দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ২৮শে জুলাই, বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। হেপাটাইটিস কি, এই রোগটি আমাদের কি ক্ষতি করে এবং কিভাবে এর প্রতিরোধ করতে পারি, আসুন সবকিছুই জেনে নিই।
হেপাটাইটিস হলো, যকৃৎ বা লিভারের প্রদাহ, যা সাধারণত ভাইরাস সংক্রমণ, অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন বা ক্ষতিকর ওষুধের কারণে হয়ে থাকে। এর প্রধান লক্ষণগুলো হলো জন্ডিস, ক্লান্তি এবং পেটে ব্যথা।
সচেতনতা, প্রতিরোধ ও নির্মূলের অঙ্গীকার
প্রতি বছর ২৮শে জুলাই বিশ্বজুড়ে পালিত হয়, বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। মানুষের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যকৃত বা লিভারকে আক্রান্ত করে এমন ভাইরাসজনিত রোগ হেপাটাইটিস সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোই এই দিবসের প্রধান উদ্দেশ্য। হেপাটাইটিস এমন একটি স্বাস্থ্যসমস্যা, যা অনেক সময় নীরবে শরীরে বাসা বাঁধে এবং দীর্ঘদিন পরে গুরুতর আকার ধারণ করে। তাই সময়মতো সচেতনতা, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের মাধ্যমে এই রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
‘হেপাটাইটিস’ শব্দের অর্থ লিভারের প্রদাহ। বিভিন্ন ধরনের ভাইরাসের কারণে হেপাটাইটিস হতে পারে। এর মধ্যে হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি এবং ই উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি ধরনের সংক্রমণের ধরন, উপসর্গ ও চিকিৎসা পদ্ধতি আলাদা হলেও হেপাটাইটিস বি ও সি দীর্ঘমেয়াদি লিভারের রোগ, সিরোসিস এবং লিভার ক্যানসারের অন্যতম কারণ হতে পারে। এই কারণে হেপাটাইটিসকে শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসমস্যা হিসেবে নয়, একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবেও দেখা হয়।
হেপাটাইটিসের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো,অনেক আক্রান্ত মানুষের শরীরে দীর্ঘদিন কোনো স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না, ফলে একজন ব্যক্তি নিজের অজান্তেই সংক্রমিত থাকতে পারেন এবং কখন, কখন অন্যের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারেন। ক্লান্তি, ক্ষুধামন্দা, বমি, বমি ভাব, পেটের অস্বস্তি, জ্বর, গাঢ় রঙের প্রস্রাব এবং চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া, এসব হেপাটাইটিসের সম্ভাব্য লক্ষণ, তবে উপসর্গ না থাকলেও সংক্রমণ থাকতে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
🍂
হেপাটাইটিস এ ও ই সাধারণত দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়াতে পারে। জল খাওয়া,খাবার ঢেকে রাখা, শৌচাগার ব্যবহারের পর এবং খাবার খাওয়ার আগে ভালোভাবে হাত ধোয়া এসব অভ্যাস সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। অন্যদিকে হেপাটাইটিস বি, সি ও ডি মূলত সংক্রমিত রক্ত বা শরীরের নির্দিষ্ট তরলের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। অনিরাপদ ইনজেকশন, জীবাণুমুক্ত নয়, এমন চিকিৎসা সরঞ্জাম, সংক্রমিত রক্ত এবং কিছু ক্ষেত্রে মা থেকে শিশুর মধ্যে সংক্রমণ এসব পথেও রোগ ছড়াতে পারে। তাই চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবায় নিরাপদ পদ্ধতি অনুসরণ করা অপরিহার্য। হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধে টিকা একটি অত্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা। নবজাতক ও শিশুদের টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে সুরক্ষা দেওয়া যায়। একইভাবে, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, একবার ব্যবহারযোগ্য বা যথাযথভাবে জীবাণুমুক্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার এবং সংক্রমণ সম্পর্কে সচেতনতা রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হেপাটাইটিস সি-এর ক্ষেত্রে বর্তমানে কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে, যা অনেক রোগীর শরীর থেকে ভাইরাস নির্মূল করতে সক্ষম। তবে রোগটি শনাক্ত করার জন্য পরীক্ষা করা জরুরি।
বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, হেপাটাইটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে শুধু চিকিৎসা নয়, সামাজিক সচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই রোগ নিয়ে সমাজে নানা ভুল ধারণা ও ভয় রয়েছে। অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তিকে অকারণে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। অথচ হেপাটাইটিসের সব ধরনের সংক্রমণ সাধারণ স্পর্শ, একসঙ্গে বসা বা স্বাভাবিক সামাজিক মেলামেশার মাধ্যমে ছড়ায় না। তাই আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য নয়, প্রয়োজন সহমর্মিতা, সঠিক তথ্য এবং চিকিৎসার সুযোগ।
বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, পরীক্ষা করান, রোগ জানুন এবং সময়মতো চিকিৎসা নিন। অনেক মানুষ নিজের সংক্রমণের কথা না জানার কারণে চিকিৎসা শুরু করতে দেরি করেন। ফলে রোগ জটিল হয়ে উঠতে পারে। নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা রোগ শনাক্তকরণে সাহায্য করে। বিশেষ করে যাদের সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে, তাদের সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। একটি হেপাটাইটিসমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সহজলভ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা, টিকাদান কর্মসূচির বিস্তার, নিরাপদ চিকিৎসাব্যবস্থা এবং জনসচেতনতামূলক প্রচার, এসব উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকেও গুজব ও ভ্রান্ত ধারণার পরিবর্তে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য গ্রহণ করতে হবে।
বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস তাই কেবল একটি স্মরণীয় দিন নয়, এটি একটি সামাজিক অঙ্গীকারের দিন। হেপাটাইটিস সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন, সংক্রমণ প্রতিরোধ, সময়মতো পরীক্ষা এবং আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, এই চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দিলে রোগের বিস্তার অনেকটাই কমানো সম্ভব। একটি সুস্থ সমাজ গড়তে প্রত্যেক মানুষের সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ। আজকের দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক, হেপাটাইটিস সম্পর্কে জানব, অন্যকে জানাব, নিরাপদ স্বাস্থ্যাভ্যাস মেনে চলব এবং রোগ সম্পর্কে কোনো ধরনের বৈষম্য বা কুসংস্কার ছড়াব না। সম্মিলিত সচেতনতা ও কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থার মাধ্যমে হেপাটাইটিস নির্মূলের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস সেই আশার কথাই আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়।
0 Comments