কমলিকা ভট্টাচার্য
জামাইষষ্ঠী আসছে। পাড়ার সব জামাইয়ের মুখে হাসি, কিন্তু বিমলবাবুর মুখে চিন্তার ভাঁজ।
কারণ, তাঁর শাশুড়ি সরলাদেবী এমন কঞ্জুস যে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে পাঁচবার জিজ্ঞেস করবেন, "চা খাবে নাকি বাবা?" কিন্তু শেষ পর্যন্ত চা আর বানাবেন না। পঞ্চাশবার বলবেন, "একটু দই-মিষ্টি আনাই?"
— "আনাই?"
— "আনুন না।"
— "থাক, এত মিষ্টি খেলে আবার সুগার বাড়বে।"
অতিথি আপ্যায়নে তাঁর সর্বোচ্চ বিলাসিতা হল বাতাসার শরবত—তাও রোজকার প্রসাদের বাতাসা নষ্ট হবে বলে সেটাই ব্যবহার করা হয়।
আর খুব বেশি হলে বাগানের গাঁদাল পাতা দিয়ে সিঙ্গি মাছের ঝোল। কারণ শ্বশুরমশাইয়ের পেট বারো মাসই খারাপ থাকে, তাই সেই অজুহাতে সারা পরিবারকে একই মেনু খেতে হয়।
অন্যদিকে বিমলবাবুও কম যান না। বাজারে গেলে ধনেপাতা ফ্রি না পেলে দোকানদারের সঙ্গে নীতিগত তর্কে জড়িয়ে পড়েন।
— "দুটো পাতা দিতে এত কষ্ট কীসের তোর?"
দোকানদার বলে,
— "আপনি তো দু'টাকার কাঁচালঙ্কা কিনেছেন, তাতেও কি ফ্রি দেব!"
বিমলবাবু বলেন,
— "তবে কিসের সঙ্গে ধনেপাতা ফ্রি দিবি বল? সেটা কিনি!"
দোকানদার অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
এমন দুই কৃপণ মানুষের সম্পর্ক ছিল অদ্ভুত রকমের মধুর। দুজনেই দুজনের কঞ্জুসি বুঝতেন এবং সম্মানও করতেন।
জামাইষষ্ঠীর এক সপ্তাহ আগে সরলাদেবী ফোন করলেন।
— "বাবা বিমল, এ বছর কিন্তু আসতে হবে।"
বিমলবাবু হিসেব কষলেন। ট্রেনভাড়া, অটোভাড়া, নতুন পাঞ্জাবি, তারপর শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে উপহার...
খরচের অঙ্ক দেখে তাঁর মাথা ঘুরে গেল।
তিনি সাবধানে বললেন,
— "মা, এখন তো ডিজিটাল যুগ। সবকিছু অনলাইনে হচ্ছে। জামাইষষ্ঠীও অনলাইনে করলে কেমন হয়?"
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
আসলে সরলাদেবীরও মাথায় একই চিন্তা ঘুরছিল। জামাই এলে ইলিশ, চিংড়ি, মাংস—সব কিনতে হবে। গ্যাস খরচ হবে, বিদ্যুতের বিল বাড়বে। একেই আবার গ্যাসের সিলিন্ডার শেষের পথে। শেষ হলে সহজে পাওয়াও যাবে না, এখন যা অবস্থা চলছে।
🍂
সব ভেবে তিনি উৎসাহ নিয়ে বললেন,
— "বাহ! কী আধুনিক চিন্তাভাবনা! আমিও তো তাই ভাবছিলাম।"
পাশ থেকে শ্বশুরমশাই ফিসফিস করে বললেন,
— "এসব কী বলছ? আমাদের একটা জামাই!"
সরলাদেবী সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দিকে কটমট করে তাকালেন।
নির্ধারিত দিনে ভিডিও কল শুরু হল।
বিমলবাবু নতুন পাঞ্জাবি না কিনে পুরনো পাঞ্জাবিটাই ইস্ত্রি করে পরে বসেছেন।
ওদিকে সরলাদেবীও ভালো পর্দার সামনে বসেছেন, যাতে মনে হয় বিশাল আয়োজন হয়েছে।
ভিডিও কল খুলতেই সরলাদেবী বললেন,
— "কেমন আছো বাবা? নতুন পাঞ্জাবিটা তোমাকে দারুণ মানিয়েছে!"
এদিকে বিমলবাবু শাশুড়ির পিছনের পর্দার দিকে অবাক হয়ে ভাবছেন, নতুন পর্দা লেগেছে! আজ প্রায় পঁচিশ বছর ধরে বিয়ে হওয়ার পর থেকে একই তেলচিটে পর্দা দেখেছি। আজ তাহলে আয়োজন ভালোই হয়েছে!
সরলাদেবী বললেন,
— "কী দেখছো বাবা? তোমার জন্য কত কিছু আয়োজন করেছি!"
বিমলবাবু বললেন,
— "হ্যাঁ মা, তাই তো দেখছি।"
সরলাদেবী বললেন,
— "দেখো বাবা! দেখো!"
ক্যামেরার সামনে সাজানো এক বিশাল প্লেট—লুচি, ছোলার ডাল, মাছ, চাটনি, মিষ্টি, পায়েস।
বিমলবাবুর চোখ কপালে।
মনে মনে ভাবলেন,
"হায় হায়! এত আয়োজন! না গিয়ে বুঝি ভুলই করলাম!"
তিনি আবেগভরা গলায় বললেন,
— "মা, এত কষ্ট কেন করলেন?"
