সুদর্শন নন্দী
স্বপ্নের এক শ্রুতিমধুর গান দিয়ে এই স্বপ্নকথন শুরু করা যেতে পারে । প্ৰিয় গায়িকা হৈমন্তী শুক্লার এই স্বপ্নীল গান আমাদের মতো পুরানো দিনের হারানো মানুষদের কানে এখনো বাজে।
এমন স্বপ্ন কখনো দেখিনি আমি
মাটিতে যে আজ স্বর্গ এসেছে নামি
........দু'চোখে যে আজ শুধু স্বপ্নেরই তৃষা
চলার এ পথে পেয়েছি নতুন দিশা
শান্ত নিমেষে মুক্ত জীবন মুক্তোর চেয়ে দামী
এমন স্বপ্ন কখনো দেখিনি আমি।
এ স্বপ্ন জেগে দেখার স্বপ্ন, যে স্বপ্নের অমোঘ টানে মাটিতে স্বর্গ নেমে আসে। এরকম স্বপ্ন গানে যতটা সম্ভব বাস্তবের মাটিতে ততটাই কঠিন।
স্বপ্ন আনন্দের হলে তো কথাই নেই। তা নাই বা হল বাস্তব, হোক না মিথ্যে। মান্না দে তাই তো গেয়েছেন স্বপন যদি মধুর এমন হোক সে মিছেই কল্পনা।
আবার আজগুবি স্বপ্নের আনন্দই আলাদা।
আজগুবি স্বপ্নের কথা সরস ছড়ায় কবিগুরু কি সুন্দর লিখে গেছেন :
একদিন রাতে আমি স্বপ্ন দেখিনু,
‘চেয়ে দেখো’ ‘চেয়ে দেখো’ বলে যেন বিনু।
চেয়ে দেখি ঠোকাঠুকি বরগা-কড়িতে,
কলিকাতা চলিয়াছে নড়িতে নড়িতে।
স্বপ্নে কলকাতা শহর দিব্যি হেঁটে চলেছে।
সর শেষে কি হল? কবি লিখেছেন,
"কিসের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল যেই,
দেখি কলিকাতা আছে কলিকাতাতেই।"
আর স্বপ্নে এটাই সত্য।
আবার স্বপ্নের বিছানা কবিতায় পূর্ণেন্দু পত্রী লিখেছেন : স্বপ্নেই শুধু দ্বিতীয়বার ফিরে পাওয়া যায় শৈশব। সত্যিই তাই। ফেলে আসা জীবন স্বপ্নেই ফিরে পাওয়া যায়।
জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা স্বপ্নের হাতে। জীবনানন্দ দাশ তাঁর লেখায় স্বপ্ন এক গভীর দার্শনিক রূপ পেয়েছে।
বিভিন্ন কবি স্বপ্ন নিয়ে এরকম স্বপ্নমাখা কবিতা লিখেছেন।
সব মানুষই দুরকম স্বপ্ন দেখেন। একটা দুচোখ মেলে, যাকে জীবনের স্বপ্ন বেঁচে থাকার স্বপ্নও বলা যেতে পারে। আরেক স্বপ্ন ঘুমিয়ে, দুচোখ বুজে, অবচেতন মনে। সে স্বপ্নের রকমভেদ অনেক। যে প্রবীণের ৫০ সেকেন্ড আগের কথা মনে থাকে না, তিনি দিব্যি ৫০ বছর আগেকার ঘটনা দেখে নেন স্বপ্ন-সিনেমায়। পূর্ণেন্দু পত্রীর কথায় স্বপ্নেই শুধু দ্বিতীয়বার ফিরে পাওয়া যায় শৈশব। ঘুম ভেঙে গেলেও স্বপ্নে দেখা মাধুর্যের স্মৃতিমেদুর অবস্থা কাটতেই চায় না।
দৈনন্দিন দৈন্যতার দুঃখ বা হাসি কান্নার বিভিন্ন কারণের সাথেও স্বপ্ন দেখার মিল থাকে। যেমন ভোটের পাড়ার নেতা বলে গেল, মনে করে কিন্তু জোড়া ফুলে জোরসে বোতাম টিপবেন।
আপনার একটাই মাথা। আপনি নিশ্চয়ই হ্যাঁ বলে তাকে খুশি করলেন আর ভোটের দিনে পদ্মফুলের পাঁপড়ি টিপলেন। ভয়ে যে নেই তা নয়। ভাবলেন ওরা জানতে পারবে না তো? বুক ধুক ধুক, অম্বল সম্বল করে রাতে ঘুমোলেন। এক্ষেত্রে রাতে আপনি নেতার হাতে ঘুষি কিল চড় থাপ্পড় খাচ্ছেন সেই স্বপ্নই দেখবেন।
