অয়ন মুখোপাধ্যায়
সেদিন সকালে ফেলুদার টেবিলে তিনটে জিনিস পাশাপাশি পড়ে ছিল—এক কাপ চা, একটা মোবাইল ফোন, আর একটা পুরনো কালো খাতার ছবি। খাতাটা অবশ্য ২১ রাজানী সেন রোডে ছিল না। ছিল শুধু তার ডিজিটাল ছায়া।
তোপসে বলল, “খাতাটা কার?”
ফেলুদা চোখ না তুলেই বলল, “যার, সে এখন বিপদে।”
ঠিক তখনই লালমোহন বাবু ঢুকলেন। গায়ে উজ্জ্বল নীল পাঞ্জাবি, হাতে নতুন স্মার্টফোন, মুখে এমন তৃপ্তির হাসি যেন আধঘণ্টা আগেই তিনি ভবিষ্যৎ লেখালেখির উৎস ভূমি দেখে এসেছেন।
তিনি ঢুকেই বললেন, “মশাই, আমার আর কোন সমস্যা নেই আমি এখন এ আই-তে ঢুকে গেছি। আমার পরের বইয়ের নামও এ আই সাজেস্ট করেছে— মেট্রোরেলে মারণ মন্ত্র। কেমন?”
ফেলুদা চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে বলল, “মারণ মন্ত্রটা বাদ দিন। তবে মেট্রো রেলটা কাজে লাগতে পারে।”
লালমোহন বাবু চমকে উঠলেন। “মানে নতুন কেস?”
ফেলুদা ফোনটা তোপসের দিকে বাড়িয়ে দিল। স্ক্রিনে একটা মেসেজ খোলা।
“মিত্র মশাই, আজ দুপুরের মধ্যে না এলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। মানিক-স্মরণ প্রদর্শনীর মূল খাতাটি উধাও। তার বদলে মোবাইলে একটা ভিডিও এসেছে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে খাতাটা মেট্রোর শেষ কামরায় রাখা হচ্ছে। কিন্তু লোকটা কে, বোঝা যাচ্ছে না।”
নিচে নাম— অর্যদীপ রায়চৌধুরী।
ফেলুদা উঠে দাঁড়াল। “তোপসে, চল। কলকাতা পালটেছে। চোরের হাতও পালটেছে।”
প্রদর্শনীর জায়গাটা উত্তর কলকাতার এক পুরনো বাড়ি। বাড়িটার ঠিক পাশেই নতুন মেট্রো স্টেশনের মুখ। একদিকে রঙচটা সবুজ জানলা, লোহার বারান্দা, পুরনো পাথরের সিঁড়ি। অন্যদিকে কাচের দরজা, এস্কেলেটর, কিউ আর স্ক্যানার, বিজ্ঞাপনের এলইডি আলো। যেন দুটো সময় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু একে অপরকে বিশ্বাস করে না।
🍂
অর্যদীপ রায়চৌধুরী নিজে দরজায় এসে ফেলুদা দের খুলে দিলেন। বয়স পঁয়তাল্লিশের কাছাকাছি। জিন্স টি শার্ট পড়ে আছে , গলায় চাপা উৎকণ্ঠা। তিনি বললেন, “আপনাকে ডাকা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না, মিত্র মশাই।”
ফেলুদা বলল, “খাতাটা কী ধরনের?”
অর্যদীপ বাবু বললেন, “ছোট কালো মলাট। ভিতরে সত্যজিৎ রায়ের কয়েকটা দ্রুত আঁকা স্কেচ , একটা সিনেমার খসড়া, আর প্রথম পাতায় রায় সাহেবের বিখ্যাত সই। বহু বছর ধরে আমাদের পরিবারের মধ্যেই ছিল। আজকের প্রদর্শনীর প্রধান আকর্ষণ ও ছিল সেটাই।”
লালমোহন বাবু বললেন, “অমূল্য জিনিস।”
ফেলুদা শান্ত গলায় বলল, “অমূল্য জিনিসের দাম সাধারণত চোরেরাই আগে বোঝে।”
প্রদর্শনীর ঘরে ঢুকে তোপসে দেখল, মাঝখানে কাঁচের বাক্স। কিন্তু বাক্স খালি। পাশে একটা ট্যাবলেট। তাতে এ আই-এর সাহায্যে কিছু রেখাচিত্র নড়ছে, চোখ খুলছে, মুখের আকার বদলাচ্ছে। আরও কয়েকটা স্ট্যান্ডে কিউ আর কোড রাখা। দর্শকরা নাকি কোড স্ক্যান করলে অডিও গাইড শুনতে পেতেন।
তোপসে বলল, “মানে খাতা দেখার সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলে ব্যাখ্যাও?”
