জ্বলদর্চি

মননের দর্পণে জীবনের কিছু টুকরো কথা /দ্বিতীয় পর্ব/স্বাতী ভৌমিক

মননের দর্পণে জীবনের কিছু টুকরো কথা 
দ্বিতীয় পর্ব

স্বাতী ভৌমিক 
  
               
 মনের ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ থাকা কিছু অনুভূতির কথা এই পর্বে জানাতে চলেছি।
                        ১
 ছাদের উপর খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়েছিলাম। চাঁদের আলোতে মোটামুটি বেশ পরিষ্কারই দেখাচ্ছিল চারদিক। কৃত্রিম বাল্বের আলোটা খুব বেমানান মনে হচ্ছিল ওই অকৃত্রিম আলোর কাছে। তাই বাল্বের সুইচটা অফ করে দিলাম। তখন আরো ভালো করে দৃষ্টি পড়ল আকাশের মুক্ত আঙিনায়। মেঘগুলো ভেসে ভেসে যাচ্ছে- কখনো চাঁদের পাশ দিয়ে, আবার কখনোবা চাঁদকে ক্ষণিক আচ্ছাদিত করে। কিছু কিছু মেঘ বেশ পরিষ্কার-সাদা, আবার কিছু কিছু মেঘ বেশ কালো- ঘন কালো। মনে হচ্ছিল চাঁদকে বুঝি ওই মেঘ ঢেকেই দিল- কিন্তু দেখলাম, কিছু পরে সেই মেঘ সরে গেল, আর চাঁদ আবার সেই স্নিগ্ধতার আলোকচ্ছটা নিয়ে ঠিক আগের মতোই উজ্জ্বলময়তায় ভরে দিল আকাশের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। 

 অনুভব করলাম, মেঘ আর চাঁদের ওই দৃশ্যমানতার সাথে জীবনের এক অপূর্ব মিল রয়েছে। জীবনে কখনো কখনো হঠাৎ করেই সমস্যারা আবির্ভূত হয়-ঠিক ওই কালো মেঘের মতো। আর ওই চাঁদের মতোই মনের স্নিগ্ধ-স্বস্তির বাতাবরণকে দুঃখের আবরণে আচ্ছাদিত করে দেয়। ওই সমস্যাকীর্ণ সময়ে মনে হয়, বুঝিবা সব স্বস্তি ওই সমস্যার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে- আশারূপ আলোর দীপগুলো বুঝিবা নিভে যাচ্ছে। কিন্তু না, তা তো হয় না! একটা সময় পর মেঘেদের ভেসে যাওয়ার মতোই সময়ের স্রোতে সেই সমস্যাগুলোও ভেসে যায়- ফিকে হয়ে যায় তার দুঃখপ্রদায়ী গুরুত্ব। মনে আবার স্বস্তি ফিরে আসে- জীবন হাসে স্নিগ্ধ নির্মল হাসি।
🍂
 আমার মনে হয়, সবার জীবনেই অল্পবিস্তর এই ঘটনা ঘটেই। কিন্তু আমার এই কথাগুলোর মূল উপজীব্য বিষয় হল, জীবনে সমস্যার আসা-যাওয়ার ঘটনাগুলিকে স্বাভাবিক ভাবার ক্ষমতা অর্জন করা খুব দরকার। ওই মেঘরূপ সমস্যারা আসবে- যাবে। কিন্তু মনের ওই স্বস্তিকে চাঁদের আলোর মতোই অটুট রাখতে হবে। ওই স্বস্তিটাই তো জীবনের সবকিছুর মূল লক্ষ্য। জাগতিক বিষয় -আশয় প্রাপ্তির প্রচেষ্টা, আধ্যাত্মিক সুচেতনা- সবকিছুর মূল লক্ষ্য আমার মনে হয় ওই মনের স্বস্তি- শান্তিটুকুই। তাই লক্ষ্যকে কখনো উপলক্ষ্য করা উচিত নয়। আমরা উপায় গুলোর ভিড়ে আসল প্রাপ্তির ব্যাপারটাকে ভুলেই যাই।আর পথেই পথ হারিয়ে ফেলি।

                         ২
 এবার চলে যাই, মাটির কাছাকাছি কিছু কথায়। ছাদের উপর থেকে দৃষ্টি গেল মাটির পৃথিবীর দিকে। দেখলাম সেখানে তখনো মানুষের ব্যস্ততার চলাচল। 'ডানায় রোদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে' পাখিরা ফিরে গেছে নীড়ে। শুধু পাখিরা নয়, অনেক মানুষজনও দিনের কর্ম মুখর জীবনের পাঠ মোটামুটি ওইদিনকার মত সমাপ্ত করে শান্তির নীড়ের আশায় ফিরে গেছে আপন নীড়ে। তবে কিছু মানুষ তখনও ব্যস্ত। হয়তো বা কারোর কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে যাত্রা সবে শুরু হয়েছে, তারই ব্যস্ততার ছোঁয়া রয়েছে-তার যানবাহনে বা চলাচলে।

 একই পৃথিবীতে বসবাস করেও মানুষে মানুষে কর্মের সময়- কর্মের স্থান- কর্মের পদ্ধতি- কর্মের ধরন ইত্যাদি কত কিছুতেই না কত পার্থক্য! এ তো হল বাহ্যিক পার্থক্য, অন্তরজগত তো আরো বৈচিত্র্যময়- আরো বৃহৎ। তাহলে সেখানে পার্থক্য থাকবে না- এটা কি সম্ভব!  জীবনযাত্রা- পরিস্থিতি- পরিবেশ- শিক্ষা- সংস্কৃতি- অভিজ্ঞতা ইত্যাদি বিভিন্ন ব্যাপার মানুষের মানসিক জগতে অনেক প্রভাব ফেলে। আর এই ব্যাপারগুলো সবার একইরকম হয়ও না। সর্বোপরি ব্যক্তি ভেদে সবার ব্যক্তিত্ব আলাদা।

 বাহ্যিক- মানসিক সব জায়গাতেই বিভিন্ন ব্যাপারে মানুষ বিভিন্ন অবস্থানে অবস্থান করে। কোন কোন ব্যাপারে হয়তো মিল হয়, তবে মিল না হলে সেটা বিশাল কোন ভুলভ্রান্তি বা আশ্চর্যের ব্যাপার,তা কিন্তু ভাবাটা উচিত নয়। 

 আর আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা অনুযায়ীও প্রত্যেক আত্মার যাত্রা (Journey )আলাদা, তাই প্রত্যেক ব্যক্তির জীবনধারাও আলাদা-ঠিক ওই কাজের বিভিন্ন ব্যাপারে পার্থক্যের মতোই। তাই কারুর সৌভাগ্য দেখে ঈর্ষান্বিত হওয়ার যেমন কোন বৈধ যুক্তি নেই, তেমনি নিজের সৌভাগ্যে গর্ব অনুভব করে অন্যকে হেয় করারও কোন যৌক্তিকতা নেই। কারণ যে কার্মিক(Karmic) নিয়মে বিশ্বজগত গতিময় রয়েছে, সেই কার্মিক নিয়মে আত্মার যাত্রাপথও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। আর এটাই বিশ্বজগতের স্বাভাবিক নিয়ম।।

(ক্রমশ)

ক্লিক করে শুনে নিন 👇
লেখকের পাঠক সত্তা

Post a Comment

0 Comments