রাজার ভোজের রদবদল
(আফ্রিকা)
চিন্ময় দাশ
[অনেক কাল আগের কথা। তখনও বাঘ সিংহ সবাই ফলাহার করত। মানে হল, তারা তখন আমিষ খেতে শুরু করেছে বটে, ফলাহারটা ছেড়ে দেয়নি। কিন্তু একদিন ঠিক কেন বা কী করে ফলাহার ছেড়ে দিয়েছিল, তাই নিয়ে একটা গল্প আছে আফ্রিকা জুড়ে। সেটাই এবারের গল্প।]
আফ্রিকার বনেজঙ্গলে অনেক শেয়াল। পাড়ায় একটা শেয়ালের নাম—এমবোয়া। একদিন বনের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে এমবোয়া। খাওয়ারের খোঁজেই বেরিয়েছে সে। ঘুরতে ঘুরতে বনের অনেকটা গভীরে চলে এসেছে। সেদিন তার কপাল এমনই ভালো, হঠাৎ করেই একটা ফলন্ত গাছ চোখে পড়ে গেল। থা গাছ। আফ্রিকার ‘থা’ ফল যেমন রসালো, তেমনি মিষ্টি। এমন মিষ্টি ফল সারা আফ্রিকায় খুব কমই দেখা যায়।
এমবোয়ার তো আনন্দ ধরে না। থা খেতে পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। অনেক কপাল করলে, তবে এমন গাছের সন্ধান পাওয়া যায়। এতক্ষণ ধরে ঘোরাঘুরি আর অচেনা এলাকায় চলে আসবারই পুরস্কার এটা। লোকে বলে না-- কষ্ট করলে, কেষ্ট মেলে। হয়েছেও তাই।
গাছ ভর্তি ফল। রসে টইটুম্বুর। গছের তলায় মাটিতেও পড়ে আছে কিছু। শেয়াল জাতটাই যে ভারী লোভী, এ কথা তো সবাই জানে। এমবোয়া মনে ভাবল, ঝরে পড়া বাসি ফল। এগুলো কুড়িয়ে খেতে যাব কেন? এতদূর এসেই যখন পড়েছি, টাটকা পেড়ে খাওয়াই ভালো।
এই বলে, গাছে উঠে ডাল ঝাঁকাতে লাগলো এমবোয়া। টুপটাপ করে ফল ঝরে পড়ল।
গাছ থেকে নেমে খাওয়া শুরু করেছে। এমন সময় ভয়ানক একটা গর্জন ভেসে এলো বাতাসে। এমবোয়ার বুঝতে বাকি রইল না, সিংহের গর্জন এটা। বুকের ভেতর ছাঁৎ করে উঠল তার-- এই রে। এত মেহনত করে পাওয়া তোফা, সব জলে গেল।
তার মন বললো, ছাড়ো তো! সিংহমশাই ঠিক এখানেই আসবে, তার কী মানে? চিন্তায় চিন্তায় সময় নষ্ট না করে, খাওয়ার কাজটা সেরে নেওয়াই তো ভালো।
ফল খেতে শুরু করে দিল এমবোয়া। আহা, এ ফলের যে কী স্বাদ, না খেলে বোঝানো যাবে না কাউকে। এমবোয়ার মনে হল, স্বর্গের অমৃত খাচ্ছে সে। কপাকপ মুখে পুরতে লাগল মিষ্টি ফলগুলো।
পেটটা আধাআধি ভরেছে, এমন সময় আবার সেই গর্জন। এবার শব্দটা আরো কাছে। সে গর্জন শুনে, বুঝতে আর বাকি রইলো না কিছু। বুঝতে পারল, ভালোরকম খিদে পেয়েছে রাজামশাইর।
এমবোয়া ভালো মতোই জানে, সিংহের খিদের পরিমাণ কী রকম। তাছাড়া, এদিকেই আসছে বলে মনে হল ডাকটা শুনে। একবার এসে পড়লে, আর রেহাই নাই। সিংহ হলো বনের রাজা। রাজার অধিকার বনের সবকিছুতেই।
মাথার ভিতরে চিনচিন করতে করে উঠল তার। কী করা যায় এই পরিস্থিতিতে? এখনো সময় আছে। সে নিজে সরে পড়তে পারে। তাতে অন্তত আর কিছু না হোক, প্রাণটা তো বেঁচে যাবে। এদিকে আবার মন বলল, রসালো ফলের গাছটাকে বাঁচাতে হবে সিংহের লোভ থেকে। রাজার পেট বলে কথা। একবার হদিস পেয়ে গেলে, গোটা গাছের ফলই সাবাড় করে দেবে রাজামশাই!
