জ্বলদর্চি

চিন দেশের গল্প: ৪ (অবশ্যই!) / বাংলা ভাষান্তর : নিখিলেশ ঘোষ


চিন দেশের গল্প: ৪ (অবশ্যই!)    
বাংলা ভাষান্তর :  নিখিলেশ ঘোষ

  (একটি হান লোককথা। মূল চিনা ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন : জন মিনফোর্ড)
    

একদা এক সময় চিন দেশের এক গ্রামে এক পরম প্রতাপশালী ধনকুবের বাস করত। যেমন তার রাগী ও হিংস্র চেহারা, তেমনই তার নির্দয় মন। সেজন্য তার আসল নাম লোকে ভুলে  সবাই তাকে আড়ালে ডাকত  ‘গুঁড়োমরিচ’ নামে। । নিজের খামারের খেতমজুর আর বর্গা চাষীদের ওপর সে দিনরাত অমানুষিক খাটুনি আর চাবুকের জুলুম চালাত। একদিন সেই খামারে অন্য প্রদেশ থেকে কাজ খুঁজতে এল ঝাও ডা নামে এক সহজ-সরল মাটির মানুষ। গুঁড়োমরিচ তাকে সামান্য কটা ভাতের বিনিময়ে নিজের খামারে নিযুক্ত করল। দেখতে দেখতে কেটে গেল দীর্ঘ ছ’ বছর। ঝাও ডা সেই খামারে বলদের মতো দিনরাত এক করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে খাটত। বিনিময়ে কপালে ভালো খাবার দূরস্ত, পেত শুধু শূয়োরের খাওয়ার যোগ্য পচা উচ্ছিষ্ট আর বাসি খাবার।

 টানা খাটুনিতে ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে একদিন
 ঝাও ডা মারাত্মক অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হলো। তার শরীর আর চলল না। তা দেখে দয়ামায়াহীন নিষ্ঠুর গুঁড়োমরিচ মনে মনে খাতা-কলম নিয়ে হিসেব কষতে বসল। সে ভাবল, "এই লোকটা তো এখন খামারের কাজের বোঝা। উল্টে একে বসিয়ে খাওয়াতে গেলে আমার ভাঁড়ার থেকে  শুধু শুধুই অন্ন ধ্বংস করবে!" এতগুলো বছর যে লোকটা তার জন্য হাড়ভাঙা খাটুনি খাটল, তার জন্য সামান্যতম অনুশোচনাও হল না 
গুঁড়োমরিচের। এতটাই স্বার্থপর সে। তৎক্ষণাৎ ঝাও ডা কে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে খামার থেকে তাড়িয়ে দিল। দীর্ঘ সাত বছর জান লড়িয়ে কাজ করার পরও অভাগা ঝাওয়ের পকেটে একটা ফুটো পয়সাও রইল না। কোনো রকমে লাঠিতে ভর দিয়ে, ধুঁকতে ধুঁকতে নিজের চেনা গাঁয়ে ফিরে এল কপর্দকহীন অভাগা ঝাও ডা। 

 চালচুলো না থাকলে কি হবে ঝাও ডা ছিল অত্যন্ত সৎ আর সরল প্রকৃতির। তাই গ্ৰামের সকলে তাকে খুব ভালবাসত। গ্রামের ভিটেয় পা রাখতেই প্রতিবেশীরা তাকে ঘিরে ধরল। জিজ্ঞেস করল, " ঝাও,তোমার চোখে এত জল কেন?" তখন চোখের জল মুছতে মুছতে তার ওপর হওয়া সমস্ত অন্যায় আর গুঁড়োমরিচের চরম নিষ্ঠুরতার গল্প সবিস্তারে খুলে বলল। সব শুনে প্রতিবেশীদের চোখ রাগে লাল হয়ে উঠল। সবার রক্ত গরম হয়ে উঠল এই ভেবে যে, তাদের গাঁয়ের এক সরল মানুষের সাথে এমন অন্যায় করা হয়েছে! তারা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করল—এই নির্দয় গুঁড়োমরিচকে এর উপযুক্ত শাস্তি পেতেই হবে, নিতে হবে এর চরম প্রতিশোধ।তখনই ভিড়ের মধ্য থেকে এক চতুর বৃদ্ধ প্রতিবেশী মাথা চুলকে মুচকি হেসে এক অদ্ভূত ফন্দি বার করল। সে বলল, "শোনো ভাইয়েরা, গুঁড়োমরিচের  উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য একটা বুদ্ধি বার করেছি। গ্ৰামের সকলে উৎসূক হয়ে জিজ্ঞেস করল, " কি? কি?" 