বিজ্ঞানী বা ডাক্তারদের মতে, আমাদের ঘুমের একটি বিশেষ স্তর হল Rapid Eye Movement (REM)। এই সময়ে অক্ষিগোলোক নড়াচড়া করে হার্টরেট বেড়ে যায়, রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়। এই সময়ে আমাদের মূলত স্বপ্ন আসে। আমাদের ঘুমের ২০ শতাংশ জুড়ে থাকে রেম। এই রেম খুব অল্প সময়ের জন্য হয়। এছাড়া ঘুম যখন শেষের মুখে থাকে, তখন রেম বাড়তে থাকে। তাই ঘুমের শেষের দিকে বেশি স্বপ্ন দেখে থাকে মানুষ । ঘুম ও স্বপ্নের মাধ্যমে মস্তিষ্ক সারাদিনের সংগৃহীত তথ্য থেকে প্রয়োজনীয় স্মৃতিগুলো দীর্ঘস্থায়ী অংশে সেভ (জমা ) করে এবং অপ্রয়োজনীয় স্মৃতিগুলো ডিলিট করে দেয় মোবাইল বা কম্পিউটারের মতো । মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা আবেগ, ভয়, বা দুশ্চিন্তাগুলোকে মস্তিষ্ক স্বপ্নের মাধ্যমে পুনর্গঠন করে।
স্বপ্ন আমরা প্রতিটা মানুষই দেখি। স্বপ্ন (Dream) একদম স্বাভাবিক বিষয়। স্বপ্ন ঘুমের মধ্যে পরপর আমাদের চোখের সামনে ভাসতে থাকে।
সেক্ষেত্রে যে কোনও মানুষ স্বপ্ন দেখতে পারেন।
অনেকের মতে স্বপ্নের মাধ্যমে আমাদের স্মৃতি পোক্ত হয়। আমাদের আবেগ সঠিক পথে চালিত হতে পারে স্বপ্নের মাধ্যমে। সারাদিনে মস্তিষ্ক অনেক তথ্য সংগ্রহ করে ফেলে। এবার সেই তথ্যকে ছোট করতে প্রয়োজন হয় স্বপ্ন দেখার। এছাড়া স্বপ্নের মধ্যে বহু সৃজনশীল কাজে লাভ মেলে। এমনটা হতেই পারে যে লেখার একটা ভালো প্লট মাথায় এল লেখকের । ছবি আঁকার দৃশ্যপট তৈরি হয়ে গেল শিল্পীর।
কখনো স্বপ্ন ভয়ংকর, কখনো আনন্দদায়ক, আবার কখনো তা বেশ আশঙ্কারও কারণ হয়। কোনো কোনো মানুষ আবার স্বপ্ন নিয়ে অনেক বেশি ভাবনা–চিন্তা করে। স্বপ্নের মানে খুঁজে বেড়ায়। স্বপ্নের খানিকটা আধুনিক সংজ্ঞা পাওয়া যায় ফ্রয়েডের তত্ত্বে। তাতে মূল কথা হল এই, মানুষের মনের অমীমাংসিত ও অবদমিত ইচ্ছাগুলো মীমাংসার একটি সুযোগ সৃষ্টি করে স্বপ্ন। সিগমুন্ড ফ্রয়েড মনে করতেন যে স্বপ্ন হলো আমাদের অবচেতন মনের একটি জানালা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে স্বপ্নের মাধ্যমে একজন ব্যক্তির অবচেতন আকাঙ্ক্ষা, চিন্তাভাবনা ও প্রণোদনা প্রকাশিত হয়।
কোনো কোনো গবেষক বলেন, স্বপ্নের কোনো কারণ বা অর্থ নেই। বরং স্বপ্ন হল ঘুমন্ত মগজের অর্থহীন কর্মকাণ্ড।
শুনলে অবাক হবেন দুজন মানুষ একই সময়ে একই স্বপ্ন দেখতে পারেন। একে 'মিউচুয়াল ড্রিমিং' বলা হয়—এর কোনো প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। তবে আবেগীয় গভীর সম্পর্ক (যেমন: দম্পতি বা যমজ), সচেতন মানসিক সংযোগ, দিনভর একই অভিজ্ঞতা শেয়ার করা বা টেলিপ্যাথির মতো ধারণার মাধ্যমে অনেকেই এমন অভিজ্ঞতা পেয়ে থাকেন বলে দাবি করেন।
