জ্বলদর্চি

দেবদারু/ভাস্করব্রত পতি

বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১২৩

দেবদারু

ভাস্করব্রত পতি

"আমি তখন ছিলেম শিলঙ পাহাড়ে, রূপভাবক নন্দলাল ছিলেন কার্সিয়ঙে। তাঁর কাছ থেকে ছোটো একটি পত্রপট পাওয়া গেল, তাতে পাহাড়ের উপর দেওদার গাছের ছবি আঁকা। চেয়ে চেয়ে মনে হল, ঐ একটি দেবদারুর মধ্যে যে শ্যামল শক্তির প্রকাশ, সমস্ত পর্বতের চেয়ে তা বড়ো, ঐ দেবদারুকে দেখা গেল হিমালয়ের তপস্যার সিদ্ধিরূপে। মহাকালের চরণপাতে হিমালয়ের প্রতিদিন ক্ষয় হচ্ছে, কিন্তু দেবদারুর মধ্যে যে প্রাণ, নব নব তরুদেহের মধ্যে দিয়ে যুগে যুগে তা এগিয়ে চলবে। শিল্পীর পত্রপটের প্রত্যুত্তরে আমি এই কাব্যলিপি পাঠিয়ে দিলেম।
এই দেবদারু দিয়ে সাজানো হয় সরস্বতী পূজার মণ্ডপ

তপোমগ্ন হিমাদ্রি ব্রহ্মরন্ধ্র ভেদ করি চুপে
বিপুল প্রাণের শিখা উচ্ছ্বসিল দেবদারুরূপে।
সূর্যের যে জ্যোতির্মন্ত্র তপস্বীর নিত্য উচ্চারণ
অন্তরের অন্ধকারে, পারিল না করিতে ধারণ
সেই দীপ্ত রুদ্রবাণী -- তপস্যার সৃষ্টিশক্তিবলে
সে বাণী ধরিল শ্যামকায়া; সবিতার সভাতলে
করিল সাবিত্রীগান; স্পন্দমান ছন্দের মর্মরে
ধরিত্রীর সামগাথা বিস্তারিল অনন্ত অম্বরে।
ঋজু দীর্ঘ দেবদারু - গিরি এরে শ্রেষ্ঠ করে জ্ঞান
আপন মহিমা চেয়ে; অন্তরে ছিল যে তার ধ্যান
বাহিরে তা সত্য হল; ঊর্ধ্ব হতে পেয়েছিল ঋণ,
ঊর্ধ্বপানে অর্ঘ্যরূপে শোধ করি দিল একদিন।
আপন দানের পুণ্যে স্বর্গ তার রহিল না দূর,
সূর্যের সংগীতে মেশে মৃত্তিকার মুরলীর সুর।"
     -- কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
 
ধর্মীয় বৃক্ষ দেবদারু সংস্কৃতে দেবদারু, দেবকাষ্ঠ, দেবদ্রুম, সরল, সরলবৃক্ষ নামে পরিচিত। ইংরেজিতে Pine, Himalayan Cedar, False Ashok (অশোক গাছের মতো দেখতে। তাই অনেকেরই ভুল হয়ে যায়। এজন্যই এহেন নামকরণ। উত্তরপ্রদেশে অশোক ছালের পরিবর্তে এই গাছের ছাল ব্যবহার করা হয়) Must Tree, Cemetery Tree ইত্যাদি। এছাড়াও দেবদারুকে গুজরাটিতে দেবদার, কন্নড়ে চোপড়া দেবদার, ভদ্রদারু, তামিলে টুনা মারাম, তেলুগুতে দেবদারু চেক্কা, দেবাদারি, ফার্সিতে দেবদার, অসমীয়াতে শজর কুলজীন, হিন্দিতে দেবদারী, দেওদার, মারাঠীতে তেল্যা দেবদারু বলা হয়ে থাকে। দেবদারুর বিজ্ঞানসম্মত নাম Polyalthia longifolia। এটি Annonaceae পরিবারভুক্ত। দেবদারুর আরও কিছু প্রজাতির নাম হল --
Monoon longifolium
Polyalthia longifolia var. pendula 
Guatteria longifolia
Unona longifolia 
Uvaria altissima 
Uvaria longifolia 