অর্যদীপ বাবু মাথা নাড়লেন। “কাজটা করেছে ঋতম কুণ্ডু। ডিজিটাল আর্কাইভিং নিয়ে ওর স্টার্ট-আপ আছে। আজকের ছেলেদের মতোই স্মার্ট, দ্রুত, আর প্রযুক্তিতে ভীষণ পাকা।”
ফেলুদা কাঁচের বাক্সের দিকে ঝুঁকল। “চুরিটা কখন ধরা পড়ে?”
“দুপুর একটা নাগাদ। তার খানিক আগে পাঁচ মিনিটের জন্য আলো নিভে গিয়েছিল। ইনভার্টার ছিল, কিন্তু ট্যাবলেট আর ডিজিটাল স্ক্রিন বন্ধ হয়ে যায়। আলো ফিরতেই সব স্বাভাবিক মনে হয়। পরে দেখি খাতা নেই।”
“ঘরে তখন কারা কারা ছিলেন?”
অর্যদীপ বাবু বললেন, “চারজন বিশেষ আমন্ত্রিত। শ্রেয়াংশ গুহ, সংগ্রাহক। ঊর্জসী সেন, গবেষক। ঋতম কুণ্ডু, টেক-ডিজাইনার। আর সপ্তর্ষি লাহিড়ী, সিনেমাটোগ্রাফার। বাড়ির পুরনো লোক নকুল চরণ পালও ছিল।”
ফেলুদা বলল, “ভিডিওটা দেখান।”
অর্যদীপ বাবু মোবাইল খুললেন। ভিডিওটা কুড়ি সেকেন্ডের। তাতে দেখা যাচ্ছে, কালো মাস্ক পরা এক লম্বা লোক মেট্রোর শেষ কামরায় ঢুকছে। হাতে কালো খাতা। লোকটা খাতাটা সিটের নিচে ঠেলে দিল। তারপর দরজা বন্ধ। ট্রেন ছেড়ে দিল।
লালমোহন বাবু চাপা গলায় বললেন, “ব্যাপারটা বেশ সিনেমাটিক।”
ফেলুদা বলল, “সিনেমাটিক জিনিসকে একটু বেশি সন্দেহ করতে হয়।”
প্রথমে এলেন শ্রেয়াংশ গুহ। দামি পারফিউম, সোনালি ফ্রেমের চশমা, গলায় পরিমিত ভদ্রতা। তিনি এমনভাবে বসলেন যেন কোনও আদালতে সাক্ষ্য দিতে এসেছেন।
ফেলুদা বলল, “আপনি পুরনো পোস্টার, লবি-কার্ড, সিনেমার স্মারক সংগ্রহ করেন?”
শ্রেয়াংশ বাবু বললেন, “ওটাই আমার নেশা। তবে নেশা আর অপরাধ এক জিনিস নয়।”
ফেলুদা হালকা হাসল। “দুটোর মাঝখানে লোভ নামে একটা জিনিস থাকে। খাতাটা আপনার সংগ্রহে থাকলে মন্দ লাগত না নিশ্চয়ই?”
শ্রেয়াংশ বাবু বললেন, “মন্দ লাগত না। কিন্তু আমার পছন্দের জিনিস আমি কিনি, চুরি করি না।”
“ভিডিওটা আপনি পেয়েছেন?”
