মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২১০
মহেশ্বর দাশ শর্মা (অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ, কাঁথি)
ভাস্করব্রত পতি
ব্রাহ্মণভোজনে অংশ নিয়ে মাত্র এক পয়সা দক্ষিণা পাওয়ার আশায় যে ব্যক্তি নিয়মিত স্কুল কামাই করতেন, সেই ব্যক্তি পরবর্তীতে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁথি হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন কৃতিত্বের সাথে পাস করে সংস্কৃত ভাষা, বাংলা ভাষা এবং ওড়িয়া ভাষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। আসলে তখন তাঁর সংসারের হাল ছিল বেজায় খারাপ। নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। 'মেদিনীপুরের গর্ব' মহেশ্বর দাশ শর্মা নিজের পারদর্শিতার ওপর ভর করে কাঁথি থেকে গিয়ে একদিন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী অধ্যাপক পদে (১৯২৯-১৯৭০) আসীন থাকতে পেরেছিলেন।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁথির হৈপুরে আগষ্ট ১৯০১ (ভাদ্র ১৩০৮) সালে জন্মগ্রহণ করেন মেদিনীপুরের সত্যিকারের 'মানুষ রতন' শিক্ষক মহেশ্বর দাশ শর্মা। বাবা ধ্রুবচরণ দাশ এবং মা ব্রহ্মময়ী দেবীর ছয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। ১৩১৫ সালে ব্রহ্মময়ীদেবীর হঠাৎ মৃত্যু হলে তাঁর পড়াশোনায় বিরতি পড়ে। নিদারুণ কষ্টের মধ্যে চলতে থাকে জীবনের গাড়ি। কিন্তু তিনি ছিলেন অদম্য। তাই হাজার প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে ফের শুরু করেন পড়াশোনা।
বাড়ি থেকে সাত মাইল দূরে ছিল স্কুল। হেঁটেই যাতায়াত করতে হত। এই কাঁথি উ. ই. বিদ্যালয় থেকে ১৯২৩ সালে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর আই. এ. পাস করেন মেদিনীপুর কলেজ থেকে। তখন আশ্রয় পেয়েছিলেন মণীন্দ্রকৃষ্ণ ঘোষের বাড়িতে। সেসময় অধ্যক্ষ হেমচন্দ্র সান্যাল, ইংরেজির হরিচরণ মুখোপাধ্যায়, সংস্কৃতের জ্ঞানেন্দ্রচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ বিশিষ্ট শিক্ষকদের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন তিনি।
মেদিনীপুর কলেজে পড়াশোনা শেষ করার পর বি. এ. (সংস্কৃতে অনার্স) পড়ার জন্য ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে। সেখানে তাঁকে আশ্রয় দিয়েছিলেন কলুটোলা স্ট্রীটের বিখ্যাত মতিলাল শীলের (১৭৯২-১৮৫৪) বংশধররা। তাঁদের অবশ্য তিনি নিরাশ করেননি। ১৯২৭ সালে বি. এ. পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণীতে দ্বিতীয় স্থান পান। গর্বিত হয়েছিলেন কলকাতার সেই বাড়িওয়ালারা। মেদিনীপুরের এক অজ পাড়াগাঁয়ের ছেলের কৃতিত্বে চমকিত হন তাঁরা। এবার সংস্কৃতে এ-গ্রুপ (সাহিত্য) নিয়ে তিনি এম. এ. পড়তে শুরু করলেন। ১৯২৯ সালে সেই পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান পেলেন। এ এক অবিস্মরণীয় এবং অবিসংবাদিত সাফল্য। তিনি বাসুদেবপুর রাজকীয় দর্শন চতুষ্পাঠীতে পণ্ডিত রমেশচন্দ্র নন্দ বেদান্ত বিদ্যার্নব পণ্ডিতের কাছে পড়াশোনা করে পেয়েছেন কাব্য ও বেদান্ততীর্থ ডিগ্রি। তারপর ১৯৩৩ সালে তিনি ডাবল এম. এ. হলেন বাঙলা ভাষা বিষয় নিয়ে। এখানেও তাঁর স্থান হল প্রথম শ্রেণীতে প্রথম! উল্লেখ্যনীয় যে, স্নাতকোত্তর বাংলা ভাষাতে তিনি সেসময় পেয়েছিলেন ৯৭ শতাংশ নম্বর। সেই রেকর্ড আজও অম্লান।
