জ্বলদর্চি

দেবরাজ চক্রবর্তী (সর্পবন্ধু, মেদিনীপুর)/ ভাস্করব্রত পতি

মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২১৭
দেবরাজ চক্রবর্তী (সর্পবন্ধু, মেদিনীপুর) 

ভাস্করব্রত পতি

তিনি পেশায় একজন ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি এবং গ্রিল মিস্ত্রি। আর নেশায় পরিবেশ সচেতন নাগরিক হিসেবে সর্পকূলের উদ্ধারকর্তা। কথ্য বাংলায় 'সর্পবন্ধু'। Snake Rescueier! পেটের টানে তাঁর হাতে থাকে কাটিং ও কাটার টুলস, হ্যাকস ব্লেড বা মেটাল কাটিং, অ্যাঙ্গেল গ্রাইন্ডার, কাটিং টর্চ ও রেগুলেটর ইত্যাদি। আর নেশার প্রয়োজনে তাঁর হাতে থাকে স্নেক ক্যাচার বা টং, স্নেক হুক বা লাঠি, গ্লাভস, সুতির ব্যাগ বা স্নেক ব্যাগ, পিভিসি বা ক্যানভাস টিউব, স্নেক গেইটার্স বা লেগ গার্ড, ফ্ল্যাশলাইট বা হেডল্যাম্প ইত্যাদি। 
গোখরো হাতে দেবরাজ চক্রবর্তী

মেদিনীপুর শহরের মহাতাবপুরে বাড়ি সর্পবন্ধু দেবরাজ চক্রবর্তীর। রাতবিরেতে কিংবা যেকোনো সময়ে ফোন এলেই 'দে ছুট'। বাইকের হ্যাণ্ডেলটা ধরেই ফোনকর্তার বাড়িতে হাজির সশরীরে। বাড়ির মধ্যে লুকিয়ে থাকা কালান্তক কালাচ, গদ্দার গোখরো কিংবা চাঁদপানা চন্দ্রবোড়া -- এক নিমেষেই হাতের মুঠোয়। সস্নেহে সেইসব Deadly Weapon গুলি চালান হয়ে যায় তাঁর নিরাপদ স্নেকব্যাগের মধ্যে। গৃহকর্তা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। পাড়া প্রতিবেশি স্বস্তির শ্বাস নিলেন। আর জীবন মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে অকুতোভয় 'ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি' দেবরাজ চক্রবর্তী জিইয়ে রাখলেন তাঁর 'সর্পবন্ধু' তকমাটি। রক্ষা করলেন নিজের Uncommon নেশাটিকে। অবশেষে স্নেকব্যাগের মধ্যেকার নিউরোটক্সিক প্রাণীগুলোকে কাঁধে তুলে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে আসা হয় তাদের নিরাপদ বসতভূমিতে। যেখানে স্বার্থপর মনুষ্যকূল তাঁদের বেঁচে থাকার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়না। তাদের ক্ষতি করবে না। ফলে, বাঁচলো সাপ, বাঁচলো প্রকৃতি। বাঁচলো পরিবেশ, বাঁচলো বায়োডাইভার্সিটি।
ওড়িশার বাংরিপোশিত থেকে উদ্ধার করা এই সেই কিং কোবরা

বাবা দেবজ্যোতি চক্রবর্তী ও মা মঞ্জুলা চক্রবর্তী। স্ত্রী আল্পনা ও দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে সুখদুঃখের সংসার। কলকাতার বেহালায় মামাবাড়িতে ১৯৮৮ এর ২৩ শে ডিসেম্বর জন্ম। কিন্তু এখন থাকেন পৈতৃক এলাকা মেদিনীপুর শহরের মহাতাবপুরে। নিজস্ব বাড়ি নেই আজও। ভাড়াবাড়িতে তাঁর দিন গুজরান। অভাব তাঁর নিত্য সঙ্গী। কিন্তু সেসব তিনি গায়ে মাখেননা। জান্তব 'ঠকাস্ ঠাঁই' শব্দ আর পাশব 'হিস্ হিস্' শব্দ শুনতে শুনতেই কখন দিন কেটে গিয়ে রাত আসে, রাত কেটে গিয়ে ভোর হয় -- তিনি খবর রাখেননা। প্রয়োজন বোধ করেননা। আসলে তাঁর জীবনদর্শনটাই আলাদা। যেমনি দুঃখ, অভিমান, ক্রোধ, ক্ষোভ, অপ্রাপ্তি তাঁকে বিচলিত করেনা। তেমনি আনন্দ, সুখ, প্রাপ্তি তাঁকে আবেগতাড়িতও করেনা। নির্লিপ্ততা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে তাঁর জীবনযৌবনের পরতে পরতে। 