“না। শুধু অর্যদীপ বাবু আমাকে দেখিয়ে ছিলেন।”
এরপর এল ঊর্জসী সেন। তীক্ষ্ণ চোখ, ক্লান্ত মুখ, পরিপাটি নোটবুক। তোপসের মনে হল, মেয়েটা কথা কম বলে, কিন্তু যা বলে তা ভেবে বলে।
ফেলুদা বলল, “আপনি কী নিয়ে গবেষণা করছেন?”
“সত্যজিৎ বাবুর চলচ্চিত্র নিয়ে। বিশেষ করে চলচ্চিত্র নির্মাণের আগের খসড়া, শিরোনাম, , প্রোডাকশন নোট ইত্যাদি।”
“খাতার ছবি তুলেছিলেন?”
“না। নিষেধ ছিল।”
“মোবাইলে নোট?”
“না। কাগজে। মোবাইলে নোট নিলে মনোযোগ টা নষ্ট হতো।”
ফেলুদা বলল, “ভালো উত্তর।”
তৃতীয় ব্যক্তি ঋতম কুণ্ডু। বয়স কম, আত্মবিশ্বাস বেশি। টি-শার্ট, স্মার্টওয়াচ, দামি ফোন। কথা বলার সময় বারবার স্ক্রিনে চোখ যাচ্ছে। যেন মানুষ নয়, নোটিফিকেশনে ই ওর আসল পরিচিতি।
ঋতম বলল, “আমি শুধু টেক সাপোর্ট করেছি। এ আই অ্যানিমেশন, কিউ আর অডিও, ডিসপ্লে—সব আমার টিমের। চুরির সঙ্গে আমি নেই।”
ফেলুদা বলল, “খাতার স্ক্যান করেছিলেন?”
“অনুমতি নিয়ে। খুব লো-রেজ। শুধু ডিসপ্লের জন্য।”
“লো-রেজ থেকে এ আই হাই-রেজ তুলতে পারে?”
ঋতম হেসে বলল, “আজকাল অনেক কিছুই পারে।”
“মানুষের মুখও?”
“ডিপ ফেক? পারে। তবে সে সব আমার কাজ নয়।”
চতুর্থ ব্যক্তি সপ্তর্ষি লাহিড়ী। মাঝ বয়সি, কালো শার্ট, ধূসর দাড়ি, চোখে আলো মাপার অভ্যাস। তিনি বসেই বললেন, “আমি ভিডিওর লোক নই।”
ফেলুদা সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আমি তো এখনও আপনাকে কিছু জিজ্ঞেসই করিনি।”
সপ্তর্ষির মুখে এক মুহূর্তের অপ্রস্তুতি দেখা দিল। “এই সময়ে আগে থেকে বলে রাখাই ভালো।”
নকুল চরণ পালকে ডাকতেই বৃদ্ধ লোকটা ধুতি সামলে এলেন। মুখে বলিরেখা, চোখে পুরনো বাড়ির অভিজ্ঞতা। তিনি বললেন, “আলো যাওয়ার সময় এই ঘরেই ছিলুম। পরে অর্যদীপ বাবু ডেকে বাইরে পাঠালেন। মিনিট তিনেক। ফিরে এসে কিছু খেয়াল করিনি। পরে দেখি খাতাটা নাই।”
ফেলুদা কাঁচের বাক্সের খুব কাছে গেল। তারপর পাশের ট্যাবলেটটা তুলল। তাতে একটা এ আই অ্যানিমেশন চলছিল—একটা আঁকা চোখ ধীরে খুলছে, আবার অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। দৃশ্যটা সুন্দর, কিন্তু তোপসের চোখে অতিরিক্ত মসৃণ।