বুড়ো বলল,"আমরা সবাই মিলে কিছু টাকা চাঁদা তুলি। সেই টাকার একটা অংশ দিয়ে আগে আমাদের ঝাও ভাইয়ের ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক। আর বাকি টাকাটা নিয়ে আমরা সোজা শহরে যাব। সেখান থেকে কিনে আনব এক চমৎকার, চোখ জুড়ানো তোতাপাখি—যার ঠোঁট হবে টকটকে লাল আর ডানা হবে ঘন সবুজ।" 
🍂
সবাই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "তোতাপাখি দিয়ে কী হবে?" সেই প্রতিবেশী হেসে বলল, "আরে, সেই তোতাপাখিটাকে আমরা দিনরাত ধরে কেবল একটিই কথা মুখস্থ করাব আর বলা শেখাব— ‘অবশ্যই!’ আমি কথা দিচ্ছি, এই একটা কথার তোতাপাখি দিয়েই আমরা সেই অহংকারী গুঁড়োমরিচকে এমন শিক্ষা দেব যা সে জীবনেও ভুলবে না।" এই চমৎকার আর বুদ্ধিদীপ্ত ফন্দির কথা শুনে সমস্ত গ্রামবাসী একসাথে হাততালি দিয়ে উঠল," বাঃ বাঃ দারুন  বুদ্ধি।"

দেখতে দেখতে গোটা এক বছর কেটে গেল। গ্রামবাসীদের সেবা আর চিকিৎসায় ঝাও ডা এখন পুরোপুরি সুস্থ ও চাঙ্গা। এইবার অহংকারী গুঁড়োমরিচকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার পালা।একদিন ঝাও চমৎকার ও চকচকে দামী পোশাক পরে বাবু সেজে তৈরি হলো। তারপর সেই লাল ঠোঁট আর সবুজ পালকের তোতাপাখির খাঁচাটা হাতে নিয়ে সে সোজা রওনা দিল তার পুরনো মনিব, সেই চশমখোর ধনকুবেরের বাড়ির দিকে। বাড়িতে ঢুকেই ঝাও হাতজোড় করে খুব বিনয়ের সাথে বলল,
 “ মনিব, এতদিন পর আপনার এই পুরনো চাকর আপনার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসেছে।” ঝাও ডাকে দেখে গুঁড়োমরিচ তো চোখ কপালে তুলল! এক বছর আগে যে ঘাটের  মড়াটা কে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছিল, সে আজ রাজপুত্তুরের মতো পোশাক পরে তার সামনে দাঁড়িয়ে! 

ঝাওকে এত ভালো অবস্থায় আর বড়লোক চেহারায় দেখে সে রীতিমতো চমকে উঠল। লোভ আর কৌতূহল সামলাতে না পেরে গুঁড়োমরিচ জিজ্ঞেস করল, “কী রে ঝাও! তুই এতদিন কোথায় ছিলি? তোকে দেখে তো বেশ বড়লোক বড়লোক মনে হচ্ছে! আর তোর হাতে ওটা কী? ওটা দেখতে যেন একটা . . .” গুঁড়োমরিচের  কথা শেষ হওয়ার আগেই ঝাও তাকে থামিয়ে দিয়ে মুচকি হেসে বলল, “মনিব, কোনোমতে দিন চলে যাচ্ছে আর কী! আমার এই সুদিন আর উন্নতির পেছনে সম্পূর্ণ হাত রয়েছে এই আশ্চর্য জিনিসটার।” একথা শুনে লোভে গুঁড়োমরিচের বুক চিনচিন করে উঠল। সে আসল ব্যাপারটা জানার জন্য ঝাওকে ভীষণ জোরাজুরি করতে লাগল। 

