মইনুদ্দিন সরদার
শিক্ষক দিবসে আমরা শিক্ষকদের কী দিই? ফুল, শুভেচ্ছা, একটি কলম, হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি সুন্দর কথা। এগুলো ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রকাশ—নিশ্চয়ই মূল্যবান। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, একজন শিক্ষক সত্যিই আমাদের কাছে কী চান? তিনি কি চান একটি দিনের সম্মান, নাকি চান তাঁর শেখানো কথাগুলো আমাদের জীবনে বেঁচে থাকুক?
মাসুদুর রহমান স্যারের সঙ্গে
শিক্ষক মানে শুধু পাঠ্যবইয়ের একটি অধ্যায় বুঝিয়ে দেওয়া মানুষ নন। শ্রেণিকক্ষে তিনি যে পাঠ দেন, তার অনেকটাই বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না। কীভাবে ভুল স্বীকার করতে হয়, কীভাবে পরিশ্রম করতে হয়, কীভাবে ব্যর্থতার পর আবার দাঁড়াতে হয়, কীভাবে অন্যের প্রতি সম্মান দেখাতে হয়—এসবও শিক্ষারই অংশ। কখনো একটি কঠিন প্রশ্নের উত্তর শেখাতে শেখাতে তিনি আমাদের চিন্তা করতে শেখান; কখনো একটি ভুলের জন্য শাসন করতে গিয়ে শেখান দায়িত্ববোধ। তখন হয়তো আমরা সবকিছুর অর্থ বুঝি না। কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলে বুঝতে পারি, সেই কথাগুলোর মধ্যেই ছিল আমাদের ভালো চাওয়ার চেষ্টা।
আমরা অনেক সময় শিক্ষকের শাসনকে কঠোরতা মনে করি। মনে হয়, কেন এত বকাঝকা? কেন এত নিয়ম? কেন ভুল করলে ছাড় নেই? অথচ একজন শিক্ষক যদি আমাদের ভুল দেখিয়ে না দেন, তাহলে আমরা নিজেদের ভুলকে কীভাবে চিনব? যে মানুষটি আমাদের সাময়িক অসন্তোষের কারণ হয়ে ওঠেন, তিনিই হয়তো ভবিষ্যতের বড় ভুল থেকে আমাদের রক্ষা করছেন। তাই শিক্ষকের শাসনের মধ্যেও যে মমতা থাকে, সেটি বোঝার মতো পরিণত বোধ আমাদের অনেক সময় পরে আসে।
🍂
শিক্ষকের প্রতি আমাদের কর্তব্যও তাই শুধু সম্মানসূচক শব্দে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তাঁদের সময়ের মূল্য দেওয়া, মন দিয়ে পড়াশোনা করা, শ্রেণিকক্ষে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, প্রশ্ন থাকলে বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাওয়া এবং অকারণে তাঁদের অসম্মান না করা—এসবই একজন শিক্ষার্থীর প্রথম দায়িত্ব। শিক্ষক যে পরিশ্রম করে আমাদের সামনে দাঁড়ান, সেই পরিশ্রমের মর্যাদা দেওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো শেখার প্রতি আন্তরিক হওয়া।
তবে শিক্ষকের প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় কর্তব্য হয়তো আরও গভীরে। তাঁরা আমাদের যে মূল্যবোধ শেখান, তা জীবনে প্রয়োগ করা। শিক্ষক যদি সততার কথা বলেন, আমরা যেন সুযোগ পেলেই অসততার পথ বেছে না নিই। তিনি যদি মানবিক হতে শেখান, আমরা যেন দুর্বল কাউকে অপমান না করি। তিনি যদি পরিশ্রমের কথা বলেন, আমরা যেন সহজ পথের লোভে নিজের স্বপ্ন ছেড়ে না দিই। কারণ একজন শিক্ষকের শিক্ষা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা খাতার উত্তর থেকে উঠে এসে জীবনের আচরণে প্রকাশ পায়।
একজন শিক্ষক আসলে শুধু একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ তৈরি করেন না; তিনি ধীরে ধীরে একটি সমাজের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন। আজ যে ছাত্রটি শ্রেণিকক্ষে বসে আছে, কাল সে চিকিৎসক, কৃষক, শিল্পী, প্রশাসক, শিক্ষক, শ্রমিক কিংবা অন্য কোনো পেশার মানুষ হতে পারে। তার জ্ঞান ও দক্ষতার সঙ্গে যদি শিক্ষকের শেখানো নৈতিকতা যুক্ত হয়, তাহলে তার কাজের প্রভাব শুধু নিজের জীবনে নয়, চারপাশের মানুষের জীবনেও পড়ে। তাই শিক্ষককে সম্মান করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সম্মান করা।