ফেলুদা একটা কিউ আর কোড স্ক্যান করল। অডিও গাইড খুলল। দ্বিতীয়টা স্ক্যান করতেই ‘ফাইল নট ফাউন্ড’। তৃতীয়টা আবার ঠিক। চতুর্থটার লিঙ্ক অন্য কোথাও নিয়ে যাচ্ছে।
ফেলুদা বলল, “যে খাতাটা গেছে, তার পাশের কিউ আর লিঙ্ক আগে থেকে পালটানো হয়েছে। মানে খাতা হারানোর আগেই তার ডিজিটাল পথ মুছে দেওয়া হয়েছে।”
লালমোহন বাবু মুগ্ধ হয়ে বললেন, “ডিজিটাল পথ! মশাই, শব্দ বন্ধটা আমি লিখে রাখছি।”
সোজা মেট্রো স্টেশনে যাওয়া হল। প্ল্যাটফর্মে তখন ভিড় মাঝারি। কেউ ফোনে রিল দেখছে, কেউ স্ক্রিনে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ ইয়ারফোন গুঁজে অন্য গ্রহে চলে গেছে। তোপসের মনে হল, এখনকার কলকাতায় লোকজন ট্রেনের জন্য যত না অপেক্ষা করে, নোটিফিকেশনের জন্য অপেক্ষা করে তার চাইতে বেশি।
ফেলুদা ভিডিওটা আবার দেখল। তারপর প্ল্যাটফর্মের শেষ দিকটা চোখে মাপল। শেষ কামরার চিহ্ন, কাচের প্রতি ফলন, আলো পড়ার কোণ—সব যেন সে একবারে মাথায় তুলে নিল।
তোপসে বলল, “খাতাটা সত্যিই কি ট্রেনের ভেতরে ছিল?”
ফেলুদা মুচকি হেসে বলল, “ভিডিওতে ট্রেন আছে। তাই বলে ঘটনাটা ট্রেনে ঘটেছে, তার কোনোপ্রমাণ নেই।”
“মানে ভিডিওটা নকল?”
“পুরোটাই নয়। পটভূমিটা আসল।কিন্তু লোকটা বসানো।”
তোপসে চমকে বলল, “কী করে বুঝলে?”
ফেলুদা আরেকবার মুচকি হেসে বলল, “শেষ কামরার কাঁচে লোকটার প্রতিফলন নেই। আলো আছে, সিট আছে, বিপরীত দিকের কাঁচে ছায়াও আছে। শুধু ওই লোকটার নেই। আলোকে ফাঁকি দেওয়া অত সহজ নয়।”
লালমোহন বাবু বললেন, “তাহলে বলছেন চোর আধুনিক ?।”
ফেলুদা বলল, “চোর ভেবেছে সবাই আধুনিক, কিন্তু কেউ তার মত কেউ প্রযুক্তিগত ভাবে স্মার্ট নয় তাই সহজ জিনিস ভুলে যাবে।”
বাড়িতে ফিরে ফেলুদা ঋতমের ফোন দেখতে চাইল। ঋতম একটু শক্ত গলায় বলল, “প্রাইভেসি বলে একটা জিনিস আছে।”
ফেলুদা বলল, “অবশ্যই আছে। আর সন্দেহ বলেও একটা জিনিস আছে।”
ঋতম ফোনটা দিল। ফেলুদা গ্যালারি না খুলে ডাউনলোড, ক্যাশড ফাইল, স্ক্যানার অ্যাপ, পেমেন্ট হিস্ট্রি দেখল। তারপর থেমে গেল।
সে বলল, “আপনার ফোনে মেট্রোর কিউ আর টিকিট আছে। সময় বারোটা বত্রিশ। আপনি বোঝাতে চাইছেন, তখন আপনি মেট্রোয় ছিলেন।”
ঋতম বলল, “ঠিক তাই।”
ফেলুদা শান্ত গলায় বলল, “আপনি টিকিট কেটেছিলেন। কিন্তু ট্রেনে ওঠেননি।”
ঋতম কটমট করে তাকাল। “প্রমাণ?”
