লাদাখ : মন ভালো করা এক দেশ
চতুর্থ পর্ব
কলি সাহু চৌধুরী
প্রথম বার 18,000 ফিট উচ্চতায় খারদূংলা পাস অভিযানের আনন্দে মেতে সবাই ,আগের দিন সন্ধ্যায় জিনিস পত্তরের ভার একটু হালকা করে গুছিয়ে নেওয়া হলো, কারণ বড় বড় ব্যাগ নিয়ে না গেলে ভালো। লেহ থেকে নুব্রা ভ্যালি,প্যাংগঙ লেক,সোমরিরি চার দিনের সফরের জন্য আরও উপরে উঠতে হবে ,গাড়িতে অক্সিজেন সিলিন্ডার, ড্রাইভারের নিজের হালকা কিছু জিনিসপত্র ছিল। করমা ভাইয়ার উপরে বাকি চারদিনের নির্ভরশীলতা,বিদেশ বিভুঁইয়ে বেড়াতে গেলে সেখানকার কিছু নিয়মকানুন, রাস্তার আদব কায়দা মেনে চললে বেড়ানোটা মসৃণ হয়। হোটেলের ডিনার রুমে গিয়ে ও সবাই যারা পরের দিন নুব্রা যাছ্ছে সবাই কে বলতে শুনেছি high altitude এ যেতে গেলে হালকা খাবার খেয়ে বেরনোই ভালো, সারা দিনের ট্যুর! মাঝখানে ২-৫ মিনিটের বেশী থামবে না।
সময় মতো খুব ভোরে উঠে তৈরী হয়ে হালকা breakfast করে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। দেখতে দেখতে শহর ছাড়িয়ে দুপাশে রুক্ষ পাহাড় শুরু হলো, দূর থেকে ওই আবার শান্তি স্তুপা দেখা যাচ্ছে,বাইরে খুব ঠাণ্ডা নেই , মসৃণ চওড়া হাইওয়ের উপর দিয়ে গাড়ি দূর্বার গতিতে ছুটে চলেছে, অল্প গাছপালার দেখা মেলে কোথাও কোথাও। এই রহস্যময় প্রকৃতির টানেই তো লাদাখে ছুটে আসা, মাঝেমধ্যেই ভাবছি গ্ৰীষ্মের এই কয়েকটা মাস তো দেখতে দেখতেই কেটে যাবে, তারপর হাড় হিম করা ভয়ঙ্কর ঠান্ডা নিয়ে হাজির হবে শীত। শুরু হবে সেই নির্মম প্রকৃতির সঙ্গে সেনাবাহিনী ও স্থানীয় মানুষের নিত্য দিনের জীবনযুদ্ধ। বাইরের দৃশ্য থেকে চোখ সরছে না, কতটা ভয়ঙ্কর সুন্দর রাস্তা ,তার কতটুকু আর ক্যামেরায় তোলা হয়, সে কেবল মন ও চোখ দিয়ে চেটে পুটে গোপন কুঠুরি তে জমা করে নেওয়া,মন কেমনের অবসরে আবার বের করে উল্টেপাল্টে,নেড়ে চেড়ে তার স্বাদ নিতে হবে যে!
মাঝখানে গাড়ি এক জায়গায় থামলো,আমাদের ID proof check হলো, সঙ্গে ৫ মিনিটের চা বিরতি ও হাত পা ছাড়িয়ে নেওয়া। আবার চলা শুরু,এবার ধীরেসুস্থে পাক দিয়ে গাড়ি উপরে খারদূংলা পাসে উঠছে, বিশ্বের অন্যতম উচ্চতম মোটরগাড়ি চলাচলযোগ্য গিরিপথ Khardung La-র দিকে। পথ যত উপরে উঠছিল, চারপাশের দৃশ্য ততই বদলে যাচ্ছিল। কোথাও বাদামি রুক্ষ পাহাড়, কোথাও আবার দূরে বরফে ঢাকা শৃঙ্গ। রাস্তার একদিকে গভীর খাদ, অন্যদিকে আকাশ ছোঁয়া পাহাড়—প্রতিটি বাঁক যেন নতুন এক বিস্ময় উপহার দিচ্ছিল।
খারদুংলা পাস 18000 ft উচ্চতা
কনকনে ঠাণ্ডা বাড়তে লাগলো,আমরা মাইনাস তাপমাত্রার জ্যাকেট পরে নিলাম,দেখতে দেখতে বাইরে দুপাশে যতদূর চোখ যায় শুধু বরফের রাজ্য, গাড়ি এসে থামলো নির্দিষ্ট জায়গায়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৮ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত খারদুংলা পাসে পৌঁছে মনে হল যেন মেঘের রাজ্যে এসে দাঁড়িয়েছি। জীবনে এত উঁচু জায়গায় এই প্রথম ওঠা। করমা ভাইয়া বলল, একদম ধীরে সুস্থে নামবেন, ১৫ মিনিটের বেশী নয়, জোরে হাঁটা বারন, শ্বাসকষ্ট শুরু হতে পারে, এখানেই মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন। যার অসুবিধে হবে গাড়ীর মধ্যে এসে অক্সিজেন নিতে হবে। কিছুটা হেঁটে পৌঁছলাম, কত হাজার উচ্চতায় এসেছি তার প্রমানস্বরূপ পাসের বিখ্যাত সাইনবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকটি ছবি তুললাম। ফটো নেওয়ার জন্য তখন পর্যটকদের কে আগে জায়গা দখলের ব্যাস্ততা, কম সময়ের মধ্যে দু একটা ফটো নিয়ে গাড়ীতে বসলাম। নিঃশ্বাস নিতে একটু কষ্টও হচ্ছিল, কারণ এই উচ্চতায় বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ অনেক কম। তাই সবাইকে বেশি সময় না থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।