তার উপর সবচেয়ে বড় কথা হোল, যদি একবার তিনি এখানে পৌঁছান। তাহলে আর কেউ কখনও এই গাছের ছায়াও মাড়াতে পারবে না। রাজার অধিকারে চলে যবে গাছটা।
এমবোয়ার মন বলল, গাছটাকে সিংহের হাত থেকে বাঁচাতেই হবে। এছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। মনে মনে ফন্দি আঁটতে লাগল সে। শেয়ালের মতো ধুরন্ধর আর কে আছে দুনিয়ায়? যেমন ধূর্ত, তেমনি তার চালাকি। সবেতেই সে ধুরন্ধর।
একটু বাদেই এমবোয়া বুঝতে পারল, সিংহ প্রায় এসে পড়েছে। আড় চোখে তার দিকে একবার তাকিয়ে দেখল সে। টপাটপ কয়েকটা ফল খেয়ে ফেলল হাপুস-হুপুস করে। এবার শব্দ করেই খেল, যাতে তার খাওয়াটা সিংহের নজরে পড়ে।
সিংহ সেটা দেখতেও পেয়ে গেল। সিংহ দেখল, একটা গাছের তলায় রসালো টসটসে ফল যেন বিছিয়ে রেখেছে কেউ। আর, একটা শেয়াল সেগুলো টপাটপ মুখে পুরে দিচ্ছে। কিন্তু আচমকাই কী যে হল, উল্টে পড়ে গেল শেয়ালটা। তারপরই যন্ত্রণায় চিৎকার করতে লাগলো। পা দিয়ে মাটি আঁচড়াতে লাগল পাগলের মত। তার পর সামান্য একটু পরেই, একেবারে স্থির হয়ে গেল শেয়ালটা।
সিংহমশাই ভ্যাবাচেকা খেয়ে গিয়েছে এমন দৃশ্য দেখে। কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। ব্যাপারটা মাথাতেই ঢুকছে না তার। এই তো গপাগপ ফল খাচ্ছিল। তার পর হোলটা কী? চেঁচাতে লাগল কেন? মাটি আঁচড়াতেই বা গেল কেন? এখন তো আবার চিৎপটাং হয়ে পড়ে আছে পাথরের মত!
সামনে এতগুলো রসালো পাকা ফল। আর, ওদিকে বেচারা শেয়ালটার এমন কাহিল অবস্থা। অনেক ভেবে চিন্তে শেয়ালের দিকে এগিয়ে গেল সিংহ। যতই হোক, বনের রাজা বলে কথা। একটা দায়িত্ব রাজার তো থাকেই। কী হোল ব্যাপারটা, দেখা দরকার।
শেয়ালের কাছে গিয়ে হাজির হোল সিংহ। বলল-- কী হে, শেয়াল পণ্ডিত! হলটা কী? এমন ছিরকুটে পড়ে আছো কেন?