সরলাদেবী বললেন,
— "কষ্ট কোথায় বাবা?"
— "তাহলে?"
— "অনলাইন যখন, তুমি তো আর খেতে আসছ না। তাই পাশের বাড়ির রমাকে বললাম, 'তোর জামাইয়ের জন্য যখন প্লেট সাজাবি, আমায় ডাকিস।' আমি এখন ওদের বাড়ি থেকেই ফোন করছি।"
বিমলবাবু কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।
তারপর গর্বিত হাসি হেসে বললেন,
— "বেশ করেছেন মা! অপচয় একদম পছন্দ করি না।"
এই বলে তিনি উঠে গিয়ে কাঁচের শোকেস থেকে গতবারের মেলায় কেনা কৃষ্ণনগরের মাটির ফল আর মিষ্টির সেট এনে টেবিলে সাজিয়ে দিলেন।
— "মা, আপনিও দেখুন। আপনার জন্য ফল-মিষ্টির ব্যবস্থা করেছি।"
সরলাদেবী মুগ্ধ।
— "আহা! কী সুন্দর আপেল!"
— "মাটির।"
— "ওই তো ভালো! পচবে না।"
— "হ্যাঁ, আর একবার কিনলে সারাজীবন চলে যাবে।"
সরলাদেবী এতটাই খুশি হলেন যে প্রায় কেঁদে ফেললেন।
— "বাবা, তোমাকে পেয়ে আমার মেয়ের জীবন ধন্য।"
এরপর শুরু হল উপহারের পালা।
সরলাদেবী বললেন,
— "তোমার জন্য একটা উপহার আছে।"
বিমলবাবুর চোখ চকচক করে উঠল।
— "সত্যি মা?"
— "অবশ্যই। হোয়াটসঅ্যাপে ছবি পাঠিয়েছি। ডাউনলোড করে যত খুশি দেখো, নতুন জামা-প্যান্টের।"
বিমলবাবু বললেন,
— "দারুণ! আমি তো স্ক্রিনশট নিয়ে রাখব।"
— "সেটাই তো চাই।"
বিমলবাবুও কম যান না।
— "আমিও আপনাকে একটা উপহার পাঠিয়েছি।"
— "কী বাবা?"
— "একটা গোলাপের ইমোজি।"
— "একটাই?"
— "দুটো পাঠাতে যাচ্ছিলাম। পরে ভাবলাম, অত ভালোবাসা একসঙ্গে দেখানো ঠিক হবে না।"
এরপর আশীর্বাদের পালা।
সরলাদেবী বললেন,
— "দীর্ঘজীবী হও বাবা। খালি হাতে তো আর আশীর্বাদ হয় না।"
এই বলে তিনি মোবাইলের সামনে ৫০ টাকার একটি নোট দেখিয়ে আবার আঁচলে বেঁধে রাখলেন।
বিমলবাবু বললেন,
— "আপনিও প্রণাম নিন, শতায়ু হোন মা।"
দুজনেই মনে মনে ভাবলেন,
"আশীর্বাদ আর শুভেচ্ছা দিতে তো কোনও খরচ নেই!"
বিমলবাবু বললেন,
— "অনেকক্ষণ কথা হলো মা, এবার তাহলে রাখি। আপনার ফোনের বিল উঠছে।"
কল শেষ হওয়ার আগে সরলাদেবী একটু নিচু গলায় বললেন,
— "বাবা, নিজের মোবাইল ডেটা খরচ হচ্ছে না, রমার বাড়িরটাই ইউজ করছি।"
বিমলবাবু বললেন,
— "মা, আজ আমার মনে হচ্ছে আপনি আমার যোগ্য শাশুড়ি মা।"
বাড়ি ফিরে সরলাদেবী স্বামীকে বললেন,
— "দেখেছ? এক টাকাও খরচ হল না, অথচ জামাইষষ্ঠীও হয়ে গেল!"
ওদিকে বিমলবাবু স্ত্রীকে বললেন,
— "দেখলে? যাতায়াত ভাড়া, উপহার, খাওয়াদাওয়া—সব বাঁচল!"
পরের বছর থেকে দুজনেই সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নিলেন, জামাইষষ্ঠী নয়, "ই-জামাইষষ্ঠী" পালন করা হবে।
কারণ তাঁদের মতে—
"ভালোবাসা হৃদয়ে থাকলেই হয়, খরচের বিলটা কেন থাকবে?"
এদিকে শ্বশুরমশাই নিজের মেয়েকে ফোন করলেন। শাশুড়ি-জামাইয়ের কাণ্ডকারখানায় দুজনে হেসে পাগল।
মেয়ে বলল,
— "বাবা, তোমার জামাই আর মা দুজনকেই একসঙ্গে নোবেল দেওয়া উচিত—বিশ্ব অর্থনীতি বাঁচানোর জন্য!"
শ্বশুরমশাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— "নোবেল না হোক, অর্থমন্ত্রকের উপদেষ্টা তো করা উচিত। এরা দুজনে মিলে দেশের বাজেট উদ্বৃত্ত করে দেবে!"
4 Comments
বেশ ! বেশ !
ReplyDeleteবেশ বেশ,খান ই -সন্দেশ
Delete🍛🍛🍛
কমেডিকুইন জিতে রহো। হাসির জিলাবি ভাজতে থাকুন। 😆🤣🙏
ReplyDeleteএমনি রানী যখন হলাম নাই
ReplyDeleteহাসির রানী হয়ে খুশি তাই।
কাল মধুবাবু খাবে জিলাপি
হেসে হেসে থাকুন হ্যাপি।