তাঁর কর্মজীবনের অধ্যায় শুরু হয় প্রেসিডেন্সি কলেজের অন্দরমহলে। মাত্র এক বছর ছিলেন এখানে। তিনি হয়েছিলেন সংস্কৃতের শিক্ষক। সেটা ছিল ১৯৩১ সাল। এর অব্যবহিত পরেই ঠিক একবছর বাদে যোগদান করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিজয়চন্দ্র মজুমদার অবসর নেওয়ার ফলে শূন্যপদের সৃষ্টি হয়। তখন তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতীয় ভাষা বিভাগে ওড়িয়া ভাষার শিক্ষকরূপে যোগদান করেন।
বিভাগাধ্যক্ষ দীনেশচন্দ্র সেনের অবসর গ্রহণের আগেই তিনি বিভাগে যোগদান করেছিলেন। তাঁকে ধরে বিভাগের চারজন ওড়িয়াশিক্ষকই প্রস্তুতখণ্ডে নিযুক্ত হয়েছিলেন। এই বিভাগে দ্বিতীয় আরও একটি দায়িত্ব তাঁর কাঁধে চাপানো হয়েছিল। যখন ১৯৩৬ সালে প্রাকৃতের শিক্ষক হরগোবিন্দ দাস শেঠ অবসর নিলেন, তখন তাঁর দায়িত্ব ছিল ছাত্রদের প্রাকৃত পড়ানোর। বাংলার ছাত্রদের তিনি প্রাকৃত পড়িয়েছিলেন দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর ধরে [খণ্ডকাল উপাধ্যায়রূপে (১৯৩৭-১৯৫২), উপাধ্যায়রূপে (১৯৫২-১৯৬৮) এবং শেষে রীডাররূপে (১৯৬৮-১৯৭০)]।
গবেষক প্রবীরগোপাল রায় লিখেছেন, "সোনপুরের মহারাজা স্যার বীরমিত্রোদয় সিংদেও জি পি. নোটে যে টাকা দান করেছিলেন (বিশ্ববিদ্যালয় শতবার্ষিকী গ্রন্থ অনুযায়ী যার মোট মূল্য ৬০,৩০০ টাকা) এবং যে দান সিণ্ডিকেট ৬ ফেব্রুআরি ১৯২৫ গ্রহণ করেছিল, সেনেট সে টাকার সুদ থেকে একজন বক্তার (বেতন-১৫০ টাকা) এবং একজন সহকারী বক্তার (বেতন- ৫০ টাকা) পদ সৃষ্টি করেছিল। প্রথম বক্তা মহেশ্বর দাশশর্মা (১৯৩২)"।
তিনি কোনও বাংলা বই লেখেননি। ওড়িয়া ভাষায় একটি লিখেছিলেন। একসময় প্রকাশকদের চাহিদামতো একাধিক সংস্কৃত গ্রন্থের নোটস্ লিখেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'বাংলা সাহিত্য পত্রিকা', প্রথম বর্ষ, ১৯৬৭-৬৮, পৃ ৫১-৬৭ তে তিনি লিখেছিলেন রচনা 'শিব কি অনার্য দেবতা?' শিক্ষকতা ছাড়াও তিনি অন্য আর ও অনেক কাজে যুক্ত হয়েছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরে শ্রীগোপাল মল্লিক লেনে স্নাতকোত্তর ছাত্রদের জন্য একটি বেসরকারি ছাত্রাবাস গঠিত হয়েছিল। তিনি ছিলেন সেই ছাত্রাবাসের সুপারিনটেনডেন্ট (১৯৩৬-১৯৭৫)। তারকেশ্বর শ্রীজগন্নাথ আশ্রম ট্রাস্ট বোর্ড সহ আরও নানা সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার এবং কর্মকর্তা হিসেবে গুরুত্ব সহকারে দায়িত্ব পালন করে গিয়েছেন। তিনি বিয়ে করেছিলেন জাহ্নবী দেবীকে (জন্ম : ১৯০৯)। মেদিনীপুরের এই বিস্মৃতপ্রায় মহান শিক্ষাবিদ অনন্তলোকে যাত্রা করেন ১৯৮৮ সালের ৩১ শে ডিসেম্বর।
0 Comments