গত ২৬ বছরের বেশি সময় ধরে সাপোদ্ধার করছেন তিনি। যে সময় থেকে তিনি স্বেচ্ছায় সাপধরার হাতেখড়ি নিয়েছিলেন, তখন সেই বয়সের ছেলেমেয়েরা ঐকিক নিয়মের অঙ্কটাই করতেই শেখেনি। প্রথম সাপ ধরার অভিজ্ঞতা ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়তে পড়তে। তা ছিল এক কিলবিলে সুপার কিলার কেউটে। জানতেননা, তা আসলে মারাত্মক মারণাস্ত্র। বুঝতেননা, একটু ভুলচুক হলেই কেল্লা ফতে। এক ছোবলেই ছবি হতে কয়েক মুহূর্ত লাগতে পারে! আসলে ঐটুকু বয়সে নিছক রোমাঞ্চ অনুভবের লক্ষ্যে সাপেদের দিকে হাত বাড়ানো তাঁর। ভেবেছিলেন বাড়ির উঠোনে বসে লৌকিক 'কাটাকুটি খেলা'র মতোই কেউটে ধরাও অনায়াস এক খেলা। কিন্তু পরবর্তীতে অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝেছেন, এ আসলে 'আগুন নিয়ে খেলা'। 

তাঁর এই সাপকেন্দ্রিক 'ব্রেন ক্যাপচারে'র মূল স্থপতি ছিল টেলিভিশনের জনপ্রিয় ডিসকভারি চ্যানেল। সেখানে দেখানো হত 'খপ খপ' করে সাপধরার নানা কারসাজি ও কৃৎকৌশল। তিনিও ভাবলেন, এরকম করতে পারা মনে হয় 'বাম হাতের খেল'। মনে মনে পোষণ করতেন এরকম কাজ তিনিও পারবেন। আর তার জেরে মনের কোনে অচিরেই স্থান পেয়ে যায় রোমুলাস হুইটেকার, জুলিয়া বেকার, রেমণ্ড হোসার, ভাভা সুরেশ, স্টুয়ার্ট ম্যাকেঞ্জিদের নাম ও কাজ। আর আজ তিনি এরাজ্যের অন্যতম একজন সর্প উদ্ধারকারী অসমসাহসী ব্যক্তিত্ব। সাপেদের বন্ধু - 'সর্পবন্ধু'। বিষধর সাপেদের হাতের মুঠোয় ধরে নিজের বশবর্তী করে রাখতে পারাটা তাঁর এখন সত্যিকারেরই 'বাম হাতের খেল'! 

সেই শুরু। এরপর কোনও পরিচিতজনদের বাড়িতে সাপ ঢুকলেই সেইসব লোকজনদের আর্তিভরা আহ্বান ও আবেদন জুটতো বাড়ি থেকে সাপ বের করে দেওয়ার জন্য। তখন থেকেই আপদে বিপদে পাশে দাঁড়াতেন তাঁদের। উদ্ধার করতেন কালাচ থেকে কালনাগিনী। আর লোকমুখে হয়ে উঠতে শুরু করলেন 'স্নেক রেসকিউয়ার'।  

কোনও প্রথাগত প্রশিক্ষন তাঁর নেই। কোনও সেন্টার থেকে তিনি কোর্স করেননি এজন্য। কেউ তাঁকে হাতে ধরে শিখিয়েও দেননি। পুরোপুরি মহাভারতের একলব্যের মতো সাপোদ্ধারের যাবতীয় খুঁটিনাটি পদ্ধতি তিনি শিখেছেন টেলিভিশনে প্রচারিত 'ডিসকভারি চ্যানেল'কে গুরুদেব দ্রোণাচার্য হিসেবে মান্যতা দিয়েই। নিবিড় পর্যবেক্ষণ আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির ওপর ভর করে তাঁর 'পরিবেশপ্রেমী সাপুড়ে' হয়ে ওঠা। যদিও তিনি সাপের নিয়ে খেলা দেখাননা। সাপখেলা দেখিয়ে অর্থোপার্জনও করেননা। তিনি সাপেদের ত্রাতা। সাপেদের জীবন রক্ষাকর্তা। পথভ্রষ্ট সাপেদের উদ্ধার করে ফিরিয়ে দেন তাদের নিজস্ব বিচরণভূমিতে। বেঁচে থাকুক সর্পকূল। 