ঝাও প্রথমে একটু ইতস্তত করার ভান করল, যেন সে গোপন তথ্যটা সহজে ফাঁস করতে চাইছে না। শেষমেশ গুঁড়োমরিচকে আরও কৌতূহলী করে তুলে সে তার বানানো গল্পটি বলতে শুরু করল। ঝাও বলল, “হুজুর, খামার থেকে তাড়ানোর পর আমি যখন বাড়িতে অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়েছিলাম, তখন এক রাতে স্বপ্নে আমার সামনে এক দেবতা হাজির হলেন। তিনি দয়া করে আমাকে এক গোপন কথা বললেন।।" ঝাও একথা বলে চুপ করে
রইল। মরিচ গুঁড়ো তাকে ঠেলা মেরে বলল," থামলি কেন? বল।" ঝাও এবার আস্তিনের আসল তাসটি বার করলো, " তিনি জানালেন ঠিক কোন জায়গায় এমন এক অসাধারণ তোতাপাখি পাওয়া যাবে, যা দুনিয়ার সমস্ত লুকিয়ে থাকা সোনা ও রূপোর খোঁজ জানে!” গুঁড়োমরিচ হাঁ করে শুনতে লাগল। 

ঝাও বলতে থাকল, “দেবতার কথামতো আমি পাখিটির খোঁজ করতে শুরু করলাম। আমার শেষ সম্বল মাত্র দুটো মুদ্রার গোছা দিয়ে পাখিটি কিনে আনলাম। ব্যস! তখন থেকেই সোনা-দানা আর টাকা-পয়সা নিজে থেকেই আমার কাছে আসতে শুরু করেছে। এই পাখিটি আমার কাছে এক আলাদিনের প্রদীপ, তাই যেখানেই যাই একে আমি সাথে সাথে রাখি।” গল্পটা শুনে মরিচ গুঁড়োর মনে মনে একটু খটকা বাঁধল। সে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারল না। সে ঝাওকে বলল, “তোর কথা তো বিশ্বাস হচ্ছে না রে বাপু! তুই বরং পাখিটাকে এখনই একবার পরীক্ষা করে দেখা, দেখি এর কেমন কেরামতি!” ঝাও মনে মনে হাসল এবং রাজি হওয়ার ভান করে বলল, “ঠিক আছে হুজুর, আপনার সামনেই এর পরীক্ষা হয়ে যাক!”

ঝাও তখন তার তোতাপাখির খাঁচাটা হাতে নিল। মরিচ গুঁড়োকে সাথে নিয়ে সে রওনা দিল খামারের পেছনের এক নির্জন মাঠের দিকে, যেখানে একটা পুরনো কুয়ো ছিল। কুয়োর পাড়ে দাঁড়িয়ে ঝাও খাঁচার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি সুরে ডাকল, “পলি সুন্দরী ! বল তো দেখি, এই কুয়োর নিচে কি কোনো রূপো লুকানো আছে?”তোতাপাখিটি তখনই ঘাড় বেঁকিয়ে ডানা ঝাপটে চেঁচিয়ে উঠল, “অবশ্যই!” 