“এই টিকিটটা স্ক্রিনশট। লাইভ টিকিট নয়। আর স্ক্রিনশটের সময় ফোনের ব্যাটারি একচল্লিশ শতাংশ ছিল। এখনো একচল্লিশ। তিন ঘণ্টায় এক শতাংশ ও কমেনি। কারণ তখন ফোনটা এরোপ্লেন মোডে ছিল।”
ঋতম চুপ।
ফেলুদা এবার ট্যাবলেটের অ্যাডমিন সেটিং খুলল। কয়েকটা ফোল্ডার দেখে থামল। একটা ফোল্ডারের নাম— test_shadow। ভিতরে ফুল-রেজ স্ক্যান।
ফেলুদা বলল, “আপনি বলেছিলেন লো-রেজ স্ক্যান করেছেন। অথচ এখানে ফুল-রেজ ফাইল। নাম বদলে রেখেছেন মাত্র।”
অর্যদীপ বাবুর মুখ ফ্যাকাশে করে বললেন, “শেষে ঋতম তুমি?”
ঋতম বলল, “আমি চুরি করিনি। আমি শুধু ডিজিটাল আর্কাইভ বানাচ্ছিলাম।”
ফেলুদা কাঁচের বাক্সের তলায় নখ দিয়ে ঠুকল। দেখল শব্দটা ফাঁপা। আবার ঠুকল। একই শব্দ।
“নকুল চরণ বাবু, একটা স্ক্রু-ড্রাইভার হবে?”
মিনিটখানেক পরে বাক্সের কাঠের তলা খোলা হল। ভিতরের ফাঁকা জায়গা থেকে বেরিয়ে এল সেই কালো খাতা।
লালমোহন বাবু হাঁ করে বললেন, “চোর বাইরে মেট্রো দেখিয়ে খাতাটা ঘরেই লুকিয়েছে!”
ফেলুদা বলল, “চোর জানত সবাই বাইরে ছুটবে—মেট্রোয়, সিসিটিভিতে, ভিডিওতে, কিউ আর কোডে। তাই আসল জিনিসটাকে সে লুকিয়েছে সবচেয়ে পুরনো জায়গায়—কাঠের ভিতরে।”
ঋতম এবার আর অভিনয় করল না। সে ধীরে বলল, “আপনারা বুঝবেন না। একটা অমূল্য জিনিস কাঁচের বাক্সে আটকে থাকবে, আর নতুন প্রজন্ম শুধু দূর থেকে তাকিয়ে থাকবে—এটা অন্যায়। আমি ওটার উপর এ আই মডেল বানাতে চেয়েছিলাম। রেখা, হাতের গতি, অক্ষরের চাল—সব শেখানো যেত।”
ফেলুদা বলল, “চেনা আর ব্যবহার করা এক জিনিস নয়। শ্রদ্ধা আর দখলও এক জিনিস নয়।”
ঋতম বলল, “আমি ওটাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।”
ফেলুদার গলাটা শক্ত হল। “বাঁচাতে হলে আলোয় আনতে হয় সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। লুকিয়ে নয়। মিথ্যে বানিয়ে তো নয়ই।”
তারপর ফেলুদা একে একে ভুলগুলো দেখিয়ে দিল। “এক—খাতার পাশের কিউ আর লিঙ্ক আপনি আগেই সরিয়েছেন। দুই—ভিডিওতে প্রতিফলন নেই। তিন—মেট্রোর অ্যালিবাই স্ক্রিনশট। চার—ফুল-রেজ স্ক্যানের ফাইল। পাঁচ—বাক্সের তলার স্ক্রু পুরোপুরি আটকাতে ভুলেছেন।”
ঘরে এক মুহূর্তে নীরবতা নেমে এল। ঊর্জসী আস্তে বলল, “প্রযুক্তির দোষ নয়। সমস্যা হয় যখন মানুষ ভাবে, ইতিহাস কেও এইভাবে ডাউনলোড করা যাবে।”
শ্রেয়াংশ গুহ গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “সংগ্রহ, সংরক্ষণ আর দখল—তিনটে আলাদা ব্যাপার।”
সপ্তর্ষি লাহিড়ী বললেন, “ডিপ ফেকের আলো কখনও পুরো ঠিক হয় না। ক্যামেরা শেষ পর্যন্ত মিথ্যে কে ক্ষমা করে না।”
অর্যদীপ বাবু খাতাটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “এখন কী করা উচিত বলুনতো ফেলু বাবু?”