শিক্ষক দিবস এলেই আমরা নানা আয়োজন করি। কার্ড বানাই, ফুল দিই, অনুষ্ঠান করি, বক্তৃতা দিই। এসবের আনন্দ আছে, আবেগ আছে। কিন্তু শিক্ষককে ভালোবাসার অর্থ যদি শুধু একটি দিনের অনুষ্ঠানে আটকে থাকে, তাহলে সেই ভালোবাসা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একটি ফুল একদিন শুকিয়ে যায়, একটি শুভেচ্ছা একদিনের মধ্যেই পুরোনো হয়ে যায়; কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর ভালো মানুষ হয়ে ওঠা একজন শিক্ষকের শিক্ষাকে বহুদিন বাঁচিয়ে রাখে।
শিক্ষকও তো মানুষ। তাঁদেরও ক্লান্তি আছে, দুশ্চিন্তা আছে, ব্যক্তিগত জীবন আছে। প্রতিদিন একই নিষ্ঠায় শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে বহু শিক্ষার্থীর প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, দুর্বল ছাত্রকে বারবার বোঝানো, কারও ভুল শুধরে দেওয়া—এসবের পেছনে যে শ্রম থাকে, তা আমরা সবসময় দেখতে পাই না। তাই তাঁদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, তাঁদের কথা মন দিয়ে শোনা এবং তাঁদের মানবিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা আমাদের দায়িত্বেরই অংশ।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার—শিক্ষকের অবদান সবসময় পরীক্ষার নম্বরে মাপা যায় না। কোনো ছাত্র হয়তো জীবনে বড় সাফল্য অর্জন করবে, কেউ হয়তো নিজের ছোট্ট পরিসরে সৎ ও দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে থাকবে। কিন্তু দুজনের জীবনেই কোনো না কোনো শিক্ষকের শেখানো একটি বাক্য, একটি উপদেশ কিংবা একটি সংশোধন নীরবে কাজ করে যেতে পারে। শিক্ষকের কাজ অনেকটা বীজ বোনার মতো; বীজ বোনার মুহূর্তে তার ভবিষ্যৎ বৃক্ষটি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু একদিন তার ছায়ায় অনেক মানুষ দাঁড়াতে পারে।
আমাদেরও তাই প্রশ্ন করা উচিত—আজ আমি শিক্ষকের কাছ থেকে কী পেলাম, আর আগামীকাল সেই শিক্ষাকে কীভাবে কাজে লাগাব? এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো শিক্ষক দিবসের সবচেয়ে সত্যিকারের উদযাপন।
তাই শিক্ষক দিবসে শুধু বলি না—“স্যার, আপনাকে শ্রদ্ধা করি” বা “ম্যাম, আপনাকে ধন্যবাদ।” আমাদের জীবনও যেন একদিন তাঁদের প্রতি সেই কথার সত্যতা প্রমাণ করে। আমরা যখন সত্য কথা বলি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াই, কাউকে সাহায্য করি, নিজের কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে করি, তখনই শিক্ষকের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা বাস্তব হয়ে ওঠে।
শিক্ষককে দেওয়ার মতো সবচেয়ে বড় উপহার কোনো দামী জিনিস নয়। কোনো ফুলও নয়। আমাদের চরিত্র, আমাদের মানবিকতা, আমাদের সততা এবং আমাদের ভালো হয়ে ওঠাই হতে পারে তাঁদের জন্য সবচেয়ে সুন্দর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
6 Comments
মইনুদ্দিন খুব ভালো লিখেছো ,লেখায় যে সরলতা আছে,সেটা বজায় রেখো সারাজীবন।অনেক শুভেচ্ছা ও আশীর্বাদ রইল।
ReplyDeleteধন্যবাদ, আমার জন্য আশীর্বাদ করবেন
Delete"শিক্ষকের কাজ অনেকটা বীজ বোনার মতো; বীজ বোনার মুহূর্তে তার ভবিষ্যৎ বৃক্ষটি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু একদিন তার ছায়ায় অনেক মানুষ দাঁড়াতে পারে।"-- খুব মূল্যবান কথা বলেছেন। একজন শিক্ষক মানব জমিন আবাদ করেন এই বিশ্বাস থেকে যে একদিন সেই জমি ভরে উঠবে সোনার ফসলে। সেই সুঘ্রাণ পাবার জন্যই সংবেদনশীল শিক্ষকেরা পথ চেয়ে বসে থাকেন। ভালো থাকবেন সবসময়।
ReplyDeleteধন্যবাদ স্যার, আপনাদের আশীর্বাদে আমি যেনো ভালো ভাবে জীবনে সঠিক পথে চলতে পারি। লেখা লেখি, নাটক বা অভিনয় এবং পড়াশুনার করে জীবনে যেনো সাফল্যের পথে এগিয়ে যেতে পারি।
Deleteধন্যবাদ
ইতি -
মইনুদ্দিন সরদার
মইনুদ্দিন তোমাকে অনেক ভালোবাসা ও স্নেহাশীষ জানাই। নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকো আর বিশ্বস্ত থেকো নিজের প্রতি। লেখালেখি করো। থেমে যেওনা।
ReplyDeleteএকদম স্যার আমি চেষ্টা চালিয়ে যাব
Delete