মননের দর্পণে জীবনের কিছু টুকরো কথা
ষষ্ঠ পর্ব
স্বাতী ভৌমিক
এই পর্বের আলোচনার বিষয় হলো- জীবনের পর্যায়স্রোতে চিন্তার-ধারণার পরিবর্তনশীলতা।
চেতন- অচেতন সমস্ত পার্থিব ব্যাপারগুলিরই ক্রমপরিণতির স্তর রয়েছে। সচেতনভাবে বা অচেতনভাবে- যেভাবেই হোক না কেন, চেতনার পরিমাণ অনুযায়ী পরিণতির স্রোতে এই স্তরগুলি অতিক্রম করতেই হয়।
মানব জীবনকালকে মোটামুটি কয়েকটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে- শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব ও বার্ধক্য। প্রতিটি স্তরে অভিজ্ঞতার গলিপথ- রাজপথ অতিক্রম করে বা বিভিন্নভাবে ক্রমবিকশিত হতে থাকে মানব চেতনা।
🍂
এরই সাথে মানব চাহিদারও পরিবর্তন ঘটতে থাকে। শৈশবের চাওয়া-পাওয়ার সাথে বার্ধক্য- বা এত দূরে যেতে হবে না, যৌবনের চাওয়া-পাওয়ার আমূল পার্থক্য ঘটে যায়। যৌবনের সাথে আবার বার্ধক্যের চাওয়া-পাওয়ার, পরিমাণ-বিষয়ের আরও বেশি তারতম্য পরিলক্ষিত হয়।
কিন্তু একটা বিষয় লক্ষ্য করার, তা হল- সব স্তরেই চাওয়ার মানসিকতার সাথে যে বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তা হল- সুখ অথবা শান্তি তথা মনের খুশি বা আনন্দ। এর অন্বষনেই মানুষের জীবনকাল অতিবাহিত হয়ে যায়।
কম বয়সের জেদ বা চঞ্চল ইচ্ছেরা বয়সের দ্বারপ্রান্তে এসে একসময় ত্যাগ বা সহনশীলতায় রূপান্তরিত হয়ে যায়। তীব্র ক্রোধও একসময় শান্তস্বরূপের রূপ নেয়।
ইহজীবন নিয়ে চিন্তিত- ব্যতিব্যস্ত মন, জীবনের ওপারের কথা ভাবতে শুরু করে। একসময় মন জীবনের সব কর্মউদ্দীপনাকে একরকম দায়সারা ভাবে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। এটাই তো জীবন!
কত সূক্ষ্ম অথচ আশ্চর্যজনক জীবনের এই পদসঞ্চালন! এক একটা সেকেন্ড এগোচ্ছে আর আমরা আমাদের এই জীবনের চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। নিরন্তর প্রবহমান এই গতি। অবচেতন মন পূর্ণরূপে জ্ঞাত যে, জীবন মৃত্যুর দিকে আর মৃত্যু নবজীবনের সূচনার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
চেতন মন সবসময় ঘটমান বিভিন্ন ব্যাপার বা ঘটে যাওয়া বিশেষ কিছু ব্যাপার বা ভবিষ্যতের কিছু ব্যাপার- যা তার সচেতন ইচ্ছের সাথে সম্পর্কিত, তা নিয়েই চিন্তিত থাকে। কিন্তু অবচেতন মন সবকিছুর উপলব্ধিগুলোকে স্তরে স্তরে পাললিক শিলান্যাসের ন্যায় সঞ্চিত রাখে, আর মননে অদৃশ্যভাবে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। আমাদের সংশয়, গভীর আত্মপর্যবেক্ষণ সবই অচেতন মনের ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল।
তাই স্পর্শকাতর বিষয়গুলো ভুলে যাওয়া নয়, তার সঠিক বিশ্লেষণ দরকার। দুঃখকে ভয় নয়, দুঃখ প্রাপ্তির মাঝে দুঃখহীনতার যে প্রচ্ছন্ন সংকেত থাকে- তার বিশ্লেষণ দরকার। মৃত্যুভয় নয়- মৃত্যুর নবীকরণের প্রাণউদ্দীপনা বোঝার প্রয়োজন রয়েছে। তবেই এসব বিভিন্ন সংশয়, ভীতি ব্যাপারগুলো নঞর্থক নয়- ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে, সাহসের সঞ্চার করবে- জীবনসমস্যা সমাধানের মানসিকতা গঠনে সহায়তা করবে এবং অবচেতন মনের ঘরে প্রাণসঞ্চারী চেতনার প্রকাশ ঘটাবে-যার দ্যুতি চেতন মন, চেতন কর্মকে প্রভাবিত করে এই জীবনের চলার পথকে শান্তিময় করে তুলবে।।
0 Comments