথমবার বিধায়ক হন। দক্ষিণ কাঁথি বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হয়ে শুভেন্দু অধিকারী পান ৬৮৬০৮ টি ভোট (৫০.৬০%)। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সিপিআইয়ের সত্যেন্দ্রনাথ পণ্ডা পান ৬০০২৮ টি ভোট (৩৮.৩১%)। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় পদার্পণ হল তাঁর। তখন বাম শাসন এরাজ্যে। মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। এক বছর যেতে না যেতেই রাজ্যে তখন নন্দীগ্রাম আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়েছে। সেসময় 'আমরা দুশো পঁয়ত্রিশ' বলা সরকারকে একা হাতে দুমড়ে মুচড়ে দেওয়ার কারিগর হয়ে উঠেছিলেন অচিরেই। বাম সরকারের কফিনে শেষ পেরেক পোঁতার কাজ নন্দীগ্রামের বুকেই করে দিয়েছিলেন মেদিনীপুরের বুবাই। এই মানুষটির লড়াইয়ের ফল মিললো ২০১১ তে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিদায় নিল পঁয়ত্রিশ বছরের বামফ্রন্ট সরকার। 
 
২০০৯ এ বিধায়ক পদ ছেড়ে লোকসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেন তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে। ১৭২৯৫৮ ভোটে হারালেন সিপিআইএম নেতা লক্ষ্মণ শেঠকে। ২০০৪ এর পরাজয়ের গ্লানি সুদে আসলে উসুল করলেন পরিবর্তনপ্রিয় মানুষের কাঁধে চেপে। শুভেন্দু অধিকারী পান ৬৩৭৬৬৪ ভোট (৫৫.৫৪%)। আর লক্ষ্মণ শেঠ পান ৪৬৪৭০৬ টি ভোট (৪০.৫০%)। তমলুক লোকসভায় দুবারের সাংসদ ছিলেন ২০০৯ এর ১৬ ই মে থেকে ২০১৬ এর ২০ শে মে পর্যন্ত। ২০১৪ এর লোকসভা নির্বাচনেও জয়ী হন তিনি। সেবার সিপিআইএম এর শেখ ইব্রাহিম আলিকে পরাজিত করেন ২৪৬৪৮১ ভোটে। শুভেন্দু অধিকারী পেয়েছিলেন ৭১৬৯২৮ টি ভোট (৫৩.৬০%)। শেখ ইব্রাহিম আলি পেয়েছিলেন ৪৭০৪৪৭ টি ভোট (৩৫.২০%)। এরপর সাংসদ পদ ছেড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিধায়ক হন।
এই প্রতিবেদকের লেখা বই 'চড়াম চড়াম' উদ্বোধন করছেন শুভেন্দু অধিকারী

২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর ভালোবাসার কেন্দ্র নন্দীগ্রামে প্রার্থী হন। সেবার জেতেন ৮১২৩০ ভোটে। শুভেন্দু অধিকারী পান ১৩৪৬২৩ টি ভোট (৬৭.২০%)। আর তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সিপিআইয়ের আবদুল কবির শেখ পান ৫৩৩৯৩ টি ভোট (২৬.৭০%)। পশ্চিমবঙ্গের পরিবহনমন্ত্রী হিসেবে ২০১৬ এর ২৭ শে মে থেকে এবং পরিবেশমন্ত্রী হিসেবে ২০১৮ এর জুন থেকে কার্যভার সামলেছেন ২০২০ এর ২৭ শে নভেম্বর পর্যন্ত। এরপর তিনি তৃণমূল কংগ্রেস ছাড়েন। যোগ দেন ভারতীয় জনতা পার্টিতে। ২০২০ সালের ১৯ শে ডিসেম্বর মেদিনীপুরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অমিত শাহের হাত থেকে ভারতীয় জনতা পার্টির পতাকা নিলেন। নিজের নাম জুড়লেন ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের সাথে। ৩১ শে ডিসেম্বর ২০২০ থেকে ২ রা মার্চ ২০২১ পর্যন্ত জুট কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ার চেয়ারপার্সনও ছিলেন। আজ তিনি সেই ভারতীয় জনতা পার্টির নবনির্বাচিত প্রথম বাঙালি মুখ্যমন্ত্রী। 

২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে ভারতীয় জনতা পার্টির প্রার্থী হিসেবে দ্বিতীয়বার ভোটে প্রতিদ্বন্দিতা করেন। তাঁর বিরুদ্ধে নিজের নির্বাচিত কেন্দ্র ছেড়ে নন্দীগ্রামে এসে দাঁড়ালেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী 'তৃণমূল সুপ্রিমো' মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আসলে মুখ্যমন্ত্রী চেয়েছিলেন শুভেন্দুকে হেলায় হারিয়ে তাঁর রাজনীতি করার যাবতীয় সাধ আহ্লাদ ঘুঁচিয়ে দেবেন। কিন্তু বিধি বাম। ১৯৫৬ ভোটে নিজেই হেরে গেলেন মেদিনীপুরের জননেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে। শুভেন্দু অধিকারী পেয়েছিলেন ১১০৭৬৪ টি ভোট (৪৮.৪৯%)। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পেয়েছিলেন ১০৮৮০৮ টি ভোট (৪৭.৬৪%)। শুভেন্দু অধিকারী জিতলেও রাজ্যে ক্ষমতায় এলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। নন্দীগ্রামে হেরে অন্যত্র জিতে তৃতীয়বারের জন্য আবারও মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দু অধিকারীর কথায় যিনি কিনা 'কম্পার্টমেন্টাল চিফ মিনিস্টার'। 
মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে আসীন মেদিনীপুরের সন্তান শুভেন্দু অধিকারী

