জ্বলদর্চি

দুটি কবিতা /কমলিকা ভট্টাচার্য

দুটি কবিতা
 কমলিকা ভট্টাচার্য

পূর্ণিমার চাঁদ জানে


পূর্ণিমার চাঁদ জানে কলঙ্কের কালি, তবু তার জোৎস্না কেন এত কোমল হয়ে তোমার মুখে এসে পড়ে— সে কথা কি কখনও বলেনি তোমায়?

আমার বুকের গভীরে যে জোয়ার ওঠে, নিস্তব্ধ রাতের নদীর মতো, তার শব্দ কেউ শোনে না— শুধু তুমি ছাড়া। তবু তুমি অবাক চোখে জানতে চাও, আমি তোমার কে?

আমি সেই পূজারিণী, যে প্রতিটি পূর্ণিমায় কুর্চি ফুলের শুভ্র অর্ঘ্য সাজিয়ে রাখে তোমার অদেখা বেদীর সামনে। যার প্রতিটি প্রার্থনায় তোমার নাম নিঃশব্দে জেগে থাকে, যেমন প্রদীপের শিখায় লুকিয়ে থাকে আগুন।

তুমি কি টের পাও না, আমার ভালোবাসার সুবাস কুর্চি ফুলের গন্ধ হয়ে তোমার চারপাশে ঘুরে বেড়ায়? তুমি কি অনুভব করো না, আমার সমস্ত না-বলা কথা রাতের বাতাস হয়ে তোমার কানের কাছে এসে থমকে দাঁড়ায়?

নাকি তুমি সবই জানো, তবু জানতে চাও আবার— যেমন চাঁদ জানে সমুদ্রের টান, তবু প্রতিরাতে জোয়ার ডেকে দেখে সে এখনও আসে কিনা।

আমি তোমার সেই অপেক্ষা, যে অপেক্ষার কারণ নেই। আমি তোমার সেই প্রার্থনা, যার কোনো উচ্চারণ নেই। আমি তোমার সেই নামহীন প্রেম, যে প্রেম নিজের পরিচয় চায় না, শুধু তোমার হৃদয়ের এক কোণে একফোঁটা আশ্রয় চায়।

আর যদি কোনোদিন তুমি সত্যিই জানতে চাও, আমি তোমার কে— তবে পূর্ণিমার রাতে কুর্চি ফুলের গন্ধ মেখে চাঁদের দিকে একবার তাকিও।
দেখবে, আমার সমস্ত ভালোবাসা জোৎস্না হয়ে নেমে এসেছে তোমার উপর, আর নীরবে বলছে—
"আমি তোমার সেই মানুষ, যে তোমাকে ভালোবেসে নিজেকেই তোমার মধ্যে বিসর্জন দিয়েছে।"

🍂

অপ্রয়োজনীয়

নিজেকে কতবার ভেঙেছি, তোমার ভালোবাসার মন্দির গড়ব বলে— টের পাইনি, কখন যে সেই মন্দিরের সিঁড়িতে পড়ে থাকা এক মুঠো ধুলো হয়ে গেছি।

তোমার আকাশ থেকে ঝরে পড়া অবসরের কয়েকটি ক্ষণ, ক্লান্ত বিকেলের কিছু অন্যমনস্ক শব্দ, আর উচ্ছিষ্ট কিছু স্নেহ— প্রসাদ ভেবে দু'হাত পেতে নিয়েছি।

ভাবতাম, ভালোবাসা বুঝি এমনই— একজন নদী হয়ে বয়ে যায়, অন্যজন কেবল তীরে দাঁড়িয়ে থাকে।

তোমার নীরবতাকে ভাষা দিয়েছি, অবহেলাকে দিয়েছি অজস্র অজুহাত, আর নিজের সমস্ত অভিমান রাতের জানালায় ঝুলিয়ে রেখে প্রতিদিন ফিরে এসেছি তোমার কাছেই।

কিন্তু অবহেলারও এক নিজস্ব ঋতু আছে— বারবার এলে সে হৃদয়ের বাগানে ফুল নয়, শুধু শুকনো পাতার শব্দ রেখে যায়।

আজ তাই আর কোনো দাবি নেই, কোনো অভিযোগও নয়। শুধু এতটুকু বুঝেছি— ভালোবাসা যদি ভিক্ষা হয়ে যায়, তবে সে আর ভালোবাসা থাকে না।
যেখানে নিজেকে বারবার ছোট করতে হয়, সেখানে প্রেমের চেয়ে অপমানই বেশি জন্মায়।

তাই আজ তোমার বন্ধ দরজার সামনে শেষবারের মতো দাঁড়িয়ে নিজেকেই ফিরিয়ে নিচ্ছি— নইলে যে একদিন নিজের কাছেই বড় অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাব।

Post a Comment

2 Comments

  1. AnonymousJune 19, 2026

    দুটোই আদ্যন্ত প্রেমের কবিতা। তবে প্রথমটার অভিঘাত বেশি। শেষ কটা লাইন অনবদ্য। দ্বিতীয় কবিতা প্রেমের চেয়ে বেশি বিরহের। বর্ষার আবহে বেশি ভালো লাগল।

    ReplyDelete
  2. AnonymousJune 19, 2026

    দুটোই আদ্যন্ত প্রেমের কবিতা। তবে প্রথমটার অভিঘাত বেশি। শেষ কটা লাইন অনবদ্য। দ্বিতীয় কবিতা প্রেমের চেয়ে বেশি বিরহের। বর্ষার আবহে বেশি ভালো লাগল।

    ReplyDelete