দেবদারুকে চেনা যায় দারু, দারুক, ইন্দ্রদারু, পীড়দারু, মস্তদারু, ভদ্রদারু, সুরদারু,  স্নিগ্ধদারু, ভবদারু, অমরদারু, অমরকাষ্ঠ, পুতিকাষ্ঠ, দেবকাষ্ঠ, মহাকাষ্ঠ, শাম্ভব, শত্রুপাদপ, পারিভদ্রক, দুকিলিম, ভূতহারি, সুরদ্রু, সুরর্ভুরুহ, ভদ্রবৎ নামেও। এই দেবদারু হল পেট ফাঁপা, ফুলো রোগ, ঝিমুনি, কাশি, চুলকানি, আমবাত, অর্শ, পক্ষাঘাত, সর্দি রোগের উপশমকারী আয়ুর্বেদিক উদ্ভিদ। জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন, 
"আমাকে তুমি দেখিয়েছিলে একদিন, 
মস্ত বড়ো ময়দান - 
দেবদারু পামের নিবিড় মাথা - 
মাইলের পর মাইল"। 
দেবদারুর সবুজ পাতা

যাকে আমরা 'দেবদার' বলে ডাকি, তার আদি বাসস্থান শ্রীলঙ্কা। রাস্তার ধারে লাগানো হয় Ornamental Plant বা ছায়াতরু হিসেবে। আবার পাহাড়ি এলাকায় অন্যরকম গাছ জন্মায়। উত্তর পশ্চিম হিমালয়ের কাশ্মীর থেকে গাড়োয়াল অঞ্চল, আফগানিস্থান ও বালুচিস্তানের পার্বত্য অঞ্চলের ৪-১০ হাজার ফুট উচ্চতায় জন্মায় দেবদারু গাছ। তাই কোনটি আসল দেবদারু গাছ? পাহাড়ি এলাকায় যে গাছ দেখতে পাওয়া যায় তার সঙ্গে বিস্তর ফারাক সমতলের দেবদারুর সঙ্গে। এ প্রসঙ্গে আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য লিখেছেন, "আমরা (বিশেষতঃ বাংলায়) যাকে দেবদারু বলে চিহ্নিত করি সেইটি বেদোক্ত দেবদারু কিনা? কারণ হিমালয়ের বহু উচ্চ শৃঙ্গমালায় যেসব দেওদার বৃক্ষ, সেগুলি দেবদারু শব্দের ভ্রষ্ট ভাষা 'দেওদার'। এটা যতখানি নির্ভরযোগ্য ভাষা, এই সমতলভূমিতে জাত দেবদারু বৃক্ষগুলির আকৃতি কিন্তু এক নয়। তবে এটা যে বেদোক্ত দেবদারু হ'তে পারে না তার কারণ গবেষকদের বহু সমীক্ষিত এবং এটি বহিরাগত বলেই এ সম্বন্ধে আরও একটি বক্তব্য এই দেবদারুর একটি কেন, দুটি পর্যায় নাম (যাকে বলে ডাক নাম) দুকিলিম এবং কিলিম। তিব্বত দেশের প্রাচীন নাম কিলিম। তিব্বতীয় পাহাড়ী এলাকার উচ্চ গিরিশৃঙ্গে এই গাছের প্রাচুর্য দেখেই এর কি এই কিলিম নামকরণ করা হ'য়েছে?"
দেবদারুর ফল

বাংলা সাহিত্যিকদের কলমেও এসেছে দেবদারুর প্রসঙ্গ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সহ জীবনানন্দ দাশ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্যের লেখায় পাই দেবদারুর কথা। শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাঁর 'তুমি একা থেকো' কবিতায় লিখেছেন --
'দেবদারু বীথি শুধু তোমাকেই টানে 
গভীর শিকড়ে তার, তুমি স্তন্যপায়ী! 
ওখানে দুধের রং, রসবর্ণ পছন্দ তোমার 
একথা পোষ্টারে লিখে এঁটে দিয়ে গেছো 
কোনোদিন, মধ্যরাতে, জ্যোৎস্নার ভিতরে?
সত্যি কথা বলো, আমি চেষ্টা করে দেখি।
কোলের কাঙাল আমি, পিপাসার্ত আমি,
কেবলি চন্দন-চিতা আমন্ত্রণ করে;
চলে এসো, অন্যথা করো না।
বাসা খালি আছে, বালি সরানো হয়েছে
চলে এসো, অন্যথা করো না।
এভাবে যাবার আগে, দেবদারু, শিকড়ে মুখ রাখি
অন্তত একবার যাই, তারপর যথা ইচ্ছা যাই 
তুমি একা থেকো।।' (তুমি একা থেকো, শক্তি চট্টোপাধ্যায়) 