এর পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধিতেও তাঁর উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো। একদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার, অন্যদিকে সশরীরে উপস্থিত থেকে বিভিন্ন আলোচনা সভায় তিনি জনমানসে গেঁড়ে থাকা সাপ নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে সচেষ্ট থাকেন। সেইসাথে চিনিয়ে দেন কোন সাপ কিরকম। কোনটা বিষধর বা কোনটা বিষহীন। আর সর্পদংশনের পর কি করা উচিত এবং কি করা উচিত নয় -- তাও তিনি তুলে ধরেন মানুষের কাছে। স্কুল, কলেজ, ক্লাবের অনুষ্ঠানে আয়োজিত সেমিনারগুলিতে তাঁর বক্তব্য হয়ে ওঠে অত্যন্ত মনোগ্রাহী এবং চিত্তাকর্ষক। 

তমলুক থেকে তলকুই, রামনগর থেকে রসকুণ্ডু - তাঁকে ছুটতে হয় বাড়িতে সাপ ঢুকলেই। গাঁটের কড়ি খসিয়ে সারা মেদিনীপুর তাঁকে পাড়ি দিতে হয় নিজের দুচাকার লজঝড়ে বাইক নিয়েই। বিনিময়ে কখনো কেউ সামান্য কিছু রাহা খরচ দিলেও বেশিরভাগ সময় সেটুকুও জোটেনা। তাঁর মূল কার্যক্ষেত্র মেদিনীপুর শহর হলেও এখান থেকে ময়না, ঝাড়গ্রাম, চন্দ্রকোনা, লোয়াদা, কোলাঘাট, কাঁথি, পিংলা, কেশপুর, ডেবরা, ঘাটাল, নয়াগ্রাম, বেলদা, সবং, রাধামনি যেতে যে পরিমাণ পরিশ্রম আর সময় নষ্ট হয় তার মূল্যও কেউ দেয়না। তবুও তিনি যান। পেটে খিদে, সংসারের হাঁড়ির রসদ জোগাড়ের কাজ কারবার ফেলে পরিবেশ প্রকৃতিকে রক্ষায় তিনি এগিয়ে আসেন কোনও কিছু পাওয়ার আশা না করেই। হয়তো দিনের শেষে সারাদিনের উপার্জনের টাকাটা চলে যায় বাইকের তেলের পেছনে! তবুও তাঁর মুখে বিরক্তি নেই, রাগ নেই, অভিমান নেই, দুঃখ নেই। নির্ভিক চিত্তে তিনি গেরস্থের বসতবাটির অন্দরমহল থেকে সস্নেহে উদ্ধার করেন পাইথন, চিতি, ঢেমনা, শাঁখামুটি থেকে কিং কোবরা, গোখরো, খরিস, কেউটে, বোড়া। 

এখনও পর্যন্ত প্রায় কুড়ি হাজার সাপোদ্ধার করেছেন। তাদের ফিরিয়ে দিয়েছেন নিরাপদ এলাকায়। এই বিপুল পরিমাণ সাপ বাঁচানোর সেবাব্রতের লিস্টে কিং কোবরাও রয়েছে। ২০২৫ এর ১৫ ই জুলাই সাপোদ্ধার করতে গিয়েছিলেন ওড়িশার বাংরিপোশি। সরকারি কাজে এক বটগাছ যখন উপড়ে ফেলা হয়, তখন সেখানে দেখতে পাওয়া যায় একটি ১২ ফুট লম্বা কিং কোবরা। দীর্ঘ একমাস পর মেদিনীপুর থেকে গিয়ে তিনি সেটি উদ্ধার করে ছেড়ে দিয়েছিলেন তার নিরাপদ বাসস্থানে। এ ঘটনা দেবরাজের জীবনের অন্যতম মাইলস্টোন! 