আবেগগতভাবে খুব কাছাকাছি থাকা দুইজন মানুষ অনেক সময় একই ধরনের চিন্তা বা অনুভূতির মধ্য দিয়ে যান, যা ঘুমের মধ্যেও তাদের অবচেতন মনকে প্রভাবিত করতে পারে। দিনের বেলা দুজন মানুষ একই ঘটনা বা স্মৃতি নিয়ে আলোচনা করলে, রাতে ঘুমানোর সময় তা তাদের মস্তিষ্কের সাবকনসাস বা অবচেতন মনে একই স্বপ্নের রূপ নিতে পারে। দুই ব্যক্তির মনের মধ্যে অদৃশ্য ও গভীর যোগাযোগের কারণে ঘুমালেও তাদের মধ্যে চিন্তার আদান-প্রদান ঘটতে পারে।
স্বপ্নে দেখা ঘটনা ঘুমন্ত অবস্থাতেও আমাদের শরীর সাড়া দেয়। যেমন আপনি স্বপ্নে ফুটবল খেলছেন। জোরে বল মারলেন গোল করতে। দেখা যায় ঘুমন্ত অবস্থাতেও আপনি জোরে পা ছুড়লেন ।
স্বপ্নের মধ্য দিয়েই আপনার পায়ে সংকেত গেল। কোন ভয়ের স্বপ্নে আপনি সত্যি সত্যি চিৎকার করে ওঠেন। স্বপ্নে চোর ঢুকেছে দেখে আপনি সত্যি চোর চোর আওয়াজ করতে পারেন। ঘুম ভেঙে গেলে সে এক বিরাট স্বস্তি । স্বপ্ন কখনো কখনো জীবনের অন্য মানুষের, সমাজের বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসে। যেমন রাণী রাসমণি যে দক্ষিণেশ্বরে ভবতারিণী মন্দির নির্মাণ করেন সেই নির্মাণের আদেশ তিনি স্বপ্নে পেয়েছিলেন। আর সেখান থেকে আমরা পেলাম ঠাকুর রামকৃষ্ণ, মা সারদা, স্বামী বিবেকানন্দকে। এরকম অনেক বিজ্ঞানী, গবেষক তাদের অনেক সূত্রই স্বপ্ন থেকে আহরণ করেছেন বলে শুনেছি।
স্বপ্ন নিয়ে মজার মজার ঘটনাও শোনা যায়। আমার এক বন্ধু স্বপ্ন নিয়ে বলল, জানিস স্বপ্নের একটা জিনিস কিছুতেই বুঝতে পারি না।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম কি বুঝতে পারিস না? সে উত্তর দিল, স্বপ্নে দৌড়ালে ঘুম ভেঙে দেখি সেটি মিথ্যে। স্বপ্নে কোন কিছু খাচ্ছি দেখে ঘুম ভাঙলে দেখি সেটি মিথ্যে, স্বপ্নে মোবাইল হারিয়ে গেলে আতঙ্কে ঘুম ভেঙে গেলে দেখি স্বপ্ন মিথ্যে। কিন্তু স্বপ্নে যদি দেখি আমি ছোট টয়লেৎট করছি তবে সেটা সত্যি হয় কি করে? বিছানাও ভিজে যায় সত্যি সত্যি । স্বপ্ন তো তখন মিথ্যা হয় না। আমি উত্তর দিতে পারি নি।
এবার স্বপ্ন নিয়ে আমার জীবনের একটা সত্যি ঘটনা বলি। বছর কুড়ি আগেকার ঘটনা।
মাঝ রাতে উঠে দেখি বৌ বিছানার উপর বসে হাউ মাউ করে কাঁদছে। উঠে বললাম কি হয়েছে, খারাপ স্বপ্ন দেখলে নাকি?
সে স্বভাব মতো আরো জোরে কেঁদে উঠল। আমি বললাম জানো আমি এইমাত্র স্বপ্ন দেখলাম একটা চোরকে আমি বেধড়ক পেটাচ্ছি। কি বাজে স্বপ্ন বল দেখি?
বৌ কাঁদতে কাঁদতে এবার বলল, চোরকে কোথায়, ঐ মার তো আমার পিঠে মেরেছ? ওরে বাবারে, কি জোর জোর ঘুষি মারলে আমায়। বলে আবার সে কান্নার বাঁশি বাজাতে লাগল।
এটাকেই বোধ হয় বলে স্বপ্নের অপকারিতা।
🍂
0 Comments