২০২১ এর নির্বাচনে নিজে সফলতা পেলেও ভারতীয় জনতা পার্টি কিন্তু ক্ষমতায় আসেনি। সেই থেকে জেদ যেন আরও বেড়ে গেল। ২০২১ এর ১৩ ই মে থেকে ২০২৬ এর ৯ ই মে পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতার ভূমিকায় থেকে রাজ্যের গনতন্ত্রপ্রিয় মানুষকে দিয়ে গিয়েছেন বেঁচে থাকার অক্সিজেন। রাজ্যময় নানা অনাচার, অবিচার, অত্যাচারের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন প্রতিবাদের মুখ। সীমাহীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুখর নেতা। মানুষের মন থেকে 'ভয়' দূর করে 'ভরসা' প্রতিষ্ঠিত করলেন দার্জিলিং থেকে দীঘা পর্যন্ত। 

'নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়, খুলে যাবে এই দ্বার--
জানি জানি তোর বন্ধনডোর ছিঁড়ে যাবে বারে বার।। 
খনে খনে তুই হারায়ে আপনা   সুপ্তিনিশীথ করিস যাপনা -
বারে বারে তোরে ফিরে পেতে হবে বিশ্বের অধিকার।।' -- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। 

বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচিত হয়ে শুরু থেকেই সোজা ব্যাটে খেলতে লাগলেন রাজ্যজুড়ে। স্ট্রেট ড্রাইভ, কভার ড্রাইভ, হেলিকপ্টার শট থেকে হুক, পুল, বাপি বাড়ি যা ইত্যাদি ক্রিকেটীয় পরিভাষার যাবতীয় টার্মগুলো প্রাধান্য পেল সরকারের বিরুদ্ধে একজন সত্যিকারের বিরোধী দলনেতা হিসেবে। তখন থেকেই ঘোষণা করেছিলেন, 'মাননীয়া, আপনাকে ভবানীপুরেও হারাবো'। এটা কোনও কাল্পনিক হুমকি বা প্রতিহিংসা ছিল না। এটা ছিল প্রত্যয়। এটা ছিল একজনের অহংকারকে চূর্ণ করার তীব্র বাসনা। এটা একজন ভবিষ্যৎদ্রষ্টা সফল রাজনীতিবিদের মনের জোর। তিনি যা বলেছিলেন, তা করেও দেখিয়েছেন। 

তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জেলার মানুষ। মাতঙ্গিনী হাজরা, ক্ষুদিরাম বসু, দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমল, সুশীল কুমার ধাড়া, সতীশচন্দ্র সামন্ত, অজয়কুমার মুখোপাধ্যায়ের জেলার মানুষ। তাঁর দাদু বিপীন অধিকারীও ছিলেন ব্রিটিশের জেলে বন্দী থাকা স্বাধীনতা সংগ্রামী। ফলে লড়াই তাঁর রক্তে। আন্দোলন করার মানসিকতা তাঁর মজ্জায়। তিনি হারতে জানেননা। বরং দুর্বিনীতদের হারাতে জানেন। 

'ভয় হতে তব অভয়মাঝে   নূতন জনম দাও হে। 
দীনতা হতে অক্ষয় ধনে,   সংশয় হতে সত্যসদনে,
জড়তা হতে নবীন জীবনে   নূতন জনম দাও হে।।' -- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। 

২০২৬ এর বিধানসভা নির্বাচন ছিল শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অন্যতম অ্যাসিড টেস্ট। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের অনুমোদন পেয়ে দাঁড়ালেন এরাজ্যের দুটি বিধানসভা কেন্দ্রে। দুটি কেন্দ্রেই জয়ী হয়ে নিজেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে চলে যান। যা আসলে তাঁর কর্মদক্ষতার চূড়ান্ত নিদর্শন। নিজের জেলা পূর্ব মেদিনীপুরের ১৬ টি আসনেই জয়ী হল ভারতীয় জনতা পার্টির সকল বিধায়করা। এককথায় ক্লিন বোল্ড বিরোধীরা। কথা দিয়েছিলেন, কথা রাখলেন। 

