জ্বলদর্চি

মননের দর্পণে জীবনের কিছু টুকরো কথা/চতুর্থ পর্ব /স্বাতী ভৌমিক

মননের দর্পণে জীবনের কিছু টুকরো কথা 
চতুর্থ পর্ব

স্বাতী ভৌমিক 

 পথে ঘাটে চলার সময় এমন অনেক দৃশ্য মাঝে মাঝে চোখে পড়ে, যেসব দৃশ্য দেখলে মনে এক অচেনা শান্তি অনুভূত হয়। এরকমই একটি দৃশ্য হলো- বয়স্ক মানুষদের বেশ কয়েকজনের একসাথে দাঁড়িয়ে গল্প বা তাদের মনভরা একটু হাসির ঐক্যতান।

 জীবনের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে, জীবনের অনেক চড়াই উৎরাই পথ পেরিয়ে, দীর্ঘ অভিজ্ঞতার জীবন খাতার পাতায় পাতায় কতই না কথা লেখা থাকে! কত কিছু পেয়ে হারানো- কত কিছু হারিয়ে পাওয়া-কখনো আশাহত হওয়া- কখনো বা তেমন কিছু আশা না করেও অযাচিতভাবে পাওয়া  জীবনের কিছু মূল্যবান মুহূর্ত- স্মৃতির পাতায় এরকম কত কিছুই না লেখা থাকে বা লেখা হয় মরমের মর্মালোকে! 

 অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেরকম লোকসমক্ষের  খুব পরিচিত মুখ না হলে, সাধারন জীবনযাত্রানির্বাহী বয়স্ক ব্যক্তিগণ জীবনের সায়াহ্নকালে মনের ঘরে জমে থাকা কথা বলার মত মানুষ খুঁজে পান না। জীবনের স্মৃতির পুরনো পাতা উল্টে- পাল্টে দেখেন, দৃশ্যমান সামনের জীবনপ্রবাহের সাথে নিজেদের জীবনের মিল- অমিল বা যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা করেন। আর হঠাৎ করে কাউকে কথা বলার পেলে- বলা ভালো, ওনাদের কথা শোনানোর মানুষ পেলে মন উজাড় করে জমানো কথার সিন্দুক খুলে বসেন। আমার সেসব কথা কখনোবা শুনতে ভালো লাগে আর কোন কোন ক্ষেত্রে কখনো সেরকম আগ্রহের বিষয় না থাকলেও কথাগুলো শুনি এটা মনে করে যে,ওনাদের কথা শুনলে ওনারা খুব খুশি হন-এই ভেবে যে, কেউ ওনার কথাগুলো শুনছে বা কাউকে উনি কথাগুলো বলতে পারছেন- যেটা ওনাদের কাছে খুব আনন্দের বিষয়।

🍂
 এই কিছুদিন আগে একজন বৃদ্ধের সাথে দেখা হয়েছিল। একটি ঔষধ দোকানের সামনের রাস্তাতে বিভিন্ন যানবাহন ও মানুষের যাতায়াতের জন্য খুব ভিড় হয়ে গিয়েছিল। একটু ভিড়টাকে কমিয়ে মোটামুটি সহজগম্য যাতায়াতের রাস্তা বানানোর প্রয়াসে কিছু কথা কাটাকাটিও হচ্ছিল। হঠাৎ একজন বৃদ্ধ- ওনাকে দেখে বেশ অবস্থাপন্ন ঘরেরই বলে মনে হল, আমাকে 'দিদি' সম্বোধন করে কোন পরিচিতির ভূমিকা না  করেই বেশ শান্ত কণ্ঠস্বরে বললেন, "দেখুন দিদি, শুধু টোটোকে দোষ দিচ্ছে, অথচ দোকানের সামনে বাইকগুলো কিভাবে রেখে দিয়েছে! এগুলো তো ঠিক ভাবে সাজিয়ে রাখার ব্যবস্থা করতে পারে!"কথাপ্রসঙ্গে ওনার অতীত বাসভূমি, বর্তমান অবস্থান, কলকাতার ঘিঞ্জি পরিবেশে থাকার ইচ্ছে না থাকলেও বাধ্য হয়ে থাকা ইত্যাদি নানা কথা বলতে শুরু করলেন। তাড়া থাকলেও ওনার বলার আগ্রহ দেখে আমি কিছুটা সময় অপেক্ষা করে ওনার কথাগুলো শুনলাম। তারপর উনি আবার ওনার বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলেন। 

 এইরকম ঘটনা তো প্রায় সবারই জানা।কিন্তু আমার এই পেজের নাম যেহেতু 'মননের দর্পণে জীবনের কিছু টুকরো কথা'- তাই এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমার মনের চিন্তনের কিছু কথা তুলে ধরছি। 

 আমার মনে হল, মানুষ একসময় দেখতে দেখতে কেমন বার্ধক্যে এসে উপনীত হয়! যখন বয়সের অংক জোয়ারের বেলায় থাকে, তখন বার্ধক্য আসবে জেনেও ব্যক্তি যতটা সম্ভব প্রতিরোধের আশায় থাকে। আর কত সঞ্চয়- কতই না গড়ার কাজ করে চলে,নিজের জন্যই হোক বা পরিবারের জন্য। কিন্তু একটা সময় পর যখন ভাঁটার বেলা ঘনিয়ে আসে- বার্ধক্য আসে, স্বপ্নের ঘর- স্বপ্নের ভবিষ্যৎ এইসবকিছু নিজের হলেও, তখন নিজের মতো করে সেসবের সাথে সময় কাটানোর পরিস্থিতি বা সামর্থ্য আর ব্যক্তির থাকেনা। বার্ধক্যের ছাপ জীবনের প্রতি পদক্ষেপে মনে করিয়ে দেয়, "তুমি বৃদ্ধ হয়েছ, আর হয়তো কিছু বাকি এ জীবনের নাট্যরোল......।" তাই বেঁচে থাকার তাগিদে  জীবন এগিয়ে চলে জীবনের পথে। জীবনের সোনালী দিনগুলোর কথা ভেবে, সেইসব দিনের কথা শুনিয়ে ব্যক্তি সেই কষ্টের ছায়া থেকে নিজেদের কিছুটা মুক্ত করার চেষ্টা করে। আর চেনা মুখ পেলে তো ব্যক্তির মুখ বর্ণনাতীত শান্তির অভিব্যক্তিতে ভরে ওঠে।

 জীবন কি আশ্চর্যের! শুরু আর শেষের মিলের মাঝেও কত গরমিল! জীবনে শুধু অর্থ-জড় বিষয় নয়,ওই বার্ধক্যের জন্য সঞ্চয়ে কিছু মননের সামগ্রীও রাখা প্রয়োজন। বার্ধক্যের স্তরে স্বাভাবিক যেসব প্রতিবন্ধকতা আসে, সেসব ক্ষেত্রে তো ব্যক্তির কিছু করার নেই, তবে ব্যস্ত পৃথিবীর মাঝে জীবনের ঐ অসহায় সময়ে মানসিক এমন কিছু অবলম্বন মনের ঘরে সঞ্চিত রাখা প্রয়োজন, যাতে ওই সময়ে সেগুলি অবলম্বন করে ব্যক্তি কিছুটা স্বস্তির সময় নিজে নিজেকে উপহার দিতে পারে- তা ধর্ম হোক বা শিল্পকর্ম বা আধ্যাত্মিক চেতনা,যা ওই সময়ে কিছুটা হলেও শান্তির অবলম্বন হতে পারে- এটা খুব খুব প্রয়োজন।।

(ক্রমশ)

Post a Comment

0 Comments