এমবোয়া মনে মনে ভাবল, আহা, ভাষার কী ছিরি। রাজার মুখে এমন কথা মানায়? পন্ডিত না হলে, যা হয় তাই। মটকা মেরে পড়ে রইলো সে। সাড়া না পেয়ে, শেয়ালের কাছে আরো এগিয়ে এল সিংহ। একবার শুঁকে দেখল। শিয়াল তো দম বন্ধ করে রেখেছে। সিংহ ভাবল, নিশ্চয়ই ফলগুলো বিষাক্ত। না বুঝে খেয়ে, মারা পড়েছে হতচ্ছাড়াটা।
সিংহ বুঝে গেল, ভুলেও এই ফল মুখে তোলা উচিত হবে না। চোখের সামনেই তো ফলাফল বোঝা যাচ্ছে। এখান থেকে সরে পড়াই ভালো।
চলেও এল বটে, কিন্তু আসবার আগে, রসালো ফলগুলোর দিকে একবার চোখ না বুলিয়েও পারল না সিংহ। চোখে লোলুপ দৃষ্টি। কিন্তু সাথে সাথে শেয়ালটার দশা মনে হতেই, চোখ ফিরিয়ে নিল। মনে ভাবল, লোভ সামলে রাখাটা খুব জরুরী। রাজার মত দুলকি চালে চলে গেল গাছের তলা থেকে।
চোখ পিটপিট করে এমবোয়া তাকিয়ে দেখল, রাজামশাই চলে যাচ্ছেন। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়লো সে। পেট ভরে বাকি ফলগুলো খেলো। তারপর নিজেও হেলতে দুলতে বাসায় ফিরে এলো।
পেট ভরা থাকলে, ঘুম ভালো হয়। বাসায় ঢুকে সেই যে শুয়েছিল, এক ঘুমে রাত কাবার হয়ে গেল এমবোয়ার। সকালে ঘুম ভাঙল মন ভরা ফুর্তি নিয়ে। রাজাকে বোকা বানানো গেছে। কম কথা নাকি? তাছাড়া, গাছটার ঠিকানাও পাওয়া গেছে। মর্জি মত গিয়ে, পেট ভরে খেয়ে আসা যাবে।
কিন্তু তখনই তার মন বলল, রাজাকে বোকা বানানো অত সোজা কথা নয়। কৌশলটা যদি ধরা পড়ে যায়, তাহলে ফলের গাছটা তো গেলই। প্রাণটাও বাঁচানো যাবে না রাজার হাত থেকে।
সকাল হতেই রোদ উঠেছে। সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে চার দিক। একটা ফন্দি এলো এমবোয়ার মাথায়। মোড়লের বাড়ির দিকে হাটা দিল সে। তাকে ব্যাপারটা জানিয়ে রাখা দরকার।
মোড়ল হল গোটা এলাকার সব শিয়ালের মাথা। সবাই তাকে বেশ মান্য করে। মোড়লের বাড়ি অনেকদিন আসা হয়নি তার।
মোড়লের বাড়ি পৌঁছে, এমবোয়া দেখল, অনেক শেয়ালের ভিড় বাড়িতে। কান্নাকাটিও চলছে। ব্যাপার কী? জানা গেল, একটা শেয়াল মারা পড়েছে। তাই জমায়েত। তাই কান্নাকাটি।
সাথে সাথে চিড়িক করে উঠলো এমবোয়ার মাথায়। নতুন একটা ফন্দি এসে গেল মনে।
ভিড় ঠেলে, ভেতরে ঢুকে পড়ল সে। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল, সকলের চোখে জল।
সেও খানিকটা মড়া কান্না কেঁদে নিল হাউ-হাউ করে। জমায়েতের কান্নাকাটি থামল এক সময়। এবার মরা শেয়ালটাকে কোথাও ফেলে দিয়ে আসার ব্যাপার।
এমবোয়া চটপট এগিয়ে গেল-- আমাকে দাও। আমি একে কোথাও নামিয়ে রেখে আসছি। দেরি করে এসেছি তো। সময় মত পৌঁছাতে পারিনি আমি। এটা তার খেসারত।
শেয়ালদের মোড়ল বলল-- তুমি একা কী পারবে?
এমবোয়া বলল-- ঠিক পারবো। একটু কষ্ট হয় তো হবে। সেটুকু তো করতেই হবে। দাও ওকে আমার পিঠে চাপিয়ে।
কয়েকজন মিলে ধরাধরি করে মরা শেয়ালটাকে তার পিঠে চাপিয়ে দিল। এমবোয়া তো এটাই চাইছিল। সে মনে মনে জানে, এবার কী করতে হবে। কী ভেবে রেখেছে সে।
মরা শেয়ালটা পিঠে নিয়ে চলেছে এমবোয়া। মনে বেশ ফূর্তি। এইবারে রাজাকে চিরকালের মতো বোকা বানানো যাবে।
পিঠে মরা শেয়ালটা। বনের ভিতর ঢুকে, ফলে ভরা সেই থা গাছের গোড়ায় গিয়ে, ফেলে দিয়ে এলো সেটাকে।
মনে ভাবল, এবার চিরকালের জন্য নিশ্চিন্ত। এই গাছের ছায়াও আর মাড়াবে না রাজামশাই।