শুধু সাপ নয়, যেকোনো বিপন্ন বন্যপ্রাণী উদ্ধার করতেও তিনি ছুটে যান অকুস্থলে। কখনো আহত ঈগল, দলছুট হাতি, কচ্ছপ, পাখির ছানা, অসুস্থ পাখি তাঁর হাতের ছোঁয়ায় প্রাণ ফিরে পায়। নতুন জীবনের আলো দেখতে পায়। সেসব নিজের বাড়িতে এনে চিকিৎসা করেন নিজেই। এরপর তা ফের ছেড়ে দেন প্রকৃতির খোলা আকাশের নিচে। একবার এক কুকুরের মুখ ঢুকেছিল প্লাস্টিকের খালি বয়ামের মধ্যে। দীর্ঘদিন কেউ তা বের করতেই পারেনি। ক্ষুৎপিপাসায় কাতর মৃতপ্রায় সেই অবলা কুকুরকে বহু পরিশ্রম করে উদ্ধার করেন। মুখ থেকে বয়াম বের করে দেন। নবজীবন লাভ করেন সেই সারমেয়। 

'জীবন বাঁচানো'র ব্রত নিয়ে চলতে চলতে বেশ কয়েকবার নিজের জীবনও বিপন্ন হয়েছিল। পাবলিকের অতি উৎসাহে এবং হেনস্থার দরুন মেদিনীপুর শহরের জজকোর্ট এলাকায় বিপদের মধ্যে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। সাপের ছোবল খেয়ে হাসপাতালে কাটাতে হয়েছিল বিনিদ্র রাত। তাঁর সাপোদ্ধারের সময়ে মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় এইসব অত্যুৎসাহী জনতা। তাঁদের অপরিসীম এবং অনর্থক কৌতূহল ডেকে আনে বিপদ। আর একবার বিষধর সাপ বিষ ছিটিয়েছিল তাঁর চোখে। কিন্তু তিনি থাকেন সদাসতর্ক এবং সজাগ। অহেতুক স্টান্টবাজি দেখানো তাঁর পছন্দ নয়। মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে প্রতিদিন নেমে পড়েন এই Thankless Job এ। 'মেদিনীপুর ছাত্র সমাজ' সংগঠন তাঁর এই মহান কাজে পাশে থেকেছে নানাভাবে। দিয়েছে সহায়তা, দিয়েছে উৎসাহ। দিয়েছে কাজ করার শক্তি। 
পরিবেশ বাঁচানোর পোস্টারিং করছেন দেবরাজ

তাঁর এই 'অর্থহীন' কাজের জন্য একসময় কল্যাণী পৌরসভার পক্ষ থেকে পেয়েছেন 'মহাশ্বেতা দেবী স্মারক সম্মাননা'। সেইসাথে মেদিনীপুর প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে 'অনন্য সম্মাননা'এবং মেদিনীপুর ছাত্র সমাজের থেকে 'সর্বপল্লি সম্মাননা' জুটেছে তাঁর কপালে। ব্যাস এটুকুই। সমাজের আর কেউ তেমনভাবে তাঁর কাজে পাশে দাঁড়াতে চায়নি। তাতে কি? তিনি নির্লিপ্ত। 

আজও বনদপ্তরের পক্ষ থেকে জোটেনি 'স্নেক রেসকিউয়ার' হিসেবে কোনও বৈধ অনুমতিপত্র। ফলে বহুক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের উৎকট সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। প্রায়শঃই মানুষের ভ্রান্ত ধারণার শিকার হতে হয় সাপোদ্ধারের সময়। তবুও তিনি এভাবেই ছুটে যেতে চান সামনের দিকে। 'লক্ষ্য' তেমন কিছু নেই। সবমিলিয়ে পঞ্চাশ হাজার সাপেদের জীবনরক্ষা করতে বদ্ধপরিকর এই মানুষটি। মেদিনীপুরের সত্যিকারের 'মানুষ রতন' সর্পবন্ধু দেবরাজ চক্রবর্তীর কথায়, 'যতদিন বাঁচবো, ততদিন এভাবেই বাউণ্ডুলে হয়ে সাপেদের সেবা করে যাবো'।
🍂

Post a Comment

0 Comments