জাতীয় সম্প্রচার দিবস
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ২৩শে জুলাই, জাতীয় সম্প্রচার দিবস। এই দিনটিকে জনজীবনের সঙ্গে সংযোগের এক ঐতিহাসিক মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। সম্প্রচার বলতে কি বুঝি এবং এই দিনের গুরুত্ব কি, আসুন সবকিছুই বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
প্রতি বছর ২৩শে জুলাই ভারতে পালিত হয় জাতীয় সম্প্রচার দিবস (National Broadcasting Day)। এই দিনটি ভারতের সম্প্রচার ব্যবস্থার ঐতিহাসিক যাত্রাকে স্মরণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। ১৯২৭ সালের ২৩শে জুলাই বোম্বে (বর্তমান মুম্বই) থেকে ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানির মাধ্যমে নিয়মিত সম্প্রচারের সূচনা হয়। তাই ভারতীয় সম্প্রচারের ইতিহাসে এই দিনটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।
রেডিও সম্প্রচার শুধু একটি প্রযুক্তিগত আবিষ্কার ছিল না, এটি ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের এক নতুন দিগন্ত। একসময় সংবাদপত্র পৌঁছতে সময় লাগত, টেলিভিশন সবার ঘরে পৌঁছায়নি, আর ইন্টারনেটের অস্তিত্বই ছিল না। সেই সময়ে রেডিও মানুষের ঘরে, ঘরে খবর, সংগীত, শিক্ষা, বিনোদন এবং নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পৌঁছে দিতে শুরু করে। শ্রোতারা একটি ছোট যন্ত্রের মাধ্যমে দেশের নানা প্রান্তের খবর জানতে পারতেন, গান শুনতে পারতেন এবং বিশ্বের সঙ্গে নিজেদের সংযোগ অনুভব করতেন।
🍂
ভারতে সম্প্রচারের ইতিহাস ১৯২৭ সালের আগেও শুরু হয়েছিল। ১৯২৩ সালের জুন মাসে বোম্বে রেডিও ক্লাব থেকে প্রথম দিকের সম্প্রচার শুরু হয়। এরপর কলকাতা ও মাদ্রাজেও সম্প্রচার কার্যক্রম গড়ে ওঠে। ১৯২৭ সালের ২৩শে জুলাই বোম্বে স্টেশনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মাধ্যমে ভারতে সম্প্রচার একটি সংগঠিত রূপ পায়। পরবর্তীকালে কলকাতাতেও সম্প্রচার শুরু হয়।
প্রথম দিকের এই যাত্রা খুব সহজ ছিল না। ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি আর্থিক সমস্যার কারণে ১৯৩০ সালে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ভারত সরকার সম্প্রচার ব্যবস্থার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং ‘ইন্ডিয়ান স্টেট ব্রডকাস্টিং সার্ভিস’ নামে কার্যক্রম চালু হয়। ১৯৩৬ সালের ৮ই জুন এই পরিষেবার নাম পরিবর্তন করে অল ইন্ডিয়া রেডিও (AIR) রাখা হয়। পরে ১৯৫৬ সালে ‘আকাশবাণী’ নামটিও জাতীয় সম্প্রচারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে উঠে।
স্বাধীনতার পর ভারতের জাতীয় জীবনে আকাশবাণীর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংবাদ, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জনসচেতনতামূলক অনুষ্ঠান প্রচারিত হতে থাকে। গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে রেডিও হয়ে ওঠে তথ্যের অন্যতম প্রধান উৎস। কৃষকদের জন্য কৃষি বিষয়ক অনুষ্ঠান, শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্য ও সামাজিক সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান সম্প্রচারের মাধ্যমে রেডিও জনকল্যাণের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
জাতীয় সম্প্রচার দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সম্প্রচার কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি সমাজ গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জরুরি পরিস্থিতি বা গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঘটনার সময় রেডিও দ্রুত মানুষের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দিতে পারে। বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেটের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও রেডিও অনেক দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষের কাছে পৌঁছতে সক্ষম। এই কারণেই আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও রেডিওর গুরুত্ব একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। ভারতের সম্প্রচার জগৎ সময়ের সঙ্গে, সঙ্গে ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। একসময়ের সীমিত পরিসরের রেডিও সম্প্রচার আজ এফএম, ডিজিটাল রেডিও, অনলাইন স্ট্রিমিং এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। আকাশবাণী আজও বহু ভাষা ও উপভাষায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে তুলে ধরছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আকাশবাণী দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ও বিপুল জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছনোর পাশাপাশি ২৩টি ভাষা ও ১৭৯টি উপভাষায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে।
সম্প্রচার মাধ্যম ভারতের সংস্কৃতির সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। লোকসংগীত, শাস্ত্রীয় সংগীত, নাটক, কবিতা, সাহিত্য আলোচনা এবং আঞ্চলিক সংস্কৃতির নানা দিক রেডিওর মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছেছে। অনেক শিল্পী ও সাহিত্যিক তাঁদের সৃষ্টিকে বৃহত্তর শ্রোতৃসমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। ফলে সম্প্রচার মাধ্যম একদিকে যেমন বিনোদন দিয়েছে, অন্যদিকে দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেও সমৃদ্ধ করেছে।
তবে বর্তমান ডিজিটাল যুগে সম্প্রচার মাধ্যমের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের দ্রুত প্রসারের ফলে মানুষের তথ্য গ্রহণের অভ্যাস বদলেছে। এখন মুহূর্তের মধ্যে খবর মানুষের হাতে পৌঁছে যায়। কিন্তু এই দ্রুততার সঙ্গে ভুয়ো খবর, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও অসম্পূর্ণ তথ্যের সমস্যাও তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল, নির্ভরযোগ্য ও যাচাই করা তথ্য পরিবেশনের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। জাতীয় সম্প্রচার দিবস তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, তথ্য পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি সত্য ও দায়িত্বশীলতার মূল্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের প্রজন্মের কাছে রেডিও হয়তো আগের মতো একমাত্র বিনোদনের মাধ্যম নয়, কিন্তু এর ঐতিহাসিক ও সামাজিক গুরুত্ব এখনও অপরিসীম। রেডিও আমাদের শোনার অভ্যাস তৈরি করেছে, কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত করেছে এবং শব্দের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে মানুষের এক অদৃশ্য সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। প্রযুক্তি বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু মানুষের কাছে সঠিক তথ্য ও মানবিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার মূল উদ্দেশ্যটি আজও একই রয়ে গেছে।
জাতীয় সম্প্রচার দিবস তাই শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক দিন নয়, এটি ভারতের যোগাযোগ, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও জনসচেতনতার দীর্ঘ যাত্রার স্মারক। ১৯২৭ সালের সেই সূচনা থেকে আজকের ডিজিটাল সম্প্রচার পর্যন্ত ভারতীয় সম্প্রচার ব্যবস্থা বহু পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে। ভবিষ্যতে নতুন প্রযুক্তি আরও উন্নত হবে, সম্প্রচারের ধরনও বদলাবে। তবুও মানুষের কাছে সত্য, জ্ঞান, সংস্কৃতি ও মানবিকতার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার যে মূল আদর্শ তা চিরকালই প্রাসঙ্গিক থাকবে।
0 Comments