ঘটনাটা ঘটলও ঠিক তেমনই। এমবোয়া যেমনটি ভবেছিল। আট-দশ দিন কেটে গেছে তারপর। কিন্তু সিংহের মাথা থেকে ফলে ভরা গাছটার কথা নেমে যায়নি। চোখ বুজলেই, টস-টসে ফলগুলোর রঙিন ছবি ভেসে উঠছে। কিছুতেই ভুলে যেতে পারছে না সে। সিংহের মন বলল, ব্যাপারটা একবার খতিয়ে দেখা দরকার। যা ধূর্ত এই শেয়াল জাতটা। ভালো করে না দেখে, কিছুই বলা যায় না।
যেমন ভাবা, তেমন কাজ। সোজা গাছটার দিকে এগিয়ে চলল সিংহ। কাছাকাছি হয়েছে, একটা দুর্গন্ধ নাকে এসে লাগল তার। গাছের কাছে গিয়ে দেখল, গাছের তলায় কী একটা পড়ে আছে। পচে গলে গেছে দেহটা। কিন্তু চামড়া থেকেই বাঘের মালুম হোল, এটা সেদিনের সেই শেয়ালটাই।
ঝরে পড়া পাকা পাকা ফলে গাছের তলাটা ভরে আছে। সিংহ বুঝতে পারল, লোভ করে খেতে গিয়েছিল শেয়ালটা। মারা পড়েছে হতভাগাটা।
নাঃ, তাহলে আশঙ্কাটাই ঠিক। বিষ আছে এই ফলগুলোতে। সত্যিই মারা পড়েছে হতভাগাটা। লোভকে জয় না করতে পারার ফল ভুগেছে। পন্ডিত হয়েও, এভাবে বেঘোরে প্রাণটা দিতে হলো। নিজের ডেরায় ফিরে চলল সিংহ।
মরা শেয়ালটা ফেলে দিয়ে যাওয়ার পর থেকে, প্রতিদিন আড়াল থেকে গাছের তলাটা লক্ষ্য রাখে এমবোয়া। একদিন দেখতে পেয়ে গেল, সিংহমশাই লোভে লোভে গাছের তলায় এসেছেন। অবস্থা দেখে ফিরেও গেলেন। একটাও ফল মুখে তুললেন না।
এমবোয়া তো আনন্দে আটখানা। তার কারসাজি খেটে গেছে।
পাড়ায় ফিরে গিয়ে, মোড়লের কাছে হাজির। সমস্ত ঘটনা তাকে খুলে বলল। সবাই হাসতে লাগলো হো-হো করে। দল বেঁধে সব্বাইকে নিয়ে গাছের তলায় ফিরে এলো এমবোয়া। সবাই মিলে ভুরিভোজ করলো পাকা ফলগুলো দিয়ে।
কিন্তু এদিকে হয়েছে আর এক ঘটনা। গাছতলা থেকে ফিরে আসার পথে, একটা বাঘের সাথে সিংহের দেখা। অনেকদিন পরে দেখা দুজনের। গল্প জুড়ে দিল বাঘ আর সিংহ। অনেকক্ষণ এ কথা সে কথা পর, সিংহ সেই গাছতলার শেয়ালটার দুর্দশার কথা বলল। শুনে বাঘ বলল-- তাই নাকি? এমন বিষাক্ত ফল আছে এই বনের ভেতর?
সিংহ বলল-- তাহলে আর বলছিটা কী। নিজের চোখে তো দেখে এলাম সব। ভাগ্যিস সেদিন ফলটা খাইনি। নইলে আর দেখা হতো না তোমার সাথে। সেখানেই অক্কা পেয়ে পড়ে থাকতাম।
বাঘ সিংহ দুজনে যেখানে গল্প করছিল, কাছেই একটা ঝোপের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল একটা খরগোশ। ওই পথে যাচ্ছিল সে, সিংহকে দেখে লুকিয়ে পড়েছিল বেচারা। খানিক বাদে সেখানেই আবার এক বাঘ এসে হাজির। দু’-দুজন যম সামনে। চোখে পড়ে গেলে, আর রেহাই নাই। ঘাপটি মেরে ঝোপের আড়ালে বসে আছে খরগোশটা।
এতক্ষন ভয়েই মারা পড়ছিল খরগোশ। সিংহের শেষ কথাটা শুনে, তার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। ছোট্ট দুর্বল জীব খরগোশ। বনের ভিতর বাঘ সিংহের অভাব নেই। সব সময় ভয়ে মরে থাকতে হয়। আজ এমন একটা সুযোগ পাওয়া গেছে, চিরকালের জন্য একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
খরগোশ মনে ভাবল, মওকা সব সময় আসে না। একবার যখন এসেছে, হাতছাড়া করা ঠিক নয়। সাহস করে, ঝোপ থেকে বেরিয়ে এলো খরগোশ। কিচ-কিচ করে, দুই বলবানের দিকে এগিয়ে গেল। দুই হাত জড়ো করে বলল—পেন্নাম হই, রাজামশাইরা।
খরগোশের এমন ভঙ্গি দেখে, সিংহ হতবাক। এত সাহস হোল কী করে পুঁচকেটার! হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে আছে, সিংহ বলল—কীরে, কী খবর?