ঝাও আর দেরি করল না। কুয়োর পাশের নরম মাটি খুঁড়তে শুরু করল। মরিচ গুঁড়ো ঘাড় গুঁজে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। অলৌকিক কাণ্ড! মাত্র হাতখানেক খুঁড়তেই মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে এল চকচকে রূপোয় ঠাসা একটা ছোট পাত্র! মরিচ গুঁড়োর চোখ তো লোভের চোটে ছানাবড়া হয়ে গেল। তারা আবার হাঁটতে শুরু করল। কিছুদূর গিয়ে তারা মাঠের এমন এক জায়গায় পৌঁছাল, যেখানে মাটিতে একটা ছোট গর্ত মতো ছিল। ঝাও আবার তোতাপাখির দিকে তাকিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, “পলি সুন্দরী , এবার বল তো, এই গর্তটার নিচে কি সোনা লুকানো আছে?” তোতাপাখিটি তার চেনা সুরে আবার কায়দা করে ডেকে উঠল, “অবশ্যই!” 

ঝাও খপ খপ করে সেই গর্তের মাটি সরাতেই ম্যাজিকের মতো সেখান থেকে উদ্ধার হলো খাঁটি সোনার একটা ছোট প্যাকেট! পরপর দু-দুবার চোখের সামনে মাটির নিচে সোনা-রূপো পাওয়ার অলৌকিক কেরামতি দেখে গুঁড়োমরিচের মুখ দিয়ে তো লোভের লালা ঝরতে লাগল। তার হৃৎপিণ্ড যেন গলার কাছে চলে এল। সে তখন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। তার মাথায় তখন একটাই ভূত চেপেছে—যেভাবেই হোক, এই সোনার ডিম পাড়া তোতাটাকে ঝাওয়ের কাছ থেকে হাতছাড়া করা চলবে না ।

 পরের দিন সকাল হতেই গুঁড়োমরিচের  প্রাসাদোপম বাড়িতে এলাহী কাণ্ড শুরু হয়ে গেল। সে এক বিশাল প্রীতিভোজের আয়োজন করল এবং শহরের সমস্ত নামী-দামী, গণ্যমান্য ও ধনকুবের ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানাল।আসলে গুঁড়োমরিচ  ছিল চরম ধূর্ত। সে মনে মনে ফন্দি এঁটেছিল, এত সব বড় বড় বিশিষ্ট অতিথিদের সামনে ঝাও তোতাপাখিটি বিক্রি করতে কোনোমতেই অস্বীকার করতে পারবে না। লজ্জায় বা কুণ্ঠায় পড়ে সে পাখি বিক্রি করতে বাধ্য হবেই। তাই ভোজসভার ঠিক মাঝামাঝি সময়ে, যখন আড্ডা জমজমাট থাকবে, তখনই কেনাকাটার চুক্তিটি সেরে ফেলার মোক্ষম পরিকল্পনা করেছিল সে। এদিকে অলৌকিক তোতাপাখির আজব কেরামতির কথা রটে যাওয়ায় স্থানীয় গণ্যমান্য এবং ধনী ব্যক্তিরা সেটি দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। তারা মৌমাছির ঝাঁকের মতো গুঁড়োমরিচের  প্রাসাদে এসে জড়ো হতে লাগল এবং  বিনয়ের সঙ্গে অভিনন্দন জানাতে লাগল। আনন্দ-উৎসবে যখন তিন কাপ পানীয় শেষ হলো, ঠিক তখনই গুঁড়োমরিচ  মোক্ষম চালটি চালল। 

