পঞ্চম খণ্ড: পর্ব- ৬
কমলিকা ভট্টাচার্য
সিগন্যালের ওপারে
ল্যাবরেটরির ভেতর আজ এক ধরনের ঘন নীরবতা। ভয়ের নয়—মনোযোগের।
যে নীরবতা অপারেশন থিয়েটারে থাকে, যখন সবাই জানে—একটি মাত্র ভুল মানেই সব শেষ।
ঘড়ির কাঁটা চলছে, কিন্তু তার অনুভব নেই। বাতাসে হালকা যন্ত্রের গন্ধ, তারের উষ্ণতা, আর অপেক্ষা।
কনসোলের সামনে বসে আদরের ছোট আঙুলগুলো এক মুহূর্তও থামে না। স্ক্রিনে দ্রুত বদলাচ্ছে ডায়াগ্রাম, কোড, সিগন্যাল ম্যাপ। তার চোখে অদ্ভুত এক মনোযোগ—যে মনোযোগ সাধারণ শিশুর চোখে থাকে না।
নাতাশা হুইলচেয়ারে বসে গভীর দৃষ্টিতে সব দেখছে। তার শরীর এখনও দুর্বল, কিন্তু মস্তিষ্ক তীক্ষ্ণ। মাঝে মাঝে সে খুব ছোট, খুব নির্ভুল কমান্ড টাইপ করে দিচ্ছে।
অনির্বাণ দাঁড়িয়ে দেখে—এ যেন দু’জন বিজ্ঞানীর যৌথ কাজ। একজন অভিজ্ঞতায় পরিপক্ব, আরেকজন অদ্ভুতভাবে প্রস্তুত।
ইরা কাঁচের ওপাশে দাঁড়িয়ে। বুক কাঁপছে, কিন্তু চোখে গর্বের আলো।
স্ক্রিনে খোলা আছে পুরোনো আর্কাইভের নিউরাল মানচিত্র।
🍂
আদর শান্ত গলায় বলে,
— “সমস্যা নিউরনে না… সংযোগে। আঙ্কেলের ভেতরের নেটওয়ার্ক নিজের সাথেই কথা বলতে পারছে না।”
নাতাশা মাথা নাড়ে।
অনির্বাণ ফিসফিস করে,
— “নিউরাল ব্রিজ…”
আদর তাকিয়ে হালকা হাসে,
— “হ্যাঁ।”
ঋদ্ধিমানের মাথায় মাইক্রো-নিউরাল ইন্টারফেস জুড়ে দেওয়া হয়। মনিটরে ক্ষীণ সিগন্যাল ওঠে—যেন দূর থেকে কেউ দরজায় খুব আস্তে টোকা দিচ্ছে।
আদর গ্রাফের দিকে ঝুঁকে থাকে।
— “দেখো… সাড়া আছে। চেতনা হারায়নি, শুধু আটকে আছে।”
নাতাশার চোখ ভিজে ওঠে। সে টাইপ করে: Memory relay required.
আদর সঙ্গে সঙ্গে বলে,
— “ওনার নিজের স্মৃতিকেই পথ দেখাতে হবে।”
প্রথম চেষ্টা শুরু হতেই সিগন্যাল হঠাৎ ওপরে ওঠে। সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকে। তারপর আবার নেমে যায়।
অনির্বাণের বুক ধক করে ওঠে।
আদর থামে না। খুব সহজ গলায় বলে,
— “না… স্মৃতি দিয়ে শুরু করলে হবে না। অনুভূতি দিয়ে শুরু করতে হবে।”
নাতাশা তাকায়। ইরা এগিয়ে আসে।
আদর জিজ্ঞেস করে,
— “ওনার সবচেয়ে শক্তিশালী অনুভূতি কী ছিল?”