খরগোশ বলল-- অপরাধ নেবেন না আমার। একটা কথা বলতাম।
সিংহের ভুরু কুঁচকে গেল। হোল কী দেশটার? একটা খরগোশ চলে এসেছে সামনে! মুখে বলল—তা, বলে ফেল। তোর কী কথা?
খরগোশ বলল-- আমি বলছিলাম কী, শুধু ওই ফলটা কেন, হুজুর? কোনও ফলই কি না খেলে, চলে না আপনাদের?
তার কথা শুনে, বাঘ গরগর করে উঠল—মানে? কী বলতে চাস তুই?
--না, মানে আমি বলতে চাইছি, কোনও ফলের গায়ে তো আর লেখা নেই যে কোনটা ভালো, আর কোনটা বিষ। না জেনে শুনে কামড় বসিয়ে, বেঘোরে মরার দরকারটাই বা কী আপনাদের? তাছাড়া, এসব ফল-পাকুড়, ঘাস-পাতা এসব প্রজারা খায়। এমন খাওয়া আপনাদের মত রাজা-রাজড়াদের মানায় না।
খরগোশের কথা শুনে, বাঘের মনে ভারি পুলক। এই বনের ভিতর সবচেয়ে জ্ঞানী বলে মানা হয় খরগোশকে। সে বাঘকেও সিংহের সমান বলে ভাবছে। রাজার দলে ফেলে দিয়েছে বাঘকেও।
বাঘ ভারী খুশি হল মনে মনে। নরম গলায় বলল-- একেবারে খাঁটি কথা বলেছিস। আদত কথা একেবারে।
সিংহ পশুরাজ। তারও মনে ধরেছে কথাটা। গম্ভীরভাবে কেশর দুলিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো সিংহ।
দুজনের মনের ভাব ধরে ফেলেছে খরগোশ। সে বলল—আর একটা কথা বলি, হুজুরেরা। গায়ে শক্তি আছে আপনাদের। ফল-পাকুড় খেতে যাবেন কেন আপনারা? বনের অন্য সবাই হাসাহাসি করে আপনাদের দেখে। এই বনের ভেতর যত গাছগাছালি, জীবজন্তু তো তারও চেয়েও বেশি। তাদের ধরে খাওয়া-দাওয়া করুন। মাংস খাওয়ায় তো কোন বিপদ নাই। কোনদিন কোনও অসুবিধায় পড়তে হবে না আপনাদের। শুধুমুধু কেন এসব ফল-পাকুড় খেতে যাবেন?
খরগোশের কথা মেনে নিল দুজনে। বাঘ সিংহ দুজনেই খুশি। একটা অজানা বিপদের হাত থেকে চিরকালের মতো বাঁচিয়ে দিল এই পুঁচকে প্রাণীটা।
সিংহ হলো বনের রাজা। তার একটা দায়িত্ব আছে অন্যদের নিয়েও। সিংহ সেদিনই ঘোষণা করে দিল-- আজ থেকে বনের ফল-পাকুড় আমরা বাঘ-সিংহরা কেউ খাব না।
সেটাই নিয়ম হয়ে গেল। বাঘ আর সিংহ কেউ কোনদিন বনের ফল খায় না। বলতে কী, খরগোশের পরামর্শে সেদিন থেকে নিরামিষ ভোজন ছেড়ে দিয়েছে বাঘ এবং সিংহেরা।
তাতে লাভ হয়েছে অন্যদের। নিজেদের মতো ইচ্ছেমতো পেট ভরে খেতে পারে সবাই। বাঘ সিংহকে আর ফলের ভাগ দিতে হয় না তাদের। নইলে, জালার মতো যা পেট রাজারাজড়াদের!
0 Comments