সে আসরের মাঝখানে বুক ফুলিয়ে ঝাওকে বলল, “হ্যাঁ রে ঝাও, এবার আসল কথায় আসা যাক। তোকে কিন্তু তোর তোতাপাখিটি আমার কাছে বিক্রি করতেই হবে। এবার চটপট তোর দামটা কত, সেটা বলে ফেল।” ঝাও চতুর হলেও মুখে আমতা আমতা করার ভান করল। উত্তর দেওয়ার আগে সে কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলল, “কত্তা, আপনি টানা ছ-সাত বছর ধরে আমার মালিক ছিলেন। আজ শহরের এত সব মানী লোকের সামনে আমি আপনার প্রস্তাব কীভাবে ফেলি বলুন? কিন্তু এই প্রাণীটি তো সাধারণ কোনো পাখি নয়, এ এক জীবন্ত গুপ্তধন। তাই এর একটা যুক্তিসঙ্গত বিক্রয়মূল্য ঠিক করার জন্য আমি আসরের সমস্ত অতিথিদেরই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ডাকতে চাই।” একথা শুনে উপস্থিত অতিথিরা সবাই একবাক্যে মাথা নেড়ে আস্বস্ত করলেন, “আরে ঝাও ভাই, তুমি একদম চিন্তা কোরো না। আমরা সবাই এখানে আছি। আমরা খেয়াল রাখব যাতে উভয় পক্ষই একদম ন্যায্য ও সঠিক চুক্তি পায়।” অতিথিদের নিজের পক্ষে কথা বলতে দেখেগুঁড়ো মরিচ  তো মনে মনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠল।

 ঠিক তখনই তার লোভী স্ত্রী পাশে এসে তার কানে কানে ফিসফিস করে বলল, “ওগো শুনছ, এমন একটা অলৌকিক ও বিস্ময়কর জিনিসের মূল্য আমাদের যা কিছু সম্পত্তি আছে, তার সবকিছুর সমান হলেও কম! তাই হাতছাড়া কোরো না।” স্ত্রীর এই কুবুদ্ধিটি গুঁড়োমরিচের  কাছে অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত মনে হলো। সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে লোভের বশে সেই অনুযায়ী কাজ করার সিদ্ধান্ত নিল। ব্যস! তৎক্ষণাৎ ভোজসভার অতিথিদের মধ্য থেকে একজন মধ্যস্থতাকারী এবং একজন সাক্ষীকে সামনে ডেকে আনা হলো। তাদের উপস্থিতিতেই তৈরি করা হলো এক পাকাপোক্ত বিক্রয় দলিল। গুঁড়োমরিচ  নিজে কলম তুলে নিয়ে আনন্দের চওড়া হাসি হেসে সেই দলিলে স্বাক্ষর করল।

সেই দলিলের শর্ত ছিল অত্যন্ত অদ্ভুত ও মারাত্মক—তোতাপাখিটির বিনিময়ে গুঁড়োমরিচের  আজ পর্যন্ত উপার্জিত সমস্ত জমি-জমা, খামার, বাড়ি আর ধন-সম্পত্তি চিরদিনের জন্য ঝাও-এর হাতে চলে যাবে! চুক্তি সম্পন্ন হতেই গুঁড়োমরিচ  ভাবল সে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় বাজি জিতে গেছে। আর চারপাশ থেকে আমন্ত্রিত অতিথিরা আবারও একবার হাততালি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানাতে ভিড় জমাল।

তোতাপাখিটি হাতে পেয়ে গুঁড়ো মরিচের আর আনন্দ ধরে না! সারা গায়ে তার উৎসাহের জোয়ার। সে খাঁচাটি উঁচিয়ে মহা দম্ভে রওনা দিল সোনার খনি খুঁজতে। তার পেছনে পেছনে চলল তার লাঠিয়াল ভাড়াটে গুন্ডারা, আর সাথে একদল আত্মীয়-বন্ধু। যাদের সে ডেকে এনেছিল নিজের ভাগ্য বদলানোর আর মাটির নিচ থেকে সোনা-রূপো তোলার অলৌকিক দৃশ্য চাক্ষুষ করার জন্য। হাঁটতে হাঁটতে তারা এক বিশাল পুকুরের পাড়ে এসে পৌঁছাল। গুঁড়োমরিচ  খাঁচাটি চোখের সামনে তুলে ধরে গদগদ হয়ে জিজ্ঞেস করল, “পলি সুন্দরী , বল তো দেখি, এই পুকুর পাড়ের নিচে কি রূপো লুকিয়ে আছে?” তোতাপাখিটি তখনই ঘাড় বেঁকিয়ে ডানা ঝাপটে চেঁচিয়ে উঠল, “অবশ্যই!”