ইরা ধীরে বলে,
— “আমাদের বাঁচানো।”
আদর মাথা নাড়ে,
— “তাহলে সেখান থেকেই শুরু।”
পুরোনো ভিডিও, অডিও, রেকর্ড বের করা হয়।
ইরার ফিরে আসার মুহূর্ত।
আদরের জন্মের পর ঋদ্ধিমানের হাসি।
ইরার সঙ্গে গভীর রাতের ল্যাব কথোপকথন।
সব একে একে সিগন্যাল হয়ে নিউরাল ব্রিজে পাঠানো হয়।
মনিটরের রেখা আবার কাঁপে। এবার অনেকক্ষণ।
অনির্বাণ খুব আস্তে বলে,
— “ও শুনছে…”
ঋদ্ধিমানের আঙুল খুব সামান্য নড়ে ওঠে।
ইরা চমকে ওঠে,
— “নড়েছে!”
সিগন্যাল ধীরে ধীরে স্থির হতে থাকে। নিয়মিত। ছন্দময়।
কিন্তু… সে জাগে না।
ঘরের মধ্যে এক অদ্ভুত অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে। সাফল্যও নয়, ব্যর্থতাও নয়—মাঝামাঝি কোথাও আটকে থাকা এক অবস্থা।
আদর চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। তার চোখে এক নতুন বিস্ময় জন্ম নিচ্ছে।
সিগন্যাল ঠিক আছে। নিউরাল প্রতিক্রিয়া ঠিক আছে।
তবু আঙ্কেল জাগছেন না কেন?
রাত নেমে আসে।
সবাই ক্লান্ত হয়ে নিজের ঘরে ফিরে যায়।
সবাই ঘুমিয়ে পড়লে আদর আবার ল্যাবে ফিরে আসে।
অন্ধকার ল্যাবে শুধু মনিটরের নীল আলো।
ঋদ্ধিমানের সিগন্যাল নিয়মিত উঠছে-নামছে।
আদর ধীরে ধীরে সিগন্যাল ট্র্যাক করতে থাকে—গ্রাফ, ফ্রিকোয়েন্সি, রিসিভার লোকেশন…
হঠাৎ সে থেমে যায়।
তার ভ্রু কুঁচকে ওঠে।
— “এটা কী…?”
ঠিক সেই সময় অনির্বাণও ল্যাবে ফিরে আসে। দরজায় দাঁড়িয়ে দেখে আদর মনিটরের দিকে স্থির তাকিয়ে।
— “কি হলো?”
আদর ধীরে বলে,
— “বাবা… আঙ্কেলের সিগন্যাল রিসিভার এখানে নেই।”
অনির্বাণ এগিয়ে আসে।
স্ক্রিনে লোকেশন ম্যাপ জ্বলে ওঠে।
সিগন্যাল যাচ্ছে। দূরে। অনেক দূরে।
অনির্বাণের শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়।
— “এটা সম্ভব না…”
আদর ঘুরে তাকায়,
— “আঙ্কেল যেন চেয়েও জেগে উঠছেন না। যেন ইচ্ছে করে আটকে আছেন।”
অনির্বাণের মাথায় যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়।
ঋদ্ধিমান কখনও নিজের বিপদের পরোয়া করেনি।
তাহলে…?
আদর?
আদরের কথা কি কেউ জেনে গেছে?
অনির্বাণ দ্রুত ঋদ্ধিমানের রিসেন্ট মেমোরি খোলে।
স্ক্রিনে ভেসে ওঠে একটি এনক্রিপ্টেড মেসেজ।
ডিকোড হতেই লেখা জ্বলে ওঠে—
“Prototype is ready. We want the child back. If you can save him, we are coming.”
আদর পিছনে দাঁড়িয়ে সব পড়ে।
তার গলা শুকিয়ে যায়।
— “আমিই সেই child… আঙ্কেল আমাকে বাঁচাতে নিজেকে বন্ধ করে রেখেছেন।”
অনির্বাণের বুক কেঁপে ওঠে।
সব পরিষ্কার।
ঋদ্ধিমান নিজের চেতনাকে লুকিয়ে রেখেছেন—যাতে তার মস্তিষ্ক হ্যাক করে আদরের তথ্য নেওয়া না যায়।
লোকেশন আবার জ্বলে ওঠে।
অনির্বাণ তাকিয়ে থাকে।
চোখ বড় হয়ে যায়।
পুরোনো সেই জায়গা।
2 Comments
আত্মত্যাগের ছোঁয়া
ReplyDelete🙏
Delete