দেবদারু একটি ধর্মীয় বৃক্ষ। অথর্ববেদেও (বৈদ্যককল্প -১৭। ১১। ২২২) পাই দেবদারু গাছের উল্লেখ - 
'বনস্পতে সুরাহ্বো হি ভূয়া অস্মৎ সখা প্রতরণঃ সুধায়ঃ। 
বীড্ব বুহ্নো যম্বা স্থাতা জয়তু জেতানি।।'
এই সিডার গাছের কথা মেলে খ্রিষ্টানদের বাইবেলেও। ওল্ড টেস্টামেন্টে এটির উল্লেখ রয়েছে অন্তত ৭৫ বার। বিভিন্ন মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে গৃহ সাজানোর জন্য দেবদারু গাছের পাতা ব্যবহৃত হয়। প্রাচীনকালে গ্রীকরা তাঁদের দেবী ডায়ানার (আর্টিমিস) মূর্তি করত এই সিডার গাছ দিয়ে। কেননা, তাঁদের বিশ্বাস এই গাছ হল অবিনশ্বর। গ্রীকরা ছাড়াও রোমানরা এবং পরবর্তীতে খ্রিস্টানরা এই গাছকে প্রাধান্য দিত। দেবদারু হল সকল গাছেদের (দারু) দেবতা (দেব)। এ প্রসঙ্গে P. N. Ravindran তাঁর 'Sacred and Ritual Plants of India' বইতে উল্লেখ করেছেন, "Lord Śiva was meditating under the devadaru when Kamadeva, the god of love, shot his famous arrow sammohanam (an arrow of Kamadeva that creates love, passion and infatuation in the mind of the target person) that then led to the burning of Kamadeva by the enraged Siva. In the Western Himalayas, cedar is closely linked to Śiva worship, and near a grove of cedars, a Śiva temple is often found. In Himachal Pradesh, there are many local legends associated with cedar. Such legends were mainly responsible for the conservation of this tree. Being a sacred tree, the tribes do not allow anyone to disturb the cedar groves" (পৃষ্ঠা : ৩৮৪)। 

রাস্তার পাশে সারিবদ্ধ প্যাগোডার মতো দেবদারু বৃক্ষ

দেবদারু হল শাখাপ্রশাখাযুক্ত সরল, সোজা এবং উঁচু বৃক্ষ। দেবদারু বৃক্ষের উচ্চতা প্রায় ৪০ - ৫০ মিটার হয়। গাছের উপরের অংশ দেখতে অনেকটা শঙ্কু আকৃতির। রাস্তার পাশে সারিবদ্ধ দেবদারু গাছ আসলে শ্রীবৃদ্ধি করে এলাকার। রোদের ঝলক সেই গাছের ওপর পড়লে তা হয়ে ওঠে আরও চাকচিক্য। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছেন, 'দেবদারু গাছে রোদের ঝলক, হেমন্তে ঝরে পাতা / সারাদিন ধ'রে মুরগীরা ডাকে, এই নিয়ে দিন গাঁথা'। এই গাছের পাতা গাঢ় সবুজ, মসৃণ এবং সরু। দেখতে অনেকটা ছুরি বা বর্শার মত। কিন্তু পাতার কিনারা ঢেউ খেলানো। এই পাতা দিয়ে সরস্বতী পূজার গেট তৈরি করা হয়। দেবদারুর ফুল গুচ্ছবদ্ধ ও সবুজাভ হলদে। অক্টোবর মাসে ফুল আসে। এরপর ফল ধরে। যদিও তা পাকে বেশ দেরীতে। এর বীজগুলি মার্বেলের মতো। গাছের তলায় ছড়িয়ে পড়ে গুচ্ছাকারে হওয়া দেবদারুর পাকা ফল। বিভিন্ন পাখির খাদ্য হয়ে ওঠে তা। উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের মতে এই গাছের আয়ু ৫০০ - ৬০০ বছর পর্যন্ত হতে পারে।

🍂

Post a Comment

0 Comments