একথা শুনে গুঁড়োমরিচ  তার কর্মচারীদের হুকুম দিল, “খোঁড়, জলদি খোঁড়!” কর্মীরা কোদাল নিয়ে মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে প্রায় পাতাল অব্দি পৌঁছে গেল, কিন্তু রূপো তো দূর—এক টুকরো ভাঙা লোহাও মিলল না! সবাই একটু অবাক হলেও গুঁড়োমরিচ  দমে গেল না। সে ভাবল, হয়তো রূপো নেই, সোনা আছে! তারা আবার হাঁটা দিল এবং যতক্ষণ না একটা পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছাল, ততক্ষণ হাঁটতেই থাকল। পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে মরিচ গুঁড়ো আবার বুক ফুলিয়ে জিজ্ঞেস করল, “পলিসুন্দরী , এবার বল তো, এই পাহাড়ের নিচে কি খাঁটি সোনা চাপা আছে?” তোতাপাখিটি তার চেনা সুরে আবার কায়দা করে ডেকে উঠল, “অবশ্যই!” কর্মীরা আবার কোদাল-শাবল নিয়ে পাহাড়ের গায়ে চড়াও হলো। খনন চলল জোরকদমে। কিন্তু এবারও মাটি আর পাথর ছাড়া কিছুই মিলল না। মিলবেই বা কী করে? আগের দিন তো ঝাও নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে আগে থেকেই ওই নির্দিষ্ট জায়গায় সোনা আর রূপো লুকিয়ে রেখেছিল। আজ তো এই নতুন পুকুর পাড়ে বা পাহাড়ে আগে থেকে কেউ কিছু  লুকিয়ে রাখার কষ্ট করেনি, তাই কিছু না পাওয়াটাই তো স্বাভাবিক!

পরপর দুবার ব্যর্থ হয়ে এত মানুষের সামনে গুঁড়ো মরিচের মুখ চুন হয়ে গেল। সে এবার হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারল যে সে এক্কেবারে পথে বসেছে, চতুর ঝাও তাকে চরম ফাঁদে ফেলেছে! সে রাগে-ক্ষোভে জ্ঞান হারিয়ে খাঁচার ওপর চিৎকার করে বলে উঠল, “পলিসুন্দরী ! তুমি আমাকে প্রতারিত করেছ!”তোতাপাখিটি খাঁচার ভেতর থেকে মাথা দুলিয়ে উত্তর দিল, “অবশ্যই!” গুঁড়োমরিচ  নিজের চুল ছিঁড়তে ছিঁড়তে আবার চিৎকার করল, “ পলিসুন্দরী ! তুমি আমাকে সর্বস্বান্ত করেছ, আমায় ঠকিয়েছ!”তোতাপাখিটি এবারও নির্বিকার চিত্তে ডেকে উঠল, “অবশ্যই!”শুনে গুঁড়োমরিচ  মুখ রাগে-অপমানে নীল হয়ে গেল। তার চোখ দুটো কোটর থেকে যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইল। গালিগালাজ আর অভিশাপ দিতে দিতে সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে তোতাপাখির খাঁচার দরজা খুলে পাখিটিকে মাটিতে আছাড় মারল আর চেঁচিয়ে বলল, “তুমি আমার মৃত্যুর কারণ হবে, তুমি হতভাগা সর্বনাশা পাখি!” কিন্তু তোতাপাখিটি তো কম চতুর নয়! মাটিতে পড়ার আগেই সে তার সুন্দর ডানা দুটো ঝাপটে বাতাসে ডানা মেলল। তারপর সোজা উড়ে গিয়ে বসল পাশের এক উঁচু গাছের ডালে। সেখান থেকে  রাগী মুখের দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো ডানা দুলিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল— “অবশ্যই! অবশ্যই!''

Post a Comment

0 Comments