২০২৬ এর বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুর কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ১৫১০৫ ভোটে এবং নন্দীগ্রামের তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র করকে ৯৬৬৫ ভোটে পরাজিত করেন। ভবানীপুরে শুভেন্দু অধিকারী পান ৭৩৯১৭ টি ভোট (৫৩.০২%) এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পান ৫৮৮১২ টি ভোট (৪২.১৯%)। পরপর দুবার এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে হারানোর বিরলতম কৃতিত্বের অধিকারী হলেন শুভেন্দু অধিকারী। শুধু তাই নয়, এই জয়ের মাধ্যমে এ রাজ্যের বুক থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৫ বছরের জমানার The End ঘটিয়ে দিলেন 'মেদিনীপুরের টকা'। এর পাশাপাশি নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে তিনি পেয়েছিলেন ১২৭৩০১ টি ভোট (৫০.৩৭%)। আর পবিত্র কর পান ১১৭৬৩৬ টি ভোট (৪৬.৫৫%)। 

অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ৯ ই মে, ২০২৬, শনিবার। দিনটি ছিল পঁচিশে বৈশাখ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন। বাঙালির আবেগ এই দিনটিকে ঘিরে। বাঙালির ভালোবাসা এই দিনটির প্রতিটি ক্ষণে। বাঙালির গর্ব, বাঙালির শ্রদ্ধা, বাঙালির অস্মিতা পঁচিশে বৈশাখকে সামনে রেখেই। এর চেয়ে পবিত্র দিন আর হয় কি? এহেন শুভদিনে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে পশ্চিমবঙ্গের জনগণকে সাক্ষী রেখে শপথ নিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে। 

'তুমি মোরে করেছ সম্রাট। তুমি মোরে
পরায়েছ গৌরবমুকুট; পুষ্পডোরে
সাজায়েছ কন্ঠ মোর। তব রাজটীকা
দীপিছে ললাট মাঝে মহিমার শিখা
অহর্নিশি। আমার সকল দৈন্য লাজ, 
আমার ক্ষুদ্রতা যত, ঢাকিয়াছ আজ
তবে রাজ আস্তরণে।' -- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।। 

তিনি হলেন পশ্চিমবঙ্গের নবম মুখ্যমন্ত্রী। আর মেদিনীপুরের সন্তান হিসেবে তিনি হলেন দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী। তার আগে এই জেলার আরেক বিখ্যাত জননেতা অজয়কুমার মুখোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন (১৫ ই মার্চ, ১৯৬৭)। শুভেন্দু অধিকারীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অন্যান্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থেকে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীগণ। এ যেন চাঁদের হাট! রাজ্যপাল আর এন রবি শপথবাক্য পাঠ করালেন নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে। রচিত হল ইতিহাস। শুরু হল নতুন বাংলার বুকে এক মেদিনীপুরবাসীর দৃপ্ত ও দৃঢ় পদসঞ্চারণ। 

তাঁর মুখে হাসি সবসময়। এক গাল হাসি দিয়েই সকলের মন জয় করার টেকনিক তাঁর করায়ত্ব। আসলে তিনি 'গোমড়াথেরিয়াম' হয়ে থাকতে পছন্দ করেন না। এটাই তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম ইউ এস পি। লিফটে চড়ে রাজনীতিতে আসেননি। তিনি এসেছেন সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে, চড়াই উৎরাই অতিক্রম করতে করতে। এই লড়াইয়ের শক্তি আসলে মেদিনীপুরের উর্বর মাটিরই যৌতুক। আজ পরিবর্তনপ্রিয় বাঙালির কাছে শুভেন্দু অধিকারী একটি ব্র্যান্ডের নাম। ধ্রুবতারার নাম। অন্ধকার কাটিয়ে আলোয় ফেরানো বাঙালি তাই দৃঢ়কন্ঠে গায় --

'কাটবে এবার অন্ধকার
শুভেন্দুদার অঙ্গীকার
শোষনের দিন শেষ হবে আজ জনতাই হাল ধরবে
জঙ্গলরাজ পাল্টাতে দাদা জনতার হয়ে লড়বে। 
কান পেতে শোনো ঐ শোনা যায় দিন বদলের সুর। 
ভয় নেই দাদা করবেই ভয় মুক্ত ভবানীপুর।। 
দুঃসময়ের বন্ধু দাদা আমজনতার লোক
তাঁর হাত ধরে ভবানীপুরের পরিবর্তন হোক। 
শুভেন্দুদার গর্জনে কেঁপে উঠবে অত্যাচারী
ভবানীপুরে একশতভাগ সুরক্ষা পাবে নারী।
ভয়ের শাসন শেষ হবে আর থাকবে না অনাচার। 
কাটবে এবার অন্ধকার
শুভেন্দুদার অঙ্গীকার।। 
যত দুর্নীতি অনাচার তার সমাধান একটাই
পদ্মফুলে ভরসা রেখে শুভেন্দুদাকে চাই। 
কালীঘাটে কালীমায়ের কৃপা আছে সামনে যাঁর। 
জনতার সেবা করতে তাঁকে রুখবে এমন সাধ্য কার? 
ন্যায়ের শাসন আসবে রাজ্যে পাবো মোরা সুবিচার। 
কাটবে এবার অন্ধকার
শুভেন্দুদার অঙ্গীকার।।' 
    - 'কন্ঠ যোদ্ধা' সঙ্গীত সরকার।

🍂

Post a Comment

0 Comments