চারদিকে শুধু পাহাড় আর পাহাড়, তার মাঝখানে আমরা—ভাবতেই এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ হচ্ছিল। এতদিন বইয়ে পড়েছি, ছবিতে দেখেছি, আর সেদিন নিজের চোখে সেই খারদুংলাকে দেখলাম। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতির সামনে মানুষ কত ক্ষুদ্র, অথচ সেই প্রকৃতির বুকেই দাঁড়িয়ে থাকার আনন্দ কত বড়!
🍂
আমরা সেখানে খুব বেশি সময় থাকিনি, মোটামুটি পনেরো মিনিটের মতো। মাথা ঘোরা বা শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি এড়াতে সবাই দ্রুত নিচের দিকে নামতে শুরু করলাম। কিন্তু সেই অল্প সময়ের অভিজ্ঞতাই আজও মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে।
এখানে ও হালকা খাবার,চা, ম্যাগি এসবের দোকান আছে। এই কারণে উল্লেখ করছি,যারা পরবর্তী সময়ে যাবেন একটা ধারণা থাকা ভালো। খারদূংলা পাসে খানিকটা সময় কাটিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম এবার দুই বরফে মোড়া পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে- দিগন্তব্যাপী বরফে ঢাকা হাইওয়ের মধ্যে দিয়ে নীচে নামতে নামতে Diskit Monestry এর দিকে...
এবার রাস্তাঘাট খুব একটা ভালো নয়, কোথাও কোথাও এবড়োখেবড়ো, কাঁচা রাস্তা,যেটুকু চোখে পড়ছে সেনাবাহিনীর মালবাহী ট্রাক লাইন দিয়ে চলছে,আর পর্যটকদের গাড়ি। কিছু দূর এগিয়ে একটা ছোট্ট গ্ৰাম লাগোয়া জনপদ, কটেজধর্মী কাঠের তৈরী ২-৩ টে সাধারণ খাবার এর দোকান আর সৈন্যদের ব্যারাক, জন বসতি কম। পিছনে বরফে ঢাকা পাহাড়, দুই পাহাড়ের গা বেয়ে কুল কুল করে বয়ে চলেছে নদী,ইতি উতি ইয়াকের দল ঘুরে বেড়াচ্ছে,পরিচ্ছন্ন পটে আঁকা ছবির মতো! হঠাৎ ঝির ঝির করে বরফ পড়া শুরু হল। আমাদের সঙ্গে আনা খাবার ও গরম চা দিয়ে দুপুরের খাওয়া সাঙ্গ হল। ১০ মিনিটের যাত্রাবিরতি,কিছু ক্ষন জিরিয়ে নিয়ে আবার গাড়ি দৌড়তে শুরু করল,পাহাড়ের পাদদেশে সমান্তরাল রাস্তায় ।
বিকেল গড়াতেই Hunder এ ঢুকলাম, মেঘ কেটে গেছে ঝলমলিয়ে রোদ উঠেছে, ডিসকিট পৌঁছতেই দূর থেকে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে যাওয়া সাদা-লাল রঙের ডিসকিট মনাস্ট্রিটা চোখে পড়ে। নির্জন প্রকৃতির মাঝে কয়েক একর জায়গা জুড়ে গড়ে উঠেছে এই বৌদ্ধ মন্দির Diskit Monestry ,রৌদ্রজ্জ্বল আবহাওয়ায় সুবিশাল মৈত্রী বুদ্ধের মূর্তি আমাদের যেন আলিঙ্গন করল!চমৎকার স্থাপত্যের নিদর্শন! নুব্রা উপত্যকার সবচেয়ে পুরোনো ও বড় বৌদ্ধ গুম্ফাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। পাহাড়ের অনেকটা উপরে দাঁড়িয়ে থাকা এই মনাস্ট্রি থেকে নিচের পুরো নুব্রা ভ্যালি, শ্যোক নদীর বিস্তীর্ণ চর আর সবুজ গ্রামের দৃশ্য একসঙ্গে দেখা যায়।
আমরা ধীরে ধীরে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠছিলাম। চারপাশে উড়ছে রঙিন প্রার্থনা-পতাকা, পাহাড়ি হাওয়ায় তাদের মৃদু দোল যেন এক অন্যরকম শান্তির বার্তা নিয়ে আসে। মনাস্ট্রির ভিতরে প্রবেশ করতেই ধূপের গন্ধ, প্রার্থনার মৃদু সুর আর নিস্তব্ধ পরিবেশ মনকে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে দিল। শতাব্দী প্রাচীন দেওয়ালচিত্র, বুদ্ধমূর্তি আর প্রার্থনাকক্ষের গম্ভীর আবহ!