ফেলুদা বলল, “প্রথমে নিরাপত্তা। তারপর সঠিক ডিজিটাল আর্কাইভ। গবেষকদের জন্য নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকার। কিন্তু শিল্পীর স্বাক্ষর কে শুধু ডেটা ভেবে ব্যবহার করবেন না। স্মৃতির ও একটা মর্যাদা আছে।”
লালমোহন বাবু সঙ্গে সঙ্গে নোটবই বার করে লিখতে শুরু করলেন। তারপর বললেন, “আমি বইয়ের নাম ঠিক করে ফেলেছি— মেট্রোরেলে ছায়া স্বাক্ষর ।”
ফেলুদা বলল, “এটা আগেরটার চেয়ে ভালো। অন্তত মারণ মন্ত্রটা বাদ গেছে।”
ফিরতি পথে মেট্রোর শেষ কামরাতেই ওঠা হল। কাচে নিজের মুখ ভেসে উঠছিল। বাইরের অন্ধকারের উপর ভিতরের আলো এসে লেগে মানুষকে দু’বার দেখাচ্ছিল—একবার সত্যি, একবার প্রতিফলনে।
তোপসে বলল, “ফেলুদা, আজকের কেসে খলনায়ক কি প্রযুক্তি?”
ফেলুদা মাথা নাড়ল। “নারে তোপসে। প্রযুক্তি খলনায়ক নয়। খলনায়ক হল শর্টকাট। আগে চোর তালা ভাঙত। এখন কিউ আর বানায়, ডিপফেক বানায়, অ্যালিবাই বানায়। কিন্তু তাড়াহুড়োয় সে এখনও একই ভুল করে—নিজেকে অতিরিক্ত বুদ্ধিমান ভাবে।”
ট্রেন তখন সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে ছুটছে। কামরার অর্ধেক মানুষ মোবাইলের দিকে তাকিয়ে। কেউ কারও মুখ দেখছে না। তবু কাচে ফেলুদার মুখের প্রতিফলন দেখে তোপসের মনে হল, সন্দেহ করা আর প্রশ্ন করার শিল্পটাই বোধহয় এখনও মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।
ফেলুদা বলল, “একজন শিল্পী তার নিজস্ব রেখা রেখে যান। একজন বিজ্ঞানী তার আবিষ্কার করা পদ্ধতি রেখে যান। আর একজন গোয়েন্দা সে সমস্ত কিছুকে সন্দেহ করবে এবং প্রশ্ন করবে। আর এই তিনটে জিনিস থাকলেই মানুষ এ আই-কে ব্যবহার করবে, এ আই মানুষকে নয়। মনে রাখবেন আগামী পৃথিবীতে মানবিক সৃষ্টি গুলোর দাম অনেক বেশি দামি হবে সবচেয়ে বড় কথা এ আই কে চালাবে কে? মানুষ অতএব মগজাস্ত্রই শেষ কথা।”
লালমোহন বাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আপনি আমার সাহিত্যিক স্বাধীনতাকে বারবার বিজ্ঞানের হাতে তুলে দেন, মশাই।”
ফেলুদা হেসে বলল, “আপনার স্বাধীনতা নিয়ে চিন্তা নেই। আপনি শিরোনাম দিয়েই পাঠক ধরে ফেলবেন।”
ট্রেন থামল। দরজা খুলল। লোকজন নেমে গেল। কেউ তাকাল না। কিন্তু তোপসের মনে হল, এই শহরে রহস্য এখনও বেঁচে আছে। শুধু সে আর পুরনো সিন্দুকে লুকিয়ে থাকে না।
কখনও সে থাকে মোবাইলের স্ক্রিনে। কখনও মেট্রোর কাঁচে। কখনও এ আই-এর তৈরি মসৃণ মিথ্যের ভিতরে।আবার কখনও, এক টুকরো সই এর মধ্যে—যেখানে মানুষ ভাবে সে ইতিহাসকে ছুঁয়ে ফেলেছে, অথচ আসলে সে কিছুতেই জয় করতে পারেনি নিজের লোভ কেই।
0 Comments