ডিস্কিট মনাস্ট্রির চাতালে দাঁড়িয়ে নুব্রা উপত্যকার অপরূপ দৃশ্য দেখছিলাম। হঠাৎ চোখ গেল উল্টোদিকের পাহাড়ের ঢালে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে বিশাল এক বৌদ্ধ গোম্ফা, যেন পাহাড়ের বুক জুড়ে আঁকা কোনো শিল্পীর নিখুঁত ছবি। সাদা দেওয়াল, সোনালি ছাদ আর পাহাড়ি রোদে ঝলমল করা সেই মনাস্ট্রির সৌন্দর্য চোখ আটকে রাখে। পরে জানতে পারলাম,সেটি সামস্তানলিং মনাস্ট্রি (samstanling monastry)। প্রায় দেড়শো বছরেরও বেশি পুরনো এই গোম্ফা নুব্রা উপত্যকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র। বহু সন্ন্যাসী এখানে ধর্মচর্চা ও শিক্ষাগ্রহণ করেন। ভিতরে রয়েছে সুন্দর সুন্দর চিত্রকলা, এর চারপাশে ছড়িয়ে আছে গাছপালা হীন রুক্ষ উপত্যকা, দূরের পাহাড়ের গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই শান্ত গোম্ফাটিকে দেখে মনে হচ্ছিল, যেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সে নীরবে পাহারা দিয়ে চলেছে সমগ্র নুব্রা উপত্যকাকে।
এখানে আমরা বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে, মনাস্ট্রি দর্শন করে ফিরে এলাম গাড়িতে। আজকের রাত্রিবাস খানিকটা দূরে হান্ডার গ্ৰামে একটি সুন্দর হোম-স্টে তে। পাহাড়ের কোলে যত্ন করে টিবেটিয়ান আর্কিটেকচারে সাজানো ডাবল স্টোরির হোটেল, সামনে ছড়ানো নিজেদের organic উপায়ে তৈরি সবজির খেত। তাজা শাক- সবজি দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করেন প্রায় নুব্রা ভ্যালির সবকটা হোটেল ও হোমস্টে। এখানের প্রধান আকর্ষণ , Sun dune তে double humped camel ride।
হোটেলের Organic সবজি ক্ষেত, নুব্রা ভ্যালিতে
বাতাসে আবার শীতের কামড় শুরু হল, হোটেল ঢুকেই আমরা আগে রিসেপশনে বসে চা এর অর্ডার দিলাম। প্রথম দর্শনেই খুব ভালো লেগে গেল হোটেল ও তাদের অমায়িক ব্যাবহার, যা আমাদের পথশ্রমের ক্লান্তি অনেকটাই দূর করে দিল। খানিক পরে রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখি সামনের পাহাড়ের চূড়ায় গোধূলির রং ঢেলে ডুব দিচ্ছে অগ্নিগোলক। আকাশের রঙ এর ছোঁয়া লেগেছে পাহাড়ের প্রতিটি কোনায়, অসাধারণ সূর্যাস্ত দেখে প্রান জুড়িয়ে গেল। দিনান্তের সূচনায় জলচর পাখির ঝাঁক উড়ে চলেছে আপন বাসায়, ধীরে ধীরে দিনমনি বিদায় নিলেও আকাশে তখনও দিনের আবছা আলোর রেশ,আর আমার মনে আগামীকাল Indo- Pak border এ তুরতূক গ্ৰাম দেখতে যাওয়ার উদগ্ৰীব ঔৎসুক্য !
0 Comments